অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১৯)

প্রকাণ্ড একটা মরাল সাপ হঠাৎ যেন আকাশ ছুঁড়ে নেমে এল। মিসির আলি চমকে উঠলেন। তার চোখ থেকে চশমা খুলে পড়ল। আর ঠিক তখন মনে হল এই দৃশ্যটি সত্যি নয়। ময়মনসিংহ শহরের একটি বাড়িতে এতবড় একটি মরাল এসে উপস্থিত হতে পারে না। তাছাড়া কোনাে সাপ পেটে ভর দিয়ে নিজের মাথাটা এত উঁচুতে তুলতে পারে না। এই দৃশ্যটি নিশ্চয়ই তিন্নির তৈরী-করা। মেয়েটি এই ছবি দেখাচ্ছে । মিসির আলি চোখ বন্ধ করলেন। আর ঠিক তখন তিন্নির হাসি শােনা গেল। মেয়েটি তার ঘরে বসেই হাসছে তিনি শুনতে পাচ্ছেন। তিন্নির হাসি থামল। সে রিনরিনে গলায় বলল, খুব ভয় পেয়েছেন?অন্যভুবন 

তা পেয়েছি। কিন্তু যতটা ভয় পাবেন ভেবেছিলেন ততটা পান নি। আপনি বুঝে ফেলেছেন যে এটা মিথ্যা সাপ। 

একটি ভয়াবহ ব্যাপার ঘটল হ্যা, তাও ঠিক। আপনার এত বুদ্ধি কেন বলুনতাে? 

জানি না। সব মানুষের যদি আপনার মতাে বুদ্ধি হত তাহলে খুব ভালাে হত। তাই না? 

মিসির আলি হেসে ফেললেন। হাসি থামিয়ে শান্ত গলায় বললেন, তুমি আমাকে ভয় দেখালে কেন? 

আপনিই বলুন কেন। আপনার এত বুদ্ধি আর এই সহজ জিনিসটা বলতে পারবেন 

আন্দাজ করতে পারছি। তুমি চাও না আমি ঐ গর্তটি দেখি যেখানে তুমি রােজ দাড়াও। তাই না? 

হ্যা, তাই। দেখ তিন্নি আমি তােমার ব্যাপারটা বুঝতে চাই। কিন্তু তুমি আমাকে বুঝতে দিচ্ছ । তুমি আমাকে সাহায্য না করলে আমি তােমাকে সাহায্য করতে পারছি না। আমার এত ক্ষমতা নেই। 

তিন্নি ক্লান্ত গলায় বলল, কোনাে মানুষ আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। যারা পারত তারা করবে না। 

কারা পারত? তিন্নি জবাব দিল না। মিসির আলির মনে হল মেয়েটি কাঁদছে। 

মিসির আলি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। দরজায় খুটখুট শব্দ শুনে জেগে উঠলেন। অনেক রাত। ঘড়ির ছােট কাঁটা একের ঘর পার হয়ে এসেছে। তিনি মুদুস্বরে বললেন, কে? কোনাে জবাব এল না। কিন্তু দরজার কড়া নড়ল। মিসির আলি অবাক হয়ে দরজা খুললেন। অন্ধকারে বরকত সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। 

সরি, আপনার ঘুম ভাঙালাম বােধ হয়। কোনাে অসুবিধা নেই, আপনি আসুন। 

বরকত সাহেব ইতস্তত করে বললেন, ঘুম আসছিল না ভাবলাম আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করি । 

খুব ভালাে করেছেন। বসুন। 

বরকত সাহেব বসলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব অস্বস্তি বােধ করছেন । বসে আছেন মাথা নিচু করে। একজন অহংকারী লােক এভাবে কখনাে বসে না। মিসির আলি বললেন, আমার মনে হয় আপনি আপনার স্ত্রীর কথা কিছু বলতে চান। বলুন আমি শুনছি। 

বরকত সাহেব চুপ করে রইলেন। তাঁর মাথা আরাে একটু ঝুঁকে পড়ল। মিসির আলি বললেন, আমি বরং বাতি নিভিয়ে দেই তাতে কথা বলতে আপনার সুবিধা হবে। আলােতে আমরা অনেক কথা বলতে পারি না। অন্ধকারে সহজে বলতে পারি। 

বাতি নেভাবার পর ঘর কেমন অন্যরকম হয়ে গেল। গা ছমছম করতে লাগল। যেন এই ঘরটি এতদিনের চেনা কোনাে ঘর নয়। অন্য কোনাে রহস্যময় অচেনা ঘর । বরকত সাহেব সিগারেট ধরিয়ে মৃদু স্বরে বলতে লাগলেন ঃ আমার স্ত্রী খুবই সহজ এবং সাধারণ একজন মহিলা। বলার মতাে তেমন কোনাে বিশেষত্ব তার নেই। কোনােরকম অস্বাভাবিকতাও তার চরিত্রে ছিল না। তবে আমার শাশুড়ি একজন অস্বাভাবিক মহিলা ছিলেন। বিয়ের আগে তা জানতে পারিনি। জেনেছি বিয়ের অনেক পরে।

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ 

আমার স্ত্রীর জন্মের পরপর আমার শাশুড়ি মারা যান। আমার শাশুড়ি সম্পর্কে এখন আপনাকে যা বলছি সবই শােনা কথা। আমার স্ত্রীর জন্মের ঠিক আগে-আগে আমার শাশুড়ি অদ্ভুত আচার-আচরণ করতে থাকেন। তার ভেতর উল্লেখযােগ্য হচ্ছে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে রােদে বসে থাকা। এখন তিনি যা করে অনেকটা তাই। আমার শাশুড়ি লােকজনদের বলতে শুরু করেন তার পেটে মানুষের বাচ্চা নয়, তার পেটে বড় হচ্ছে একটা গাছ। সবাই বুঝল এটা মাথাখারাপের লক্ষণ । গ্রাম্য চিকিৎসা হতে থাকল। কোনাে লাভ হল না। তিনি বলতেই থাকলেন তার পেটে বড় হচ্ছে একটা গাছ। যাই হােক যথাসময়ে আমার স্ত্রীর জন্ম হল। ফুটফুটে একটি মেয়ে। আমার শাশুড়ি মেয়েকে কোলে নিলেন কিন্তু বললেন- তােমরা বুঝতে পারছ না এ আসলে মানুষ নয়, এ একটা গাছ। এর কিছুদিন পর আমার শাশুড়ি মারা যান। 

আপনাকে আগেই বলেছি আমার স্ত্রী খুব স্বাভাবিক মহিলা ছিলেন। কিন্তু তিন্নি যখন পেটে এল তখন তার ভেতরেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিল। এক রাতে সে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল— তার পেটে যে বড় হচ্ছে সে মানুষ নয়, সে একটা গাছ । আমি এমন ভাব দেখালাম যে এই খবরে মােটেও অবাক হই নি। আমি বললাম, তাই 

কি? 

সে বলল, হ্যা। কী করে বুঝলে? 

অনেক দূরের কিছু গাছ আমাকে স্বপ্নে বলেছে। তারা বলেছে, তােমার গর্ভে যে জন্মেছে তাকে খুব যত্নে বড় করবে। কারণ তাকে আমাদের খুব দরকার। 

স্বপ্নে তাে মানুষ অনেক কিছুই দেখে। স্বপ্নটাকে কখনাে সত্যি মনে করতে নেই। এটা সত্যি। এটা স্বপ্ন নয়। ঠিক আছে সত্যি হলে সত্যি। এখন ঘুমাও। 

তিন্নির জন্মের কিছুদিন পর আমার স্ত্রী মারা গেল। তার মৃত্যুর দুদিন আগে তিন্নিকে কোলে নিয়ে আমি তার কাছে গেলাম। হাসিমুখে বললাম, কী সুন্দর একটি মেয়ে, তুমি বলছ গাছ? 

আমার স্ত্রী ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাসল। শান্ত স্বরে বলল, তুমি বুঝতে পারছ না। কিন্তু একদিন বুঝবে। আমি হাসতে হাসতে বললাম, একদিন সকালবেলা দেখব তিন্নির চারদিকে ডালপালা গজিয়েছে। নতুন পাতা ছেড়েছে? 

অন্যভুবন-হুমায়ূন আহমেদ 

আমার স্ত্রী তার জবাব দিল না। কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল। যেন আমার কথায় সে অসম্ভব রেগে গেছে। | বরকত সাহেব থামলেন। ঘর অন্ধকার কিন্তু মিসির আলি পরিষ্কার বুঝতে পারছেন ভদ্রলােকের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। 

আপনি আমার স্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন। আমি যা জানি আপনাকে বললাম। এখন আপনি আমাকে বলুন কী হচ্ছে। 

মিসির আলি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। বরকত সাহেব ধরা-গলায় বললেন, কিছুদিন থেকে তিন্নি বাগানে একটি গর্তে চুপচাপ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। ফিরে আসে অনেক রাতে। আমার প্রায়ই মনে হয় একদিন সে হয়তাে আর ফিরবে না । সেখানেই থেকে যাবে এবং দেখব…। 

বরকত সাহেব কথা শেষ করলেন না। তাঁর গলা বন্ধ হয়ে এল। মিসির আলি বললেন, নিন এক গ্লাস পানি খান। বরকত সাহেব তার্তের মতাে পানির গ্লাস শেষ করলেন। 

মিসির আলি সাহেব। জ্বি বলুন। 

তিন্নি এখন আমাকে বলছে বাড়ি ছেড়ে যেতে। সে একা থাকবে এখানে। কাজের লােক থাকবে না, দারােয়ান মালী কেউ থাকবে না। থাকবে শুধু সে একা। এবং আপনি জানেন মেয়েটি যা চায় তাই আমাকে করতে হবে। ওর অসম্ভব ক্ষমতা। আপনি তার পরিচয় ইতিমধ্যেই হয়তাে পেয়েছেন। 

 হ্যা তা পেয়েছি। 

Leave a comment

Your email address will not be published.