• শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২০

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১)

আমার বাবা পুলিশ অফিসার ছিলেন। উনিশ শ’ একাত্তর সনের পাঁচই মে তাঁকে দেশপ্রেমের অপরাধে পাকআর্মি গুলী করে হত্যা করে। সে সময় আমি আমার ছােট ছােট ভাইবােনদের নিয়ে বরিশালের এক গ্রামে লুকিয়ে আছি! কী দুঃসহ দিনই না গিয়েছে। বুকের ভেতর কিলবিল করছে ঘৃণা, লকলক করছে প্রতিশােধের আগুন। স্বাধীনতা টাধীনতা কিছু নয়, শুধু ভেবেছি, যদি একবার রাইফেলের কালাে নলের সামনে ওদের দাঁড় করাতে পারতাম।

শ্যামল ছায়া ঠিক একই রকম ঘৃণা, প্রতিশােধ গ্রহণের একই রকম তীব্র আকাক্ষা সেই অন্ধকার দিনের অসংখ্য ছেলেকে দুঃসাহসী করে তুলেছিল। তাদের যুদ্ধের কোনাে অভিজ্ঞতা ছিল না, কোনাে সহায় সম্বল ছিল না, কিন্তু শ্যামল ছায়ার জন্যে গাঢ় ভালােবাসা ছিল। আমার শ্যামল ছায়া’ সেই সব বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। 

হুমায়ূন আহমেল  

আবু জাফর শামসুদ্দিন নৌকা ছাড়তেই ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। | এ অঞ্চলে বৃষ্টি-বাদলার কিছু ঠিক নেই। কখন যে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামবে, আবার কখন যে সব মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ ঝকঝকে হয়ে উঠবে, কেউ বলতে পারে না। 

আমি নৌকার ভেতরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়লাম। বেশ শীত করছে। ঠাণ্ডা বাতাসে গায়ে কাঁপন লাগে। নৌকা চলছে মন্থর গতিতে। হাসান আলি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড় টানছে। এত বড়াে নৌকা কী জন্যে নিয়েছে কে বলবে। পানসির মতাে আকৃতি। দড়ি টেনে একে নিয়ে যাওয়া কি সােজা কথা? 

এখন বাখছে না। রাত দুটোর আগে রামদিয়া পৌছান এ নৌকার কম নয়। 

গুণ টেনে নিয়ে গেলে হয়তাে হবে। কিন্তু গুণটা টানবে কে? আমি নেই এর মধ্যে, বৃষ্টিতে ভিজে গুণের দড়ি নিয়ে দৌড়ান আমাকে দিয়ে হবে না। সাফ কথা। 

বৃষ্টি দেখছি ক্রমেই বাড়ছে। বিলের মধ্যিখানে বৃষ্টির শব্দটা এমন অদ্ভুত লাগে। কেমন যেন মন খারাপ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আবার বাতাসে ‘হত’ ‘হঅ আওয়াজ উঠছে। পাচা ডাকার মতো। ভয় ধরে যায় শব্দ শুনে। ছেলেবেলায় এক বার এ রকম শব্দ শুনে এমন ভয় পেয়েছিলাম। মানসাপােতার বিলে মাঝি দিক ভুল করেছে। চারদিকে সীমাহীন জল। বড়ােরা সবাই ভয় পেয়ে চেচামেচি করছে। তাদের হৈচৈ-এ ঘুম ভেঙে শুনেছি সেই বিচিত্র ‘হত হঅ আওয়াজ। আজও সেই শব্দে ভয় ধরল। কে জানে কেন। আমি কি কোনাে অমঙ্গলের আশঙ্কা করছি? 

কুটকুট করে মশার কামড় খাচ্ছি। এই বিলের মধ্যে আবার মশা কোথেকে আসে? হাত-পা আর মুখে অল্প কিছু কেরােসিন তেল মেখে নিলে হত। সবাই দেখি তাই করে। হুমায়ুন ভাইও করেন। মশার উৎপাত থেকে বাঁচা যায় তাহলে। কেরােসিন মাখতে ইচ্ছে হয় না আমার। কি জানি বাবা চামড়ার কোনাে ক্ষতিই করে কিনা। হয়তাে গাল-টাল ঝলসে কয়লা হয়ে পড়বে। এর চেয়ে মশার কামড় অনেক ভালাে। হাড়ে টাইমস বেটার। 

হুমায়ুন ভাইও দেখি আমার পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছেন। তাঁর ধারণা, আমি ঘুমিয়ে রয়েছি। মাথার নিচে থেকে নিঃশব্দে বালিশটা নিয়ে নিলেন। বেশ লােক যা হােক! মজিদ বা আনিস হলে আমি গদাম করে একটা ঘুষি মারতাম। পরিষ্কার একটা হাতের কাজ দেখতে পেত। চালাকি পেয়েছ, না? বালিশ ছাড়া আমি শুয়ে থাকতে পারি না। অনেকেরই দেখি মাথার নিচে কিছু নেই, কিন্তু কেমন ভোঁস ভোঁস করে 

নাক ডাকায়। আমি পারি না। | বৃষ্টির তাে বড়াে বাড়াবাড়ি দেখছি। ঝড়টড় এলে বিপদ। সাঁতার যা জানি, তাতে তিন মিনিটের বেশি ভেসে থাকা যাবে না। নৌকা ডুবলে মার্বেলের গুলির মতাে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। অবশ্যি সেটাও খুব একটা মন্দ ব্যাপার হবে 

! ওমা, হাসি আসছে কি জন্যে বা! সবাইকে চমকে দিয়ে হেসে উঠব নাকি? | হুমায়ূন ভাই দেখি উঠে বসেছেন। মশা কামড়াচ্ছে বােধ হয়। কিংবা কোনাে কারণে ভয় লাগছে। ভয় পেলেই এ রকম অস্থিরতা আসে। মজিদ বলল, ‘কি হুমায়ুন ভাই, ঘুম হল না? 

| ‘এই ঝড়-বৃষ্টিতে ঘুম আসে নাকি? তাছাড়া টেনশনের সময় আমার ঘুম হয়

এক দফা চা খেলে কেমন হয়? বানাব নাকি? বাতাসের মধ্যে চুলা ধরাবে কী করে? ‘হাসান মিয়া ধরাতে পারবে। ও হাসা, লগি মেরে নৌকা দাঁড় করাও গাে চা খেলে জুত হচ্ছে না। এহে, তুমি তাে ভিজে একেবারে আলুর দম হয়ে গেছ। 

হাসান আলি।’ 

ভিজে আলুর দম হয়ে যাওয়াটা আবার কী রকম! এরকম উল্টোপাল্টা কথা শুধু মজিদই বলতে পারে। এক দিন আমাকে এসে বলছে, ‘জাফর, যা পরিশ্রম করেছিএকেবারে টমেটো হয়ে গেছি।’ পরিশ্রমের সঙ্গে টমেটোর কী সম্পর্ক কে 

জানে।। | নৌকার খুঁটি গেড়ে বসে আছে। এতক্ষণে তাও নৌকার দুলুনিতে বেশ একটা ঝিমুনির মতাে এসেছিল, সেটুকুও গেছেঘনঘন চা খেয়ে কী আরাম যে পায় লােকে, কে জানে। আনিস দেখি আবার সিগারেট ধরিয়েছে। নতুন খাওয়া শিখেছে তাে, তাই যখনতখন সিগারেট ধরান চাই। আবার ধোঁয়া ছাড়ার কত রকম কায়দা। নাকমুখ দিয়ে। হাসি লাগে দেখে। মজিদ বলল, আনিস, আমাকে একটা ট্রাফিক পুলিশ দাও দেখি। আরে বাবা, সিগারেটের কথা বলছি। 

‘বুঝেছি বুঝেছি, তােমার এইসব ঢং ছাড় দেখি। 

বৃষ্টির বেগ মনে হয় একটু কমেছে। হাহা করে বাতাস বইছে ঠিকই। মজিদ বলল, ‘জাফর মড়ার মতাে ঘুমুচ্ছে, দেখেছেন হুমায়ুন ভাই! 

| হেটে আসে নেই তো, টায়ার্ড হয়ে পড়েছে। | ‘টায়ার্ড না হাতি, জাফর হচ্ছে কুম্ভকর্ণের ভাতিজা। হেভি ফাইটিংএর সময়ও দেখবেন মেশিনগানের ওপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে।’ 

Related Posts

Leave A Comment