• Monday , 12 April 2021

কার্ল মার্কস এর জীবনী

কার্ল মার্কস [১৮১৮–১৮৮৩]

লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিশাল পাঠকক্ষের এক কোণে প্রতিদিন এসে পড়াশুনা করেন এক ভদ্রলোক । সুন্দর স্বাস্থ্য, চওড়া কপাল, সমস্ত মুখে কালো দাড়ি । দুই চোখে গভীর দীপ্তি । যতক্ষণ চেয়ারে বসে থাকেন, টেবিলে রাখা স্তূপিকৃত বইয়ের মধ্যে আত্মমগ্ন হয়ে থাকেন । দিন শেষ হয়ে আসে । একে একে সকলে পাঠকক্ষ থেকে বিদায় নেয়, সকলের শেষে বেরিয়ে আসেন মানুষটি । ধীর পদক্ষেপে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেন । একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসেন । ২৮ নম্বর ঘরের দরজায় এসে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দেন এক ভদ্রমহিলা । সাথে সাথে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে ছয়টি ছেলেমেয়ে । 

এক মুহূর্তে গম্ভীর আত্মমগ্ন মানুষটি সম্পূর্ণ পালটে যান । হাসিখুশি আমোদ আহ্লাদে মেতে ওঠেন স্ত্রী আর শিশুদের সঙ্গে ।এক এক দিন ঘরে এসে লক্ষ্য করেন শিশুদের বিষাদক্লিষ্ট মুখ । মানুষটির বুঝতে অসুবিধা হয় না ঘরে খাবার মত একটুকরো রুটিও নেই । আবার বেরিয়ে পড়েন মানুষটি । চেনা পরিচিতদের কাছ থেকে সামান্য কিছু ধার করে খাবার কিনে নিয়ে আসেন, যেদিন কারোর কাছে ধার পান না সেদিন কোন জিনিস বন্ধক দেন । ঘরে ফিরে আসতেই সব কিছু ভুলে যান, তখন আবার সেই হাসিখুশিভরা প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ।  গুরুগম্ভীর পাণ্ডিত্যের চিহ্নমাত্র নেই ।

এই অদ্ভুত মানুষটির নাম কার্ল মার্কস । যিনি রাজনীতি রাষ্ট্রনীতি সমাজনীতি অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রেই যুগান্তর এনেছেন । আধুনিক পৃথিবীকে উত্তরণ করেছেন এক যুগ থেকে আরেক যুগে । যিনি পৃথিবীর সমস্ত শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র নিপীড়িত মানুষকে মুক্তির আলো দিয়েছেন । ভাগ্যের কি বিচিত্র পরিহাস, সেই মানুষটিকে কাটাতে হয়েছে চরম দারিদ্র আর অনাহারের মধ্যে । 

জার্মানির রাইন নদীর তীরে ছোট্ট শহর ট্রিয়ার (Trier) । এই শহরে বাস করতেন হার্সকেল ও হেনরিয়েটা মার্কস নামে এক ইহুদি দম্পতি, হার্সকেল ছিলেন আইন ব্যবসায়ী  । শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মার্জিত রুচির লোক বলে শহরে তাঁর সুনাম ছিল । প্রতিবেশী সকলেই তাঁদের সম্মান করত । প্রতিবেশী জার্মানদের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক ছিল । ১৮১৮ সালের ৫ই মে হেনরিয়েটা তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিলেন । প্রথম সন্তান ছিল মেয়ে । জন্মের পর শিশুর নাম রাখা হল কার্ল । 

যখন কার্লের বয়স ৬ বছর, হার্সকেল তাঁর পরিবারের সব সদস্যই খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষা নিলেন । ইহুদিদের উপর নির্যাতনের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েছিলেন হার্সকেল । সন্তানের রক্ষার জন্য নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত হলেন ।হার্সকেলের সব চেষ্টাই বৃথা গেল । যে সন্তানদের রক্ষার জন্য তিনি নিজের ধর্ম ছাড়লেন, তাঁর সেই সন্তানদের মধ্যে চারজন টিবিতে মারা গেল । শুধু বেঁচে রইলেন কার্ল, হয়ত মানুষের প্রয়োজনের জন্যেই ঈশ্বর তাঁকে বাঁচিয়ে রাখলেন । ছেলেবেলা থেকেই কার্ল মার্কস ছিলেন প্রতিবেশী অন্য সব শিশুদের  চেয়ে আলাদা । ধীর শান্ত কিন্তু চরিত্রের মধ্যে ছিল এক অনমনীয় দৃঢ়তা । যা অন্যায় মনে করতেন, কখনোই তার সাথে আপোস করতেন না । 

বারো বছর বয়েসে কার্ল স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন । তিনি ছিলেন ক্লাসের সেরা ছাত্র । সাহিত্য গণিত ইতিহাস তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত । স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে বিচলিত হয়ে পড়তেন । সহপাঠিরা যখন বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখত, তাঁর মনে হত এই সব দুঃখী মানুষের সেবায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন ।

সতেরো বছর বয়সে কৃতিত্বের সাথে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন । ভর্তি হলেন জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে । ইচ্ছা ছিল দর্শন নিয়ে পড়াশুনা করবেন । শুধুমাত্র বাবার ইচ্ছা পূর্ণ করতেই ভর্তি হলেন আইন পড়তে । কিন্তু আইনের বই- এর চেয়ে বেশি ভাল লাগত কবিতা, সাহিত্য,দর্শন । আর যাকে ভাল লাগত তাঁর নাম জেনি । পুরো নাম জোহান্না বার্থাজুলি জেনি ওস্টেফালেন । জেনির বাবা ছিলেন ট্রিয়ারের এক সম্ভ্রান্ত ব্যারন, রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা । ব্যারনের সাথে কার্লের বাবার ছিল দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব । সেই সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল  জেনি আর কার্লের । শৈশবে খেলার সাথী, যৌবনে নিজের অজান্তেই দুজনে প্রেমের বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেল । যতদিন দুজনে ট্রিয়ারে ছিলেন, নিয়মিত দেখা হত কিন্তু বনে যেতেই কার্ল অনুভব করলেন জেনির বিরহ । পড়াশুনায় মন বসাতে পারেন না, সব সময় মনে পড়ে জেনির কথা ।

ছেলের এই অস্থিরতার কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন হার্সকেল । ডেকে পাঠালেন মার্কসকে, ট্রিয়ারে এসে পৌঁছাতেই ফিরে পেলেন জেনিকে । আবার আগের মা স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন কার্ল । কিন্তু এখানে তো বেশিদিন থাকা সম্ভব হবে না । তাই গোপনে জেনি কার্লের বাগদত্তা হয়ে গেলেন । কিন্তু এ খবর গোপন রাখা গেল না । চিন্তায় পড়ে গেলেন হার্সকেল, সামনে গোটা ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে । ঠিক করলেন এবার বন না, কার্লকে পাঠাবেন বার্লিনে । সেখানে রয়েছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী অধ্যাপক । সেখানকার পরিবেশে গেলে হয়ত কার্লের পরিবর্তন হতে পারে । 

বাদ সাধলেন কার্ল । বার্লিনে গেলে শুধু আইন পড়ব না । দর্শন আর ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করব । অগত্যা তাতেই মত দিলেন হার্সকেল । বার্লিনের নতুন পরিবেশ ভাল লাগল কার্লের । পড়াশুনান ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিতি চিঠি লেখেন জেনিকে । সেই চিঠিতেই থাকে ছোট ছোট কবিতা, দাস ক্যাপিটালের স্রষ্টা প্রেমের কবিতা লিখছেন ।

বার্লিন থেকে মার্কস এলেন জেনাতে । এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট লাভ করলেন । তাঁর থিসিস –এর বিষয় ছিল ”The difference between the narural philosophy of demiocitus and Epicurus.”  এই প্রবন্ধে তাঁর প্রতিটি যুক্তি এত তথ্যপূর্ণ সুসংহত প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ করছেন, পরীক্ষকরা বিস্মিত হয়ে গেলেন । 

কিন্তু এই প্রবন্ধে তাঁর স্বাধীন বস্তুবাদী মতামত কারোরই মনমত হল না । তাছাড়া জার্মানিতে তখন স্বাধীন মত প্রকাশের কোন অধিকার ছিল না । তাঁর ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি নেবেন । কিন্তু উগ্র স্বাধীন মতামতের জন্য তাঁর আবেদন অগ্রাহ্য হল ।

ইতিমধ্যে বাবা মারা গিয়েছেন । ট্রিয়ারে রয়েছে মা আর প্রিয়তাম জেনি । চাকরির আশা ত্যাগ করে তাদের কাছেই ফিরে চললেন মার্কস । অবশেষে প্রেমের পরিণতি ঘটল । মার্কস আর জেনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন । জেনি ছিলেন ধনী পরিবারের অসাধারণ সুন্দরী তরুণী, তবু মার্কসের মত এক দরিদ্র যুবককে বিবাহ করেছিলেন । পরিণামে পেয়েছিলেন চরম দারিদ্র আর দুঃখ, স্থায়ী ঘর বাঁধতে পারেননি তাঁরা । যাযাবরের মত এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, তবুও জেনি ছিলেন প্রকৃত জীবনসঙ্গিনী । আমৃত্যু স্বামীর সব দুঃখ যন্ত্রণাকে ভাগ করে নিয়েছিলেন ।

বিয়ের পর ফিরে এলেন বনে । এই সময় হেগল ছিলেন জার্মানির শ্রেষ্ঠ দার্শনিক । তাঁর দার্শনিক মতবাদ, চিন্তা যুবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল । মার্কসও হেগলেন দার্শনিক চিন্তার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তাছাড়া সেই সময় জার্মানির যুবসমাজ যে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন দেখছিল, মার্কস তা সর্বান্তকরণে সমর্থন করতেন ।

বনে এসে কয়েকজন তরুণ যুবকের সাথে পরিচয় হল । তারা সকলেই ছিল হেগেলের মতবাদে বিশ্বাসী ।    এদের সাথেই তিনি স্থানীয় বৈপ্লবিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে পড়লেন । নিজের ব্যক্তিত্ব, প্রখর বাস্তব জ্ঞান, অসাধারণ প্রতিভায় স্থানীয় র‌্যডিকাল মনোভাবাপন্ন যুবকদের নেতা হিসাবে নির্বাচিত হলেন । সেই সময় তাঁর সম্বন্ধে একটি চিঠিতে ঐতিহাসিক মেসেস (Moses) তাঁর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “কার্ল মার্কসের সাথে পরিচয় হলে তুমি মুগ্ধ হবে, এ যুগের শুধু নন, সম্ভবত একমাত্র প্রকৃত দার্শনিক ।মাত্র চব্বিশ বছর বয়সেই প্রগাঢ় প্রজ্ঞার সাথে মিশেছে তীক্ষ্ণ পরিহাস বোধ । যদি রুশো, ভলতেয়ার, হাইনে, হেগলকে একত্রিত কর তবে একটি মাত্র নামই পেতে পার, ডক্টর কার্ল মার্কস । মার্কস অনুভব করলেন তাঁদের চিন্তাভাবনা, মতামত প্রকাশ করবার জন্য একটি পত্রিকার প্রয়োজন । সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হল রেনিস গেজেট । মার্কস হলেন তাঁর সম্পাদক । তৎকালীন শ্রমিকদের দূরবস্থা সম্বন্ধে সকলকে সচেতন করবার জন্য তিনি এই পত্রিকায় একের পর এক প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করলেন । 

কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হতেই সরকারি কর্মচারীরা সচেতন হয়ে উঠল, এত স্পষ্টতই বিদ্রোহের ইঙ্গিত । সরকারি আদেশবলে নিষিদ্ধ করা হল রেনিস না প্রাশিয়ান সরকার । যে মানুষটি কলমে এমন অগ্নিঝরা লেখা বের হয়, সে আবার নতুন কি বিপদ সৃষ্টি করবে কে জানে ! তাই মার্কসকেও দেশ থেকে নির্বাসিত করা হল । মাত্র কয়েক মাসের সাংবাদিকতা জীবনে মার্কস এক নতুন রীতির প্রবর্তন করলেন । চিরাচরিত নরম সুর নয়, প্রাণহীন নীরস রচনা নয়, বলিষ্ঠ দৃপ্ত নির্ভীক সত্যকে অসংকোচ প্রকাশ করেছেন । ভাষায় নিয়ে এসেছেন ‍যুক্তি, তথ্যের সাথে সাহিত্যের মাধুর্য । সাংবাদিকতার ইতিহাসে এ এক উজ্জ্বল সংযোজন । 

জার্মান ত্যাগ করে মার্কস এলেন ফ্রান্সে । সাথে স্ত্রী জেনি । শুরু হল নির্বাসিত জীবন । এখানকার পরিবেশ অপেক্ষাকৃত স্বাধীন, মুক্ত । পরিচয় হল সমমনোভাবাপন্ন কয়েকজন তরুণের সাথে । এদর মধ্যে ছিলেন প্রাওধন, হেনরিক হাইনে, পিয়েরি লিরক্স । 

তিনি স্থির করলেন এখানে থেকেই একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন । তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল ক্ষুরধার তরবারী । নিজের লেখা প্রকাশ করবার জন্য উদদ্রীব হয়ে উঠলেন । প্যারিস থেকে প্রকাশিত হত একটি জার্মান পত্রিকা Worwart । এতে পর পর কয়েকটি জ্বলাময়ী প্রবন্ধ লিখলেন মার্কস । তাঁর ভবিষৎ জীবনের চিন্তাভাবনার প্রথম প্রকাশ ঘটল এখানে । তিনি লিখলেন, “ধর্ম পৃথিবীর মানুষের দুঃখ ভোলাবার জন্য স্বর্গের সুখের প্রতিশ্রুতি দেয় । এ আর কিছু নয়, আফিমের মত মানুষকে ভুলিয়ে রাখবার একটা কৌশল ।দার্শনিকদের সম্বন্ধে বললেন, তারা শুধু নানাভাবে জগতের ব্যাখ্যা করা ছাড়া কিছুই করেনি । আমরা শুধু ব্যাখ্যা করতে চাই না চাই জগৎকে পালটাতে ।

কিন্তু মার্কসের চাওয়ার সাথে সমাজের ওপর তলার মানুষদের চাওয়ার বিবাদ শুরু হল । কারণ তারা পৃথিবীর পরিবর্তন চায় না । বর্তমান অবস্থার মধ্যেই যে তাদের সুখ ভোগ-বিলাস না, নিজেদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সব দেশের অভিজাত ক্ষমতাবান মানুষেরাই এক ।

মার্কসেন তীব্র সমালোচনার মুখে বিব্রত প্রাশিয়ান সরকার ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করল মার্কসকে অবিলম্বে দেশ থেকে বহিস্কার করবার জন্য । প্রাশিয়ার অনুরোধে সাড়া দিয়ে ফরাসি সরকার মার্কসকে অবিলম্বে দেশ ত্যাগ করবার নির্দেশ দিল । ফ্রান্সের পনেরো মাসের অবস্থানকালে পরিচয় হয়েছিল ফ্রেডারিক এঙ্গেলস এর সাথে । এই পরিচয় মার্কসের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা  কারণ পরবর্তী জীবনে এঙ্গেলস হয়ে উঠেছিলেন তাঁর প্রিয়তম বন্ধু, সহকর্মী সহযোগী । তিনি যে শুধু মার্কসকে রাজনৈতিক কাজে সাহায্য করেছিলেন তাই নয়, দুঃখের দিনে এঙ্গেলস উদার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সাহায্যে । এঙ্গেলস ছিলেন মার্কেসের চেয়ে দু’বছরে ছোট । তাঁর বাবা ছিলেন জার্মানীর এক শিল্পপতি । ছেলেবেলা থেকেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রগতিশীল । বাবার ব্যবসার কাজে ইংলান্ডে গিয়েছিলেন, সে সময় বিখ্যাত চার্টিস্ট আন্দোলনের সাথে পরিচয় হয় । মার্কসের সাথে পরিচয় হয় যখন তিনি রেনিস গেজেট পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন । বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্যারিসে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের পর থেকে । 

এই ইশতেহার মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হল ১৮৪৮ সালে । সমস্ত ইউরোপের বুকে যেন বিপ্লব শুরু হয়ে গেল । এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসক শ্রেণীর বুক ।মার্কস ছিলেন ব্রাসেসে । বেলজিয়ামের শাসক শ্রেণীর মহল হল তাঁর মত একজন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ অনিবার্যভাবে নিজের ধ্বংসের পথকে প্রশস্ত করা । হুকুম দেওয়া হল অবিলম্বে বেলজিয়াম ত্যাগ কর । ইতিমধ্যেই ফ্রান্স, জার্মানি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন ।

১৮৪৯ সালে ইংলান্ডে এসে বাসা বাঁধলেন মার্কস, সঙ্গে জেনি আর তিনটি শিশু সন্তান । সেই সময় ইংলান্ড ছিল ইউরোপের সবচেয়ে উদার মনোভাবাপন্ন দেশ এবং বিভিন্ন দেশের নির্বাসিতদের আশ্রয়স্থল । যখন মার্কস এখানে এসে পৌঁছলেন, তাঁর হাতে একটি কপর্দকও নেই । সর্বহারা মানুষের সপক্ষে লড়াই করতে করতে উনি নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন সর্বহারা । পাঁচজনের সংসার । আরো একজন জেনির গর্ভে, পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায় । দু’কামরার একটা ছোট্ট বাড়ি । পরের দিন খাওয়া জুটবে কি জুটবে না কেউই জানে না । জামা-কাপড় জুতোর অবস্থা এমন বাইরে যাওয়াই দুষ্কর । বহুদনি গিয়েছে শুধুমাত্র একটি জামার অভাবে ঘরের বাইরে যেতে পারেননি মার্কস । অভুক্ত শিশুরা বসে আছে শূন্য হাঁড়ির সামনে । দোকানী ধারে কোন মাল দেয়নি ।

এমন ভয়ঙ্কর দারিদ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ও নিজের কর্তব্য দায়িত্ব থেকে মহূর্তের জন্যও তিনি বিচলিত হননি । একটি মাত্র পরিবার তো নয়, তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে পৃথিবীর কোটি কোটি পরিবার । তাদের শিশুদের মুখেও যে এক ফোঁটা অন্ন নেই । 

তবুও মাঝে মাঝে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না । পথে বেরিয়ে পড়েন । আনমনা উদাসীর মত লন্ডনের পথে পথে ঘুরে বেড়ান । লোকেরা অবাক চোখে চেয়ে দেখে মানুষটিকে । মাথায় ঘন কাল চুল, সাড়া মুখে দাড়ি, প্রশস্ত কপাল, পরনের কোট জীর্ণ, অর্ধেক বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছে।  তাঁর হাঁটার ভঙ্গিটা বড় অদ্ভুত কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে তাঁর দুই চোখে ফুটে উঠেছে এক আশ্চার্য প্রত্যয় আর বিশ্বাস । তাঁর কণ্ঠস্বর মিষ্ট নয় কিন্তু যখন কিছু বলেন, শ্রোতারা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর প্রতিটি কথা অনুভব করে । সেই মুহূর্তে তিনি নম্র বিনয়ী শান্ত । তাঁর এই ভাবনা চিন্তা মননশীলতা প্রকাশ করলেন তাঁর অবিস্মরণীয় গ্রন্থ ড্যাস ক্যাপিটল –এ (Das Capital) এতে তিনি ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন । 

১৮৬৭ সালে তাঁর ড্যাস ক্যাপিটল প্রচারিত হয় । পরবর্তী দুটি খণ্ড তাঁর মৃত্যুর পর এঙ্গলস সম্পাদনা করেন । এই বইখানি সমস্ত শোষিত বঞ্চিত সংগ্রামী মানুষের বাইবেলা। রুশোর ”সামাজিক চুক্তি” মতবাদ বইটি যেমন ফরাসি বিপ্লবের প্রেরণা দিয়েছিল, ড্যাস ক্যাপিটালও ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রেরণা দিয়েছিল । 

মার্কস তাঁর জীবিতকালে Das Capital– এর প্রভাব দেখে যেতে না পারলেও অনুভব করেছিলেন একদিন তাঁর বই সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতিকে নাড়া দেবে । তাই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বই রচনাতেই বেশি সময় কাটাতেন । ক্রমশই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল । ডাক্তারা পরীক্ষা করে দেখলেন তাঁর লিভার অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছে । কিছুদিনের মত তাঁকে বিশ্রাম নিতে বললেন । কিন্তু বিশ্রাম শব্দটি মার্কসের অভিধানে লেখা ছিল না । তাছাড়া Das Capital– এর কাজ তিনি শেষ করতে পারেননি । অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি লিখে চললেন । এই সময় তাঁর জীবনে  নেমে এল চরম আঘাত । ১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর বুকে ক্যানসারে মারা গেলেন মার্কসের সুখ-দুঃখের চিরসাথী জেনি । যদিও কিছুদিন ধরেই অসুস্থ হয়ে ছিল জেনি, বিছানা ছেড়ে ওঠবার ক্ষমতা ছিল না তাঁর । তবুও এই মৃত্যু মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত করে দিল মার্কসকে ।

বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন মার্কস । এ বাড়ির সর্বত্র যে জেনির স্মৃতি ছড়ানো, কিছুতেই তাকে ভুলতে পারছেন না । পুরো একটি বছর তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে তাকে ভুলতে পারছেন না । পুরো একটি বছর তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়ালেন । শরীরের অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছিল ।১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে বড় মেয়ে মারা গেল । মেয়েকে খুব ভালবাসতেন মার্কস । ফিরে এলেন বাড়িতে । সমস্ত জগৎ যেন তাঁর কাছে অন্ধকার হয়ে এসেছিল । বুকে নতুন অসুখ দেখা দিল । ডাক্তাররা সাধ্যমত চিকিৎসা করেন কিন্তু অসুখ বেড়েই চলল । অবশেষে ১৪ মার্চ ১৮৮৩ সালে চিরঘুমের দেশে হারিয়ে গেলেন মার্কস । তখন তাঁর বয়স ৬৬ হতে কয়েক সপ্তাহ বাঁকি ।

তিনদিন পর তাঁর স্ত্রীর সমাধির পাশে তাঁকে সমাধি দেওয়া হল । তখন মাত্র দশ-বারোজন লোক সেখানে উপস্থিত । তাদের মধ্যে ছিলেন মার্কসের প্রিয় বন্ধু সহযোগী ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস । মার্কসের সমাধির পাশে এঙ্গেলস যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাঁর মধ্যেই রয়েছে তাঁর জীবনও কর্মের যথার্থ ‍মূল্যায়ন ।

Related Posts

Leave A Comment