ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ুন আহমেদ

প্রিয়াংকা বলল, কিছু না। জাভেদ ঘুমজড়ানাে স্বরে বলল, ঘুমাও। জেগে আছ কেন ? বলতে বলতেই ঘুমে জাভেদ এলিয়ে পড়ল । জাভেদকে জড়িয়ে ধরে সারারাত জেগে রইল প্রিয়াংকাছায়াসঙ্গী

একটি দীর্ঘ ও ভয়াবহ রাত। স্বামীকে জড়িয়ে ধরে প্রিয়াংকা শুয়ে আছে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় পাশের ঘরে। সে স্পষ্টই শুনছে ছােটখাটো শব্দ, ইজিচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালে যেমন ক্যাচক্যাচ শব্দ হয় সেরকম শব্দ, গলার শ্লেষ্ম পরিষ্কার করার শব্দ। শেষরাতের দিকে শােনা গেল বারান্দায় পায়চারির শব্দ। কেউ-একজন বারান্দার এ-মাথা থেকে ও-মাথায় যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে। এইসব কি কল্পনা ? নিশ্চয়ই কল্পনা। রাস্তা দিয়ে ট্রাক যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনাে শব্দ আসছে না। 

ফজরের আজানের পর প্রিয়াংকার চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল। ঘুম ভাঙল বেলা সাড়ে ন’টায়। ঘরের ভেতর রােদ ঝলমল করছে । জাভেদ চলে গেছে কলেজে। মরিয়ম জিতু মিয়ার সঙ্গে তারস্বরে ঝগড়া করছে। প্রিয়াংকার সব ভয় কপূরের মতাে উবে গেল । রাতে সে যে অসম্ভব ভয় পেয়েছিল এটা ভেবে এখন নিজেরই কেমন হাসি পাচ্ছে।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ুন আহমেদ

সে স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই না। মানুষ কতরকম দুঃস্বপ্ন দেখে। এও একটা দুঃস্বপ্ন। এর বেশি কিছু না। মানুষ তাে এর চেয়েও ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে। সে নিজেই কতবার দেখেছে। একবার স্বপ্নে দেখেছিল সম্পূর্ণ নগ্নগায়ে বাসে করে কোথায় যেন যাচ্ছে। ছি ছি, কী ভয়ংকর স্বপ্ন! প্রিয়াংকা বিছানা থেকে নামতে নামতে ডাকল, মরিয়ম! ‘জে আম্মা। 

ঝগড়া করছ কেন মরিয়ম ? ‘জিত কাচের জগটা ভাইঙ্গা ফেলছে আম্মা। ‘চিৎকার করলে তাে জগ ঠিক হবে না। চিৎকার করবে না। ‘জিনিসের উপর কোনাে মায়া নাই… মহব্বত নাই…’ “ঠিক আছে তুমি চুপ করাে। তােমার স্যার কি চলে গেছেন ? ‘জে।। 

কখন আসবেন কিছু বলে গেছেন? দুপুরে খাইতে আসবেন। ‘আচ্ছা যাও, তুমি আমার জন্যে খুব ভালাে করে এক কাপ চা বানিয়ে আনাে।’ নাশতা খাইবেন না আম্মা ? না। তােমার স্যার নাশতা করেছে ? ‘জে।’ 

মরিয়ম চা আনতে গেল । প্রিয়াংকা মুখ ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বসল। এখন তার করার কিছুই নেই। দুজন মানুষের সংসার। কাজ তেমন কিছু থাকে না। এ সংসারে কাজকর্ম যা আছে সবই মরিয়ম দেখে এবং খুব ভালােমতােই দেখে। চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া প্রিয়াংকার কোনাে কাজ নেই। এই ফ্ল্যাটে অনেক গল্পের বই আছে । গল্পের বই পড়তে প্রিয়াংকার ভালাে লাগে না।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ুন আহমেদ

ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার জন্যে পড়াশােনা করা দরকার। পড়তে ভালাে লাগে না। কারণ প্রিয়াংকা জানে পড়ে লাভ হবে সে পাস করতে পারবে না। কোনাে একটা কলেজেই তাকে বিএ পড়তে হবে। কে জানে হয়তাে জাভেদের কলেজেই। যদি তা-ই হয় তা হলে জাভেদ কি তাকে পড়াবে ? ক্লাসে তাকে কী ডাকবে— স্যার ? 

চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই মরিয়ম তাকে একটা চিঠি দিল। ‘কিসের চিঠি মরিয়ম ? ‘স্যার দিয়ে গেছে।’ | চিঠি না- চিরকুট। জাভেদ লিখেছে— প্রিয়াংকা, তােমার গা-টা গরম মনে হলাে । তৈরি হয়ে থেকো, আমি দুপুরে তােমাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। 

প্রিয়াংকার মনটা হঠাৎ ভালাে হয়ে গেল। মানুষটা ভালাে । হৃদয়বান। এবং বুদ্ধিমান। স্বামীদের কতরকম অন্যায় দাবি থাকে তার তেমন কিছু নেই। অন্যদের দিকেও খুব তীক্ষ দৃষ্টি । প্রিয়াংকা কেন, আজ যদি জিতু মিয়ার জুর হয় তাকেও সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে । জাভেদ এমন একজন স্বামী যার ওপর ভরসা করা যায়। 

যে যা-ই বলুক, এই মানুষটাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে তার খুব লাভ হয়েছে। জাভেদের আগে একবার বিয়ে হয়েছে সেটা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়। বেচারার স্ত্রী মারা গেছে বিয়ের আটমাসের মাথায়। স্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে বিয়ে করার জন্যেও অস্থির হয়ে পড়েনি। দু’বছর অপেক্ষা করেছে। মামা মামি যে তাকে দোজবর একটি ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন এই নিয়েও প্রিয়াংকার মনে কোনাে ক্ষোভ নেই।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ুন আহমেদ

মামা দরিদ্র মানুষ। তিনি আর কত করবেন! যথেষ্টই তাে করেছেন। মামি নিজের গয়না ভেঙে তাকে গয়না করে দিয়েছেন। ক’জন মানুষ এরকম করে ? আট-নটা নতুন শাড়ি কিনে দিয়েছেন। এর মধ্যে একটা শাড়ি আছে বারােশাে টাকা দামের । 

জাভেদের আগের স্ত্রীর অনেক শাড়ি এই ঘরে রয়ে গেছে। ঐ মেয়েটির শাড়ির দিকে তাকালেই মনে হয় খুব শৌখিন মেয়ে ছিল। ড্রেসিংটেবিল ভরতি সাজগােজের জিনিস। কিছুই ফেলে দেয়া হয়নি। বসার ঘরে মেয়েটির বড় একটি বাঁধানাে ছবি আছে। খুব সুন্দর মুখ । তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। 

এই ডাক্তার জাভেদের বন্ধু । কাজেই ডাক্তার অনেক আজেবাজে রসিকতা করল— যেমন হাসিমুখে বলল ভাবিকে এমন শুকনাে দেখাচ্ছে কেন? সংসারে নতুন কেউ আসছে নাকি ? হা-হা-হা। বুদ্ধিমান হয়ে ঠিক কাজটি করে ফেলেননি তাে ? 

দু-সপ্তাহও হয়নি যার বিয়ে হয়েছে তার সঙ্গে কি এরকম রসিকতা করা যায়? রাগে প্রিয়াংকার গা জ্বলতে লাগল । 

ডাক্তার তাকে একগাদা ভিটামিন দিলেন এবং বললেন, ভাবিকে মনে হচ্ছে রাতে ঘুমুতে-টুমুতে দেয় না। দুপুরে ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেবেন, নয়তাে শরীর খারাপ করবে—হা-হা-হা । 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ুন আহমেদ

প্রিয়াংকা বাড়ি ফিরল রাগ করে। সন্ধ্যা মেলাবার পর সেই রাগ ভয়ে রূপান্তরিত হলাে। সীমাহীন ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলল। এ-ঘর থেকে ও ঘরে যেতে ভয়। বারান্দায় যেতে ভয়। হাতমুখ ধুতে বাথরুমে গিয়েছে— বাথরুমের দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলাে আর সে দরজা খুলতে পারবে না। দরজা আপনাআপনি আটকে গেছে। সে দরজা খােলার চেষ্টা করেই কাঁপা গলায় ডাকতে লাগল-মরিয়ম, ও মরিয়ম! মরিয়ম! 

রাতে আবার ঐদিনের মতাে হলাে। জাভেদ পাশেই প্রায় নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে আর প্রিয়াংকা স্পষ্টই শুনছে স্যান্ডেল পরে বারান্দায় কে যেন পায়চারি করছে। প্রিয়াংকা নিজেকে বােঝাল ও কেউ না, ও হচ্ছে মরিয়ম। মরিয়ম হাঁটছে। ছােট ছােট পা ফেলছে। মরিয়ম ছাড়া আর কে হবে ? নিশ্চয়ই মরিয়ম। স্যান্ডেলে কেমন ফটফট শব্দ হচ্ছে। জাভেদ যখন স্যান্ডেল পরে হাঁটে তখন এরকম শব্দ হয় না। একবার কি বারান্দায় উঁকি। দিয়ে দেখবে? কী হবে উঁকি দিলে ? কিছুই হবে না। ভয়টা কেটে যাবে। রাত একটা বাজে এমন কিছু রাত হয়নি। রাত একটায় ঢাকা শহরের অনেক দোকানপাট খােলা থাকে। এই তাে পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চাটা কাঁদছে। এখন নিশ্চয়ই বারান্দায় যাওয়া যায়। 

খুব সাবধানে জাভেদকে ডিঙিয়ে প্রিয়াংকা বিছানা থেকে নামে। তার হাত-পা কাঁপছে, তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে, কানের কাছে কেমন ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হচ্ছে। সব অগ্রাহ্য করে বারান্দায় চলে এল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়ানাে মানুষটা বলল, প্রিয়াংকা এক গ্লাস পানি দাও তাে! 

Leave a comment

Your email address will not be published.