• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-২)

 সবাই হেসে উঠল হাে-হাে করে। আমার বেশ মজা লাগছে। আনিস বলল, ‘এক কাজ করি, জাফরের কানের কাছে মুখ নিয়ে মিলিটারি মিলিটারি বলে চিৎকার করে উঠি। দেখি জাফর কী করে? মজিদ বলল, ‘দাঁড়া, চায়ের পানি ফুটুক, তারপর। | ওদের কথাবার্তা এমন ছেলেমানুষী, হাসি লাগে আমার।

শ্যামল ছায়া কী মনে করেছে ওরা! “মিলিটারি মিলিটারি” শুনে আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে আমি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ব নাকি? সরি, এতটা ভয় আমার নেই। আচমকা শুনলে একটু দিশাহারা হব হয়তাে, এর বেশি না। সােনাতলায় এক বার মিলিটারির সামনে পড়ে গেলাম না? আমি আর সতীশ ধানক্ষেতে রাইফেল লুকিয়ে একটু এগিয়েছি, অমনি মুখােমুখি। ভাগ্য ভালল-দলের আর কেউ ছিল না আমাদের সঙ্গে। আট-দশটা জোয়ান ছেলে একসঙ্গে দেখলে কি আর রক্ষা ছিল? দু’ জন ছিলাম বলেই বেঁচেছি। সতীশ অবশি। দারুণ ভয় পেয়েছিল। নারকেলের পাতার মতাে কাঁপতে শুরু করেছে। আমি নিজেও হকচকিয়ে গিয়েছি। দু’ জন মিলিটারি ছিল সব মিলিয়ে, যেমন চেহারা তেমন স্বাস্থ্য। তারা জানতে চাইল, কোন বাড়িতে কচি ডাব পাওয়া যাবে। আমরা ওদের খাতির করে আজিজ মল্লিকের বাড়ি নিয়ে গেলাম। সতীশ গাছে উঠে কাঁদি কাঁদি ডাব পেড়ে নামাল। তারা মহাখুশি। এক টাকার একটা নােট দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিল সতীশের দিকে। সতীশ সেই নােট হাতে নিয়ে বত্রিশ দাঁতে হেসে ফেলল–যেন 

সাত রাজার ধন হাতে পেয়েছে। 

| প্ল্যান করেছিলাম, রাতের অন্ধকারে এক হাত নেব। কিন্তু ওরা সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকল না। দুপুরের রােদ একটু কমতেই রওনা হয়ে গেল। 

| বৃষ্টি বােধ করি একেবারেই থেমে গেল। চা বানান হচ্ছে শুনছি। ওদের “মিলিটারি মিলিটারি বলে চেচিয়ে ওঠার আগেই উঠে পড়ব কিনা ভাবছি, তখনি অনেক দূরে কোথায় ‘হই হই’ শব্দ পাওয়া গেল। নিমিষের মধ্যে আমাদের নৌকার সাড়া-শব্দ বন্ধ। চায়ের পানি ফোটার বিজ বিজ আওয়াজ ছাড়া অন্য কোনাে আওয়াজ নেই। হাসান বলল, ‘নৌকা আসছে। একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল শরীরে। ধ্বক করে উঠ বুক। 

কিসের নৌকা, কাদের নৌকা–কে জানে? মিলিটারিরা অবশ্যি স্পীডবােট ছাড়া নড়াচড়া করে না। তা ছাড়া রাতের বেলা তারা ঘাঁটি ছেড়ে খুব প্রয়ােজন ছাড়া নড়ে না। তবে গ্রাজাকারের” উপদ্রব বেড়েছে। তাদের আসল উদ্দেশ্য লুটপাট করা। এই পথে শরণার্থীদের নৌকা মেঘালয়ের দিকে যায়। সে সব নৌকায় হামলা করলে টাকা-পয়সা গয়না-টয়না পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে অল্পবয়সী সুশ্রী মেয়ে পাওয়া যায়। দূরের নৌকা দেখলাম স্পষ্ট হয়েছে। সেখান থেকে ভয় পাওয়া গলায় কে যেন হাঁক দিল, ‘কার নৌকা গাে? 

আমাদের নৌকা থেকে মজিদ চেচিয়ে বলল, তােমার কার নৌকা? ‘বাপারীর নৌকা। মাছ যায়। 

শুনে পেটের মধ্যে হাসির বুদবুদি ওঠে। ব্যাপারী মাছের চালান দেয়ার আর সময় পেল না। আর মাছ নিয়ে যাচ্ছে এমন জায়গায়, যেখানে দেড় টাকায় এক একটা মাঝারি সাইজের রুই পাওয়া যায়। হুমায়ূন ভাইয়ের গম্ভীর গলা শােনা গেল, ‘এই যে মাছের ব্যাপারী, নৌকা আন এদিকে। | কী আশ্চর্য, এই কথাতেই নৌকার ভেতর থেকে বহুকণ্ঠের কান্না শুরু হয়ে গেল। ছােট ছােট ছেলেমেয়ের গলার আওয়াজও আছে। এই বাচ্চাগুলি এতক্ষণ কী করে চুপ করে ছিল তাই ভাবি।

নৌকার ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। মজিদ বলল, “ভয় নাই ব্যাপারী; নৌকা কাছে আন। 

আপনারা কী করেন? ‘ভয় নাই, আমরা মুক্তিবাহিনীর লােক। আস এদিকে, কিছু খবর নেই।” 

‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিবাহিনী! আনন্দের একটা হল্লা উঠল নৌকা দু’টিতে। অনেক কৌতূহলী মুখ উকি মারল। এরা হয়তাে আগে কখনাে মুক্তিবাহিনী দেখে নি, শুধু নাম শুনেছে। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলােয় কৌতূহলী মুখগুলি দেখতে ভালাে লাগে। | ‘নমষ্কার গাে বাবাসকল। আমার নাম হরি পাল। কাসুন্দিয়ার জগৎ পালের নাম তাে জানেন। আমি জগৎ পালের ছােট ভাই। আমার আর জ্যাঠার পরিবার আছে এই 

নৌকায়। মােট একুশ জন।। | হরি পাল লােকটা বাক্যবাগীশ। কথা বলেই যেতে লাগল। দেখতে পাচ্ছি, তার ঘনঘন তৃপ্তির নিঃশ্বাস পড়ছে। নৌকার ভেতরের ছেলেমেয়েগুলির কৌতূহলের সীমা নেই। ক্রমাগত উকিঝুকি দিচ্ছে। এদের মধ্যে একটি মেয়ের চেহারা এমন মনকাড়া যে চোখ ফেরান যায় না। আমি বললাম, ও খুকি, কী নাম তােমার? 

খুকি জবাব দেবার আগেই হরি পাল বলল, এর ডাকনাম মালতী। ভালাে নাম সরােজিনী। আর এর বড়ো যে, তার নাম লক্ষ্মী। ভালাে নাম কমলা। ও মালতী, বাবুরে মক্কার দে। মালতী ফিক করে হেসে ফেলল। হরি পালকে চা খেতে 

দেওয়া হল এক কাপ। 

Related Posts

Leave A Comment