এপিটাফ পর্ব:০৯ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:০৯

বুঝলি দিলু, ব্রেইন ডিফেক্টের মতো হয়ে গেছে। ব্যবসার অবস্থা ভয়াবহ। বড় অ্যামাউন্টের একটা এলসি খুলেছিল। ব্যাংক থেকে কী যেন প্রবলেম করছে। আমি জানিও না, কিছু বুঝিও না। গতকাল আমাকে বলে, রুবা, আমাকে একলাখ টাকা ধার দাও না। তিনশ বস্তা সিমেন্ট কিনব। অবস্থা চিন্তা কর। আমি টাকা পাব কোথায়? শেষে বলে, তোমার গয়না বিক্রি কর। ভাবটা এরকম যেন আমার লাখ লাখ টাকার গয়না আছে। ওর বন্ধুবান্ধব এখন ওকে দেখলে পালিয়ে বেড়ায়। সবাই ভাবে, বোধহয় এক্ষুনি টাকা ধার চাইবে…।

দিলশাদ তাকিয়ে আছে। সে ক্লান্ত গলায় বলল, তোমার এই অবস্থা! হ্যাঁ রে দিলু, এই অবস্থা। বাইরে থেকে দেখে কেউ কিছু বুঝবে না। ঠাটবাট সবই আছে। তিনদিন আগে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে কার্পেট কিনলাম। এখনো টাকা দেয়া হয় নি। রোজ টেলিফোন করছে। একবার ভাবলাম বলি, আপনারা আপনাদের কার্পেট নিয়ে যান। শেষে ভাবলাম, ঠিক আছে, যাক কয়েকটা দিন। দরকার হলে গয়না বেচব। কী করা! গয়না তো আজকাল কেউ পরে না। লকারেই পড়ে থাকে। বিক্রি করলেই কী, আর না করলেই কী। তুই কি কিছু খেয়েছিস দিলু? না শুধু-মুখে বসে আছিস?

লেবুর সরবত খেয়েছি।ভাত খাবি? ভাত খা। ওর এক বন্ধু রূপচান্দা শুঁটকি পাঠিয়েছে চিটাগাং থেকে। ঝাল ঝাল করে বেঁধেছি। খেয়ে যা।না, কিছু খাব না। আজ উঠব।তুই কি টাকার জন্যে এসেছিলি? হ্যাঁ। দুলাভাই আজ আসতে বলেছিলেন।কাল আয়। কাল এসে ওর সঙ্গে কথা বল। আমি ওকে বাসায় থাকতে বলে দেব। তাবে তোকে সত্যি কথা বলি–ওর পক্ষে সম্ভব না। ওর ভয়াবহ অবস্থা। তোর টাকা জোগাড় হয়েছে কেমন? সামান্যই হয়েছে।বড় দুলাভাই যে টাকাটা দেবেন বলেছেন, দিয়েছেন?

এখনো দেন নি।টাকাটা নিয়ে নে। আপার সঙ্গে দুলাভাইয়ের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বড় . দুলাভাই আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করেছেন। এখন শুনছি বেশিরভাগ সময় সেখানেই থাকেন। হোটেল থেকে ভাত আনিয়ে খান। সম্পর্ক আরো খারাপ হবার আগেই টাকাটা নিয়ে নেয়া দরকার।আপা, আমি আজ উঠি।তুই বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস করিস নি। তুই ভেবেছিস আমি বানিয়ে বানিয়ে অভাব-টভাবের কথা বললাম।তা ভাবব কেন!বিশ্বাস কর, আমি এক বর্ণ মিথ্যা বলি নি। পাপিয়া একটা মিউজিক্যাল ট্যুরে মালয়েশিয়া যাবে।

ওর বাবাকে লিখল পাঁচশ ডলার পাঠাতে। ঘুরবে-টুরবে, কেনাকাটা করবে। ওর বাবা বলল, মালয়েশিয়ার কোনো দরকার নেই। মেয়েকে ঢাকায় চলে আসতে বলল। ওর পড়ার খরচ দিতে পারব কিনা তার নেই ঠিক। শেষপর্যন্ত অবশ্যি টাকা পাঠিয়েছে। কী করে পাঠিয়েছে সে-ই জানে। আমি ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করি নি।আপা, আজ উঠি? উঠবি? দাঁড়া, তোকে কয়েকটা রূপচান্দা মাছের শুঁটকি দিয়ে দি।শুঁটকি দিতে হবে না। তুমি তোমার ড্রাইভারকে বলো আমাকে একটু নামিয়ে দিতে। এত রাতে একা যেতে ভরসা হচ্ছে না।

ভরসা হলেও তোকে আমি একা ছাড়ব নাকি? দিলু, বড় দুলাভাইয়ের ব্যাপারে যেটা বললাম মনে রাখিস। ভুজুং-ভাজুং দিয়ে টাকাটা ম্যানেজ করে নে। কালই যাবি।দেখি।এখানে দেখাদেখির কিছুই নেই। প্রয়োজনটা আমাদের। ও, আসল কথা বলতে ভুলে গেছি। পাপিয়ার বাবার এক ক্লোজ ফ্রেন্ড আছে, টিভির কর্তা ব্যক্তি। তার সঙ্গে পাপিয়ার বাবার কথা হয়েছে। ওদের একটা ম্যাগাজিন। নাতাশাকে প্রজেক্ট করবে। নাতাশার সঙ্গে কথা-টথা বলবে। প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল এটা বলে তার জন্যে সাহায্য চাওয়া হবে।

লোকজন এমনিতে কিছু দিতে চায় না। কিন্তু টিভিতে কিছু প্রচার করলে হু হু করে টাকা আসতে থাকে। আমাদের কিছু করতে হবে না। শুধু ব্যাংকের একটা অ্যাকাউন্ট নাম্বার দেয়া থাকবে। টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে। নাতাশাকে টিভি স্টেশনে যেতেও হবে না। টিভি ক্রুরা বাসায় এসে রেকর্ড করবে।দিলশাদ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, এসবের কোনো দরকার নেই আপা।দরকার নেই কেন? আমি তো কোনো অসুবিধা দেখছি না। আমাদের কার্যোদ্ধার দিয়ে হচ্ছে কথা।নাতাশা মনে কষ্ট পাবে। এমনিতেই সে ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে আছে। আমি সেই কষ্ট আর বাড়াতে চাই না।ফট করে না বলিস না। ভেবে দেখ।এর মধ্যে ভাবাভাবির কিছু নেই।

আপা, আমি আজ যাচ্ছি।আয়, আমিও তোর সঙ্গে যাই। তোর বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে আসি।তোমাকে যেতে হবে না। তুমি উত্তরা থেকে ক্লান্ত হয়ে এসেছ। তুমি বিশ্রাম কর।দিলরুবা দুটা রূপচান্দার শুঁটকি পলিথিনের ব্যাগে করে নিয়ে এলো। সঙ্গে একটা গল্পের বই। শরদিন্দুর ‘ঝিন্দের বন্দি’।নাতাশার জন্যে পাপিয়া পাঠিয়েছে। বইটা ওকে দিয়ে দিস। কাল-পরশু একবার গিয়ে ওকে দেখে আসব।দিলশাদ ক্লান্ত গলায় বলল, আচ্ছা এসো।তোকে একটা ইন্টারেস্টিং কথা বলা হয় নি। আমাদের সামনের বাসায় যে ভাড়াটে থাকে– আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় অফিসার। সে সেদিন হঠাৎ এসে আমাকে একটা দাওয়াতের কার্ড দিয়ে গেল। ওদের কী যেন অফিসিয়েল ফাংশান, যেতেই হবে…।

আপা, তোমার এই গল্প আরেকদিন এসে শুনব। আজ যাই।সাজ্জাদ মেয়ের সঙ্গে গল্প করছে। গল্প করে আগের মতো আনন্দ পাচ্ছে না। নাতাশা তার দিকে তাকিয়ে আছে ঘুম ঘুম চোখে।সাজ্জাদ একবার বলল, মা, ঘুম পাচ্ছে? নাতাশা বলল, ঘুম পাচ্ছে না তো। অসুখের জন্যে আমার চোখ ছোট ছোট হয়ে গেছে। তুমি সাইনবোর্ডের গল্পটা আরেকবার বলল।শোনা গল্প আবার শুনবি?

হুঁ।নতুন অনেক গল্প আছে। সেগুলি শোন। জঙ্গলের গল্প।না। তুমি গল্প বলার সময় আমার দিকে তাকিও না। আমার দিকে তাকালে তোমার মনে হবে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। তুমি আগের মতো মজা করে গল্প করতে পারবে না। বাবা, শুরু কর।সাজ্জাদ চিন্তিত গলায় বলল, তোর মা এখনো আসছে না। এগারটার উপরে বাজে।তোমার গল্প শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মা চলে আসবে। দেরি না করে তুমি শুরু কর তো বাবা।তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছি। রেজাল্ট বেরুতে দু-তিন মাস দেরি। আমাদের কিছু করার নেই। সময় আর কাটছে না।

কয়েক বন্ধু মিলে প্ল্যান করলাম, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ট্যুর দেব। সাইকেল ট্যুর। আমরা ছয় বন্ধু, সাইকেল জোগাড় হলো তিনটা। ট্যুর প্রোগ্রাম বাতিল হয়ে গেল। কী করা যায় কিছুই বুঝতে পারছি না। একেকদিন একেকজনের মাথা থেকে একেক ধরনের আইডিয়া আসে। আইডিয়া নিয়া চিন্তা-ভাবনা করতে করতে সময় কেটে যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় মা। আমাদের এক বন্ধু ছিল– করিম। এফ, করিম।বাবা, উনি এখন কোথায়?

জার্মানি চলে গিয়েছিল। সেখানেই নিখোঁজ হয়ে গেছে। কেউ কোনো খবর জানে না।তোমার সেই বন্ধুর যা বুদ্ধি, আমার ধারণা, উনি বড় কিছু করেছেন।করতে পারে। তবে ওর বুদ্ধির সবটাই ফাজলামি ধরনের। ফাজলামি ধরনের বুদ্ধি দিয়ে খুব বেশি কিছু করা যায় না মা।তারপর কী হলো বাবা বললো।এক রাতে করিম বলল, চল আমরা এক কাজ করি। শহরের মানুষগুলির পিলে চমকানোর ব্যবস্থা করি। আক্কেল গুড়ুম করে দি। আমি বললাম, কীভাবে করবি? করিম বলল, এমন কিছু করব যে শহরের লোকগুলির চোখ শুধু কপালে না, মাথার তালুতে উঠে যাবে।

যেমন ধর, এক দোকানের সাইনবোর্ড অন্য দোকানে লাগিয়ে দেব। এক রাতের মধ্যে সব সাইনবোর্ড বদলে দেব। মিষ্টির দোকানে ঝুলবে ফার্মেসির সাইনবোর্ড। কাঠের দোকানে ইউনানি দাওয়াখানার সাইনবোর্ড। করিমের আইডিয়া আমাদের সবার যে পছন্দ হলো তা না। কিছুই করার নেই। বলেই আমরা রাজি হলাম। মফস্বল শহরে পাহারাদার-টার এমন থাকে না। রাতটাও ছিল শীতের রাত। সবাই গভীর ঘুমে। আমরা হাতুড়ি, পেরেক আর খুন্তি নিয়ে বের হলাম। তারপর শুরু করলাম সাইনবোর্ড বদলানো। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব মজা পেয়ে গেলাম। রাত সাড়ে তিনটার মধ্যে সব সাইনবোর্ড পাল্টানো হয়ে গেল। আমরা খুশি মনে ঘুমুতে গেলাম।

পরদিন সারা শহরে হৈচৈ পড়ে গেল। সবার মুখে মুখে সাইনবোর্ডের কথা। সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে কত রকম গবেষণা, কত থিওরি। মফস্বল শহরে তো আর উত্তেজনার মতো কিছু ঘটে না। সামান্য কিছু ঘটলেই তা নিয়ে তোলপাড় হয়ে যায়। আমরা কল্পনাও করি নি আমাদের সাইনবোর্ড পাল্টানোর ব্যাপারটা এত আলোড়ন তুলবে। আমরা চিন্তা করতে লাগলাম এর পর কী করা যায়। টিয়া পাখি, ঘুমিয়ে পড়েছিস?

নাতাশা জবাব দিল না। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। সাজ্জাদ ভেতরের বারান্দায় চলে গেল। অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয় না। গল্প বলে বলে মুখ শুকিয়ে গেছে। সাজ্জাদ বেতের চেয়ারে বসার সঙ্গে সঙ্গে কলিংবেল বাজল। তার নিজেরই দরজা খুলে দিতে ইচ্ছা করছে। সেটা সম্ভব হলো না। ফুলির মা ছুটে গেল। হড়বড় করে সে চাচাজানের আসার সংবাদ দিচ্ছে। দিলশাদকে না দেখেই সাজ্জাদ বুঝতে পারছে ফুলির মা’র উৎসাহ দিলশাদের ভেতর সংক্রমিত হলো না। সে শুধু জিজ্ঞেস করল– নাতাশা খেয়েছে? সাজ্জাদের মনে হলো, মানুষকে অগ্রাহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে এই মহিলা জন্মেছে। তবু নিজের স্বামীকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা সম্ভব না।

সে অবশ্যই বারান্দায় এসে জিজ্ঞেস করবে, কখন এসেছ? সাজ্জাদ অপেক্ষা করতে লাগল। দিলশাদ বারান্দায় এলো না। সে কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। তার শরীর ঘামে কুটকুট করছে। সে আজ অনেক সময় নিয়ে গোসল করবে এবং বাথরুমের নির্জনতায় কিছুক্ষণ কাঁদবে। আজ তার কেন জানি কান্না পাচ্ছে।তাদের দেখা এবং কথা হলো খাবার টেবিলে। সাজ্জাদ লক্ষ করল দিলশাদকে খুব রোগা এবং অসুস্থ লাগছে। চোখের কোণে কালি পড়েছে। মেয়ের অসুখ নিয়ে সে অকুল সমুদ্রে পড়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে। সাজ্জাদের খুব মায়া লাগল। কিছু অত্যন্ত কঠিন কথা বলবে বলে ঠিক করে রেখেছিল। এখন মনে হচ্ছে কোনো কিছুই বলা ঠিক হবে না।

দিলশাদ শুকনো গলায় বলল, তুমি খেয়ে নাও। আমি এখন খাব না।রাত তো কম হয় নি। এখন খাবে না তো কখন খাবে? যখন খেতে ইচ্ছা করবে তখন খাব। আমার ব্যাপার নিয়ে তোমাকে অস্থির হতে হবে না।অস্থির হচ্ছি না, শুধু জিজ্ঞেস করলাম।জিজ্ঞেস করারও দরকার নেই। তোমাকে খেতে দেওয়া হয়েছে, তুমি খেয়ে নেবে।সাজ্জাদ প্লেটে ভাত নিল। দিলশাদ এমন কঠিন আচরণ কেন করছে সে ঠিক বুঝতে পারছে না। বড় বিপর্যয়ের সময় মানুষ কাছাকাছি চলে আসে, সে দূরে চলে যাচ্ছে কেন?

ফুলির মা চিন্তিত মুখে পানির জগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দিলশাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল, জগ হাতে সঙ-এর মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? এত বড় টেবিলে জগ রাখার জায়গা পাচ্ছ না? জগ নামিয়ে রেখে বসার ঘরে তোমার চাচাজানের বিছানা করে দাও। আমার খাটের নিচে তোষক আছে, মশারি আছে। যাও সামনে থেকে। হা করে দাঁড়িয়ে থাকবে না।সাজ্জাদ ডাল নিতে নিতে বলল, পৃথক বিছানা হচ্ছে? হ্যাঁ হচ্ছে। কোনো অসুবিধা আছে?

না। অসুবিধা নেই। টিয়া পাখি ঘুমুচ্ছে, হৈচৈ করো না।তুমি আমার এখানে থাকলে হৈচৈ হবে। চেঁচামেচি হবে। হৈচৈ ছাড়া বাস করতে চাইলে যেখান থেকে এসেছ সেখানে চলে যাও। জঙ্গলে চলে যাও।সাজ্জাদ হতাশ গলায় বলল, তুমি অকারণে রাগ করছ, রাগ করার মতো কোনো অপরাধ আমি এখনো করি নি। বরং তুমি অপরাধ করেছ। নাতাশার অসুখের খবর আমাকে জানাও নি। আমাকে না জানানোর পেছনে তোমার লজিক কী তা আমি জানি না। নিশ্চয়ই কোনো লজিক আছে। তুমি লজিক ছাড়া কোনো কাজ করবে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে আমি সম্ভবত আমার অল্প বুদ্ধির কারণে তোমার লজিক ধরতে পারছি না।

এখনি বা কেন হঠাৎ করে রেগে যাচ্ছ সেটাও বুঝতে পারছি না।দিলশাদ প্রায় অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মতো চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, নাতাশার অসুখের খবর জানলে তুমি কী করতে? তোমার কি কিছু করার ক্ষমতা আছে? মেয়ের চিকিৎসার জন্যে এগার লাখ টাকা আমার দরকার। তুমি পারবে এগার লাখ টাকা জোগাড় করতে? কী হবে তোমাকে জানিয়ে? আমাকে ধন্যবাদ দাও যে তোমাকে জানাই নি। জানাই নি বলে নিশ্চিন্ত মনে এই কমাস মদ-ফদ খেয়ে ফুর্তি করতে পেরেছ। জানালে এই ফুর্তিও করতে পারতে না।Thave spared you the pain.

সাজ্জাদ টেবিল ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, আমার খাওয়া হয়ে গেছে, তুমি ইচ্ছা করলে খেতে বসতে পার।দিলশাদ ফুলির মা’র দিকে তাকিয়ে বলল, টেবিল পরিষ্কার কর, আমি খাব না।সাজ্জাদ বলল, আমার উপর রাগ করে খাওয়া বন্ধ করার কোনো মানে হয় না। তুমি বাচ্চা মেয়ে না। তুমি ভয়াবহ টেনশানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছ তা বুঝতে পারছি। বুঝতে পারছি বলেই রাগ করছি না।তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না, প্লিজ। লোমার সঙ্গে আমার কথা বলতেও ইচ্ছা করে না। তুমি ছিলে না, আমি শান্তিতে ছিলাম।এখন আমি কি খুব অশান্তি করছি?

হ্যাঁ করছ। অশান্তি যে করছ তুমি নিজেও সেটা ভালো করে জানো। আজ এই যে আমার এত সমস্যা তার মূলেও কিন্তু তুমি।সাজ্জাদ বিস্মিত হয়ে বলল, আমি! দিলশাদ সহজ স্বাভাবিক গলায় প্রায় কাটা কাটা ভঙ্গিতে বলল, হ্যাঁ তুমি। দুষ্টগ্রহের কথা বইপত্রে লেখা থাকে না? তুমি আমার জীবনের দুষ্টগ্রহ।সাজ্জাদ তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বলল, নাতাশা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে সেটাও আমার জন্যে?

অবশ্যই তোমার জন্যে। ওর অসুখ জেনেটিক অসুখ। তোমার জিন আমার জিন মিশ খায় নি বলেই নাতাশার জিনে এই গণ্ডগোল হয়েছে। আমার মেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। সিগারেট ধরাবে না। খবরদার! কিছুক্ষণ আগে এসেছ, এর মধ্যেই বাসা ধোয়ায় ঢেকে ফেলেছ। নিঃশ্বাস ফেলার উপায় নেই।সাজ্জাদ সিগারেট ধরাল না। হাতের সিগারেট প্যাকেটে রেখে দিল। এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে হকচকিয়ে গিয়েছে।

দিলশাদ এই পর্যায়ে যাবে সে ঠিক ভাবতে পারে নি।ফুলির মা ঘরে নেই। তবে সে চলেও যায় নি। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। সাজ্জাদ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, ফুলির মা, আমি এক কাপ চা খাব।দিলশাদ সাজ্জাদকে অবাক করে দিয়ে বলল, চা আমি বানিয়ে এনে দিচ্ছি। But do me a favour, চা খেয়ে অন্যকোথাও চলে যাও।অন্যকোথাও চলে যাব? 

দিলশাদ শান্ত গলায় বলল, নিজের উপর আমার এখন আর আগের মতো কন্ট্রোল নেই। রাগ সামলাতে পারি না। তুমি বাসায় থাকলে আমার রাতে ঘুম হবে। আমি ক্রমাগত তোমার সঙ্গে ঝগড়া করব। নাতাশা শুনবে। সে কিছু বলবে কিন্তু কষ্ট পাবে। সে এমনিতেই অনেক কষ্ট পাচ্ছে, আমি আমার মেয়েকে আর কষ্ট দেব না।সাজ্জাদ অবাক হয়ে দিলশাদের দিকে তাকিয়ে রইল। দিলশাদ বলল, সকালে আমি অফিসে চলে যাই। নানান কাজে সারাদিন ঘুরি। এইসময় তুমি এসে তোমার মেয়েকে সঙ্গ দিও। তোমার মেয়ের তোমাকে দরকার। আমার তোমাকে দরকার নেই।সত্যি চলে যেতে বলছ?

হ্যাঁ, চলে যেতে বলছি। তোমাকে দেখেই আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। দুপুরে আমি কিছু খাই নি। খিদেয় আমার শরীর ঝিমঝিম করছে। তুমি আশেপাশে থাকলে আমি ভাত নিয়েও বসতে পারব না।আমি চলে গেলে ভাত খেতে পারবে? হয়তো পারব।আচ্ছা, আমি চলে যাচ্ছি। চা লাগবে না। তুমি খাওয়া-দাওয়া কর।আমি নটার দিকে অফিসে চলে যাই। তুমি নটার পর চলে এসো।আচ্ছা।সাজ্জাদ প্রায় হতবুদ্ধি হয়ে ঘর থেকে বের হলো। সে ভেবে পাচ্ছে না দুঃশ্চিন্তায় দুঃশ্চিন্তায় দিলশাদের মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে কিনা। তার আচার-আচরণ হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো। এই রোগ কখনো কমে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে।

Leave a comment

Your email address will not be published.