অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১৭)

তার মনে হল মেয়েটি মরে গেলে তিনি মুক্তি পান। জন্মের পরপর তিন্নির জন্ডিস হয়ে ছিল। গা হলুদ হয়ে মরাে-মরাে 

অবস্থা। মেয়েকে ঢাকা পি. 

জিতে নিয়ে যেতে হয়েছিল। বহু কষ্টে তাকে সারিয়ে তোেলা হয়েছে। সেই সময় কিছু-একটা হয়ে গেলে আজ এই ভয়াবহ কষ্ট সহ্য করতে হত না। 

অন্যভুবনতিনি কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঘরের ভেতরে পায়চারি করলেন। একবার ভাবলেন বাগানে যাবেন। কিন্তু সেই চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী হল না। কী হবে বাগানে গিয়ে? তিনি কি পারবেন এই মেয়েকে ফেরাতে পারবেন না। সেই ক্ষমতাই তার নেই। হয়তাে কারােরই নেই। পীর ফকির ধরলে কেমন হয়? তিনি নিজে এইসব বিশ্বাস করেন 

সারাজীবন তিনি ভেবেছেন অস্বাভাবিক কোনাে ক্ষমতা মানুষের নেই। থাকতে পারে না। কিন্তু এখন দেখছেন তার ধারণা সত্যি নয়। অস্বাভাবিক ক্ষমতা মানুষের থাকতে পারে। তিন্নিরই আছে। কাজেই পীর ফকিরের কাছে বা সাধু সন্ন্যাসীর কাছে যাওয়া যেতে পারে। 

স্যার! 

কে? 

তিনি দেখলেন চায়ের পেয়ালা হাতে কাদের দাঁড়িয়ে আছে। তিনি চায়ের পেয়ালা হাতে নিলেন। কাদের বলল, ঐ লােকটা আসছে। 

কোন্ লােক? আগে যে ছিলেন। ও, মিসির আলি ? জ্বি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। 

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ

বরকত সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, দেখা করার কোনাে দরকার নেই। আমি এখন ঘর থেকে বেরুব না। দ্রলােককে তার ঘর দেখিয়ে দাও। খাবার দাবারের ব্যবস্থা কর । আর তিনি যদি তিন্নির সঙ্গে দেখা করতে চান তাহলে তিন্নিকে খবর দাও। তিন্নি বাগানে গিয়েছে।

 কাদের চলে গেল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়বৃষ্টি হবে বােধ হয়। বাতাস ভারী হয়ে আছে। চারদিকে অসহ্য গুমট। 

মিসির আলি এসেছেন সন্ধ্যাবেলায়, এখন রাত এগারটা। কিছুক্ষণ আগেই রাতের খাবার শেষ করেছেন। প্রায় চার ঘণ্টার মতাে হল তিনি এ বাড়িতে আছেন । কাদের এর মধ্যে দুবার জিজ্ঞেস করেছে সে তিন্নিকে খবর দেবে কি না। তিনি বলেছেন খবর দেবার দরকার নেই। কারণ তিনি নিশ্চয়ই জানে যে তিনি এসেছেন। আলাদা করে বলার কোনােই প্রয়ােজন নেই। 

তিন্নি আছে কোথায়? বাগানে।। 

এই রাতের বেলায় বাগানে কী করছে? 

জানি না স্যার। কয়েকদিন ধরে সন্ধ্যার পর বাগানে যায়। অনেক রাত পর্যন্ত থাকে। 

তাই নাকি? জ্বি স্যার। এত রাত পর্যন্ত বাগানে সে কী করে? 

বাড়ির পিছনের দিকে একটা বড়ই গাছ আছে। সেই বড়ই গাছের কাছে একটা গর্ত। ঐখানে চুপচাপ দাঁড়ায়ে থাকে। 

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ

ও আচ্ছা। 

মিসির আলির মুখ দেখে মনে হল তিনি এই খবরে তেমন অবাক হননি। বেশ সহজভাবে বললেন, তুমি বারান্দায় আমাকে একটা চেয়ার দাও। বারান্দায় বসে আকাশের শােভা দেখি। আর শােননা, ভালাে করে এক কাপ চা দিও। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বৃষ্টি হবে বােধ হয়। 

জ্বি। 

মিসির আলি বারান্দায় এসে বসবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টুপটুপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল। মিসির আলি অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন তিনি বেড়িয়ে আসবে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। এ-রকম একটি ঝড় জলের রাতে বাচ্চা একটি মেয়ে একা-একা বাগানে। কতরকম অদ্ভুত সমস্যা আমাদের চারদিকে। মিসির আলি সিগারেট ধরালেন। ইলেট্রিসিটি চলে গিয়েছে। কেরােসিনের বাহারি ল্যাম্প জ্বালানাে হয়েছে। কাদের একটি ল্যাম্প বাইরে নিয়ে আসতেই হাওয়া লেগে সেটি দপ করে নিভে গেল । ঠিক তখন মিসির আলি দেখলেন তিনি বের হয়ে আসছে। ভিজে চুপসে গিয়েছে মেয়েটি। তিন্নিই তাকে দেখেছে। সে এগিয়ে এল মিসির আলির দিকে। 

আপনি কখন এসেছেন? অনেকক্ষণ হল। তুমি বুঝতে পারনি? না। এখন দেখলাম। 

মিসির আলি বেশ অবাক। মেয়েটি বুঝতে পারল না কেন? টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা কি নষ্ট হয়ে গেছে? 

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ

কাদের হা করে তাকিয়ে আছে। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। মিসির আলি বললেন, তিন্নি তুমি হাতমুখ ধুয়ে আস আমরা গল্প করি। ঝড়বৃষ্টির রাতে গল্প করতে বেশ ভালাে লাগে। আর কাদের তুমি আমাদের দুজনের জন্যে চা নিয়ে আস। তিন্নি তুমি চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে? 

কাদের ফিসফিস করে বলল, আপা আজ সারাদিন কিছু খায় নাই। মিসির আলি বললেন, তাহলে কিছু খাবারও নিয়ে আস। হালকা কোনাে খাবার। 

আমি কিছুই খাব না, খিদে নেই। ঠিক আছে না খেলে। এসাে গল্প করি। যাও হাতমুখ ধুয়ে আস। তােমার সমস্ত পা কাদায় মাখামাখি। 

তিনি চলে গেল । কাদের একপট চা এনে রাখল সামনে। মিসির আলি অপেক্ষা করতে লাগলেন কিন্তু মেয়েটি সে রাতে আর তার কাছে এল না। খুব ঝড় হল সারা রাত। শোঁ-শোঁ করে হাওয়া বইতে থাকল। মিসির আলি অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমুতে পারলেন না। তাঁর বারবার মনে হতে লাগল হয়তাে কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটি যােগাযােগ করবে তার সঙ্গে। দুজন দু-জায়গায় বসে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করবেন । কিন্তু তা হল না। 

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ

সূর্য এখনাে উঠেনি। মিসির আলি দ্রুত পা ফেলছেন। ব্রহ্মপুত্র নদী মনে হচ্ছে এখনাে ঘুমিয়ে। দিনের কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়নি। কাল রাতের বৃষ্টির জন্যেই বুঝি চারদিক ঝিলমিল করছে। মিসির আলি গত রাতটা প্রায় অঘুমেই কাটিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে খারাপ লাগছে না। শরীরে কোনাে ক্লান্তি নেই। তিনি খুঁজছেন চাওয়ালাকে। পাওনা টাকাটা দিয়ে দেবেন। গল্পগুজব করবেন। তার মনে একটা আশঙ্কা ছিল হয়তাে এই চাওয়ালা বুড়াের আর খোঁজ পাওয়া যাবে না। বাকি জীবন মনের মধ্যে এই ক্ষুদ্র ঘটনা কাটার মতাে বিঁধে থাকবে। আশঙ্কা সত্যি হল না। বুড়ােকে পাওয়া গেল। কেতলিতে চায়ের পানি ফুটে উঠেছে। কেতলির নল দিয়ে ধুয়া বেরুচ্ছে। বুড়াের মুখ হাসি-হাসি। 

কেমন আছেন বুড়াে মিয়া। আল্লায় যেমন রাখছে। আপনের শইল বালা? 

জ্বি ভালাে। আমাকে চিনতে পারছেন না? ঐ যে চা খেয়ে পয়সা না দিয়ে চলে গেলাম। 

বুড়াে হেসে ফেলল। মিসির আলি বললেন, জরুরি কাজে ঢাকায় চলে গিয়েছিলাম। কাল এসেছি। আপনার টাকা নিয়ে এসেছি। চা কি হয়েছে? 

বুড়াে চায়ের কাপে লিকার ঢালতে লাগল। মিসির আলি বললেন, আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে আমাকে খুব গালাগালি করেছেন। | জ্বি না মিয়া সাব । অত অল্প কারণে কি আর গাইল দেওন যায়? আমি জানতাম আপনে আইবেন।। 

কী করে জানতেন? বুঝা যায়। 

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ

এই কথাটি ঠিক। অনেক কিছুই বােঝা যায়। রহস্যময় উপায়ে বােঝা যায়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মিসির আলির মনে হল তিন্নির ব্যাপার তিনি খানিকটা বুঝতে পারছেন। আবছাভাবে বুঝছেন। 

কী ভাবেন মিয়া সাব? কিছু না। উঠি । 

মিসির আলি চায়ের দাম মিটিয়ে রওনা হবেন, ঠিক তখন মাথা ঝিম করে উঠল । তিন্নির পরিষ্কার রিনরিনে গলা—আপনি ভালাে আছেন? মিসির আলি আবার বেঞ্চিতে বসে পড়লেন। বুড়াে বলল, কী হইছে? বসেন বসেন। 

Leave a comment

Your email address will not be published.