অপেক্ষা পর্ব (৫)- হুমায়ূন আহমেদ

সময় লাগে । 

‘জ্বি, বুঝতে পারছি। 

‘না, বুঝতে পারছেন না। বােঝাটা এত সহজ না। একটা ঘটনা বলি শুনুন । ঘটনা শুনলে আমাদের যােগাযােগ পদ্ধতিটা সম্পর্কে আপনার ধারণা হবে।

অপেক্ষা

রকিব সাহেবের যােগাযােগ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেবার কোন ইচ্ছা ফিরোজের নেই। সে এখন পুরােপুরি নিশ্চিত পুরাে ব্যাপারটাই ভাওতাবাজি। ক্ষিধেয় তার নাড়িভুড়ি হজম হয়ে আসছে। মাথা ঘুরছে । তার উচিত এই বাড়ি 

থেকে বের হয়েই সােজা কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকে গরুর ভুনা মাংস এবং গরম গরম পরােটার অর্ডার দেয়া। সঙ্গে কাটা পেয়াজ থাকবে। মাঝে মধ্যে পেয়াজে কামড়। প্রচন্ড ক্ষিধের সময় হঠাৎ হঠাৎ কিছু খাবার খেতে ইচ্ছে করে। আজ পরােটা গােসত খেতে ইচ্ছা করবে অন্য কোনদিন অন্য কোন খাবার খেতে ইচ্ছে করবে। 

‘ফিরােজ সাহেব!’ ‘জ্বি।’ ‘আপনার কি শরীর খারাপ না-কি ? চেহারা কেমন যেন মলিন লাগছে।’ “জ্বি না, শরীর ভাল আছে।’ 

‘চা খান। চা খেতে খেতে গল্প করি। আপনার মনের শান্তির জন্যে বলে রাখি— আপনার ভাই-এর ব্যাপারে আমি অনিতাকে বলেছিলাম। অনিতা আমাদের থিওসফিক্যাল সােসাইটির সদস্য, অত্যন্ত পাওয়ারফুল মিডিয়াম। সে আমাকে জানিয়েছে এক সপ্তাহের মধ্যে পজিটিভ কিছু বলতে পারবে। 

অপেক্ষা পর্ব (৫)- হুমায়ূন আহমেদ

‘আমি কি এক সপ্তাহ পরে আসব ?’ 

‘আসুন। আগামী বুধবারে আসুন। রাত দশটার পর আসুন। অসুবিধা হবে। নাতাে ?’

‘জ্বি না।’ 

‘ঐ রাতে আমাদের একটা সিয়েন্সও হবে। ইচ্ছে করলে অবজার্ভার হিসেবে থাকতে পারেন। সােসাইটির বাইরের কারাের থাকার অবশ্যি নিয়ম নেই। তবে আপনার ব্যাপারে আমি বলে টলে ব্যবস্থা করে রাখব। 

‘জি আচ্ছা। ‘এখন শুনুন, আমার জীবনের একটা অদ্ভুত ঘটনা। চার বছর আগের কথা। অক্টোবর মাস । তারিখটা হল ৯ তারিখ। সন্ধ্যাবেলা এক ভদ্রলােক এসে উপস্থিত হলেন। বছর দুই আগে তার একটা মেয়ে মারা গেছে। কিছুদিন হল রােজ মেয়েটাকে স্বপ্ন দেখছেন। মৃতা মেয়ের সঙ্গে যােগাযােগ করতে চান। আমরা কোন ব্যবস্থা করে দিতে পারি কি-না। তিনি সঙ্গে করে মেয়ের কিছু ব্যবহারী জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন। মেয়ের ছবি এনেছেন। তার হাতে লেখা ডাইরী এনেছেন। আমি বললাম, রেখে যান দেখি কিছু করা যায় কি-না। মৃত মানুষের আত্মাকে চক্রে আহ্বান করা কঠিন কিছু না তবে অল্প বয়সে মারা 

গেলে সমস্যা হয়। প্লানচেটে বা চক্রে শিশুদের আহ্বান করার নিয়ম নেই। আহ্বান করলেও তারা আসে না। 

ফিরােজ জড়ানাে গলায় বলল– ও! ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। মনে হচ্ছে যে কোন মুহূর্তে সােফায় সে এলিয়ে পড়বে এবং তার নাক ডাকতে শুরু করবে। ভদ্রলােক একটা ভয়ংকর গল্প ফেদেছেন, এরমধ্যে নাক ডাকানাে ভয়াবহ ব্যাপার হবে। ঘুম কাটানাের কিছু পদ্ধতি সে ব্যবহার করছে লাভ হচ্ছে না। উল্টা আরাে ঘুম পাচ্ছে। সব পদ্ধতিই কোন না কোন সময়ে ব্যাক ফায়ার করে উল্টো দিকে চলা শুরু করে। তার বেলায় এখন তাই হচ্ছে। 

অপেক্ষা পর্ব (৫)- হুমায়ূন আহমেদ

ভয়ংকর কোন ঘটনার কথা ভাবলে ঘুম কেটে যায়। সে ভাবছে— বাসায় পৌছেই দেখবে তার মা আকলিমা বেগম আঁকা বাঁকা অক্ষরে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন—– চিঠির প্রতিটি সংবাদই দুঃসংবাদ। বাবা ফিরােজ, তুমি জমি বিক্রি করিয়া টাকা পাঠাইতে বলিয়াছ। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেছি। লােকজনের হাতে এখন টাকা নাই । জমি কিনিবার ব্যাপারে কাহারাে আগ্রহ নাই। তুমি মহা বিপদে পরিয়াছ ইহা আমি জানি কিন্তু কি করিব আমি নিরুপায়।…’ 

ফিরােজ সাহেব!’ ‘জি স্যার।’ ‘আপনার জ্বর-টর আসছে না-কি ? চোখ লাল। ‘বােধ হয় জ্বর আসছে– আজ বরং উঠি।’ 

‘গল্পের শেষটা শুনে যান। শেষটা না শুনলে মনের উপর চাপ থাকে। এই চাপ মানসিক শান্তির জন্যে ক্ষতিকর। তারপর কি হল শুনুন— আমরা কয়েকটা সিয়েন্স করলাম এবং প্রতিবারই রিডিং পেলাম মেয়েটা জীবিত। মৃত নয়। বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা ? 

‘জ্বি।’ 

‘আমার নিজের ধারণা হল আমরা কিছু ভুল করছি। আত্মার অনেকগুলি স্টেট থাকে। নানান স্তরে তাদের বাস। পৃথিবীর কাছাকাছি যারা থাকে তাদের চিন্তা ভাবনা দেহধারীদের মতাে…’ 

ফিরােজ বাসায় পৌছল জ্বর নিয়ে। তার কেঁপে জ্বর এসেছে। জ্বর আসায় একটা সুবিধাও হয়েছে—পরােটা গােসতের ব্যাপারটা মাথা থেকে চলে গেছে। 

এখন ইচ্ছা করছে কাথার ভেতর ঢুকে পড়তে। দরজা জানালা বন্ধ করে কাঁথার ভেতরে ঢুকে কুলী পাকিয়ে যাওয়া। মােটামুটি মাতৃগর্ভের মত একটা পরিবেশ তৈরি করে জন্মের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া। এই স্টেটেরও নিশ্চয় কোন নাম আছে। থিওসফিস্ট রকিব সাহেব বলতে পারবেন। 

অপেক্ষা পর্ব (৫)- হুমায়ূন আহমেদ

দরজা খুলে দিল ইমন। সে দরজা খােলা শিখেছে। চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে সিটকিনি খুলতে পারে। এবং এই কাজটা খুব আগ্রহের সঙ্গে করে । ফিরােজ বলল, খবর কিরে ? 

ইমন বলল, মা তােমাকে ডাকে। ফিরােজ বিরক্তমুখে বলল, মা আমাকে ডাকবে কিরে ব্যাটা, আমিতাে এইমাত্র ঢুকলাম। ভাবীতাে জানেই না আমি এসেছি । 

ইমন আবারাে বলল, মা তােমাকে ডাকে। 

ইমনের মধ্যে রােবট টাইপ কিছু ব্যাপার আছে। মাথার ভেতর কিছু ঢুকে গেলে সেটাই বলতে থাকে। ফিরােজ বলল, যাচ্ছি। হাত মুখ ধুয়ে তারপর যাই। বুঝলিরে ব্যাটা, শরীর ভাল না। থার্মোমিটার না দিয়েও বুঝতে পারছি— একশ তিন জ্বর। 

‘মা তােমাকে এখনই ডাকে।’ | ফিরােজ সুরাইয়ার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে গেল। খাটে। বিছানাে শাদা চাদর রক্তে মাখামাখি। চাদর থেকে গড়িয়ে মেঝেতেও ফোটা ফোটা রক্ত পড়ছে। সুরাইয়ার মুখ ছাই বর্ণ। প্রচণ্ড ব্যথা সে নিজের মধ্যে চেপে রাখছে তা বােঝা যাচ্ছে শুধু তার কণ্ঠার হাড়ের ওঠানামা দেখে। 

ভাবী, কি হয়েছে ? ‘সুরাইয়া ফিস ফিস করে বলল— বুঝতে পারছি না। বােধ হয় এবােরশন হয়ে যাচ্ছে।’ 

‘কি সর্বনাশের কথা। ভাবী আমি এক্ষুনি এম্বুলেন্স নিয়ে আসছি। তুমি আর কিছুক্ষণ এইভাবে থাক। | সুরাইয়া জবাব দিল না। ঘােলাটে চোখে তাকাল।সেই ঘােলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে ফিরােজের মনে হল— এম্বুলেন্স আনতে গিয়ে সময় নষ্ট করা যাবে না। এত সময় হাতে নেই। তাকে যা করতে হবে তা হচ্ছে ভাবীকে পাজাকোলা করে নিয়ে এক্ষুনি রাস্তায় চলে যেতে হবে কোন একটা বেবী ।

অপেক্ষা পর্ব (৫)- হুমায়ূন আহমেদ

টেক্সিতে উঠে বেবী টেক্সীওয়ালাকে বলতে হবে— তাড়াতাড়ি মেডিকেলে নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি। 

বেবীটেক্সী ঝড়ের গতিতেই যাচ্ছে। ফিরােজ সুরাইয়ার অচেতন শরীর কোলে নিয়ে বসে আছে । ফিরােজের পাশে ইমন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে না— সে খুব ভয় পাচ্ছে। সে অবশ্যি তার মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছেও না। সে বেবীটেক্সীর সাইডের আয়নাটার দিকে তাকিয়ে আছে। এই আয়নায় বেবীটেক্সীওয়ালার মুখ দেখা যাচ্ছে। বেবীটেক্সীওয়ালার মুখ দেখতে ভাল লাগছে। কেমন গােল মুখ।

চোখ দুটিও মার্বেলের মত গােল। এর মধ্যে একবার সে শুধু তার ছােট চাচার দিকে তাকিয়েছে। ছােট চাচা খুব কাঁদছেন। শব্দ করে কাঁদছেন না— তবে তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। ছােট চাচার কান্না দেখে তার মনে হচ্ছে— মা মারা গেছেন। এখন থেকে সকালে কে তাকে স্কুলে নিয়ে যাবে ? ছােট চাচা ? স্কুল থেকে ফেরত নেবার সময় ছােট চাচা সময় মত আসবে তাে ? দেরী করে এলে তার খুব খারাপ লাগবে । কষ্ট হবে। 

সুরাইয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল সন্ধ্যা ছ’টায়। রাত তিনটায় ডাক্তাররা তাকে অপারেটিং রুমে নিয়ে গেলেন। তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল না রুগী সম্পর্কে তারা খুব আশাবাদী। কিছু একটা করতে হয় বলেই অপারেটিং রুমে নিয়ে যাওয়া। 

ইমন একটা বেঞ্চে একা একা বসেছিল—এত রাত হয়েছে তারপরেও সে জেগে আছে। ঘুম পাচ্ছে না। ছােট চাচা তাকে একটা কলা একটা বনরুটি কিনে দিয়েছেন। সে কলা এবং বনরুটি হাতে বসে আছে। ছােট চাচা খুব দৌড়াদৌড়ির মধ্যে আছেন। একবার ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন, একবার ওষুধ কিনতে যাচ্ছেন, একবার যাচ্ছেন রক্তের জন্যে। তবে কিছুক্ষণ পর পর এসে 

ইমনকেও দেখে যাচ্ছেন। 

ভাের চারটায় ছােট চাচা এসে ইমনকে বললেন ইমন তাের একটা বােন। হয়েছে। তাের বােনটা ভাল আছে, তাের মাও ভাল আছে। আর কোন চিন্তা নেই । 

ইমন বলল, বােনটার নাম কি ? ‘নাম এখনাে রাখা হয় নি। নাম রাখা হয় নি কেন ? 

Leave a comment

Your email address will not be published.