• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-৮)

‘ও মাইজি গাে, ও মাইজি গাে।’ কতকাল আগে হয়তাে এই মহিলা মারা গেছেন।শ্যামল ছায়াসেই মহিলাটিকে হাজী সাহেব হয়তাে ভুলেই গিয়েছিলেন। আজ রাইফেলের কালাে নলের সামনে দাঁড়িয়ে আবার তাঁর কথা মনে পড়ল। আল্লাহুর নাম চাপা পড়ে গেল। এক অখ্যাত গ্রাম্য মহিলা এসে দাঁড়ালেন সেখানে। | আমি পিছিয়ে পড়েছিলামআনিস বলল, রাইফেলটা আমার কাছে দিন, হুমায়ুন ভাই। আমি একটু লজ্জা পেয়ে গেলামজাফর এবং হাসান আলি ডিস্ট্রিক্ট বাের্ডের উঁচু সড়কে উঠে পড়েছে। বেশ কিছু দূর এগিয়ে রয়েছে তারা। দ্রুত পা চালাচ্ছি। উচু সড়কে উঠে পড়তে পারলে হাঁটা অনেক সহজ হবে। পরিষ্কার রাস্তা, জলকাদা নেই। এখন থেকেই আমরা সরাসরি গ্রামের ভেতর দিয়ে চলব। আমি উঠে আসতেই মজিদ বলল, জোঁক ধরেছে নাকি দেখেন ভালাে করে।’ আনিসের পা থেকে তিনটি জোক সরান হয়েছে। একটা রক্ত খেয়ে একেবারে কোলবালিশ হয়ে গিয়েছিল। 

হাসান আলি টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পায়ে উপর ফেলতে লাগল। না, জোঁকটোক নেই। তবে শামুকে লেগে পা অল্প কেটেছেজ্বালা করছেমজিদ বলল, একটু রেস্ট নিই, মালগাড়ির মতাে টায়ার্ড হয়ে গেছি। দেখি আনিস, একটা সিগারেট। 

আনিস সিগারেটের প্যাকেট খুলল। হাসান আলিও হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিল। সে আমাদের সামনে খাবে না, তাই একটু সরে গেলআনিস বলল, “আপনিও নিন একটা হুমায়ুন ভাই। সিগারেট টানলে আমাজিভ জ্বালা করে। নিকোটিন জিতের উপর জমা হয় হয়তােতবু নিলাম একটাআমাদের এখন সাহস দরকার। আগুনের স্পর্শ সে সাহস দেবে হয়তােদেয়াশলাই সবে জ্বালিয়েছি, অমনি বাঁশবনের অন্ধকার থেকে কুকুর ডাকতে লাগলতার পরপরই একটি ভয়ার্ত চিৎকার শােনা গেল, কেড়া, ঐখানে কেডা? কতা কয় না লােকটা! কেড়া গাে? | হারিকেন হাতে দুচার জন মানুষও বেরিয়ে এল। ও রমিজের বাপ, ও রমিজের বাপ’ বলে চিকন কণ্ঠে তুমুল চিৎকার শুরু করল একটি মেয়ে। সবাই বড়াে ভয় পেয়েছে। এর মধ্যে অল্পবয়সী একটি শিশু তারস্বরে কাঁদতে শুরু করল। মজিদের উচ্চকণ্ঠ শােনা গেল, ভয় নাই, আমরা।‘ 

‘তােমরা কেডা? ‘আমরা মুক্তিবাহিনীর লােক। 

কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের চারপাশে ভিড় জমে উঠল। হারিকেন হাতে ভয়কাতর লােকগুলি ঘিরে দাঁড়াল আমাদের। অস্পষ্ট আলােয় রাইফেলের কালাে নল চিকচিক করছে। আমরা তাদের সামনে অষ্টম আশ্চর্যের মতাে দাঁড়িয়ে আছি। 

‘মিয়া সাবরা এটু পান তামুক খাইবেন? ‘না। আপনারা এত রাতেও জাগা, কারণ কি? ‘বড়াে ডাকাইতের উপদ্রবঘুমাইতাম পারি না। জাইগা বইয়া থাকি। 

এই দিকে মিলিটারি আসছি

জ্বি না। তয় রাজাকার আইছিল দুই বার। রমেশ মালাকাররে বাইন্ধা ইয়া গেছে। গয়লা পাড়া পুড়াইয়া দিছে। 

‘রাজাকারদের কেউ খাতির যত্ন করেছিল নাকি? ‘জি না, জ্বি না।’ 

এই গ্রামের কেউ রাজাকারে নাম লেখাইছে? লােকগুলি চুপ করে রইল। জাফর ধমকে উঠল, ‘বল ঠিক করে।’ ‘এক জন গেছে। কী করব মিয়া সাব, পেটে ভাত নাই। পুলাপানডি কান্দে। 

আমি বললাম, দেরি হয়ে যাচ্ছে, চল হাঁটা দিই। 

আনিসের বােধহয় কিছু কথা বলবার ইচ্ছে ছিল। সে অপ্রসন্ন ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল। | আনিসের এই স্বভাব আমি লক্ষ করেছি। মানুষের সপ্রশংস চোখ তার ভারি প্রিয়। যখনি আমাদের ঘিরে কিছু কৌতুহলী মানুষ জড় হয়, তখনি সে খুব ব্যস্ত হয়ে এল এম জি র ব্যারেল নাড়তে থাকে বা খামকাই গুলীর কেসটা খুলে ফেলে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে এমন একটা ভঙ্গি করে, যেন ভারি বিরক্ত হয়েছে। বক্তৃতা দিতেও তার খুব উৎসাহ। দেশের এই দুর্দিনে আমাদের কী করা উচিত, এ সম্বন্ধে তার সারগর্ত ভাষণ তৈরী। টেপ রেকর্ডারের মতােচালু করে দিলেই হল। ‘গ্রামে গ্রামে প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করতে হবে। চোর, ডাকাত, দালাল নির্মূল করতে হবে। দখলদার বাহিনীকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে হবে।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। বক্তৃতা শেষে কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বিকট সুরে চেঁচিয়ে ওঠে‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু! 

আনিস ছেলেটিকে আমি খুব পছন্দ করি। চমৎকার ছেলে, একটু পাগলাটে। অপারেশনের সময় সব বিচারবুদ্ধি খুইয়ে বসে। গুলী ছোঁড়ে এলােপাথাড়ি। পেছনে সরতে বললে ক্রল করে সামনে এগিয়ে যায়। সামনে এগুতে বসলে আচমকা পেছন দিকে দৌড় মেরে বসে। | মেথিকান্দায় প্রথম অপারেশনে গিয়েছি। আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে, একেবারে ফাঁকা ক্যাম্প চার জন পশ্চিম পাকিস্তানী রেঞ্জার আর গােটা পনের রাজাকার ছাড়া আর কেউ নেই। রাত দুটোয় অপারেশন শুরু হল। আমি আর সতীশ গর্তের মতাে একটা জায়গায় পজিশন নিয়েছি।

Related Posts

Leave A Comment