• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৭)

বসে পড়ে বলল, ‘যেতে হলে এখনই যান। তােপশে, তুই ইংরিজিতে হেলপ করিস। | হিগেরানির ঘরের নম্বর দুশাে আটাশি। আমরা সিঁড়ি দিয়েই নেমে গিয়ে তার দরজার বেল টিপলাম । 

দরজা খুলল না। ‘সময়-সময় এই বেলগুলাে ওয়র্ক করে না’, বললেন জটায়ু। এবার বেশ জোরে চাপ দিও ত।

নয়ন রহস্য 

আমি বললাম, ‘ভদ্রলােকের ত বেরােবার কথা না। ঘুমােচ্ছন নাকি ? | তিনবার টেপাতেও যখন ফল হল না, তখন আমাদের বাধ্য হয়ে লবিতে গিয়ে হাউস টেলিফোনে ২৮৮ ডায়াল করতে হল। 

ফোন বেজেই চলল। নাে রিপ্লাই ।। 

ইতিমধ্যে লালমােহনবাবু রিসেপশনে গিয়েছিলেন জিজ্ঞেস করতে। তারা বলল-“মিঃ হিরােনি নিশ্চয়ই ঘরেই আছেন। কারণ তাঁর চাবি 

এখানে নেই। 

এবার জটায়ুর মুখ দিয়ে তােড়ে ইংরিজি বেরােল, ভাষা টেলিগ্রামের। বাট ইম্পর্ট্যান্ট সী হিঙ্গোরানি–ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট । নাে ডুপ্লিকেট কী ? নাে ডুপ্লিকেট কী ? 

কাজটা খুব খুশি মনেই করে দিল রিসেপশনের লােকেরা। 

চাবি হাতে বয়কে সঙ্গে নিয়ে আমরা লিফটে দোতলায় উঠে আবার হিঙ্গারানির ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

ইয়েল লক চাবি ঘােরাতেই খড়াৎ করে খুলে গেল, বয় দরজা ঠেলে দিল, আমি বললাম “থ্যাঙ্ক ইউ’, জটায়ু আমার আগেই ঘরে ঢুকে তৎক্ষণাৎ তড়াক করে পিছিয়ে আমারই সঙ্গে ধাক্কা খেলেন । তারপর অদ্ভুত স্বরে তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে তিন টুকরাে কথা বেরােল। 

‘হিং-হিং-হিক। 

ততক্ষণে আমিও ভিতরে ঢুকে গেছি, আর দৃশ্য দেখে এক নিমেষে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। 

খাটের উপর চিত হয়ে হাতপা ছড়িয়ে পড়ে আছেন মিঃ হিঙ্গেরানি। তাঁর পা দুটো অবিশ্যি নীচে নেমে মেঝের কার্পেটে ঠেকে আছে। তাঁর গায়ে যে লাল নীল সাদা আলাের খেলা চলেছে, সেটার কারণ হচ্ছে বায়ে টেবিলের উপর রাখা টিভি—যেটাতে হিন্দি ছবি চলেছে, যদিও কোনাে শব্দ নেই। ভদ্রলােকের বােম খােলা জ্যাকেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে। সাদা সাটের উপর ভেজা লাল ছোপ, আর তার মাঝখানে উচিয়ে আছে। একটা ছােরার হাতল । 

হিঙ্গারানিকে যে ডিটেকনীকের গােয়েন্দাই খুন করেছে তাতে কোনাে সন্দেহ নেই, কারণ পুলিশের ডাক্তার নানা পরীক্ষা করে বলেছেন খুনটা হয়েছে আড়াইটে থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে। গােয়েন্দা ভদ্রলোেক আমাদের ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন পৌনে তিনটে নাগাত—আর তিনি | নিজেই বলেছিলেন সােজা যাবেন হিঙ্গোরানির ঘরে। এও বোেঝা যাচ্ছে যে। হিঙ্গোরানি তেওয়ারির টাকা ফেরত দিতে রাজি হননি। তাই গােয়েন্দা তার কথামতাে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিয়েছেন। বেডসাইড টেবিলের উপর খুচরাে পয়ষট্টি পয়সা ছাড়া এক কপর্দকও পাওয়া যায়নি হিঙ্গোরানির ঘরে। একটা সুটকেস ছাড়া আর কোনো মাল ঘরে ছিল না । টাকা নিশ্চয়ই একটা ব্রীফকেস জাতীয় বাগে ছিল ; তার কোনাে চিহ্ন আর 

নেই। 

ফেলুদা পুলিশকে জানিয়েছে যে আততায়ী যদি টাকা নিয়ে থাকে তাহলে সে-টাকা সে কলকাতায় গিয়ে টি এইচ সিন্ডিকেটের মিঃ দেবকীনন্দন তেওয়ারির হাতে তুলে দেবে। এই খবরটা কলকাতার পুলিশকে জানানাে দরকার। 

ফেলুদাকে হত্যাকারীর চেহারার বর্ণনা দিয়ে বলতে হল যে লােকটার নাম তার জানা নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি যে সে সম্ভবত কচ্ছ প্রদেশের লােক। | মিঃ রেড্ডি খবর পেয়েই চলে এসেছিলেন, আর এখন আমাদের ঘরেই বসে ছিলেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি ব্যাপারটা জেনে মূছা যাবেন। তার বদলে দেখলাম নয়ন ছাড়াও কী ভাবে শশাটাকে জমানাে যায় তিনি সেই কথা ভাবছেন। বােঝাই যায় ভদ্রলােকের তরফদারের উপর একটা মায়া পড়ে গেছে । বললেন, ‘শশা বন্ধ না করে যদি আপনার হিপনােটিজম-এর আইটেমটা ডবল করে দেওয়া যায় ? আমি ম্যাড্রাসের লীডিং ফিল্ম স্টারস, ডানসারস, সিঙ্গারসকে ডাকৰ ওপনিং নাইটে । আপনি তাদের এক এক করে স্টেজে ডেকে বুদ্ধ বানিয়ে দিন। কেমন আইডিয়া ? 

তরফদার মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘শুধু আপনার ওখানে 

খেলা দেখিয়ে ত আমার চলবে না। আমি জানি নয়নের খবর ছড়িয়ে গেছে। সব ম্যানেজার ত আপনার মতাে নয়, মিঃ রেড্ডি !—তাদের বেশির ভাগই কড়া ব্যবসাদার । নয়ন ছাড়া তারা আমাকে বুকিংই দেবে 

একসঙ্গে দুটো দুর্ঘটনা আমাকে শেষ করে দিয়েছে। 

ফেলুদা তরফদারকে জিজ্ঞেস করল, ‘হিরােনি কি তােমাকে অলরেডি কিছু পেমেন্ট করেছেন ? 

কলকাতায় থাকতে কিছু দিয়েছিলেন ; তাতে আমাদের যাতায়াতের খরচ হয়ে যায়। একটা বড় কিস্তি আগামী কাল দেবার কথা ছিল। উনি দিনক্ষণ দেখে এসব কাজ করতেন। আগামীকাল নাকি দিন ভালাে ছিল। | মিঃ রেড্ডি কাহিল। বললেন, তােমার অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। এই মন নিয়ে তােমার পক্ষে শাে করা অসম্ভব। 

শুধু আমি না, মিঃ রেডি । আমার ম্যানেজার শঙ্কর এমন ভেঙে পড়েছে যে সে শয্যা নিয়েছে। তাকে ছাড়াও আমার চলে না। 

Related Posts

Leave A Comment