অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১৩)

মিসির আলি বললেন, আমি আজ সন্ধ্যায় ঢাকা যাব। এখানকার কাজ আমার আপাতত শেষ হয়েছে। ঢাকায় আমি কিছু পড়াশােনা করব। খোঁজখবর করব। তারপর ফিরে আসব ।

অন্যভুবন

আজই যাবেন ? 

হ্যা আজই যাব। হাতে সময় বেশি নেই। কিছু একটা করতে হলে দ্রুত করতে হবে। 

এ-কথা কেন বলছেন ? ইনসটিংকট থেকে বলছি। আমার মনে হচ্ছে এ-রকম । 

আপনি কিন্তু আমার মেয়ের সঙ্গে একবারই কথা বলেছেন। আমি চাচ্ছিলাম আপনি তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ আলােচনা করবেন। 

আমি আবার ফিরে আসছি। তখন করব। কবে ফিরবেন ? চেষ্টা করব খুব তাড়াতাড়ি ফিরতে। আমার মেয়েটিকে কেমন দেখলেন বলুন। এখনাে বলবার মতাে কিছু পাচ্ছি না। পাবেন কি ? পাব নিশ্চয়ই পাব। কেন পাব না ? বরকত সাহেব একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। মনে হল তিনি খুব আশাবাদী নন। 

তিনি প্রায় সারাদিনই ছাদে বসেছিল। মিসির আলি তার কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলেন বিকেলে। 

তিন্নি আমি চলে যাচ্ছি। মেয়েটি বলল, আমি জানি। আমি তােমার ছবিগুলি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি । তাও জানি। কিছুদিনের মধ্যে আমি আবার আসব। তখন দেখবে সব ঝামেলা মিটে গেছে। তিন্নি কিছু বলল না। মিসির আলি বললেন, গাছপালা তুমি খুব ভালােবাস তাই

মাঝে মাঝে বাসি । মাঝে মাঝে বাসি না। 

তুমি কি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পার ? এখানে যেসব গাছপালা আছে তাদের সঙ্গে পারি না। 

তাহলে কাদের সঙ্গে পার ? 

মেয়েটি জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। মিসির আলি বললেন, তুমি আমার অনেক প্রশ্নের জবাব দাও না। কেন দাও না বলাে তাে? কোনাে বাধা আছে কি? 

তিন্নি সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ফিসফিস করে বলল, আপনি আমাকে ভালাে করে দিন। অসুখ সারিয়ে দিন। 

মিসির আলির খুবই মন খারাপ হয়ে গেল। বাচ্চা একটি মেয়ে বাস করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জগতে— যে জগতের সঙ্গে আশেপাশের চেনা জগতের কোনাে মিল নেই। মেয়েটি কষ্ট পাচ্ছে। তার কষ্টের ব্যাপারটি কাউকে বলতে পারছে না। সে নিজেও হয়তাে জানে না পুরােপুরি। 

তিন্নি আমি যাই ? মেয়েটি কিছু বলল না। মিসির আলি লক্ষ্য করলেন তিন্নি নিঃশব্দে কাঁদছে। 

ঢাকায় ফেরার ট্রেনে উঠবার পর মিসির আলির মনে পড়ল তিনকাপ চায়ের দাম তিনি দিয়ে আসেন নি। রশীদ নামের বুড়ােমানুষটি আগামীকাল ভােরবেলায় যখন দেখবে কেউ আসছে না তখন না-জানি কী ভাববে। মিসির আলির মন গ্লানিতে ভরে গেল । কিন্তু কিছুই করার নেই। ঢাকা মেইল ছুটে চলেছে। পেছনে পড়ে আছে নদীর ধারে গড়ে ওঠা চমৎকার একটি শহর। 

ড. জাবেদ আহসান অবাক হয়ে বললেন, আপনি আমার কাছে ঠিক কী জানতে চান বুঝতে পারছি না। কয়েকটি গাছপালার হাতে-আঁকা ছবি দিয়ে গিয়েছেন, আর তাে কিছু বলেন নি। 

ছবিগুলি ভালাে করে দেখেছেন ? ভালাে করে দেখার কী আছে ? 

মিসির আলি লক্ষ্য করলেন ড. জাবেদ বেশ বিরক্ত। ভদ্রলােক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বােটানি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা তেমন কোনাে কাজকর্ম করেন না, কিন্তু সবসময় ব্যস্ততার একটি ভঙ্গি করেন। ড. জাবেদ এই মুহূর্তে এমন মুখের ভাব করছেন যেন তার মহামূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

মিসির আলি বললেন, এই গাছগুলি সম্পর্কে কিছু বলুন। ছবিতে আঁকা গাছগুলির কথা বলছি। 

কী বলব সেটাই বুঝতে পারছি না। আপনি কী জানতে চাচ্ছেন? এ জাতীয় গাছ দেখেছেন কখনাে? 

বইপত্রে এ-রকম গাছের কোনাে রেফারেন্স পেয়েছেন? 

দেখুন পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ ধরনের গাছ আছে। সবকিছু আমার জানার কথা নয়। আমার পিএইচডির বিষয় ছিল প্লান্ট ব্রিডিং। সে সম্পর্কে আপনাকে আমি কিছু বলতে পারি। আপনি একটি বাচ্চামেয়ের আঁকা কতগুলি ছবি নিয়ে এসেছেন। সেই ছবিগুলি দেখে আমাকে গাছ সম্পর্কে বলতে বলছেন। এ ধরনের ধাধার পেছনে সময় নষ্ট করার আমি কোনাে অর্থ দেখছি না। 

মিসির আলি বললেন, আপনি বিরক্ত হচ্ছেন কেন? বিরক্ত হচ্ছি কারণ আপনি আমার সময় নষ্ট করছেন। 

মিসির আলি বললেন, আপনি বসে বসে টিভি দেখছিলেন। তেমন কিছুতে করছিলেন না। সময় নষ্ট করার কথা উঠছে না। 

মিসির আলি ভাবলেন এই কথায় ভদ্রলােক ভীষণ রেগে যাবেন। গেট আউট’ জাতীয় কথাবার্তাও বলে বসতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তেমন কিছু হল না। ড. জাবেদকে মনে হল তিনি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়েছেন। অপ্রস্তুত মানুষেরা যেমন খুব অদ্ভুত ভঙ্গিতে কাশতে থাকে ভদ্রলােক সে-রকম কাশছেন। কাশি থামার পর বেশ মােলায়েম স্বরে বললেন, একটু চা দিতে বলি ? 

জ্বি না। চা খাব না। একটু খান। ঠাণ্ডা পড়েছে। চা ভালােই লাগবে। বসুন চায়ের কথা বলে আসি । 

চা এল। শুধু চা নয়। চায়ের সঙ্গে নানান রকমের খাবার দাবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাড়ির এই একটি বিশেষত্ব আছে। এরা অতিথিকে চায়ের সঙ্গে নানান রকম 

Leave a comment

Your email address will not be published.