চলে যায় বসন্তের দিন পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

চলে যায় বসন্তের দিন পর্ব:০৫

চব্বিশ ঘণ্টা যাক তারপর যা বলার বলব।খালু সাহেব দরজার দিকে রওনা হলেন। ফ্লাস্কটা ফেলে যাচ্ছেন। নিয়ে যেতে হবে। বলব কিনা বুঝতে পারছি না। বললে হয়তো আরো রেগে যাবেন। থাকুক ফ্লাস্ক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দামি জিনিস। বরং এক কাজ করা যেতে পারে, ফ্লাঙ্ক ভর্তি চা নিয়ে ফুলফুলিয়ার সঙ্গে দেখা করা যেতে পারে। ঐ দিন তাঁর গরম রুটিগুলো ভালো ছিল। চা ভালো ছিল না।

কলিং বেলে হাত রাখার আগেই দরজা খুলে গেল এবং দরজা পুরোপুরি খোলার আগেই ফুলফুলিয়া বলল, ভাইজান আসুন। চমৎকৃত হবার মতো ঘটনা। দরজায় কোনো পিপ হোল নেই যে ফুলফুলিয়া আগে থেকে দেখবে আমি এসেছি। যেহেতু চমৎকৃত হবার ব্যাপারটা আমার মধ্যে নেই, আমি চমৎকৃত হলাম না। খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, কেমন আছ?

ফুলফুলিয়া বলল, ভালো।

তোমার দুটা ছবি আছে আমার কাছে। ছবি দুটা দিতে এসেছি।

ফুলফুলিয়া বলল, রবীন্দ্রনাথ এবং আইনস্টাইনের সঙ্গে ছবি?

তুমি ব্যাপারটা জানো না-কি?

উনি বলেছেন। উনি আসলে হঠাৎ করে ছবি দেখিয়ে আমাকে বিস্মিত করতে চেয়েছিলেন। পেটে কথা রাখতে পারেন নি। আগেই বলে দিয়েছেন। ভাইজান শুনুন, আমার বাবা বাসায় আছেন। উনার শরীর সামান্য খারাপ। আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে কিছু মনে করবেন না।

উনি কি সব সময় খারাপ ব্যবহার করেন? কী করলে উনি খুশি হন? কোনো কিছুতেই খুশি হন না। তবে তার ব্যাঞ্জো বাজনার প্রশংসা করলে তিনি মনে মনে খুশি হন।কী বাজনা বললে–ব্যাঞ্জো? জ্বি।চল, তোমার বাবার কাছে আমাকে নিয়ে চল। উনার নাম কী?

শমসের উদ্দিন।খাটের ওপর এই গরমের ভেতর কথা গায়ে দিয়ে জবুথবু হয়ে এক বৃদ্ধ বসে। আছে। নেশাগ্ৰস্ত মানুষের লাল চোখ। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কিছু মানুষ আছে সপ্তাহে একদিন শেভ করেন। উনি মনে হয় সেই দলের। ভদ্রলোকের মুখ ভর্তি দাড় গোঁফের জঙ্গল থাকলেও মাথা চুল শূন্য। টাক মাথা মানুষেরও কিছু চুল থাকে। উনার তাও নেই। তবে তার টাকে বিশেষত্ব আছে। টাকা চকচক করছে না। ম্যাট ফিনিশিং। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে খ্যাক খ্যাক করে উঠলেন।

আপনে কে?

আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, আমার নাম হিমু।

চান কী?

বসে তারপর বলি। বসতে পারি?

শমসের উদ্দিন লাল চোখে কটমট করে তাকিয়ে রইলেন। আমার দিকে না। তাঁর মেয়ের দিকে। আমি ফুলফুলিয়াকে বললাম, এই মেয়ে তুমি আমাদের দুজনকে চা দাও। আমি ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে এসেছি। চা খেতে খেতে আমি তোমার বাবার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা বলি। জরুরি কথা বলার সময় তোমার না থাকাই ভালো।

শমসের উদ্দিন আমার দিকে ফিরলেন। আগের মতোই খ্যাক খ্যাক করে বললেন, মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসছেন? এই এক যন্ত্রণায় পড়েছি। দুই দিন পরে পরে যন্ত্রণা। বাংলাদেশে মনে হয় বিবাহযোগ্য মেয়ে এই একটা প্ৰস্তাব দেয়ার আগে শুনে রাখেন— আমার মেয়ের দুই বছর আগে বিয়ে হয়েছে। জামাই পোষ্টমাস্টার।এটা কোনো ব্যাপার না।কী বললেন,এটা কোনো ব্যাপার না?

জ্বি না। মোঘল ইতিহাস পড়লে দেখবেন মোঘল সম্রাটদের কোনো একটা মেয়েকে পছন্দ হলো। দেখা গেল সেই মেয়ে বিবাহিত।কোনো অসুবিধা নেই। হাসবেন্ট মেরে ফেলে নতুন করে বিয়ের ব্যবস্থা করে।চুপ !আমাকে চুপ করতে বলছেন? হ্যাঁ চুপ।আর কোনো কথা না। এখন গেট আউট। এই মুহূর্তে গেট আউট।আসল কথাতো এখনো বলতে পারিনি।আসল কথা নকল কথা কোনো কথা না। তুমি ভদ্রলোকের ছেলে। মারধোর করব না। মানে মানে বের হয়ে যাও।আপনার ব্যাঙ্গো বাজনা বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলম। আপনার মেয়ের বিবাহের বিষয়ে না।

মোঘল সাম্রাজ্যও তো এখন নাই যে স্বামী খুন করে আবার বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে।।ব্যাঙ্গো বিষয়ে তোমার কি কথা? একটা সিডি কম্পানি আপনার ব্যাঙ্গো নিয়ে সিডি বের করতে চায়। আমি তাদের এজেন্ট। এই বিষয়ে কথা বলতে এসেছি।আমার ব্যাঙ্গো বাজনার সিডি বের করতে চায়? জ্বি।তুমি আমার নাম জানো?

নাম কেন জানবো না? আপনি হলেন ওস্তাদ শামসের উদ্দিন খাঁ।খাঁ পেলে কোথায়? নামের শেষে খাঁ নেই।খাঁ নেই এখন লাগিয়ে দেব। ওস্তাদের নামের শেষে খাঁ না থাকলে মানায় না। আপনি আগ্রহ থাকলে বলেন। টার্মস এন্ড কন্ডিশন ঠিক করি।আমার ব্যাঙ্গো বাজনা তুমি শুনেছ?

আমি শুনিনি। শোনার ইচ্ছা ও নেই। গান বাজনা আমার পছন্দের জিনিস না।আমি এজেন্ট। আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে, করলাম। বাকি আপনার ইচ্ছা। শুনেছি ব্যাঙ্গো যন্ত্রটা এখন আজকাল বাজানো হয় না। লোকজন এই যন্ত্রটার কথা ভুলেই গেছে। আর আপনি নাকি মোটামুটি বাজাতে পারেন।মোটামুটি বাজাই? আমি মোটামুটি বাজাই? আমি মোটামুটি বাজালে সিডি কম্পানি তোমাকে আমার কাছে পাঠাতো সিডি বের করার জন্য? এরা তো তোমার মতো ঘাস খায় না।তা ঠিক। আপনি কি রাজি?

ফট করে রাজি আরাজি কি? জিনিসটা ভালো মতো বুঝে নেই।চা খাও। কি ধরনের বাজনা ওরা চায়?রাগ প্রধান? সেটা আপনার ইচ্ছা। রাগ প্রধান বাজাতে চাইলে রাগ প্রধান বাজাবেন। ভালোবাসা প্রধান বাজাতে চাইলে ভালোবাসা প্রধান বাজাবেন।ভালোবাসা প্রধান কি? আপনারা সঙ্গীতের লোক। আপনারা জানবেন ভালোবাসা প্রধান কি?

তুমি তো দেখছি গান বাজনা লাইনের কিছুই জান না।আগেইতো বলেছি কিছুই জানি না। আপনি কি বাজাবেন আপনিই ঠিক করুন। আপনার সঙ্গে কি তবলা ফবলা লাগবে? ফবলা কি? এইভাবে কথা আমার সাথে বলবে না।জ্বি আচ্ছা বলব না।শামসের উদ্দিনের চোখ মুখ কমল হয়ে গেল।তিনি এই প্রথম কমল নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নাম কি?

হিমু।

ভালো নাম কি?

ভালো নাম, খারাপ নাম একটাই -হিমু।

সত্যি সত্যি ব্যাঙ্গোর সিডি বের করবে?

অবশ্যই।এই উপমহাদেশে আমার চেয়ে ভালো ব্যাঙ্গো কেউ বাজায় না।এটা জানো? জ্বি না।তোমাকে তুমি তুমি করে বলছি, মনে কিছু নিও না।আপনি ওস্তাদ আপনি তো তুমি তুমি করে বলবেনই। তাহলে কথাবার্তা ফাইনাল?

শামস উদ্দিন নিজের মনে বিড়বিড় করে বললেন,বত্রিশ মাত্রা তার, সঙ্গে তেহাই -রাগ কাফি যখন ধরব ঝড় তুলে দেব। ব্যাঙ্গোর উপর দিয়ে যখন আঙুল চালাবে। তখন আঙুল দেখা যাবে না।যদি আঙুল দেখা যায় – আল্লাহর কিরা আঙুল কেটে তোমাকে দিয়ে দিব।কাটা আঙুল দিয়ে আমি কি করবো?

তুমি আঙুল কেটে কি করবা। সেটা তোমার বিবেচনা। আমার আঙুল কেটে দেওয়ার কথা আমি দিলাম।ধন্যবাদ ! তোমার নামটা যেন কি? আর একবার বলো তো। মিহি? আজকাল মানুষের নাম মনে থাকে না।আমার নাম হিমু। তবে আপনার যদি মিহি ডাকতে ইচ্ছা হয় ডাকবেন।রাতে আমার সাথে খাওয়া দাওয়া করবে।আজ বাসায় মাংস রান্না হবে। ঝাল দিয়ে গোমাংস, সঙ্গে চালের আটার রুটি। রুটি ছিড়ে ছিড়ে ঝোলের মধ্যে ফেলবে। রুটি নরম হবে। মুখের মধ্যে ফেলবে। আর গিলে ফেলবে।

কবুল।

কবুল মানে কি?

কবুল মানে আমি রাজি।

খাওয়া দাওয়া পরে রাগ কাফির একটা বন্দীশ শুনাবো। তিন তাল শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।মাথা তো আমার এমনি খারাপ হয়ে আছে। দিন আরো খারাপ করে।ঠিক করে বলো তো চালের আটার রুটি করবে না পোলাও রাধবে? অনেক দিন পোলাও খাই না। দরিদ্র মানুষ, ইচ্ছা করলেও সম্ভব হয় না।আপনার কি পোলাও খেতে ইচ্ছা করছে? তুমি মেহমান মানুষ এই জন্যই বলছি।আর ফুলফুলিয়া সেই রকম ভালো রাধতেও পারে না। আমার স্ত্রী পারতেন। আফসোস তার হাতের পোলাও তোমাকে খাওয়াতে পারলাম না।উনি কোরমা কেমন রাঁধতেন?

কোরমার কথা বলে দিলে তো মন খারাপ করে। শহরের লোকজন তো কোরমা রাধতেই পারে না। মুরগির রোস্ট, দোপেঁয়াজা, ঝালফ্রাই। বাঙালির কোরমার কাছে কিছু লাগে? তোমার কি কোরমা খেতে ইচ্ছা করছে? জ্বি। আপনার কি করছে?

আমার তো মুখে পানি চলে এসেছে। বয়স হয়েছে তো সুখাদ্যের কথা মনে এলেই গালে পানি চলে আসে। সামলাতে পারি না। দেখি ব্যবস্থা করা যায় কি না।ফুলফুলিয়া এতক্ষণ পরে চা নিয়ে ঢুকেছে। তার দেরির কারণ বুঝা যাচ্ছে। সিঙ্গাড়া ভেজে এনেছে।শামস উদ্দিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, পোলাও রাধার ব্যবস্থা কর। পোলাও, মুরগির কোরমা, গরুর ঝাল মাংস। মিহি রাতে খাবে।

ফুলফুলিয়া বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।শামস উদ্দিন বিরক্ত গলায় মেয়েকে বললেন, হা করে তাকিয়ে থাকিস না তো। রান্নার ব্যবস্থা কর। টক দৈ এর ব্যবস্থা রাখিস। গুরু ভজনের পর টক দৈ। হজমের সহায়ক।ফুলফুলিয়া ঘর থেকে বের হতেই শামস উদ্দিন আমার দিকে ঝুকে এসে গলা নামিয়ে বললেন, মিহি এইযে আমার ব্যাঙ্গো সিডি বের হচ্ছে। কেন বের হচ্ছে জান?

আমি বললাম, না।শামস উদ্দিন বললেন,গত মাসে সিলেটে গিয়েছিলাম। শাহজালাল সাহেবের দরগায় গিয়ে কান্না কাটি করেছি। বলেছি আমার বড় শখ আমার বাজনা দেশের মানুষকে শোনাই। আল্লাহ পাক শাহজালাল সাবের উছিলায় তুমি বান্দার মনের বাসনা পূর্ণ করা। আল্লাহ পাক যে তখনই মঞ্জুর করে দিয়েছেন বুঝতে পারিনি। এখন বুঝলাম।ঠিক করেছি গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে দুরাকাত শোকরানা নামাজ পড়বো। মিহি তুমি ফুলফুলিয়াকে বলো গোসলের জন্য গরম পানি করতে।যাও রান্না ঘরে চলে যাও।

কোনো অসুবিধা নেই। আমার এই বাড়ি এখন থেকে তুমি নিজের বাড়ি মনে করবে।আমি রান্না ঘরে চলে এলাম।ফুলফুলিয়া কুলায় চাল বাছছিল। আমাকে রান্না ঘরে ঢুকতে দেখে মোটেও অবাক হলো না। শুধু বলল,সব মানুষকেই কি আপনি মুহূর্তের মাঝে হাতের মুঠোয় নিতে পারেন? আমাকে পারবেন? আমি তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললাম, গরম পানি করো তো। খাঁ সাহেব গোসল করবেন।ফুলফুলিয়া বলল, খাঁ সাহেব কে?

তোমার বাবা।

ও আচ্ছা।

আমি হাসি মুখে বললাম আর একটা জরুরি কথা। জহির তোমাকে একটা চিঠি লিখেছে। পোষ্ট করেছে।এক দুদিনের মধ্যে চিঠি তোমার হাতে চলে আসবে। চিঠি তুলে রাখবে। এখন পড়বে না। যখন আমি তোমাকে পড়তে বলব তখন পড়বে।ঠিক আছে?

ফুলফুলিয়া বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।তারপর চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,ঠিক আছে।ব্যাঙ্গো আসর বসল রাত বারোটায়। বাড়িওয়ালা না ঘুমানো পযর্ন্ত অপেক্ষা করতে হলো। দরজা জানালা বন্ধ করতে হলো। যেন শব্দ বাইরে না যায়।

বাজনা শুরু হল। আমি চমকে উঠলাম – এ কি? মনে হচ্ছে বাজনার তালে তালে, বাতাস কাপতে শুরু করেছে। শুধু বাতাস না এখন মনে হচ্ছে বাড়িঘর দুলছে। বুকের ভেতরের হৃৎপিন্ড দুলছে। এ যেন অলৌকিক অপার্থিব সঙ্গীতের ঝড়। আমি ভদ্রলোকের আঙ্গুলের দিকে তাকালাম। আঙুল সত্যি সত্যি দেখা যাচ্ছে না।যে কোনো মহাৎ সঙ্গীত বুকের ভেতরে তীব্র বেদনা তৈরি করে। আমার সে রকম হচ্ছে। বুক টনটন করছে।

একসময় বাজনা থামল। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখি আপনার পা-টা একটু এগিয়ে দিন তো। আপনার পায়ের ধুলো মাখবো।আমি হাত বাড়িয়ে দিতেই ভদ্রলোক দুহাতে  আমার হাত ঝাপ্টে ধরে তার বুকে লাগালেন এবং ব্যকুল হয়ে শিশুদের মতো শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন।

Leave a comment

Your email address will not be published.