• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-৭)

র মধ্যে গুজব রটে গিয়েছে, ঢাকা থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক দল জোয়ানকে মিলিটারিরা এই দিকেই ভাড়া করে আনছে। চারদিকে ছুটোছুটি, চিৎকার, আতঙ্ক। মা এবং জরী ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। বাবা যাকেই পাচ্ছেন তাকেই জিজ্ঞেস করছেন, কিছু মনে করবেন না, আপনি কি ডাক্তা?

শ্যামল ছায়াডাক্তার পাওয়া যায় নি, কিন্তু এক ভদ্রলােক দয়াপরবশ হয়ে তাঁর ট্রাকে আমাদের টাঙ্গাইল পৌছে দিলেন। টাঙ্গাইল পৌছালাম শুক্রবার সন্ধ্যায়। পরী মারা গেল রােববার রাতে। সন্ধ্যাবেলাতে কথা বলল ভালাে মানুষের মতাে। বারবার বলল, ‘কোনাে মতে দাদার বাড়ি পৌছতে পারলে আর ভয় নেই। তাই না বাবা? 

 পরীর মৃত্যু তাে কিছুই নয়। কত কুৎসিত মৃত্যু হয়েছে চারপাশে। মৃত্যু এসেছেসীমাহীন বীভৎসতার মধ্যে। কত অসংখ্য অসহায় মানুষ প্রিয়জনের এক ফোঁটা চোখের জল দেখে মরতে পারে নি। মরার আগে তাদের কপালে কোনাে স্নেহময় কোমল করল পড়ে নি। 

অনেক মধ্যরাত্রিতে যখন অতলস্পর্শী ক্লান্তি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে তখন মনে হয় আমার হাত ধরে টুকটুক পা ফেলে পরী হাঁটছে। | যেজান্তব পশুশক্তির ভয়ে পরী ছােট ছােট পা ফেলে ত্রিশ মাইল হেটে গেছে, আমার সমস্ত ক্ষমতা ও শক্তি তার বিরুদ্ধে। আমি রাজনীতি বুঝি না। স্বাধীনতা টাধীনতা নিয়ে সেরকম মাথাও ঘামাই না। শুধু বুঝি, ওদের শিক্ষা দিতে হবে। জাফর প্রায়ই বলে, হুমায়ূন ভাই ইচ্ছে করে চোখ বুজে থাকেন। হয়তাে থাকি। তাতে ক্ষতি কিছু নেই। আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করি নি, জাফর ? 

মনে মনে এই কথা বলে আমি একটু হাসলাম। জাফরের সঙ্গে আজ ভােরে আমার খানিকটা মন কষাকষি হয়েছে। সে চাচ্ছিল আজকের এই এ্যাসাইনমেন্টের নেতৃত্ব যেন আসলাম পায়। জানি না এর পেছনের সত্যিকার কারণটি কি? দলপতির প্রতি আস্থা না থাকা বড়াে বিপজ্জনক। মুশকিল হচ্ছেআমরা রেগুলার আর্মির লােকজন নই। আনুগত্য হল একটা অভ্যাস, যা দীর্ঘদিনের ট্রেনিংএর ফলে মজ্জাগত হয়। রেগুলার আর্মির এক জন অফিসারের অনুচিত হুকুমও সেপাইরা বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে। কিন্তু আমার হুকুম নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করবে। পছন্দ 

হলে কৈফিয়ত পর্যন্ত তলব করে বসবে। কাজেই আমার প্রথম কাজ ছিল দলের লােকের আস্থা অর্জন করা। বুঝিয়ে দেওয়া যে, আমার উপর নির্ভর করা যেতে পারে। কিন্তু আমি তা পারি নি। কাপুরুষ হিসেবে মার্কামারা হয়ে গেছি। 

যদিও তারা সব সময়ই হুমায়ূন ভাই, হুমায়ূন ভাই’ করে এবং সবাই হয়তাে একটু শ্ৰদ্ধাও করে, কিন্তু সেশ্রদ্ধা এক জন যােদ্ধা হিসেবে নয়। 

 আমার প্রথম ভুল হল আমি হাজী সাহেবের মৃত্যুতে সায় দিতে পারি নি। লােকটার নৃশংসতা সম্বন্ধে আমার কোনাে সন্দেহ ছিল না। মৃত্যুদণ্ড যে তার প্রাপ্য শাপ্তি, এতেও ভুল নেই। তবু আমার মায়া লাগল। ষাটের উপর বয়স হয়েছে। মরবার সময় তাে এমনিতেই হল। তবু বাঁচবার কী আগ্রহ। সে আমাদের বিশ হাজার টাকা দিতে চাইল। শুনে আমার ইচ্ছে হল, একটা প্রচও চড় কষিয়ে দি। কিন্তু আমি শান্ত গলায় বললামজাফর, হাজী সাহেবকে ক্যাম্পে নিয়ে চুল। জাফর চোখ লাল করে ভাকাল আমার দিকে। থেমে থেমে বশ, এক কুকুরের মতো গুলী করে মারব।’ হাজী সাহেব চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন। এই তিনিই যখন মিলিটারি দিয়ে লােকজন মারিয়েছেন, তখন সেই লােকগুলিও নিশ্চয়ই আল্লাহকে ডেকেছিল। আত্মাহ তাদের যেমন রক্ষা করেন নিহাজী সাহেবের বেলায়ও তাই হল। হাজী সাহেব অপ্রকৃতিস্থ চোখে তাকিয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতি দেখতে লাগলেন। জাফর এক সময় বলল, ‘তওবাটওবা যা করবার করে নেন। দোওয়া 

কালাম পড়েন হাজী সাহেব।’ আর তখন হাজী সাহেব চিঙ্কার করে তাঁমাকে ডাকতে লাগলেন। 

Related Posts

Leave A Comment