• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১০)

কিন্তু গান গাইতে গেলেই চিত্তির। জরী বলে, তােমার ঘড়িগুলি খুব ভালাে আসে, আর কিছুই হয় না। কি জানি বাবা, মীড় কাকে বলে। আমি এত সব জানি না। আমি তাে তাের মতো বিখ্যাত শিল্পী নই, গান নিয়ে আমার কোনাে মাথাব্যথাও নেই। বাথরুমে গােসল করতে করতে একটু গুনগুন করতে পারলেই হল

শ্যামল ছায়াজাফরটা ভীষণ গানপাগল। যেই গুনগুন করে একটু সুর ধরেছি, অমনি সে পিছিয়ে পড়েছে। এখন সে আমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটবে। জাফর যাতে ভালােমতাে শুনতে পায়, সেই জানাে আরেকটু উচু গলায় গাইতে শুরু করলাম। আমার গুনগুন শুনেই এই? কারীর গান শুনলে তাে আর হুশ শাকাব না। জাফরকে এক দিন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, গান গায় যে কানিজ আহমেদ, তার নাম শুনেছ? সে চমকে উঠে বলল, ‘নজরুলগীতি গান যিনি, তাঁর কথা বলছেন।

খুব শুনেছি। আপনি চেনেন নাকি? 

আমি সে-কথা এড়িয়ে গিয়েছি। যুদ্ধটুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে জাফরকে এক দিন বাসায় নিয়ে যাব। গুরীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দেব, এর নাম আবু জাফর শামসুদ্দীন। আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি। আর জাফরকে হেসে বলব, ‘জাফর, এর নাম হল জয়ী। আমার ছােট বােন। তুমি চিনলে চিনতেও পার, গানটান গায়, কানিজ আহমেদ। শুনে হয়তো। | জাফর নিশ্চয়ই চোখ বড়াে করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকবে। সেই দৃশ্যটি আমার বড়াে দেখতে ইচ্ছে করছে। তা ছাড়া আমার মনে একটি গােপন বাসনা আছে। জরীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব জাফরের। যুদ্ধের মধ্যে যেপরিচয়, তার চেয়ে খাঁটি পরিচয় আর কী হতে পারে? জাফরকে আমি ভালােভাবেই চিনেছি। 

কিন্তু জরীর কি পছন্দ হবে? বড়াে খুঁতখুঁতে মেয়ে। সমালােচনা করা তার স্বভাব। কেউ হয়তাে বাসায় গিয়েছে আমার খোঁজে, জরী আমাকে এসে বলবে, ‘দাদা, তােমার এক জন চ্যাপ্টা মতাে বন্ধু এসেছে। অরুণকে সে বলত কাৎলা মাছ। অরুণ ব্লেগে গিয়ে বলেছিল, ‘কাৎলা মাছের কী দেখলে আমার মধ্যে? জরী সহজভাবে বলেছে, ‘তােমার মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়াে লে, এই জন্যে। আচ্ছা, রাগ করলে আর বলব না। আদর দিয়ে দিয়ে মা জরীর মাথাটি খেয়ে বসে আছেন। অল্প বয়সেই অহংকারী আর আহাদী হয়ে উঠেছে। 

 কে জানে এর মধ্যে বিয়েই হয়ে গেছে হয়তো। অনেক দিন তাদের কোনাে খবর পাই না। শুনেছি বাবা আবার ঢাকা ফিরে এসেছেন। ওকালতি শুরুর চেষ্টা করছেন। দেশে এখন কি আর মামলা-মােকদ্দমা আছে? টাকাপয়সা রােজগার করতে পারছেন কিনা কে জানে। 

 ঢাকার অবস্থা নাকি সম্পূর্ণ অন্য রকম। কিছু চেনা যায় না। ইউনিভার্সিটি পাড়া খাঁখাঁ করে। দুপুরের পর রাস্তাঘাট নিঝঝুম হয়ে যায়ঢাকায় বড়াে যেতে ইচ্ছে করে। কত দিন ঢাকায় যাওয়া হয় না। আবার কি কখনাে এরকম হবে যে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় হেঁটে বেড়াব।

সেকেণ্ড শশা সিনেমা দেখে কোনাে একটা 

রেস্টুরেন্টে বসে চা খেয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফিরব। 

সলিল কিছু দিন আগে গিয়েছিল ঢাকায়। অনেক গল্প শুনলাম তার কাছে। খুব নাকি বিয়ে হচ্ছে সেখানে। বয়স্থা মেয়েদের সবাই ঝটপট বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। ঘরে রাখতে সাহস পাচ্ছে না। হতেও পারে। সলিল অবশি বেশি কথা বলে, তবুও বিয়ে কি আর হচ্ছে না? বিয়ে হচ্ছে। নতুন শিশুরা জন্মাচ্ছে। মানুষজন হাটবাজার করছে। জীবন হচ্ছে বহতা নদী। 

একি! আবু ভাইয়ের মতাে ফিলসফি শুরু করলাম দেখি। আবু ভাই কথায় কথায় হাসাতেন, আবার তার ফাঁকে ফাঁকে এত সহজভাবে এমন সব সিরিয়াস কথা বলে যেতেনআশ্চর্য! আবু ভাই তাঁর অসংখ্য ভক্ত রেখে গেছেন, যারা তাঁকে দীর্ঘ দিন মনে রাখবে। এই-বা কম কী? | এক দিন হস্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলেন আবু ভাই। দারুণ খুশিখুশি চেহারা। মাথার লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘হুমায়ুন, গুড নিউজ আছে। মিষ্টি খেতে চাও কিনা বল।। 

‘চাই চাই। 

Related Posts

Leave A Comment