• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৬)

মুখ তুলেই দেখি টেবিলের উল্টোদিকে চবকা হাওয়াইয়ান শার্ট পরে দণ্ডায়মান মিস্টার নন্দলাল বসাক। 

লালমােহনবাবু সামলে নিতে ভদ্রলােক বলেন, শুধু এইটে বলে দেবেন মিত্তিরকে এবং তরফদারকে যে, নন্দ বসাক পায়ের তলায় ঘাস গজাতে দেয় না। পচিশে ডিসেম্বর যদি শাে হয়, তাহলে সেই শাে থেকে শেষের আইটেমটি বাদ যাবে, এ গ্যারান্টি আমি দিতে পারি। |

নয়ন রহস্যআমাদের পাশেই কাফের দরজা। ভদ্রলােক কথাটা বলেই সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে অন্ধকার, তাই তিনি যে কোনদিকে গেলেন সেটা বুঝতেই পারলাম না। 

তেষ্টা মেটেনি, তাই কফিটা শেষ করে দাম চুকিয়ে আমরা আর দশ মিনিটের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে হােটেলমুখাে রওনা হলাম । 

| হােটেলে পৌছতে লাগল আধঘন্টা। ভিতরে ঢুকে দেখি লবি লােকে লােকারণ্য। শুধু লােক নয়, তার সঙ্গে অনেকখানি জায়গা জুড়ে দাঁড় কানাে অজস্র লাগেজ। বােঝাই যাচ্ছে একটা বিদেশী টুরিস্ট দল সবেমাত্র এসে পৌছেছে। ফেলুদাকে বসাকের খবরটা এক্ষুনি দিতে হবে, অই আমরা প্রায় দৌড়ে গিয়ে লিফটে ঢুকে চার নম্বর বােতামটা টিপে দিলাম । 

| চারশাে তেত্রিশের সামনে গিয়েই বুঝলাম ঘরে ফেলুদা ছাড়াও অন্য লােক আছে, আর বেশ গলা উচিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। 

বেল টেপার প্রায় পনের সেকেন্ড পরে দরজা খুলল ফেলুদা, আর আমাকে সামনে পেয়েই এক রামধমক। 

‘দরকারের সময় না পাওয়া গেলে তােরা আছিস কী করতে ? 

কাঁচুমাচু ভাবে ঘরে ঢুকে দেখি মাথায় হাত দিয়ে কাউচে বসে আছেন সুনীল তরফদার । 

‘ব্যাপারটা কী মশাই ? ভয়ে ভয়ে শুধােলেন জটায়ু। ‘সেটা ঐন্দ্রজালিককে জিজ্ঞেস করুন’, শুকনাে গম্ভীর গলায় বলল ফেলুদা। 

‘কী মশাই ? | ‘আমিই বলছি।’ বলল ফেলুদা, ‘ওর মুখ দিয়ে কথা বেরােবে না। খ করে লাইটার দিয়ে ঠোঁটে ধরা চারমিনারটা জ্বালিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে ফেলুদা বলল, নয়ন হাওয়া। কিডন্যাপড । ভাবতে পারিস ? এর পরেও ফেলু মিত্তিরের মান ইজ্জত থাকবে ? পই পই করে বলে দিয়েছিলাম ঘর থেকে যেন না বেরােয়, নয়ন যেন ঘর থেকে না বেরােয়। আর এই ভর সন্ধেবেলা—গিজগিজ করছে লবি, তার মধ্যে শঙ্করবাবু নয়নকে নিয়ে 

গেছেন বুকশপে। 

| ‘তারপর ?’—আমার বুকের ধুকপুকুনি আমি কানে শুনতে পাচ্ছি। 

‘বাকিটা বলল চমকদার মশাই, বাকিটা বলল ! নাকি এই কাজটাও আমার উপর ছাড়তে হবে ? 

ফেলুদাকে এত রাগতে আমি অনেকদিন দেখিনি। 

তরফদার হেট মাথা অনেকটা তুলে চাপা গলায় বললেন, ‘নয়ন একা ঘরে বসে অস্থির হয়ে পড়ে বলে শঙ্কর ওর জন্য গল্পের বই কিনতে গিয়েছিল । বই পেয়েও ছিল। দোকানের মেয়েটি দুটো বই প্যাক করে ক্যাশ মেমাে করে দিচ্ছিল—শঙ্কর তাই দেখছিল। হঠাৎ মেয়েটি বলে ওঠে—দ্যাট বয় ? হােয়্যার ইজ দ্যাট বয় ?—শঙ্কর পিছন ফিরে দেখে নয়ন নেই। ও তৎক্ষণাৎ দোকান থেকে বেরিয়ে লবিতে খােজে, নয়নের নাম ধরে ডাকে, একে ওকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু কোনাে ফল হয় না। লবিতে এত ভিড় তার মধ্যে একজন ন’ বছরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে…’ 

‘এটা কখনকার ঘটনা ? 

‘সেখানেই বলিহারি ! চেঁচিয়ে উঠল ফেলুদা। দেড় ঘন্টা আগে ব্যাপারটা ঘটেছে, আর সুনীল এই সবে দশ মিনিট হল এসে আমাকে রিপাের্ট করছেঃ ! 

‘বসাক’, বললেন জটায়ু । নাে ডাউট অ্যাবাউট ইট । ‘আপনি দেখি ভয়ঙ্কর আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলছেন কথাটা। আমি কাফের ঘটনাটা ফেলুদাকে বললাম। ফেলুদা গম্ভীর। ‘আই সী…আমি এটাই আশঙ্কা করেছিলাম। অথাৎ কুকীর্তিটা করার। কিছুক্ষণের মধ্যেই তােদর সঙ্গে দেখা হয়। … ‘শঙ্করবাবু কোথায় ?’ জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন। 

তরফদার মাথা না তুলেই বলল, থানায় । | ‘শুধু পুলিশে খবর দিলে ত চলবে না, বলল ফেলুদা, তােমার পৃষ্ঠপােষক আছে, তােমার থিয়েটারের মালিক আছেন। তিনি কি নয়ন ছাড়া শাে করতে রাজি হবেন ? আই হ্যাভ গ্রেট ডাউটস। 

‘তাহলে হিঙ্গেরানিকে…’ 

জটায়ু একবার ফেলুদার, একবার তরফদারের দিকে চাইলেন। 

তাঁকে খবর দেবার সাহস নেই এই সম্মােহক প্রবরের। বলছে—“আপনি কাইন্ডলি কাজটা করে দিন, মিস্টার মিত্তির! আমি গেলে সে লোেক আমাকে টুটি টিপে মেরে ফেলবে”। 

‘শুনুন–‘ লালমােহনবাবু হঠাৎ যেন ঘুম থেকে উঠলেন—“আপনারও যেতে হবে না, সুনীলবাবুরও যেতে হবে না। আমরা যাচ্ছি।কী তপেশ, রাজি ত ? | ফেলুদা ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট আর কপালে ভূকুটি নিয়ে শশাফায় 

Related Posts

Leave A Comment