খাগড়ছড়ি জেলার সংক্ষিপ্ত তথ্যাবলি, দর্শনীয় স্থানসমূহ । বিস্তারিত পড়ুন…….

খাগড়ছড়ি জেলা

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রাশাসনিক অঞ্চল। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মোট আয়তন ২৭০০ বর্গ কিলমিটার। এই জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে চট্রগ্রাম ও প্রর্বত্য চট্রগ্রাম জেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে চট্রগ্রাম জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত। খাগড়াছড়ি একটি নদীর নাম। নদীর পাড়ে খাগড়া বন থাকায় এটি খাগড়াছড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৭০০ সালে এই এলাকাটি কার্পাস মহাল নামে পরিচিত ছিল। তৎকালিন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোঃ এর সাথে এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তুলা (কার্পাস) ট্যাক্স হিসাবে হতো।

খাগড়াছড়ি জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ

  • আলুটিলার সুড়ঙ্গ বা রহস্যময় সুড়ঙ্গ, শহর থেকে ৮ কিঃ মিঃ পশ্চিমে আলুটিলা পাহাড় চূড়ায় আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র এর অবস্থান।
  • আলুটিলার ঝর্না বা রিছাং ঝর্না, আলুটিলা পর্যটন স্পট থেকে প্রায় ৩ কিঃ মিঃ পশ্চিমে (খাগড়াছড়ি থেকে ১১ কিঃ মিঃ) খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়ক হতে বাম পার্শ্বে ১ কিঃ মিঃ দক্ষিণে।
  • আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, অবস্থানঃ খাগড়াছড়ি শহর থেকে ৮ কিঃ মিঃ পশ্চিমে আলুটিলা পাহাড় চূড়ায় আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র।
  • গুইমারা।
  • দেবতার পুকুর (দেবতার লেক), খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কে জেলা সদর থেকে ১১ কিঃ মিঃ দক্ষিণে মূল রাস্তা হতে ৪ কিঃ মিঃ পশ্চিমে সদর উপজেলার নূনছড়ি মৌজার চির প্রশান্তিময় দেবতার পুকুরের অবস্থান।
  • আলুটিলা ঝর্ণা।
  • শান্তিপুর অরণ্য কুটির, পানছড়ি উপজেলা হতে চেঙ্গী নদীর অপর তীরে ৫ কিঃ মিঃ দক্ষিণে ছোট্ট টিলার উপর এই অরণ্য কুটির। খাগড়াছড়ি জেলা শহর হতে খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়ক দিয়ে ২৫ কিঃ মিঃ রাস্তা অতিক্রম করে পানছড়ি বাজারে পৌঁছার পর দক্ষিণ দিকের ৫ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করলেই দেখা যাবে প্রকৃতির বুকে অপরূপ শোভা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শান্তিপুর অরণ্য কুটির।
  • হাতিমাথা পাহাড় (পাহাড়ীরা একে এ্যাডোশিরা মোন) বলে।
  • বিড়িআর স্মৃতিসৌধ, বিডিআর এর জন্ম সম্পির্কিত ঐতিহাসিক স্থানটি রামগড় জেলা পরিষদের পাশে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত।

  তৈদুছড়া

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় সবুজ পাহাড় আর বুনো জঙ্গলের ‍সাথে অবস্থিত নয়নাভিরাম ঝর্ণা দুটির নাম তৈদুছড়া ঝর্ণা। ত্রিপুরা ভাষায় “তৈদু” মানে হল “পানির দরজা” আর ছড়া মানে ঝর্ণা। অসাধারণ সৌন্দর্য আর প্রাকৃতিব বৈচিত্রতা এই ঝর্ণাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। খাগড়াছড়িতে যে কয়টি দশনীয় স্থান রয়েছে তৈদুছড়া তাদের মধ্যে অন্যতম। এখানে পাহাড় আর সবুজ বুনো জঙ্গলের মাঝে আঁকা বাঁকা পাহাড়ের ভাজ দিয়ে বয়ে চলে ঝর্ণার জল। ৩০০ ফুট উচু পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়া পানি এসে পড়েছে পাথুরে ভূমিতে। অন্য সকল ঝর্ণার মত এর পানি সরাসরি উপর হতে নিচে পরছে না। পাহাড়ের গায়ে সিড়ির মত তৈরী হওয়া পাথুরে ধাপগুলো আতিক্রম করে নিচে পড়ছে।

 

খাগড়াছড়ি যাতায়াত

ঢাকা কিংবা খাগড়াছড়ি হতে গাড়ী নিয়ে সরাসরি যাওয়া যায় দীঘিনালায়। তৈদুছড়া ভ্রমনের জন্য খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপন না করে দীঘিনালায় থাকায় উত্তম। এখানে থাকার জন্য একটি ভাল মানের রেষ্টহাউজ আছে। গাড়ী নিয়ে দীঘিনালা হতে সামনে এগিয়ে চাপ্পাপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যায়। এর পর গাড়ী চলার কোন পথ না থাকায় বাকী পথটুকু হেঁটেই যেতে হবে। দীঘিনালা হতে সব মিলিয়ে তৈদুছড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ৪ ঘন্টা লাগে। নির্ভর করে হাঁটার গতির উপর। সতরাং সকালে রওয়ানা দিলে অনায়সেই সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসা সম্ভব। এই আসা যাওয়ার পথটি মোটেও বিরক্তিকর নয়। হাঁটতে হাঁটতে যতটা না ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করবে তার চাইতেও বেশী গ্রাস করবে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নেশা। চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় যে আপনি আসক্ত হবেনই।

চাপ্পাপাড়া কিংবা পোমাংপাড়া হতে দুর্গম পথ, অনেক গুলো ঝিরি, উচু নিচু পাহাড়, কোথাও হাটু সমান পানি আবার কোথাও বুক সমান পানি আর বুনো জঙ্গল পাড়ি দিয়ে অবশেষে প্রায় ৩ ঘন্টা হাঁটার পর আপনি পৌঁছবেন ১ম ঝর্ণাটিতে। এটি প্রায়৬০ ফুট উচু। ঝর্ণামুখ হতে পানি পাহাড়ের গায়ে পরে তা পাহাড় বেয়ে নিচে এসে ছোট একটি হ্রদে মিলিত হয়েছে।

প্রথম ঝর্ণার ডানপাশ দিয়ে পাহাড়ের ঢল বেয়ে উঠলে খুব কাছাকাছি পেয়ে যাবেন ২য় ঝর্ণাটি। এখানে প্রায় ৮০-৮৫ ডিগ্রী এঙ্গেলে ঢাল বেয়ে প্রায় ১০০ ফুট উপরে উঠতে হবে। উপরে উঠলে প্রথমেই চোখে পড়বে ঝর্নার মুখ যেখান হতে ১ম ঝর্নার পানি পড়ছে। ২য় ঝর্না হতে ঝিরি পথে আসছে এখানে। ঝিরি পথ ধরে প্রায় ঘন্টা খানিক হাঁটলে পরে পৌঁছানো যায় ২য় ঝর্নাটিতে। এই চলার পথটি যেমন কষ্টকর তেমনি রোমাঞ্চকর আর আহামরি ‍সুন্দর।

উপর থেকে প্রচন্ড বেগে পানি নেমে ‍আসছে। এই বেগ ঠেলে পানি বরাবরই হাঁটতে হয়। ডানে বায়ে যেখানে পানির স্রোত খুব কম সেখানে শ্যাওলা জমেছে। একটুতেই পা পিছলে যায়।

মাঝে মাঝে এখানি পানির স্রোত খুব বেশী যে ধাক্কা দিয়ে নিচে নিয়ে যেতে চায়। তাই এখানে পা টিপে টিপে  সাবধানে হাঁটতে হবে। একবার পিছলে গেলে কয়েকশ হাত দূরে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। এখান হতে আরো উপরে উঠতে হবে। চলার পথে পারি দিতে হবে বড় বড় পাথর আর কোমর সমান পানি। অতপর পেয়ে যাবেন দ্বিতীয় তৈদু ঝর্ণা।

অপূর্ব নয়নাভিরাম সে ঝর্ণা। এটি এতই দৃষ্টিনন্দন আর ব্যতিক্রম যে কারো আর তড় সইবে না। ঝর্ণার নিচে ঝাপিয়ে পরতে মন চাইবে। ঝর্ণাটি প্রায় ৮০ ফুট উচু। ঝর্ণার পানি এসে সরাসরি যেখানে পড়ছে যেখানে সিড়ির মত অনেকগুলো পাথরের ধাপ রয়েছে। ধাপগুলো বেয়ে পানি নিচে গড়িয়ে পড়ছে। ধাপগুলোতে দাড়িয়ে অনায়েসেই গোসলের কাজটি সেরে নেয়া যায়। দীর্ঘ ক্লান্তিকর হাঁটার কষ্ট মুহর্তেই ধুয়ে যাবে ঝর্ণার জলে।

এখানে সারা বছরই পানি থাকে। শীতে জল প্রবাহ কমে যায়। আর বর্ষায় হয়ে উঠে পূর্ণ যৌবনা। তবে শীতের আগে ও বর্ষার শেষে এখানে ঘুরতে যাওয়া উত্তম সিদ্ধন্ত।

যেভবে যেতে হবে: খাগড়াছড়ি হতে বাসে করে আসতে হবে দীঘিনালায়। দীঘিনালায় রাত্রি যাপন, সাথে তৈদুছড়া আসার জন্য প্রশাসনের অনুমতি গ্রহণ ও গাইড নির্বাচন করে পরেরদিন ভোরে দীঘিনালা হতে গাড়ীতে/মোটরসাইকেলে করে চাপ্পাপাড়া। চাপ্পাপাড়া হতে পায়ে হেঁটে তৈদুছড়া।

 

আলুটিয়া ও রহস্যময় সুড়ঙ্গ

খাগড়াছড়ি শহর হতে ৭ কিলমিটার পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা উপজেলর আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে একটি রহস্যময় গুহা। স্থানীয়রা একে বলে মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা। তবে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে অবস্থিত বলে একে আলুটিলার গুহাই বলা হয়। এটি খাগড়াছড়ির নামকরা পর্যটন কেন্দ্র। খাগড়াছড়ি বেড়াতে এলে সবাই অন্তত একবার হলেও এখানে ঘুরে যায়। এটি একটি চমৎকার পিকনিক স্পট। এখানকার প্রকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়, হৃদয় ছুয়ে যায়। আলুটিলা খাগড়াছড়ি জেলার সব চাইতে উচু পর্বত। নামে এটি টিলা হলেও মূলত এটি একটি পর্বতশ্রেণী। এখান হতে খাগড়াছড়ি শহরের বেশ কিছুটা অংশ দেখা যায়। শুধু তাই নয় পাহাড়ের সবুজ আপনার চোখ কেড়ে নেবে। আকাশ পাহাড় আর মেঘের মিতালী এখানে মায়াবী আবহ তৈরী করে।

আলুটিলা রহস্যময় সুড়ঙ্গে যেতে হলে প্রথমেই আপনাকে পর্যটন কেন্দ্রের টিকেট কেটে ভীতরে প্রবেশ করতে হবে। কারণ রহস্যময় গুহাটিতে একেবারেই সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। পর্যটন কেন্দ্রের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ডান পাশের রাস্তা দিয়ে মিনিট খানে হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি সরু পাহাড়ী পথ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে গেছে এই পথটি। এই পথটি বেয়ে নিচে নামলেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে প্রথম চমকটি। হঠাৎ চোখে পড়বে একটি ছোট ঝর্ণা। ঝর্ণার পানি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে ঝিরি বরাবর। তবে এখানে পাহাড়ী লোকজন ঝর্ণার পানি আটকে রাখার জন্য একটি বাঁধ দিয়েছে। তারা এই পানি খাবার ও অন্যান কাজে ব্যবতার করে।

আর ফটক হতে বাম দিকের রাস্তা বরাবর হাঁটলে পরে পাবেন রহস্যময় সেই গুহা। গুহাতে যাবার আগে আপনি পাবেন একটি বিশ্রামাগার ও ওয়াচ টাওয়ার। এর সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে আলুটিলা গুহা মুখে। কিন্তু এখন পর্যটন কর্পোরেশন একটি পাকা রাস্তা করে দিয়েছে। ফলে খুব সহজেই হেঁটে যাওযা যায় গুহামুখে।

পাকা রাস্তা শেষ হলে আপনাকে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে হবে। প্রায় ৩৫০ টি সিড়ি বেয়ে নিচে নামলে পরে পাওয়া যাবে কাঙ্খিত সেই আলুটিলা গুহা। গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল । একবারেই পাথুরে গুহা এটি। গাঁ ছমছম করা পরিবেশ। খুব সাবধানে পা ফেলে সামনে এগুতে হয়। কারণ ‍সুরঙ্গের ভীতরে কোন আলো নেই। সুরঙ্গের তলদেশে পিচ্ছিল এবং পাথুরে। এর তলদেশে একটি ঝর্ণা প্রবাহমাণ। তাই খুব সাবধানে মশাল বা আলো নিয়ে গুহা পাড়ি দিতে হবে। পা ফসকে গেলেই আহত হতে হবে।

তবে কোন অন্য ভয় নেই। গুহাটি একেবারেই নিরাপদ এর দৈর্ঘ ৩৫০ ফুট। গুহার ভীতরে জায়গায় পানি জমে আছে, রয়েছে বড় বড় পাথর। গুহাটির এপাশ দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হতে সময় লাগবে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। গুহাটির উচ্চতা মাঝে মাঝে এতটাই কম যে আপনাকে নতজানু হয়ে হাঁটতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে মনে হবে যেন সিনেমার সেই গুপ্তধন খোঁজার পালা চলছে। বিশ্বে যতগুরো প্রকৃতিক রহস্যময় গুহা আছে আলুটিলা সুড়ঙ্গ তার মধ্যে অন্যতম।

 

 

 

 

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published.