ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৮)-হুমায়ুন আহমেদ

নাসরিনের চোখে পানি এসে গেল। তার আপন বড় ভাই তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। ছায়াসঙ্গীনাসরিনের চোখের পানি অবিশ্যি কেউ দেখতে পেল না। একটু আসছি ভাইয়া বলেই সে চট করে উঠে গেল। বাথরুমে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চোখ মুছে উপস্থিত হলাে। আলাউদ্দিন তখন সুটকেস খুলে আরাে কীসব উপহার বের করছে।

অতি তুচ্ছ সব জিনিস— গাড়ির পেছনে লাগানাের স্টিকার, যেখানে লেখা ‘Hug Your Kids’। তাদের গাড়ি কোথায় যে তারা গাড়ির পেছনে স্টিকার লাগাবে ? কেউ অবিশ্যি কিছু বলল না। সবাই এমন ভাব করতে লাগল যে গাড়ির স্টিকারটার খুব প্রয়ােজন ছিল। 

আলাউদ্দিন বলল, নাসরিন তাের জন্যে তাে কিছু আনা হয়নি। নাসরিন বলল, ভাইয়া আমার কিছু লাগবে না। ‘তােকে বরং এখান থেকেই শাড়ি-টাড়ি কিছু কিনে দেব। 

‘আচ্ছা। 

আলাউদ্দিন সুটকেস ঘাটতে লাগল। তার ঘাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হয় সে আশা করছে কিছু একটা পেয়ে যাবে যা নাসরিনকে দিতে পারলে শাড়ির ঝামেলায় যেতে হবে না। নাসরিনের লজ্জার সীমা রইল না। 

‘এই যে জিনিস পাওয়া গেছে। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৮)-হুমায়ুন আহমেদ

হাসিতে আলাউদ্দিনের মুখ ভরে গেল। সবাই ঝুঁকে পড়ল সুটকেসের ওপর। লিপস্টিকের মতাে একটা বস্তু বেরুল। আলাউদ্দিন বলল-নাসরিন নে। এর নাম লিপ গ্লস। ঠোটে দিলে ঠোট চকচক করে, ঠোঁট ফাটে না। 

নাসরিন শুকনাে গলায় বলল, থ্যাংকস ভাইয়া।। 

আলাউদ্দিন বিরক্ত গলায় বলল— গিফট হচ্ছে গিফট । গিফটের মধ্যে সস্তা দামি কোনাে ব্যাপার না। বাঙালিদের স্বভাব হচ্ছে কোনাে উপহার পেলেই হিসাব-নিকাশে বসে যাবে। দাম কত, কী! 

নাসরিন বলল, আমি কোনাে হিসাব-নিকাশ করছি না ভাইয়া। লিপ গ্লসটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। 

দ্যাটস গুড। মাই গড – নাসরিন তাের ভাগ্য ভালাে আরেকটা জিনিস পাওয়া গেছে ওইজা বাের্ড। এতক্ষণ চোখেই পড়েনি। 

‘ওইজা বাের্ড আবার কী ? 

আলাউদ্দিন লুডু বাের্ডের মতাে একটা বোের্ড মেলে ধরল । চারদিকে ‘এথেকে ‘জেড’ পর্যন্ত লেখা— মাঝখানে দুটা ঘর— একটায় লেখা ‘ইয়েস’ একটায় ‘নাে’ ।। 

‘এটা কি কোনাে খেলা ভাইয়া ? 

খেলাই বলতে পারিস। ভূত নামানাের খেলা। প্ল্যানচেটের নাম শুনিসনি ? এটা দিয়ে প্ল্যানচেটের মতাে করা যায়। 

কীভাবে ? ‘লাল বােতামটা দেখছিস না ? দুজন বা তিনজন মিলে খুব হালকাভাবে তর্জনী দিয়ে এটাকে টাচ করে রাখবি, কোনােরকম প্রেশার দেয়া যাবে না । বােতামটাকে রাখবি বাের্ডের ঠিক মাঝখানে। ঘরের আলাে কমিয়ে দিবি আর মনে-মনে বলবি— ‘If any good soul passes by, please come.’ তখন আত্মাটা বােতামে চলে আসবে। বােতাম নড়তে থাকবে। তখন কোনাে প্রশ্ন করলে আত্মা জবাব দেবে। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৮)-হুমায়ুন আহমেদ

কীভাবে জবাব দেবে ? 

‘বােতামটা অক্ষরগুলির উপর যাবে । কোন কোন অক্ষরের উপর যাবে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। ভূতটার নাম যদি হয় রহিম তা হলে প্রথমে যাবে ‘আর’-এর উপর, তারপর ‘এ’-এর উপর, তারপর ‘এইচ’— বুঝতে পারছিস? 

‘বােতামটা আপনাআপনি যাবে ? , আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে রাখতে হবে।’ ভাইয়া ভূত কি সত্যি সত্যি আসে ? “আরে দূর দূর । ভূত আছে নাকি যে আসবে! আমেরিকানদের এটা হচ্ছে পয়সা বানানাের একটা ফন্দি। এত সহজে আত্মা চলে এলে তাে কাজই হতাে!’ 

আলাউদ্দিন আমেরিকানদের স্বভাবচরিত্র সম্পর্কে মজার মজার গল্প করতে লাগল । আলাউদ্দিনের মা রাহেলার মনে ক্ষীণ আশা– গল্প যেভাবে জমেছে তাতে মনে হয় না ছেলে বউকে নিয়ে হােটেলে যাবে। যদি সত্যি সত্যি যায় তা হলে তিনি মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারবেন না । এমনিতেই বিদেশী বউয়ের কথায় অনেকেই হাসাহাসি করছে। জামশেদ সাহেবের স্ত্রী গত সপ্তাহে এসে সরু গলায় বললেন- বাঙালি ছেলেরা যে। বিদেশে গিয়েই বিদেশিনী বিয়ে করে ফেলে ঐসব বিদেশিনীগুলি নিচু জাতের । ঝি, জমাদারনি এইসব । ভদ্রলােকের মেয়েরা বাঙালি বিয়ে করতে যাবে কেন ? ওদের গরজটা কী ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৮)-হুমায়ুন আহমেদ

রাহেলা ক্ষীণ গলায় বললেন, আপনাকে কে বলেছে ? 

বলবে আবার কে ? এ তাে সবাই জানে। বাঙালি ছেলেগুলির সাদা চামড়া দেখে আর হুঁশ থাকে না। ওরা তাে প্রথম প্রথম জানে না যে ঐ দেশের ঝিয়ের চামড়াও সাদা, আবার মেথরানির চামড়াও সাদা।’ 

রাহেলা এইসব কথার কোনাে জবাব দিতে পারেননি। শুধু শুনে গেছেন। এখন যদি ছেলে বউ নিয়ে হােটেলে চলে যায় তা হলে কী হবে? সবাই তাে গায়ে থুথু দেবে। 

অবিশ্যি তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন ছেলে এবং ছেলের বউয়ের জন্যে একটা ঘর ভালােমতাে সাজাতে। নাসরিনের ঘরটাই সাজাতে হয়েছে। দেয়ালে চুনকাম করা হয়েছে। টিউবলাইট লাগানাে হয়েছে। একটা ফ্যান ঘরে আছে। সেই ফ্যান ঘটাং ঘটাং শব্দ হয় বলে নতুন একটা সিলিং ফ্যান কেনা হয়েছে। তারপরেও যদি ছেলে বউ নিয়ে হােটেলে ওঠে তিনি কী আর করবেন ? তাঁর আর কী করার আছে

Leave a comment

Your email address will not be published.