ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

‘আমাদের কী বিপদ হয়েছে শুনেছেন ? 

ভাইয়া টাকা-পয়সা বেশি তাে পাঠাবেই না; বরং আরাে কমিয়ে দেবে।’ ছায়াসঙ্গী

ও আচ্ছা। ‘কী করব আমরা বলুন তাে ? ‘মেয়েটাকে মেরে ফ্যালাে। ‘এইটা ছাড়া বুঝি আপনার মাথায় আর বুদ্ধি নেই ? 

না। এটা সবচেয়ে ভালাে বুদ্ধি।’ ‘আপনার সঙ্গে আমার কথা বলতেই ইচ্ছা করছে না।’ ‘শুনে দুঃখিত হলাম।। 

‘আচ্ছা ঐদিন আপনি আমাকে ভয় দেখালেন কেন ? আপনি কি ঐ চেয়ারটায় বসেছিলেন ? আমার মনে হয় আপনি এখনও চেয়ারটায় বসে আছেন।’ 

ক্লারাকে আগুনে পুড়িয়ে মারলে কেমন হয় ? 

‘আপনি আজেবাজে কথা বলবেন না তাে! আচ্ছা বলুন তাে ঐদিন কি আপনি চেয়ারে বসেছিলেন ? 

‘তুমি একটু সাহায্য করলেই হয়। 

কী সাহায্য ? ‘যখন আগুন জ্বলে উঠবে তখন এই ঘরের দরজা তুমি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেবে। 

‘আপনার কথাবার্তার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’ ‘আগুন লাগার পর মেয়েটা যাতে বেরুতে না পারে। ‘কী বলছেন আপনি? 

‘আগুন লাগার পর সে ছুটে বের হতে চাইবে। তখন তাকে শুধু আটকানাে । অল্প কিছুক্ষণ আটকে রাখা । 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

‘চুপ করুন তাে!’ ‘ভালাে বুদ্ধি দিচ্ছি।’ ‘আপনার বুদ্ধি চাই না।’ 

তুমি আমার বন্ধু। 

‘না, আমি আপনার বন্ধু নই। 

আজ রাতে নাসরিন এক পলকের জন্যেও চোখ এক করতে পারল না। মনে মনে ঠিক করে ফেলল ওইজা বাের্ডটা ভাের হতেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে। কী সর্বনাশের কথা! বােতামটা এমন অদ্ভুত কথা বলছে কেন ? 

আগামীকাল রাত দুটার ফ্লাইটে আলাউদ্দিন চলে যাবে। শেষ রাতটা এ বাড়িতে থাকবার জন্যে এসেছে, দীর্ঘদিন হােটেলে থাকায় তাকে বেশ লজ্জিতও মনে হচ্ছে। 

আজ রাতটা থাকতে তেমন কষ্ট হবে না। বর্ষা শুরু হয়ে গেছে । আবহাওয়া অসহনীয় নয়। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। 

আলাউদ্দিন বসার ঘরে সবার সঙ্গে গল্প করছে। গল্প বেশ জমে উঠেছে। প্রথমদিকে আমেরিকায় সে কীসব বিপদে পড়েছিল তার গল্প । প্রতিটি গল্পই আগে অনেকবার শােনা তবু সবাই খুব আগ্রহ করে শুনছে। 

ঘরে ইলেকট্রিসিটি নেই। বিকেলে ঝড়বৃষ্টির সময় ইলৈকট্রিসিটি চলে। গিয়েছে, এখনও আসেনি। আজ রাতে আর আসবে বলে মনে হয় না। ঝড়বৃষ্টি এখনও হচ্ছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, বৃষ্টির ঝমঝমানি, দমকা হাওয়ার ঝাপটা, চমৎকার পরিবেশ। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

একটিমাত্র হারিকেন, সেটা বসার ঘরে। হারিকেন ঘিরে সবাই বসে আছে । ক্লারা ওদের গল্পে কোনাে মজা পাচ্ছিল না, ঘন ঘন হাই তুলছিল । মাঝরাতে সে ঘুমুতে গেল। নাসরিন তার ঘরে মােমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। | দুর্ঘটনা ঘটল তারও মিনিট দশেক পর, গল্প তখন খুব জমে উঠেছে । শুরু হয়েছে ভূতের গল্প। রাহেলা ছােটবেলায় নিশির ডাক শুনে ঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিলেন সেই গল্প হচ্ছে। গা ছমছমানাে পরিবেশ। ঠিক তখন। তীক্ষ্ণ গলায় নাসরিন বলল, ঘর এত আলাে হয়ে গেছে কেন ভাইয়া ? তার কথা শেষ হবার আগেই শােনা গেল গােঙানি ও চিকার । দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে এবং ক্লারা চ্যাচাচ্ছে— Oh God, Oh Good. 

সবাই ছুটে গেল শােবার ঘরের দিকে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে ।দুর্ঘটনা তাে বটেই। দুর্ঘটনা ছাড়া কিছুই নয়। বাতাসে মােমবাতি কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল নেটের মশারিতে। সেখান থেকে ক্লারার নাইট গাউনে। সিনথেটিক কাপড়— মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে উঠল। খুবই সহজ ব্যাখ্যা। শুধু একটি ব্যাপার ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ক্লারার ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। কেউ একজন বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়েছিল। আগুন লেগে যাবার পর ক্লারা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে ঘর থেকে বেরুতে। বেরুতে পারেনি। চিৎকার করে দরজা খুলতে বলেছে— ঝড়-বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের সঙ্গে তার চিৎকারও কেউ শােনেনি। ব্যাকুল হয়ে শেষ মুহুর্তে সে ঈশ্বরকে ডাকছিল। ঈশ্বর মানুষের কাতর আহ্বানে সাধারণত বিচলিত হন না।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

আমার ছােট মেয়ের গলায় মাছের কাঁটা ফুটেছিল। মাছের কাঁটা যে এমন যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার তা জানা ছিল না। বেচারি ক্রমাগত কাঁদছে। কিছুক্ষণ পরপর বমি করছে, হেঁচকি উঠছে। চোখ-মুখ ফুলে একাকার। আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। 

অনেক ধরনের লৌকিক চিকিৎসা করানাে হলাে। শুকনাে ভাতের দলা গেলানাে, মধু খাওয়ানাে, গলায় সেঁক। এক পর্যায়ে আমাদের কাজের মেয়েটি বলল, একটা বিড়াল এনে তার পায়ে ধরলে কাঁটা চলে যাবে । গ্রামদেশে নাকি এইভাবে গলার কাঁটা দূর করা হয়। 

বিপদে মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। হাতের কাছে বেড়াল থাকলে হয়তােবা বেড়াল চিকিৎসাও করাতাম। ডাক্তারের কথা একবারও মনে হয়নি। কারণ মনে হলেও লাভ হতাে না। আটচল্লিশ ঘণ্টার হরতাল চলছে। ঢাকা শহর অচল। পুলিশের সঙ্গে জনতার কিছু কিছু খণ্ডসংঘর্ষ হচ্ছে বলেও খবর আসছে। দুটো পেট্রোল পাম্পে নাকি আগুন লাগানাে হয়েছে। কয়েকজন মারাও গেছে। শহরভরতি গুজব । শােনা যাচ্ছে এরশাদ সরকারের পতন হয়েছে। তিনি তাঁর প্রিয় গলফ সেট বিক্রি করে দিয়েছেন। একটা হেলিকপ্টার নাকি বঙ্গভবনে রেডি অবস্থায় আছে।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

এই অবস্থায় মেয়ে কোলে নিয়ে রাস্তায় নামলাম। মেয়ে একটু পর পর কান্না থামিয়ে জিজ্ঞেস করছে— বাবা, আমি কি মরে যাচ্ছি ? | সাত বছরের মেয়ে এই জাতীয় প্রশ্ন করলে বুক ভেঙে যায়। আমার নিজেরও চোখে পানি এসে গেল। 

যখন প্রয়ােজন থাকে না তখন মােড়ে মােড়ে ফার্মেসি দেখা যায়। সেইসব ফার্মেসিতে গম্ভীরমুখে ডাক্তার বসে থাকেন। আজ কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। কোনাে ফার্মেসি খােলা নেই। দুজন ডাক্তারের বাসায় গেলাম। একজন বাসায় ছিলেন না, অন্যজন মেয়েকে না দেখেই বললেন, মেডিক্যালে নিয়ে যান। 

মেডিক্যালেই নিয়ে যেতাম তবু কেন জানি সাইনবাের্ড দেখে দেখে তৃতীয় একজন ডাক্তার খুঁজে বের করলাম। ইনি তিনতলায় থাকেন। সাইনবাের্ডে লেখা স্ত্রীরােগ বিশেষজ্ঞ। গলায় কাঁটা ফোটা নিশ্চয়ই স্ত্রীরােগ নয়, তবু গেলাম যদি কিছু করতে পারেন। 

ডাক্তারের নাম হাসনা বানু। ছােটখাটো মানুষ। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দ্রমহিলার মধ্যে মাতৃভাব অত্যন্ত প্রবল। একদল মানুষ আছে যাদের দেখলেই আপনজন মনে হয়। প্রথম দর্শনেই তাঁকে এরকম মনে হলাে। তিনি আমার মেয়েকে চেয়ারে বসিয়ে হাঁ করালেন। গলায় টর্চের আলাে ফেলে চিমটা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে এক ইঞ্চি লম্বা একটা কাঁটা বের করে ফেললেন। অতি কোমল গলায় বললেন, মামণি ব্যথা কমেছে ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

আমার মেয়ে চুপ করে রইল। সে বােধহয় তখনও ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না। ডাক্তার হাসনা বানু বললেন, কী মেয়ে, আমার সঙ্গে কথা বলবে না ? আমার মেয়ে হেসে ফেলল। 

‘এখন বলল তুমি কী খাবে ? আইসক্রিম খাবে ? দিই একটু আইসক্রিম ?’ 

‘ভ্যানিলা আইসক্রিম থাকলে খাব।’ ‘আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ভ্যানিলা আইসক্রিম আছে। 

ভদ্রমহিলার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে গেল। আমি তাঁকে চিকিৎসার জন্যে কিছু টাকা দিতে গেলাম, তিনি শান্ত গলায় বললেন, ডাক্তারি যখন করি তখন চিকিৎসার টাকা তাে নেই, কিন্তু তাই বলে বাচ্চা একটা মেয়ের গলার কাঁটা বের করারও ফি দাবি করব এটা কী করে ভাবলেন ? কাঁটাটা বের করার পর আপনার মেয়ের হাসি আপনি নিশ্চয়ই। দেখেছেন। এই হাসির দাম লক্ষ টাকা। তা-ই না ? 

Leave a comment

Your email address will not be published.