অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১০)

তার চোখে সীমাহীন কৌতূহল। সম্ভবত সে কিছু বলতে চায় । সাহস পাচ্ছে না। মিসির আলি ভারী গলায় ডাকলেন, নাজিম। 

জ্বি স্যার।

অন্যভুবন

তুমি কেমন আছ ? জ্বি স্যার ভালাে । তিন্নি তােমাকে কখনাে মাথাব্যথা দেয় নি ? 

নাজিম চমকে উঠল । কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। সহজভাবে ভাত তরকারি এগিয়ে দিতে লাগল। 

কথা বলছ না কেন নাজিম ? 

কী বলব স্যার? 

ঐ যে জিজ্ঞেস করলাম তিন্নি তােমাকে মাথাব্যথা দেয় কি না। আমার ধারণা সবাইকেই মাঝে মাঝে দেয়। ঠিক বলছি না ? 

জ্বি স্যার ঠিক বলেছেন। তােমাকেও দিয়েছে ? জ্বি স্যার। ক’বার দিয়েছে ? অনেকবার।। তবু তুমি এ বাড়িতে পড়ে আছ কেন? চলে যাচ্ছ না কেন? 

নিজাম জবাব দিল না । মিসির আলি বললেন, আমি ওর অসুখ ভালাে করার জন্যে এসেছি। কাজেই ওর সম্পর্কে সবকিছু আমার জানা দরকার। তােমরা যদি না বল তাহলে আমি জানব কী করে? 

কী জানতে চান স্যার? মানুষকে কষ্ট দেবার এই ব্যাপারটা ও কবে থেকে শুরু করেছে ? তিন বছর ধরে হচ্ছে। প্রথম কীভাবে এটা শুরু হল তােমার মনে আছে ? জি আছে। রহিমা, তিন্নি আপার জন্যে দুধ নিয়ে গিয়েছিল। তিন্নি আপা খাচ্ছিল । তখন রাগের মাথায় রহিমা তিন্নি আপাকে একটা চড় দেয়। তারপই শুরু হয়— রহিমা চিৎকার করতে থাকে। গড়াগড়ি করতে থাকে। ভয়ঙ্কর কষ্ট পায়। 

রহিমা কি এখনাে কাজ করে এ বাড়িতে? জ্বি। এ-রকম কষ্ট কি সে আরাে পেয়েছে ? জ্বি স্যার। তবু সে এ বাড়িতে পড়ে আছে ? চলে যায় না কেন? নিজাম জবাব দিল না। মিসির আলি লক্ষ্য করলেন এই প্রশ্নটির জবাব নাজিম এড়িয়ে যাচ্ছে । এত কষ্টের পরও কাজের মানুষগুলি এখানেই আছে। তার কী কারণ হতে পারে ? হয়তাে অনেক বেশি বেতন দেয়া হচ্ছে যে কারণে থাকছে। কিন্তু এটা বলতে কোনাে আপত্তি থাকার কথা নয়। 

তুমি বেতন কত পাও নাজিম ? জ্বি মাসে দেড়শ টাকা আর কাপড়চোপড়। 

মিসির আলির মনে হল এটা এমন কোনাে বেশি বেতন নয়। কাজেই এরা যে এখানে পড়ে আছে নিশ্চয়ই তার কারণ অন্য। 

নিজাম! জ্বি স্যার। তুমি কি আমাকে চা খাওয়াতে পার ? নিয়ে আসছি স্যার। 

আর শােনাে রহিমার সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই। ওকে পেলে বলবে আমার কথা । জ্বি আচ্ছা। 

নিজাম চট করে চা নিয়ে এল। লােকটি করিৎকর্মা । চা-টা হয়েছেও চমৎকার। চুমুক দিতে দিতেই মাথার যন্ত্রণা প্রায় সেরে গেল। 

চিনি লাগবে স্যার? 

লাগবে না। খুব ভালাে চা হয়েছে নাজিম। বসাে টুলটায় বসাে, কথা বলি । নিজাম বসল না। জড়সড় হয়ে দাড়িয়ে রইল। মিসির আলি বললেন, তিন্নির মধ্যে আর কী অস্বাভাবিক ব্যাপার তুমি লক্ষ্য করেছ? 

নিজাম মাথা চুলকাতে লাগল। মিসির সাহেব বললেন, ভালাে করে চিন্তা করে বলাে। সে এমন কিছু কি করে যা আমরা সাধারণত করি না ? 

তিন্নি আপা রােদের মধ্যে বসে থাকতে ভালােবাসেন। তাই নাকি? জ্বি স্যার। জ্যৈষ্ঠ মাসের রােদেও তিন্নি আপা সারাদিন ছাদে বসে থাকেন। 

এ ছাড়া আর কী করে ? আর কিছু না। 

মনে করতে চেষ্টা ক। হয়তাে কোনাে ছােট ব্যাপার। তােমার কাছে হয়। এর কোনাে মূল্যই নেই কিন্তু আমার কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বুঝতে পারছ আমার কথা ? 

জ্বি স্যার । রাত একটার দিকে মিসির আলি তিন্নির আঁকা ছবিগুলি নিয়ে বসলেন। সব মিলিয়ে পাঁচটি ছবি। প্রতিটি ছবিই গাছ বা গাছ জাতীয় কিছুর। বেশির ভাগ গাছ লতানাে। গাছের রঙ হলুদ থেকে লালের মধ্যে। সবুজের কিছুমাত্র ছোয়া নেই। তিন্নি হলুদ এবং লাল রঙ দিয়ে ছবি আঁকল কেন? সম্ভবত তাঁর কাছে সবুজ রঙ ছিল না। অবশ্যি শিশুরা অদ্ভুত রঙ ব্যবহার করতে ভালােবাসে। তাঁর এক ভাগ্নি মানুষ আঁকে আকাশী নীল রঙে। মানুষের চোখে দেয় গাঢ় লাল রঙ। | অবশ্যি এই পাঁচটি ছবি শিশুর আঁকা ছবি বলে মনে হচ্ছে না। শিশুরা এত চমত্তার আঁকে না। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে ঝড় হচ্ছে। প্রচণ্ড ঝড়। কোনাে শিশু, তা সে যত প্রতিভাবান শিশুই হােক এ-রকম নিখুঁত ঝড়ের ছবি আঁকতে পারবে না। 

ছবি দেখে মনে হয় ঝড়ের সময়টায় এই ছবির শিল্পী উপস্থিত ছিল। হাওয়ার যে ঘূর্ণি উঠেছে তাও সে লক্ষ্য করেছে। মিসির আলি সাহেব মনে মনে একটি থিওরি দাঁড়া করাতে চেষ্টা করলেন। তিনি ভাবতে চেষ্টা করলেন ছবিগুলি কোনাে শিশুর মনগড়া ছবি নয়, কল্পনার ছবি নয় । এই গাছ, এই ঝড়, বাতাসের এই ঘূর্ণি ছবির শিল্পী দেখেছে। 

যদি তাই নয় তাহলে এ গাছগুলি কি পৃথিবীর ? পৃথিবীর গাছে সবুজ রঙ থাকবে। ছায়াতে জন্মানাে কিছুকিছু হলুদ গাছ তিনি দেখেছেন কিন্তু এ-রকম কড়া সূর্যের আলােয় হলুদ গাছ তিনি দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।

 

ছবিতে দু’টি সূর্য 

প্রতিটি ছবিতে দুটি সূর্য। গনগনে সূর্য। এর মানে কী ? পৃথিবীর কোনাে ছবিতে দুটি সূর্য থাকবে না। তাহলে কি এই থিওরি দাঁড় করানাে যায় যে ছবিতে যে-দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তা অন্য কোনাে গ্রহের ? তা কেমন করে হয় ? 

তিনি অন্য কোনাে গ্রহের মেয়ে—এই যুক্তি হাস্যকর। তিনি পৃথিবীরই মেয়ে। এতে কোনাে সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। এই গ্রহের মেয়ে হয়ে বাইরের একটি গ্রহের ছবি 

সে কেন আঁকছে ? কীভাবে আঁকছে

মিসির আলি গম্ভীরমুখে দ্বিতীয় সিগারেটটি ধরালেন। সব কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। এলােমেলাে হয়ে যাচ্ছে। ছকে ফেলা যাচ্ছে না। 

তিনি সিগারেট টানতে টানতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন এবং ভাবতে চেষ্টা করলেন এইসব অল্পবয়সী একটি মেয়ের কল্পনার ছবি। এর বেশি কিছু নয়। মেয়েটির কল্পনা শক্তি খুব উচ্চপর্যায়ের, যার জন্যে সে এত চমৎকার কিছু ছবি আঁকতে পারছে। ভােরবেলায় তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। 

মিসির আলির ঠাণ্ডা লাগছে। হু হু করে বইছে উত্তরী হাওয়া। কিন্তু এই ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ লাগছে। চারদিক খুব চুপচাপ। আকাশে চাঁদ থাকায় চমৎকার জোছনা হয়েছে। গাছের পাতার ফাক দিয়ে জোছনা ভেঙে-ভেঙে পড়ছে। কী অপূর্ব একটি দৃশ্য। মিসির আলি নিজের অজান্তেই হাঁটতে হাঁটতে একটি ঝকড়া জামগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঠিক তখন অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল । তিনি স্পষ্ট শুনলেন তিন্নি বলছে—কি আপনার ঘুম আসছে না ?’ তিনি আশেপাশে কাউকেই দেখলেন না। 

দেখার কথাও নয়। এই নিশিরাত্রিতে তিন্নি নিশ্চয়ই নিচে নেমে আসে নি। তিনি বললেন কে ? কে কথা বলল ? 

মিরি আলি খিলখিল হাসির শব্দ শুনলেন। এর মানে কী? তিন্নির হাসি কোথেকে ভেসে ‘সছে? মিসির আলি বললেন, তুমি তিন্নি? 

হুঁ। 

কোখেকে কথা বলছ ? আপনি এত বুদ্ধিমান অথচ কোথেকে কথা বলছি বুঝতে পারছেন না ? 

বুঝতে পারছি না। তুমি কোথায় ? আমি আমার ঘরেই আছি। কোথায় থাকব ? 

fাসির আলি একটা বড় ধরনের চমক পেলেন। মেয়েটি তার ঘর থেকেই কথা বলছে। সেইসব কথা তিনি পরিষ্কার শুনছেন। ট্যালিপ্যাথিক যােগাযােগ। অদ্ভুত তাে। 

 

Leave a comment

Your email address will not be published.