• বুধবার , ২৭ মে ২০২০

ইতিহাসে আলোচিত নিত্যনতুন প্রাণঘাতী ভাইরাস

ভাইরাস

 করোনা ভাইরাস নিয়ে সবাই আতঙ্কিত । তবে এমন ঘটনা বিশ্বে নতুন নয় । প্রতিনিয়ত মানুষকে নিত্যনতুন প্রাণঘাতী ভাইরাসের মোকাবেলা করতে হচ্ছে এবং হয়েছে । ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক কয়েকটি ভাইরাস নিয়ে আজকের এই আয়োজন ।

ইবোলা ভাইরাসঃ

প্রথম ধরা পড়ে ১৯৭৬ সালে কঙ্গোর ইবোলা নদীতীরবর্তী অঞ্চলে । এতে আক্রান্ত হলে প্রথম উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয় মাথা ব্যথা ও গলা ব্যথা । তারপর জ্বরের সঙ্গে শুরু হয় শরীর থেকে রক্তপাত । এমনকি চোখ থেকেও ঝরতে পারে রক্ত । অকেজো হতে থাকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ । ফলে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ে । এখনো এর কোন চিকিৎসা আবিস্কার করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা । সাব সাহারান আফ্রিকায় হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে এর প্রকোপে । ৫ ধরনের ইবোলা ভাইরাস আছে । নামকরণ হয়েছে অঞ্চল অনুযায়ী-জায়ার, সুদান, তাই ফরেস্ট, বান্দিবাইগো ও রেস্টন । এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর জায়ারেরটা । সর্বশেষ ২০১৪ ও ২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকার গিনি, লাইবেরিয়া ও ‍সিয়েরা ‍লিওনে নতুন করে ছড়ায় ইবোলা ভাইরাস । এতে অন্তত ১১ হাজার মানুষ মারা যায় । এই ভাইরসের সংক্রমিত পশুর রক্ত বা শরীর রস-এর সংস্পর্শ থেকে । মনে করা হয় যে বাদুড় নিজে আক্রান্ত না হয়ে এই রোগ বহন করে ও ছড়ায় ।

সার্স ভাইরাসঃ

এই ভাইরাসের আক্রমণ হয় ২০০২ সালের নভেম্বরে, চীনের দক্ষিণের গুয়াংদং প্রদেশে । ছাড়িয়ে পড়ে বিশেষ করে হংকং, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও কানাডায় । পুরো নাম সিভিয়ান অ্যাকুইট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’(সার্স) । প্রাথমিক উপসর্গ জ্বর, গা ও গলা ব্যথা, ভয়ানক ক্লান্তি । পরে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া । তা থেকে হতে পারে মৃত্যু । এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ২৬ টি দেশের ৮ হাজারেরও বেশি মানুষ । এ রোগে মৃত্যু হয় ২৩৭ জনের । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে সার্সে আক্রান্ত হওয়ার আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি । ২০১৭ সালে এক দল চীনা গবেষক জানান এ ভাইরাসের উৎপত্তি এক প্রজাতির বাদুড় থেকে ।

মার্স ভাইরাসঃ

এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত করা হয় ২০১২ সালে সৌদি আরবে । পরে সেপ্টেম্বরে কাতারে আরেকজনের শরীরে পাওয়া যায় । নতুন ধরনের এই ভাইরাসের নাম দেওয়া হয় ‘মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনন্ড্রোম’ (মার্স) । পরের কয়েক বছরে এই ভাইরাস ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ২০টিরও বেশি দেশে । এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও আছে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে চিহ্নিত করে ‘ভবিষ্যতে মহামারি ঘটাতে সক্ষম’ ভাইরাস হিসেবে । তবে এতে কতজন আক্রান্ত হয়েছে আর কতজন মারা গেছে তা জানা যায় না ।

লাসা ভাইরাসঃ

১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার বোর্নো প্রদেশে এক নার্স প্রথম এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন । মারা যান কিছুদিনের মধ্যে । এর মধ্যে আরো দুজন একই উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিহ্নিত হয় ভাইরাসটি । পরে এর নাম দেওয়া হয় লাসা । এক ধরনের ইঁদুর এই ভাইরাস বহন করে । ছড়ায় বিষ্ঠার আশপাশের বাতাসে । বিশেষ করে সিয়েরা লিওন, গিনি, নাইজেরিয়া ও লাইবেরিয়ায় অঞ্চলে প্রতিবছরই ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ লাসা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় । মারা যাচ্ছে গড়ে প্রায় ৫০০০ জনের মতো । এতে আক্রান্ত হলে ‍শুরুতে জ্বর ও বুকে ব্যথা হয় । পরে মুখ ফুলে যায়, মস্তিষ্ক প্রদাহ হয়, শ্লেষ্মায় রক্তক্ষরণ হয় । অনেক সময় শ্রবণশক্তিও নষ্ট হয়ে যায় ।

জিকা ভাইরাসঃ

বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলে জিকা ভাইরাস । এডিস ইজিপ্টি নামে ছোট কালো রঙের সাদা চিহ্নযুক্ত এবং পয়ে ডোরাকাটা দাগযুক্ত মশার মাধ্যমে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটে । জিকা ভাইরাস ছাড়াও ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং ইয়েলো ফিভার  (পীতজ্বর) এর জন্য দায়ী এডিস ইজিপ্টি । ২০১৫ সালে ব্রাজিলে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজারের মতো নবজাতক শিশু ‘মাইক্রোসেফালি’ রোগে আক্রান্ত হয় । এই রোগে শিশুর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়া, শারীরিক বৃদ্ধি অস্বাভাবিক বা বিলম্বিত হওয়া থেকে শুরু করে অকালে মারা যাওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায় ।

জিকা নামটি নেয়া হয়েছে উগান্ডার জিকা বন থেকে । ১৯৪৭ সালে পীত জ্বর নিয়ে গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা জিকা বনে একটি খাঁচায় একটি বানর রাখেন । পরে বানরটি জ্বরে পড়লে তার দেহে একটি সংক্রামক ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয় । ১৯৫২ সালে এর নাম দেয়া হয় জিকা ভাইরাস । এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে সাধারণত জ্বর, র‌্যাশ, গোড়ালিতে ব্যথা, চোখ লাল হয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয় । এছাড়া পেশীতে ও মাথায় ব্যথা হতে পারে । ব্রাজিল ছাড়া আরও ৭০ টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে এটি ।

চিকুনগুনিয়াঃ

যে এডিস প্রজাতির মশা থেকে ডেঙ্গু ছড়ায়, সেই একই মশার কামড়ে হয় চিকুনগুনিয়া । মূলত শহরাঞ্চলে দেখা যাওয়া এ সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়ে ১৯৫২ সালে । কিন্তু ২০০৭ সালে নতুন করে গ্যাবনে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে । এরপর সারা বিশ্বে ধরা পড়ে । শুধু ২০১৬ সালেই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন ৩.৫ লাক্ষ মানুষ ।

ডেঙ্গুঃ

২০১৯ সালে এশিয়ার কয়েকটি দেশে এডিস মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে । ফিলিপাইনে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ মারা গেছে । বাংলাদেশের মতো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু । এটি এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় রোগ । এডিস মশার কামড়ে ভাইরাস সংক্রমণের ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা,বমি, পেশিতে ও গাঁটে ব্যথা এবং গাত্রচর্মে ফুসকুড়ি দেখা দেয় । কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে যাকে ডেঙ্গু ‍হেমোরেজিক ফিভার বলা হয় ।

করোনা ভাইরাসঃ

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের থাবায় লাফিয়ে লাফিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে । ইতিমধ্যেই এই ভাইরাস (আক্রান্ত রোগী) থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, ইতালি, তাইওয়ান, নেপাল, ফ্রান্স ও আমেরিকায় পাওয়া গেছে । এই ভাইরাসের উৎস বাদুড় । আক্রান্তদের জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলা ফুলে যাওয়া, কিংবা সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে সার্স আক্রান্তদের মতোই ।

পরিশেষে বলা যায়, উর্পযুক্ত ভাইরাস ছাড়াও বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়েছে মারাত্মক সব রোগ । এর মধ্যে রয়েছে স্মল পক্স ভ্যারিওলা ভাইরাস, যার টিকা আবিষ্কৃত হয় ১৭৯৬ সালে । এছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস অর্থোমিক্সোভিরিডি ফ্যামিলির একটি ভাইরাস, যা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের জন্য দায়ী । পোলিওমাইলিটিজ সংক্রামক রোগ । ১৯১৬ সালে পোলিও রোগ প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে । ১৯৫০ সালে জোনাস সাল্ক পোলিও টিকা আবিষ্কার করেন ।

 

Related Posts

Leave A Comment