করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যা খাওয়া উচিত

আমরা জানি কি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই পারে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে? আসুন যেনে নেই কিভাবে সুশৃঙ্খল খাদ্যাভাসের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায়? করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ

সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে ও মানুষের সমস্ত কাজকে স্থির করে দিয়েছে একটা ক্ষুদ্র ভাইরাস যা চোখেও দেখা যায় না তার নাম হলো, করোনা ভাইরাস। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এই প্রাণঘাতী ভাইরাস যেন সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। এমতাবস্থায় দিন দিন আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যাও রীতিমতো সবার মনে ভীতির সৃষ্টি করছে। যেহেতু এর কোন প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, তাই করোনা ঠেকাতে বার বার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।কারন যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল ও নানা রোগে আক্রান্ত তারাই এই ভাইরাসের করাল গ্রাসের ছোবলে পরে  হারাচ্ছেন প্রাণ।

করোনা ভাইরাস কিভাবে সংক্রামিত হয়:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী করোনা ভাইরাস জুনোটিক। অর্থাত্‍ এই ভাইরাস পশুর দেহ থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সম্প্রতি এই ভাইরাস সিফুড খাওয়ার ফলেই ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন আক্রান্ত মানুষের শরীর থেকেও অন্য মানুষের শরীরে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সংস্পর্শে এলে বা তার সঙ্গে হাত মেলালেও করোনা ভাইরাস শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ হলো- জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কাশি। এটি ফুসফুসে তো সংক্রমিত হয়ই, অসুখ আরও বাড়লে কিডনি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই নিজেকে সাবধান রাখাই শ্রেষ্ঠ উপায়। অসুস্থ কারো কাছাকাছি না যাওয়া।  বারবার সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার রাখবেন। নোংরা হাত চোখ-মুখে দেবেন না।আরও সতর্কতার অংশ হিসেবে মুখে মাস্ক ব্যবহার করা অপরিস্কার পোশাক পরিধান না করা ।বাসা পরিষ্কার রাখা।করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করনীয় :  

প্রথমেই প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা গড়ে তোলা।    UNICEF এর তথ্য অনুযায়ী উল্লেখিত উপায়গুলি মেনে চলার পাশাপাশি  প্রয়োজন প্রত্যেকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ Immune system বাড়িয়ে তোলা যাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের যে মারাত্মক লক্ষ্মণ অর্থাৎ respiratory  এবং gastrointestinal ইনফেকশন এর ঝুঁকি প্রতিরোধ করা যায়। 

ভাইরাস হোল Protein Coat এ একটা খারাপ বিষয় যার কারনে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টের মত এমনকি ( নতুনভাবে) মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে বিশেষ করে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে। এই ভাইরাসটি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বেশি বেশি  পরিমাণে Antioxidant সমৃদ্ধ খাবার প্রতিদিন খেতে হবে।

 Antioxidants হোল কিছু ভিটামিন, মিনারেল এবং এনজাইম যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রী রেডিক্যাল ( দেহের কোষ,প্রোটিন ও  DNA কে ড্যামেজ করে)এর বিরুদ্ধে লড়াই করে, শরীরে রোগের ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। 

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যে সকল খাবার গ্রহণ আবশ্যক : 

উপরোক্ত আলোচনায় স্পষ্ট যে, এই রোগ প্রতিরোধে একমাত্র উপায় সুশৃঙ্খল ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জীবন।আর তার সাথে নিজেদের খাদ্যাভাস পরিবর্তন। সেই সকল  খাবারই গ্রহণ করা যেগুলো খেয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।আসুন যেনে নেই একজন স্বনামধন্য বিশিষ্ঠ পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ মহুয়া ম্যাডামের মতে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অনেকটাই আসে দৈনন্দিন খাবারের হাত ধরে। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট সবরকম খাবারই রাখতে হবে খাবারের তালিকায়। দুগ্ধজাত ও দানা জাতীয় সবজির মধ্যে অ্যান্টিইনফ্লামেটরি উপাদান বেশি থাকে বলে এগুলোও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

 তাই কি ধরনের খাবার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকলে শরীরকে সুস্থ রাখা যায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িরে যে কোন ভাইরাসের সংক্রামন প্রতিরোধ করা  যায় আসুন যেনে নেই ———

 

যে সকল খাবারে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় রাখা আবশ্যক : 

যেসব উপাদান প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকলে অসুখ ঠেকানো সম্ভব  তা হলো ঃ 

মুলতঃ ৫ ধরনের এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে এবং  কমন এন্টিঅক্সিডেন্টগুলি হলোঃ ভিটামিন-এ,সি,ই, বেটা-ক্যারোটিন, লাইকোপেন, লুটেইন, সেলেনিয়াম ইত্যাদি এবং এই পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারগুলি যা বেশি করে খেতে হবে, সেগুলি  হলো :সবজি ও প্রাণীজ খাবার

১.সবজি ও প্রাণীজ খাবার : লেবু, করল্লা (Quercetin, Kaempferol, বেটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ) ,  পারপেল / লাল পাতাকপি, বিট,ব্রোকলি, গাজর,টমেটো, মিষ্টিআলু, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, প্রাণীজ ও উদ্ভিতজাতীয় প্রোটিন খাবারে জোর দিন। ডাল, দানাশস্য জাতীয় খাবার যেমন উপকার করবে, তেমনই খাবারের প্লেটে থাক মাংস, মাছ ও ডিম। হাফ বয়েল ডিম বা পোচ নয়, বরং সম্পূর্ণ সেদ্ধ করা ডিম বা অমলেট রাখুন পাতে। 

২.শাক ঃ পালংশাক,ও অন্যান্য সবুজ শাক 

৩. ফল ঃ কমলালেবু, পেপে ,আঈুর, আম, কিউই, আনার, তরমুজ, বেরি,জলপাই,  আনারস, ইত্যাদি 

৪. মসলাঃ আদা, রসুন,  হলুদ, দারুচিনি, গোলমরিচ

৫. অন্যান্যঃ সিম বিচি, মটরশুঁটি, বিচি জাতীয় খাবার, বার্লি, ওটস, লাল চাল-আটা, বাদাম। 

৬. টক দৈ ( প্রোবায়োটিক) , যা  শ্বাসযন্ত্র ও Gastrointestinal infection এর ঝুঁকি প্রতিরোধ করে,  অন্যদিকে শাক-সবজি, ফল, বাদাম জাতীয় খাবার শরীরে নিউটোভ্যাক্স ভ্যাক্সিনের এন্টিবডি প্রক্রিয়াকে উন্নত করে যা স্টেপটোকোক্কাস নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সক্রিয় ভুমিকা রাখে। 

৭. চা ঃ  Green tea, black tea যাতে L-theanine  এবং EGCG নামক এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা আমাদের শরীরে Germ-fighting compounds  তৈরি করে Immune system কে বাড়ায়।  

৮. মধু ঃ মধু খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন। যদি খাঁটি হয় তাহলে রোগ প্রতিরোধে খুব সাহায্য করে।

এছাড়াও ভিটামিন বি-৬, জিংক জাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে 

যে সকল খাবার খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে :

যে সকল খাবার অবশ্যই খাবার তালিকা থেকে বাদ দেয়া আবশ্যক সেগুলো হলো —–সিগারেট

১/ কার্বনেটেড ড্রিংকস, বিড়ি, সিগারেট,টোবাকো( জর্দা, তামাক, সাদাপাতা, খয়ের) যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাধা দিয়ে ফুসফুসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, অসাস্থ্যকর সব ধরনের  খাবার। 

২/  অপর্যাপ্ত পরিমান  ঘুম শরীরে কর্টিসল হরমোনের চাপ বাড়িয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে।

৩/ বাহিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি মুখরোচক খাবার, জাঙ্ক ফুড  বিভিন্ন রকম তেলে ভাজা খাবার খাওয়া ও খাওয়ানো থেকে বিরত থাকা।

৪/   অতিরিক্ত চিনি বা লবণ মেশানো খাবার থেকে দূরে থাকা। আরো বাদ দিতে হবে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। 

যে সকল খাবার আমাদের পুষ্টির চাহিদা পুরন করে   প্রত্যেকের Immune system Develop করতে সাহায্য করে, শুধু করোনা ( COVID-19) ভাইরাস  নয়, সব ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলা করে আমরা শারীরিক ও ব্যাক্তিগত ভাবে সক্ষম হতে পারবো বলেই আমাদের এই সকল খাবার খাওয়া উচিত আর অতিরিক্ত তৈলাক্ত ও চটপটা খাবার বর্জন করা উচিত।

খাবার গ্রহন ও তৈরির আগে করণীয় : 

করোনা ভাইরাস চলাকালীন এই বর্তমান পরিস্থিতিতে শাঁক সবজি , মাছ মাংস, ফলমূল কিভাবে খাওয়া উচিত অর্থাৎ কিভাবে ধুলে বা রান্না করলে যদি কোন জীবানু থাকে তা নির্মূল করা যায় তা নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আসুন যেনে নেই কি করনীয় ——

১/কাঁচা যে কোন কিছু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

২/ শাক সবজি, মাছ মাংস ডেটল বা ডিটারজেন দিয়ো ধোয়া উচিত না। 

৩/ উপযুক্ত তাপে খাবার রান্না করতে হবে। 

৪/মাইক্রোওয়েভে রান্নার ক্ষেত্রে ঢাকনা ব্যবহার করতে হবে।

৫/ রান্না করা কোন খাবার রেফ্রিজারেটরে রাখতপ হলে খাবার ঢেকে রাখতে হবে। 

৬/ শাক সবজি মাংস রান্নার পূর্বে ভালো করে পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

৭/ ফল সবজি পেস্টিসাইড মুক্ত করতে একটি বড় গামলার মধ্যে পানি নিয়ে তাতে লবন বা ভিনেগার দিয়ে সেই পানির মাঝে ফল ও সবজি ২০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। 

৮/ ২০ মিনিট পর এগুলোকে পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফল খাওয়া এবং সবজি  রান্নার করা উচিত।  

  • করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্ব ব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে। একদিকে এর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা যেমন দুরূহ তেমনি আমাদের মত জনবহুল ও অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থায় করোনার সংক্রমণ মোকাবেলা করা আরও জটিল। তাই শুধু মাত্র আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে নিজেদের রোগ প্রতিরোধ কৃষমতা বাড়িয়ে এই রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করতে।

 

 

 

BY

ত্রোপা চক্রবর্তী

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published.