ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

জমির সাহেব চায়ের চিনির ব্যাপারে কোনাে আগ্রহ দেখালেন না । শুকনাে গলায় বললেন, তাের মা এই চিঠি পড়েছে ?ছায়াসঙ্গী 

“হ্যা।’ ‘বলেছে কিছু ? 

না।’ 

‘বুঝলি মিতু, সুস্মিতা নামের কাউকেই চিনি না। আর ধর যদি চিনতামও তাহলে কি এইরকম একটা চিঠি কেউ লিখতে পারে ? ছি ছি, লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে।’ 

মিতু ইতস্তত করে বলল, আমার কী মনে হয় জান বাবা ? আমার মনে হয়, এই বাড়িতে জমির সাহেব বলে কেউ ছিলেন । চিঠিটা তাঁকেই লেখা। 

জমির সাহেবের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই সহজ সমাধান তার মাথায় কেন আসেনি বুঝতে পারলেন না। মিতু মেয়েটার মাথা তাে বেশ ভালাে। সায়েন্সে দেয়া উচিত ছিল। গাধার মতাে তিনি মেয়েটাকে আর্টস পড়িয়েছেন। 

তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, খুব ভালাে চা হয়েছে মা, খুব ভালাে। তােমার মা কোথায় ? 

নানুর বাড়ি গেছে। 

‘মা নানুর বাড়ি গেছে’ এই বাক্যটি জমির সাহেবের খুব অপছন্দের বাক্য। শাহানার ’র বাড়ি মীরপুর ছ’নম্বরে। ঐ বাড়িতে গেলেই শাহানা রাতটা থেকে যায়। আজও থেকে যাবে। তবে আজ জমির সাহেব অন্যদিনের মতাে খারাপ বােধ করলেন না । শাহানা থাকলে নিশ্চয়ই চিঠিটা নিয়ে গম্ভীর গলায় কথা বলত। শাহানার কথা শুনতেই ইদানীং তাঁর অসহ্য লাগে। রাগী-রাগী কথা তাে আরাে অসহ্য লাগবে। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

‘মিতু! ‘জী বাবা ? ‘তাের মা বােধহয় থেকে যাবে ও-বাড়িতে। “হ্যা। “তাের মা কিছু বলেনি চিঠি পড়ে ? না।’ তাের কি মনে হয় রাগ করেছে ? রাগ করেছিল আমি বুঝিয়ে বলেছি।’ 

মেয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় জমির সাহেবের মন ভরে গেল। মেয়েটাকে সায়েন্স পড়ানাে উচিত ছিল। সায়েন্স না পড়িয়ে ভুল হয়েছে। আর্টস পড়বে গাধা টাইপের মেয়েরা। তার মেয়ে গাধা টাইপ নয়। বুদ্ধি আছে। বাপের প্রতি ফিলিংস আছে। 

পরদিন যথারীতি জমির সাহেব অফিসে রওনা হলেন। একবার মনে হলাে বাসে না গিয়ে একটা রিকশা নিয়ে নেবেন। পরমুহুর্তেই এই চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেললেন। ফালতু একটা চিঠি নিয়ে কিছু ভাবার কোনাে মানে হয় ? এইসব জিনিস প্রশ্রয় দেয়াই উচিত না। ঝিকাতলার মােড়ে অন্যসব অফিসযাত্রীর মতাে তিনি একটা টিফিনবক্স এবং ছাতা-হাতে বাসের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন এবং যথারীতি প্রচণ্ড ভিড়ে ঠেলাঠেলি করে বাসে। উঠে পড়লেন। বাস ছেড়ে দিল। সেই মুহূর্তে কিছু-একটা হলাে তাঁর। মনে হলাে ছিটকে বাস থেকে পড়ে যাচ্ছেন। তিনি একসঙ্গে অনেক লােকের চিৎকার শুনলেন— থামাে, থামাে, থামাে—এই রুককে, রুককে 

জমির সাহেব রাস্তায় ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারালেন। জ্ঞান হলাে হাসপাতালে। তাঁর বাম পা হাঁটুর নিচে ভেঙেছে। এক জায়গায় না– দু জায়গায় । মিতু এবং শাহানা মাথার কাছে বসে আছে। দুজনই কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। সােহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডাক্তার সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, কাঁদছেন কেন ? বললাম তাে তেমন সিরিয়াস কিছু হয়নি। দিন পনেরাের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাসায় যাবে । দুটা ফ্রাকচার হয়েছে তবে সিরিয়াস কিছু না। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

ডাক্তারের কথামতাে পনেরাে দিনের মাথাতেই জমির সাহেব বাড়ি ফিরলেন। তবে পুরােপুরি সুস্থ হয়ে নয়। বা পা অচল হয়ে গেল। এদেশে নাকি কিছু করা সম্ভব না, বিদেশে যদি কিছু হয়। চাকরি শেষ হবার আগেই জমির সাহেব রিটায়ার করলেন । তিনি এবং তার পরিবারের কেউ ঐ হলুদ চিঠির কথা একবারও তুলল না। যেন ঐ চিঠি একটা অভিশপ্ত চিঠি । তার কথা তােলা উচিত না। চিঠিটা জমির সাহেবের শােবার ঘরের টেবিলের তিন নম্বর ড্রয়ারে পড়ে রইল । মাঝে মাঝে জমির সাহেব চিঠিটা বের করে পড়েন এবং তাঁর অচল পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেই রাতে তাঁর একফোঁটা ঘুম হয় না। কেমন ভয়-ভয় লাগতে থাকে। 

নতুন বছরের গােড়াতে ঝিকাতলার বাসা উঠিয়ে উত্তর শাহজাহানপুরে সস্তায় একটা ফ্ল্যাটে তারা চলে গেলেন। রােজগার কমেছে, এখন টাকা পয়সা সাবধানে খরচ করতে হবে। নতুন ফ্ল্যাটে দুটা মাত্র শােবার ঘর। একটিতে জমির সাহেব শাহানাকে নিয়ে থাকেন, অন্যটিতে মিতু আর তার ছােট বােন ইরা থাকে। জমির সাহেবের বড় ছেলে থাকে বসার ঘরে । একটা খাট ঘরে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। এই বাড়িতে মাস তিনেক কাটানাের পর আরেকটি বেয়ারিং চিঠি এল। আগের মতাে গােটাগােটা হরফে লেখা। মােটা কলমের নিব দিয়ে মেয়েলি অক্ষরে সুস্মিতা লিখেছে— 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

প্রিয়তমেষু, 

তুমি কেমন আছ ? এত দুশ্চিন্তা করছ কেন ? তােমাকে দুশ্চিন্তা করতে দেখলে আমার ভালাে লাগে না। সংসারে দুঃখ কষ্ট সমস্যা থাকেই। এতে বিচলিত হলে চলে ? মনে সাহস রাখাে। আচ্ছা একটা কথা, তােমার বড় ছেলেটাকে কিছুদিন ঢাকা শহরের বাইরে রাখতে পার ? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কোনাে ঝামেলায় পড়ে যাবে । তােমাদের গ্রামের বাড়িতে ওকে কিছুদিনের জন্যে পাঠিয়ে দাও না। ও যেতে চাইবে না। বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করাও। 

বিনীতা তােমার সুস্মিতা 

এবার আর সুস্মিতার চিঠি নিয়ে কেউ হাসাহাসি করল না। চিঠি পড়ার সময় শাহানার হাত থরথর করে কাঁপতে লাগল । জমির সাহেব অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে গেলেন। বড় ছেলে সুমনকে গ্রামের বাড়িতে পাঠানাের প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তার বি.এ. ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। দুটা পেপার হয়ে গেছে। তবু শাহানা বললেন, থাক, পরীক্ষা দিতে হবে না। ওকে পাঠিয়ে দাও। 

Leave a comment

Your email address will not be published.