• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-৬)

আবু ভাই বলতেন সব সময়। আহ্, মানুষের মতাে মানুষ ছিলেন আবু ভাই। আবু ভাইয়ের লাশ নিয়ে যখন আসল, তখন বড় ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর পায়ে চুমু খাই। আবু ভাইয়ের মতাে মানুষগুলি এত অল্প আয়ু নিয়ে আসে কেন? যুদ্ধ শেষ হলে আবু ভাইয়ের মেয়েটিকে দেখতে যাব। তাকে কোলে নিয়ে বলব|

শ্যামল ছায়া কী বলব তাকে? | হুমায়ুন ভাই দেখি উত্তেজিত হয়ে নেমে আসছেন ছাদ থেকে। কী ব্যাপার, মােটর লঞ্চের আলাে দেখা যায় নাকি? আনিস চা ছাঁকতে ছাঁকতে বলল, “কী  

ব্যাপার হুমায়ুন ভাই? 

‘কিছু না। অনেকগুলি উল্কাপাত হল। একটা তাে প্রকাণ্ড। 

উল্কাপাত শুনেছি খুব অশুভ ব্যাপার। আমার মা বলতেন অন্য কথা। তিনি নাকি কোথায় শুনেছেন উল্কাপাতের সময় কেউ যদি তার গোপন ইচ্ছাটি সশব্দে বলে ফেলে, তাহলে সে ইচ্ছা পর্ণ হয়। এক মজার কাণ্ড হল এক দিন। জ্যামিতি বই হারিয়ে ফেলেছি। সন্ধ্যাবেলা বসে আছি বারান্দায়। আকাশের দিকে চোখ। উল্কাপাত হতে দেখলেই বলব, জ্যামিতি বইটা যেন পাই’। | কোথায় গেল সেসব দিন। মায়ের মুখ আর মনেই পড়ে না। এক দিন কথায় কথায় অবনী স্যার আমাদের ক্লাসে বললেন, যেসব ছেলের মনে মায়ের চেহারার কোনাে স্মৃতি নেই, তারা হল সবচে অভাগা! আমি চোখ বুজে ক্লাসের ভেতরেই মায়ের চেহারা মনে আনতে চেষ্টা করলাম। একটুও মনে পড়ল না। সেই যে পড়ল 

, পড়লই না। এখনাে পড়ে না। স্বপ্নেও যে একআধ দিন দেখব, সে উপায়ও নেই। আমার ঘুম এমন গাঢ়স্বপ্নটরে বালাই নেই। দূর ছাই। 

নেমে পড়েছে সবাই। ওরে বাবা রে, কী কাদা কোমর পর্যন্ত তলিয়ে যাবার দাখিল! হাসান আলি আরেকটু হলে গুলীর বাক্স নিয়ে নদীতে পড়ত। লাইট মেশিনগানটা সবাই মিলে চাপিয়েছে আমার কাঁধে। নামেই লাইট, আসলে মেলা ওজন। আকাশে গুড়গুড় মেঘ ডাকছে আবার। বৃষ্টি নামলেই গেছিমজিদের ভাষায় একেবারে পটেটো চিপস” হয়ে যাব। 

হুমায়ুন আহমেদ আজ সারাটা দিন আমার মন খারাপ ছিল; এখন মধ্যরাত্রি, ছপছপ শব্দে কাদাভরা রাস্তায় হাঁটছি। মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরও বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এত দিনেও হাঁটার অভ্যেস হল না। আনিস এবং মজিদ কত নির্বিকার ভঙ্গিতেই না পা ফেলছেএতটুকু ক্লান্ত না হয়েও তারা দশ মাইল হেটে পার হবে; বিপদ হবে আমাকে নিয়ে। জাফরও হাঁটতে পারে না। তবে আমার মতাে এত সহজে ক্লান্তও হয় না। সমস্ত দলটির মধ্যে আমি সবচেয়ে দুর্বল। শরীরের দিক দিয়ে তাে বটেই, মনের দিক থেকেও। তবুও আজকের ঋন্যে আমিই কমাণ্ডার। ‘কমাণ্ডার’ শব্দটা শুনতে বড়াে গেয়াে। অধিপতি বা দলপতি হলে মানাত। না, আমি তেমন বাংলাপ্রেমিক নই। একশে ফেব্রুয়ারিতে ইংরেজি সাইনবাের্ড ওর ব্যাপার আমার কাছে খুব হাসঙ্কর মনে হয়। যেকোনাে জিনিসের বাড়াবাড়ি আমাকে পীড়া দেয়আর সে জন্যেই যুদ্ধে এসেছি। 

| এক মাইলও হাঁটি নি, এর মধ্যেই পা ভারি হয়ে এসেছে। কী মুশকিল। নিঃশ্বাস পড়ছে ঘনঘন। শার্ট ভিজে গিয়েছে ঘামে। 

ঢাকা থেকে ভাই, বােন, বাবা, মা সবাইকে নিয়ে একনাগাড়ে ত্রিশ মাইল হেঁটে পৌছেছিলাম মির্জাপুর। কী কষ্ট, কী কষ্ট! নিজের জন্যে কিছু নয়জরী ও পরীর দিকে তাকান যাচ্ছিল না। পরীর ফর্সা মুখ নীল বর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের সঙ্গে অনেকেই হাঁটছিলেন। কাফেলার মতাে ব্যাপার। একএক বার হস করে সুখী মানুষেরা গাড়ি নিয়ে উড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। এমন হৃদয়বান কাউকে কি পাওয়া যাবে, যে আমাদের একটুখানি লিফট দেবে! দুঃসময়ে সবাই হৃদয়হীন হয়ে পড়ে। আমাদের সঙ্গে এক জন গর্ভবতী মহিলা ক্লান্ত পায়ে হাঁটছিলেন। তিনি ক্রমাগতই পিছিয়ে পড়ছিলেন। ভদ্রমহিলার স্বামী তা দেখে রেগে আগুন। রাগী গলায় বললেন, ‘টুকুস টুকুস করে হাঁটছ যে তােমার জন্যে আমি মরব নাকি?’ এই দীর্ঘপথে কত কথাবার্তা হয়েছে কত জনের মধ্যে। কত অশ্রুবর্ষণ, কত তামাশাকিছুই আজ আর মনে নেই, কিন্তু ঐ স্বামী বেচারার কথাগুলি এখনাে কাঁটার মত বুকে বিধে আছে। গর্ভবতী মহিলার শােকাহত চোখ এখনাে চোখে ভাসে। 

রাস্তাতেই পরীর হু-হু করে জুর উঠে গেল। আমি বললাম, ‘কোলে উঠবি প্রী? পরীর কী লজ্জা। ক্লাস টেনে পড়ে মেয়ে, ‘দাদার কোলে উঠবে কি? পরী অপ্রকৃতিম্ভের মতাে পা ফেলে হাঁটতেই থাকল। তার হাত ধরে-ধরে চলছি আমি। ঘামে ভেজা গরম হাত, আর কী তুলতুলে নরম। পরীর হাতটা যে এত নরম, তা আগে কখনাে জানি নি। জরীর হাভীষণ খসখসে, অনেকটা পূরুষালি। কিন্তু পরীর হাত কী নরম, কী নরম। | মীর্জাপুরের কাছাকাছি এসেই পরী নেতিয়ে পড়ল। জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে। বমি করতে লাগল ঘনঘন। বাবা একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়লেন। কোথায় ডাক্তার কোথায় কি?

Related Posts

Leave A Comment