• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-৪)

আমরা ডাকতাম বুড়া ওস্তাদ। বুড়া ওস্তাদ প্রায়ই বলতেন, মজিদ ভাইয়ের হাত সােনা দিয়ে বাঁধিয়ে দেব। আহ কী হাত-কী নিশানা, জিতা রাহ। | মজিদের মধ্যে ছেলের এতটা ভয় থাকা কি ঠিক? মজিদ যদি এরকম ভয় পায় তাে আমরা কী করি? এক রাত্রে ঘুম ভেঙে দেখি সে হাউমাউ করে কাঁদছে। আমি হতভম্ব। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে মজিদ?শ্যামল ছায়া কিছু হয় নাই। | খুব করে চেপে ধরায় বলল, সে স্বপ্নে দেখেছে এক বুড়াে লােক এসে তাকে বলছে-আব্দুল মজিদ, তােমার গলায় কি গুলী লেগেছে?” এতেই কান্না। শুনে 

এমন রাগ ধরল আমার। ছিঃ ছিঃ, এ কী ছেলেমানুষী ব্যাপার। আমি অবশ্যি কাউকে বলি নি। 

পরবর্তী এক সপ্তাহ সে কোথাও বেরল না। হেনতেন কত অজুহাত। আসল কারণ জানি শুধু আমি। কত বােঝালামস্বপ্ন তাে আর কিছুই নয়, অবচেতন 

নের চিন্তাই স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু মজিদের এক কথাতার সব স্বপ্ন নাকি ফলে যায়। এক বার নাকি সে স্বপ্নে দেখিছিল তার ছােট বােন পানি পানি করে চিৎকার করছে, আর সেই বােনটি নাকি ক’ দিন পরই অ্যাক্সিডিস্টে মারা গেছে। মরবার সময় পানি পানি’ করে অবিকল যেমন স্বপ্নে দেখেছিল তেমনি ভঙ্গিতে চেচিয়েছে। কী অদূত যুক্তি! 

মৃত্যুর জন্যে ভয় পাওয়াটা একটি ছেলেমানুষী ব্যাপার নয় কি? আমার তাই মনে হয়। যখন সত্যি সত্যি মৃত্যু তার শীতল হাত বাড়াবে, তখন কী করব জানি 

তবে খুব যে একটা বিচলিত হব, তাও মনে হয় না। | তা ছাড়া আমার মৃত্যুতে কারাে কিছু আসবেযাবে না। আমার জন্যে শােক করবার মতাে প্রিয়জন কেউ নে নীয়-স্বজনরা চোখের পানি ফেলবে, চেচিয়ে কাঁদবে, বন্ধু-বান্ধবরা মুখ কালে , রে বেড়াবে, তবেই না মরে সুখ। 

 শুনেছি বিলেতে নাকি অনেক ধনী বুড়ােবুড়ি বিশেষ এক সংস্থার কাছে টাকা রেখে যায়। এইসব বুড়ােবুড়ির কোনাে আত্মীয়স্বজন নেই। সেই বিশেষ সংস্থাটি বুড়ােবুড়ির মৃত্যুর পর লােক ভাড়া করে আনে। অদ্ভুত ব্যবস্থা। সত্যি এরকম কিছু আছে, না শুধুই গালগল্প? আমাদের দেশে এরকম থাকলে আমিও আগেভাগেই লাক ভাড়া করে আনতাম। তারা সুর করে কাঁদতে বসত-ও জাফর, জাফর র, তুমি কোথায় গেলা রে?” এই কথা মনে উঠতেই দেখি হাসি পাচ্ছে। আমি সশব্দে হেসে উঠলাম। আনিস বলল, কী হয়েছে, এত হাসি— 

এমনি হাসছি।’ হঠাৎ হাসান আলি ভয়পাওয়া গলায় বলল, লঞ্চের আওয়াজ আসে। 

আমার বুক ধ্বক করে উঠল। তার মানে হচ্ছে, আমিও ভয় পাচ্ছি। সেই ভয়, যা যুক্তিতর্ক মানে না, হঠাৎ করে এসে আমাদের অভিভূত করে ফেলে। ইমায়ুন ভাই বললেন, ‘নৌকা ভেড়াও হাসান আলি। | ছপ ছপ দাঁড় পড়ছে। আনিস এবং মজিদ দু’জনেই দু’টি বৈঠা তুলে নিয়েছে। আমরা এখনাে লঞ্চের শব্দ শুনি নি, তবে হাসান আলি যখন শুনেছে, তখন আর ভুল নেই। 

 সাড়াশব্দ শুনে মজিদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সে হকচকিয়ে বলল, কী হয়েছে? 

আমি বললাম “মজিদ, তােমার শ্বশুর সাহেব আসছেন, উঠে বস‘কে শশুর, কার কথা বলছ?” 

হুমায়ূন ভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তামাশা রাখ, জাফর। হাসান আলি এখনাে শুনতে পাচ্ছ? 

হাসান আলি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর হাসিমুখে বলল, ‘না, আর শব্দ পাই না।’ 

খবর পাওয়া গেছে, এই অঞ্চলে কিছু দিন ধরেই একটি স্পীডবােট ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্ষার পানিতে খালবিলগুলি যেই একটু ভরাট হয়েছে, অমনি মিয়েছে স্পীডবােট। নৌকা করে আমাদের আরাে এগিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছি না। অবশ্যি রামদিয়া পর্যন্ত কী ভাবে যাব, তা ঠিক করবে হাসান আলি। আমাদের রাত দুটোর আগে রামদিয়া পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব হচ্ছে তার। হাসান আলি বলল, ‘হাটাপথে খাওন লাগব। অল্প কিছু পাককাদা আছে, কিন্তু উপায় আর কী! 

মজিদ বলল, ‘কয় মাইল পথ? ‘আটনয় মাইল। ‘আমার শেয়ালের মতাে খিদে লেগেছে, হাঁটা মুশকিল।

Related Posts

Leave A Comment