• Monday , 1 March 2021

চট্টগ্রাম জেলার সংক্ষিপ্ত তথ্যবলী ও দর্শনীয় স্থানসমূহ

চট্টগ্রাম জেলা

চট্টগ্রাম জেলার সংক্ষিপ্ত তথ্যবলী

বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল চট্টগ্রাম জেলা। পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, বন বনানীর কারণে চট্টগ্রামের মতো ভৌগোলিক বৈচিত্র বাংলাদেশের আর কোন জেলার নেই। ভৌগোলিক সীমানা : চট্টগ্রাম জেলার উত্তরে ফেনী জেলা এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে কক্সবাজার জেলা, পূর্ব দিকে বান্দরবান, রাঙামাটি, ও খাগড়াছড়ি জেলা, এবং পশ্চিমে নোয়াখালী জেলা এবং বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। এছাড়া দ্বীপাঞ্চল সন্দীপ চট্টগ্রামের অংশ।

চট্টগ্রাম জেলার আয়তন ৫,২৮২.৯৮ বর্গ কি.মি.। উত্তরে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে কক্সবাজার জেলা, পূর্বে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি, পশ্চিমে নোয়াখালী জেলা ও বঙ্গোপসাগর। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, অরণ্য, উপত্যকা প্রভূতি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্যে এ জেলা থেকে স্বতন্ত্র। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ৩৩.৮সে. এবং সর্বনিম্ন ১৪.৫সে.। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৩.১৯৪ মিমি। প্রধান নদীঃ কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু।

চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ১১টি জেলা রয়েছে। যেমন-

  • চট্টগ্রাম
  • বান্দরবান
  • ব্রাহ্মণবাড়ীয়া
  • চাঁদপুর
  • কুমিল্লা
  • কক্সবাজার
  • ফেনী
  • খাগড়াছড়ি
  • লক্ষ্মীপুর
  • নোয়াখালী
  • রাঙামাটি

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাওয়ারী দর্শনীয় স্থানগুলো সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ

  • সীতার পাহাড়, সীতাকুন্ড।
  • বাড়বকুন্ড
  • পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত
  • নেভাল এরিয়া
  • শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর।
  • ফয়্স লেক
  • চেরাগি পাহাড় মোড় (স্মৃতি মিনার)
  • জে এম সেন হল
  • নজরুল স্কয়ার (ডি. সি. হিল)
  • লালদীঘি
  • কালুরঘাট
  • পার্কির চর (আনয়ারা)।
  • বৌদ্ধ তীর্থ স্থান চক্রশালা পটিয়া
  • বাটালী হিল
  • আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ
  • বাঁশখালী ইকোপার্ক।
  • খানখানাবাদ সমুদ্র সৈকত, বাঁশখালী।
  • খিরাম সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ফটিকছড়ি।
  • লোহাগড়া বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।
  • মহামুনি বৌদ্ধ বিহার, রাউজান।
  • চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগান, পুকুরিয়া, বাঁশখালী।
  • ভুজপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ভূজপুর, ফটিকছড়ি।
  • মহামায়া সেচ প্রকল্প, মীরসরাই।

               গিরি-সৈকতের সীতাকুন্ড

বান্দরনগরী চট্টগ্রামের শিলাঞ্চল খ্যাত উপজেলা সীতাকুন্ড। দেশের একমত্র শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও ছোট বড় অসেকগুলো শিল্পকারখানা নিয়ে সারাক্ষণই জমজমাট। এতকিছুর মাঝেও প্রকৃতি এখানে উদার। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, অন্যদিকে সুবিশাল সমুদ্র, গিরি-সৈকতের এমন নিবিড় ঘনিষ্টতা সাধারণত দেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। দেশের অন্যতম বোটানিক্যাল গার্ডেন সীতাকুন্ড ইকো-পার্কের কথা না হয় বাদই দিলাম। এরপরেও এখানকার বেশ কিছু পর্যটন এলাকা দেশের বিভিন্ন স্থানের দর্শণার্থীদের কাছে উঠেছে যথেষ্ঠ জনপ্রিয়। এখানে প্রতিনিয়ত দেশের নানা স্থান থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ ও কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা ছুটে আসছে প্রকৃতির স্বাদ পেতে। কিন্তু সারকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে তেমন আন্তরিক নয়। সরকারের আন্তরিকতা ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেলে শুধু দেশেই নয় বরং আন্তর্জাতিকভাবেও বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারে এমন কিছু সম্ভাবনাময়ী পর্যটন এলাকা নিয়ে পরবর্তীতে আলোকপাত করা হলো।

               চন্দ্রনাথ পাহাড়

চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৭ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়। সাড়ে তিন কিলোমিটার উঁচু এ পাহাড়টিকে অনেকে আখ্যায়িত করেন বাংলাদেশের হিমালয় হিসেবে। এ পাহাড় এবং পাহাড়কে কেন্দ্র করে আশেপাশের এলাকা দেশবাসীর কাছে পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা পাচ্ছে। এর আরেক পরিচয় ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দুদের তীর্থস্থান হিসাবে। প্রতি বছর চৈত্র মাসে শিব চতুর্দশী মেলা উপলক্ষে এখানে ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ সারাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। বিভিন্ন কলেজ, ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী এবং ভ্রমণ পিপাসু সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে সবসময়। চলচিত্র নির্মাতারা আসেন ছবি নির্মাণের জন্য। এর পাহাড়, ঝরণা ও আশেপাশের দৃশ্যের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় সাধারণ মানুষ। পাহাড়ে আরোহন করে পশ্চিমে তাকালে দেখা যায় বিশাল সমুদ্র আর পূর্বে পাহাড়ের পর পাহাড়। আশেপাশের জনপদগুলোকে মনে হয় পটে আঁকা ছবি।

বাশঁবাড়ীয়া সমুদ্র-সৈকত

চট্টগ্রাম শহর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার উত্তরে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত বাঁশবাড়ীয়া সমুদ্র সৈকত। দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ সমুদ্রর সীমাহীন জলরাশি আর সবুজ মাঠ, এমন দৃশ্যে হঠাৎ করেই মন কেমন হয়ে উঠে। অনেকের মাঝে থেকেও নিজেকে তখন একা মনে হয়। মনে হয় তার মত সুখী পৃথিবীতে আর কেউ নেই। এক অফুরন্ত ভাল লাগার স্থান বাঁশবাড়ীয়া সমুদ্র সৈকতের প্রতি স্থানীয় ও আশেপাশের মানুষের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখানে সপরিবারে বেড়াতে এসে আলাড় হলো বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ বণিকের সাথে। আলোচনা প্রসঙ্গে জানান, এটি তার প্রিয় জায়গা। তিনি আরো মনে করেন বাঁশবাড়ীয়া সমুদ্র-সৈকতকে সরকার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে রাজস্ব আয় বাড়বে তেমনি মানুষের বিনোদনের সুবিধাও বাড়বে।

ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক

চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে ডুলাহাজরা নামক স্থানে ইকোপার্ক অবস্থিত। বনের জীবজন্তু, পশুপাখি আর দুষ্প্রাপ্য সব গাছের সংগ্রহ রয়েছে এই সাফারি পার্কে। বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাস্থর উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা ইকো টুরিজম ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই পার্ক ১৯৮০-৮১ সালে সর্বপ্রথম হরিণ প্রজনন কেন্দ্র নামে স্থাপন করা হয়। এই পার্কের আয়তন ৯০০ হেক্টর। পর্যটকদের জন্য এই পার্কে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য উপভোগ করার পাশাপাশি তথ্য শিক্ষা কেন্দ্র, ন্যাচারাল হিস্ট্রি, মিউজিয়াম পর্যবেক্ষণ, টাওয়ার পাখিশালা বেষ্টনী ও বিশ্রামাগার রয়েছে।

বন-পাহাড়ের মাঝে রাস্তা যেন বৃষ্টির পরশের মতো শীতলতা এনে দেয়। বিশাল বিশাল গর্জন গাছের সারি চকরিয়ায় আমাদের স্বাগত জানায়। চকরিয়ায় গাড়ি কিছুটা চলার পর পূর্বনির্ধারিত গন্তব্য ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের সামনে উপস্থিত হওয়ার পর কেমন যেন আশ্চর্য অনুভূতি সৃষ্টি হয় পর্যটকদের মধ্যে।

নগরজীবনে যাপিত আমরা প্রতিনিয়ত হাঁসফাঁস করি প্রকৃতি ও নিসর্গের ছোঁয়া পেতে।যান্ত্রিক দানব, বিদ্যুতের খুঁটি, গগনচুম্বী দালান আর রাস্তায় অগণিত মানুষের ঢল দম বন্ধ করে দেয়। একটু স্নিগ্ধতা, একটু প্রকৃতির নরম পরশ পেতে সপরিবারে জাগতিক অনেক ঝুটঝামেলা এড়িয়ে বেরিয়ে পড়া যায় কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ডুলাহাজারা এলাকার সাফারি পার্কের উদ্দেশ্যে। ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক আফ্রিকা আ কেনিয়ার সাফারি পার্কের মতো আয়তনে বড় না হলেও এখানে বন-বনানীতে ঘেরা মুক্ত ও সাযুজ্যপূর্ণ পরিবেশে পশুপাখির সন্ধান মিলবে। ঢাকা থেকে গাড়ি পথে ফেনী, চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগড়া পেরিয়ে ডুলা হাজরা সাফারী পার্ক। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার।

একসময় গণনচুম্বী গর্জন, বৈলাম, তেলসুর, চাপালিশ, চাম্পাফুল, বিবিধ লতাগুল ও ঔষধিসহ কক্সবাজারের চিরসবুজ বনাঞ্চল ছিল হাতি, চিতাবাঘ, হরিণ, ভালুক, বন্যশুকর, বানর, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি বিভিন্ন জাতের সরীসৃপ, ধনেশ, মাছরাঙা ইত্যাদির আবাসভূমি ছিল এ অঞ্চল। রয়েল বেঙ্গল টাইগার কক্সবাজার বনাঞ্চল থেকে ষাটের দশকেই বিলুপ্ত।

১৯৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বন সমিতির একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে ১৯৯৮-৯৯ সালে এই পার্ক প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ও বন গবেষণা শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সাফারি পার্ক গড়ে তোলার কাজ ২০০০-২০০১ সালে শেষ হয়। ৬০০ হেক্টর ভূমি নিয়ে এ পার্ক স্থাপিত হয়।

কুমিরা সমুদ্র-সৈকত

চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ছাব্বিশ-সাতাশ কিলোমিটার উত্তরে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে কুমিরা সমুদ্র-সৈকত। শুধুমাত্র কক্সবাজার ছাড়া দেশের অন্য কোথাও সমুদ্রকে এত ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ মেলে না । একদিকে দিগন্ত জলরাশি অন্য দিকে সবুজের সমারোহ, এ অবস্থায় যে কোন মানুষের মনই হঠাৎ করে অন্যরকম ভালো হয়ে যায়। কান পাতলে শোনা যায় সমুদ্রের গর্জন, থেমে গেলে সুনশান নীরবতা। আলাপ হলো মোস্তফা হাকিম কলেজের ছাত্র জিতু’র সাথে, বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে এসেছে। আলাপ করতেই জানালো, সে আরো একবার এসেছিল। এ জায়গাটি তার খুব ভাল লাগে। সে আরো জানায়, সরকার কুমিরা সমুদ্র-সৈকতের বিরাজমান সমস্যা সমাধান করে এটিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দিলে দেশের সুনাম বয়ে আনা সম্ভব।

কুতুবদিয়া বাতিঘর

রাতের বেলা জাহাজের নাবিকদের পথের সংকেত প্রদর্শনের জন্য সমুদ্র উপকূলে উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করে তার ওপরে আলো জ্বেলে রাখা হয়। আর সংকেত প্রদানকারী এই টাওয়ারটিই হলো বাতিঘর। বাংলাদেশের এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাতিঘর হলো কুতুবদিয়া বাতিঘর। রাতের বেলা বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজকে সংকেত প্রদর্শনের জন্য এই বাতিঘরটি নিমার্ণ করা হয়। কর্ণফুলী মোহনার ৪০ মাইল দূরে কুতুবদিয়া দ্বীপে এটি নির্মিত হয়। ক্যাপ্টেন হেয়ারের পরিচালনা ও ইঞ্জিনিয়ার জে এইচ টুগুডের নির্দেশনায় এই বাতিঘর নির্মাণ করা হয়। পাথরের ভিত্তির ওপর বসানো এই বাতিঘরের উচ্চতা ১২১ ফুট। ১৮৪৬ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

বাতিঘরটি নির্মাণে সেই সময়ে ব্যয় হয় চার হাজার ৪২৮ টাকা। পাকিস্তান আমলে লোহা দিয়ে একটি টাওয়ার বানিয়ে তার ওপর আধুনিক বাতিঘর স্থাপন করে প্রাচীন বাতিঘরটি বাতিল করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও ক্রমাগত ভাঙনের ফলে পরিত্যক্ত বাতিঘর ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর ও সামুদ্রিক এলাকায় মোট পাঁচটি বাতিঘর আছে।

বিএমএ লেক

শহরের সিটি গেইট থেকে মাত্র এক কিলোমিটার উত্তরে, ভাটিয়ারী বাজার থেকে মা্ত্র আধা কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমি (বিএমএ) সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত সুদৃশ্য লেক ও আশেপাশের ছোট-বড় অনেকগুলো পাহাড়কে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে সম্ভাবনাময়ী একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেছে। ভাটিয়ারী বিএমএ গেইট থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সীমানা পর্যন্ত প্রায় দশ-এগার কিলোমিটার এলাকায় পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে মসৃণ রাস্তা। কখনো উঁচু, কখনো নিচু। মাঝে মধ্যে পরিচিত অপরিচিত পাখির ডাক। ভাগ্য ভালো হলো সামনে পড়বে চিত্রা হরিণ, বানর, খরগোশ জাতীয় ছোট প্রাণী। উঁচু নিচু পাহাড়ের গা চিরে বয়ে যাওয়া রাস্তার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় কল্পনাও করা যায় না যে আশেপাশে কোথাও নগরের কোলাহল আছে।

চারপাশে শুধু সবুজের সমারোহ। কাউকে চোখ বন্ধ করে এখানে এনে যদি চোখ খুলে দেয়া হয় তাহলে সে বুঝতেই পারবে না সে কী চট্টগ্রাম আছে নাকি দার্জিলিং এ আছে। বিএমএ লেক সংলগ্ন এই এলাকাটি ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানের দর্শনাথীদের মনোযোগ আকর্ষনে সক্ষম হয়েছে। স্ত্রী কে নিয়ে বেড়াতে আসা জনৈক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ‘ভাই, এমন জায়গা থাকতে কী নেপাল দার্জিলিং যেতে হয়? সরকারের উচিত একে জাতীয় পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা দেয়া।’

দারোগাহাট সহস্রধারা

চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত দারোগাহাট সহস্রধারা। সুবিশাল পাহাড়ের উঁচু শৃঙ্গ আর আকাশের এমন ঘনিষ্ঠতা অনেক ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকায়ও দেখা যায় না। মনে হয় পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে উঠলেই বুঝি হাত দিয়ে আকাশ ছোঁয়া যাবে। পাহাড়ের গা চিরে ভীষণ বেগে বয়ে চলেছে ঝর্ণা, যা পরিচিত ‘সহস্রধারা’ নামে। এখানে এসে মন ভালো হবে যে কারো। প্রতিনিয়ই বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থীরা আসছে। কলেক-ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রির সংখ্যা এর মধ্যে বেশি। বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে আসা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ফৌজিয়া জানালো, এখানে এসে তার খুব ভালো লাগছে। রাঙামাটি গিয়েও সে এতো মজা পায়নি। অন্যান্য দর্শনার্থীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সরকার যদি এর উন্নতিতে মন দেয় তাহলে অচিরেই এটি বিখ্যাত দর্শনীয় স্পটে পরিণত হবে।

ফয়’স লেক

চট্টগ্রাম শহরের কোলাহলের ভেতরেই ফয়’স লেকের এক প্রান্ত থেকে আপনি যখন বোটে চড়ে রিজর্টের দিকে রওনা হবেন, ১০ মিনিটের সেই নৌভ্রমণের এক মিনিটও না যেতেই বিস্ময় আর আনন্দের শিহরণ শুরু হবে ।

সংরক্ষিত সবুজ পাহাড়ের অলিগলি দিয়ে ইঞ্জিনবোটের ধক-ধক শব্দে এগিয়ে যাওয়ার সময় আপনার মনে হবে যেন রহস্য উন্মোচনে রওনা করেছেন । ৭-৮ মিনিটের মধ্যে দূর থেকে যখন রিজর্টের খানিকটা দেখা যাবে তখন আপনি নিশ্চয়ই অনুভব করবেন আবিস্কারের অনাবিল আনন্দ । তারপর ২-৩ মিনিটে পুরো রিজর্ট যখন রূপকথার ওয়ান্ডারল্যান্ডের মতো আপনার দৃষ্টির গোচরে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে, আপনার তখন বাধ না মানা বিস্ময় যেন এক স্বপ্নপুরী, দৃষ্টিনন্দন ছবির মতো এবং ছবি তোলার মতো ।

বিশাল ব্যস্ত শহরের মধ্যেই অথচ নগরের কোলাহলের লেশমাত্র নেই । বাংলাদেশে সৃষ্টিকর্তার অপরূপ উপঢৌকন, বিশ্বসেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি অবশ্যই । আবার রাতের ঘন অন্ধকারে বোট যখন লেকের পানি চিড়ে সাপের মতো চলে দু’ধারে পাহাড়-জঙ্গল রূপকথার দৈত্য-দানবের কথা মনে করিয়ে ভয়ও সৃষ্টি করে না এটাও বুকে হাত দিয়ে বলা সম্ভব নয়। সৃষ্টির সেরা দানে গড়ে তোলা ফয়’স লেক অনেক বছর এমনি এমনি অবহেলায় থাকার পর কনকর্ড গ্রুপের রুচি ও সৃজনশীলতার উদ্যোগী সমন্বয়ে এখন আমাদের হাতছানি দেয় আনন্দ আবাহনে, ঘুরে আসুন, মন জুড়িয়ে আসুন । আরাম করুন, আয়েশ করুন । আবিস্কার করুন এক অজানা বাংলাদেশ।

আমাদের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন অনেক উপন্যাস লিখতে শুনেছি দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় কয়েকদিনের একাকীত্ববাসে যান, ফয়’স লেক রিজর্টও হতে পাবে তাদের পরবর্তী গন্তব্য।

এই রিজর্টের অভিনবত্ব হচ্ছে সেখানে আপনি একাকী গেলেও যেমন ভালো থাকবেন, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানরা গেলেও উপভোগ করবেন অসামান্য, নবদম্পতিদেরে মধুচন্দ্রিমার জন্য স্থানটি আদর্শ, আবার সেখানেই হতে পারে আপনার শুভ বিবাহের সাড়ম্বর আয়োজন । কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের নিবিঢ় সান্নিধ্য ও শান্তিময় একাগ্রচিত্তে গভীর মনোযোগে ব্যবসায়িক শলাপরামর্শ বা সম্মেলন করার জন্যও সেখানে রয়েছে সকল সুব্যবস্থা।

ফয়’স লেক রিজর্টে থাকা-খাওয়ার মান খুব ভালো। বিনোদনের জন্য রয়েছে বিস্তৃত ব্যবস্থা-ড্রাইপার্ক, ওয়াটারপার্ক, (পাশেই) চিড়িয়াখান, বারবিকিউ নাইটস্, বোট রাইডস্ এবং মাঝে মাঝে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এমনকি সেরা শিল্পীদের কনসার্টও।

এত কাছে থেকেও যেন অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ, শিহরণ আপনি আর কোথায় পাবেন ! খরচও সাধ্যের মধ্যেই । খোঁজ নিয়ে দেখুন, ঘুরে আসুন শিগগিরই।

বর্ষা, শীত কিংবা গ্রীষ্মে, ষড়ঋতুর যেকোনো দিনই আপনি উপভোগ করবেন নিশ্চিত । আর একটি কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে যে রিজর্টের কর্মীরা খুবই অতিথিপরায়ণ ও বিশেষ করে শিশুবান্ধব।

আমরা জানি কনকর্ড গ্রুপ বাংলাদেশের বিনোদনে বেশ কিছু বিশ্বমানের সুবিধা তৈরি করেছে, যেমন ঢাকার ফ্যান্টাসি কিংডম, ওয়াটার কিংডম, হেরিটেজ পার্ক । আমরা নিশ্চয় আশা করতে পারি, বাংলাদেশে তারা আরো অনেক নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো বেশি বেশি উপভোগ্য করে তোলার প্রয়াস অব্যাহত রাখবে ।

শহীদ জিয়া জাদুঘর   

এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের বিপরীত দিকে একটি শিশুপার্ক । শিশুপার্ক ছাড়িয়ে লালখান বাজার যাওয়ার পথ ধরে সামান্য হাঁটলেই রাস্তার ডানদিকে শহীদ জিয়া জাদুঘর । টিকিট কেটে জাদুঘরে ঢুকতে হয় । সাকির্ট হাউসের যে ঘরটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন । সেই ঘরের স্মৃতিচিহ্নসহ জিয়াউর রহমান ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র এবং তার বেশকিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে এখানে । রয়েছে চট্টগ্রাম কালুরঘাটে খালকাটা কর্মসূচিতে নেতৃত্বদানরত অবস্থায় শহীদ জিয়ার একটি ভাস্কর্য ।

বাটালি পাহাড়

টাইগার পাস এবং লালখান বাজারের মাঝামাঝি অবস্থান বাটালি পাহাড়ের । বোদ্ধ ব্যক্তিরা বলে থাকেন, চট্টগ্রামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে অবশ্যই টাইগার পাস আসতে হবে এবং বাটালি পাহাড়ে উঠতে হবে । বাটালি পাহাড়ে রয়েছে হরেক রকম গাছপালা । এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য পাহাড় কেটে সুবিন্যস্তভাবে তৈরি করা সিঁড়ি বাটালি পাহাড় থেকে পুরো চট্টগ্রাম দেখা যায় । মনে হবে, পাহাড়ের কোলে গা ঘেঁষে ঘুমাচ্ছে চট্টগ্রাম ।

চেরাগী পাহাড়

চেরাগী পাহাড় পত্রিকাপাড়া নামেও পরিচিত । এখানে প্রায় সব জাতীয় পত্রিকা টিভি চ্যানেল, রেডিও চ্যানেল, ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের অফিস রয়েছে । রয়েছে স্থানীয় পত্রিকার অফিসও । চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং প্রাচীন পত্রিকা প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীর অফিস এখানেই । তারপরই আন্দরকিল্লায় রয়েছে শাহী মসজিদ, জেএম সেন হলে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধাপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেনের অবক্ষমূর্তি ।

এর একটু দুরেই চকবাজার । যেখানে দুটি দর্শনীয় স্থান হচ্ছে সুপ্রাচীন অলি খাঁ মসজিদ ও নানক গুরুদুয়ার ।

পারকি সমুদ্রসৈকত

চট্টগ্রাম শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরেই এটির অবস্থান । আনোয়ারা থানায় গড়ে ওঠা এ নয়নজুড়ানো সমুদ্রসৈকত তেমন একটা পরিচিতি পায়নি । সৈকতের পাড় ঘেঁষে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ঝাউবন । জায়গাটা সবসময় চিকচিক বালিতে ভরে থাকে বলে আকর্ষণে অনেকেই ছুটে যান পারকিতে । সৈকতে সামুদ্রিক কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ নির্মল আনন্দদান করে । রয়েছে নোঙ্গর করা জাহাজ সারি ।

লালদীঘি

লালদীঘি ময়দান নানা কারণে মানুষের কাছে বহুল পরিচিত । চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমাবেশ স্থল এটি । বিভিন্ন সভা সমাবেশে যে পরিমাণ মানুষ জমায়েত হয় তা বিস্ময়কর । এছাড়া সংগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম, প্রধানতম বললেও ভুল হবে না সূতিকাগার এটি । ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলা এখানেই হয় ।

ওয়ার সিমেট্ট

নগরীর প্রবর্তক মোড় পেরিয়ে বাদশা মিয়া রোডে এর অবস্থান । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের একাংশ এখানে সমাহিত করা হয়েছে । ফুলের বাগান বেষ্টিত মনোরম এ স্থান স্মরণ করিয়ে দেয় সেইসব সৈন্যদের শৌর্যবীর্য ও বীরত্বগাথা । ছোট ছোট সমাধিফলক সারিবদ্ধভাবে সাজানো ।

বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার

মাতৃভক্তি এবং ধর্মীয় কারণে স্মরণীয় হয়ে আছেন বায়েজিদ বোস্তামী । মাজার পুকুর রয়েছে দানবাকৃতির অনেকগুলো কাছিম । জনশ্রুতি আছে, কাছিমগুলোর বয়স কয়েক শত বছর । এছাড়াও স্থাপত্যশৈলীর অনুপম নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজউদ্দৌলা রোডের চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ । প্রায় তিনশ’ বছর আগে নির্মিত এ মসজিদটির সৌন্দর্য এখনও মানুষকে বিমোহিত করে ।

সন্দীপ

অনেকেই ভুল করে সন্দীপকে নোয়াখালী জেলার অংশ ভাবেন । আসলে এটা চট্টগ্রামেরই একটি থানা । যদিও ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতি অনেকটা নোয়াখালীর মতোই । জলবেষ্টিত এ সুন্দর দ্বীপের আয়তন খুব একটা বেশি নয়, তুলনামূলক জনসংখ্যাও কম । দুইভাবেই সন্দীপ যাওয়া যায় ।

চট্টগ্রাম যাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি

আকাশপথে : 

ঢাকা বিমান বন্দর হতে বাংলাদেশ বিমান, জি.এম.জি, ইউনাইটেড এয়ার সহ আরও কয়েকটি অপারেটর বিমানপথ পরিচালনা করে থাকে ।

সড়কপথে:  

গ্রীন লাইন, সাউদিয়া এস আলম, হানিফ এন্টারপ্রাইজসহ অনেক এসি/নন এসি বাস যাতায়াত করে থাকে । আরামবাগ, সায়েদাবাদ হতে চট্টগ্রামগামী বাস পাওয়া যায় ।

রেলপথে:  ঢাকা হতে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম হতে ঢাকার মাঝে বেশ কয়েকটি ট্রেন চলাচল করে ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রেনসমূহ

  • মহানগর প্রভাতী
  • তূর্ণা নিশীথা
  • মহানগর গোধুলী এক্সপ্রেস
  • সুবর্ণ এক্সপ্রেস

যোগাযোগ

কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন

ফোন নম্বর:  ৯৩৫৮৬৩৪, ৮৩১৫৮৫৭, ৯৩৩১৮২২

মোবাইল নম্বর: ০১৭১১-৬৯১৬১২

বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশন

ফোন নম্বর: ৮৯২৪২৩৯

ওয়েবসাইট:  www.railway.gbv.bd

 

ষ্টেশন ম্যানেজার, চট্টগ্রাম – ০১৭১১-৬৯১৫৫০

অনুসন্ধান, চট্টগ্রাম – ০৩১-৬৩৫১৬২

এস আর পি, (রেল পুলিশ), চট্টগ্রাম – ০১৭১১-৬৯২৮৪৩

ও সি / জি আর পি, চট্টগ্রাম – ০৩১-৬১৬২৫৪

বিভাগীয় বানিজ্যিক কর্মকর্ত, চট্টগ্রাম – ০১৭১১-৬৯১৬২৬

ষ্টেশন ম্যানেজার, চট্টগ্রাম – ০১৭১১-৬৯১৬১২

অনুসন্ধন, ঢাকা – ০২-৯৩৫৮৬৩৪, ০২-৮৩১৫৮৫৭

বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা, ঢাকা – ০১৭১১-৬৯১৬৪৩

 

 

 

 

 

Related Posts

Leave A Comment