জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩৬ হুমায়ূন আহমেদ

জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩৬

এখন একটি দুঃসংবাদ দিতেছি, শুভপুরের গফুর ভাই এবং মিশাকান্দির এনায়েত (এনায়েতকে আপনি চিনিবেন না। অতি সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। পরহেজগার আদমি। যুদ্ধের সময়ও উনি কোনো নামাজ কাযা করেন নাই।) মিলিটারির হাতে ধরা পড়িয়াছেন। তাঁহাদের ভাগ্যে কী ঘটিয়াছে আমরা জানি না। এখনো কোনো খবর নাই। আমি যখন আহত হইয়া বিরামপুরের মাঠে পড়িয়া ছিলাম, তখন গফুর ভাই আমাকে পিঠে নিয়া তিন মাইলের বেশি দৌড়াইয়াছিলেন। আমাকে ক্যাম্পে রাখিয়া তিনি আবার যুদ্ধে যান এবং মিলিটারির হাতে ধরা পড়েন। ইহাকেই বলে নিয়তির পরিহাস। গফুর ভাইয়ের কথা মনে উঠিলেই আমি অশ্রু সামলাইতে পারি না।

আম্মাজান, এখন আপনাকে একটা দুঃসংবাদ দিব। আপনাকে আল্লাহর দোহাই লাগে, আপনি অধিক কান্নাকাটি করিবেন না। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যে করেন। এই কথাটি মনে রাখিবেন। ডাক্তাররা আমার দুইটা পা হাঁটুর নিচ হইতে কাটিয়া বাদ দিবার সিদ্ধান্ত নিয়াছেন। ডাক্তাররা বলিতেছেন, ইহা ব্যতীত আমার জীবন রক্ষা করা সম্ভব। হইবে না। দাদিজানের কাছে এই সংবাদ লুক্কায়িত রাখিবেন। তিনি বৃদ্ধ মানুষ, এই সংবাদে তিনি অত্যধিক কষ্ট পাইবেন। শেষে তাহার ভালো-মন্দ কিছু হইয়া যাইবে।

আম্মাজান, আমি গত পরশু দিবাগত রাতে আকবাজানকে খোয়াবে দেখিয়াছি। তিনি সাদা রঙের একটা বড় পাঞ্জাবি পরিধান করিয়া আমার বিছানার পাশে বসিয়া আছেন। এবং আমার গায়ে মাথায় হাত বুলাইয়া আমাকে আদর করিতেছেন। তাঁহার সহিত আমার কিছু টুকটাক সাংসারিক আলাপ হয়। আফসোস, কী আলাপ হয় তাহার কিছুই মনে নাই। অনেকদিন পরে আব্ববাজানকে খোয়াবে। দেখিয়া মনে অতীব আনন্দ পাইয়াছি।

আম্মাজান, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়া কোনো দুশ্চিন্তা করিবেন না।

ইতি

আপনার অতি আদরের সন্তান

আব্দুল গণি

পুনশ্চ : অপারেশনের তারিখ এখনো নির্ধারণ হয় নাই।

ত্রিপুরার বাংলাদেশ হাসপাতালের ডাক্তার ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম, বীর প্রতীকএর নিজের কথা।

১৯৬১ সালের কথা। তখন আমি হলিক্রস কলেজের ছাত্রী। প্রচুর খেলাধুলা করতাম। ডাক্তার হওয়ার পর ৬ মাস ইন্টার্নিশিপ করে আর্মিতে ১৯৬১ সালের জুন-জুলাই মাসে যোগদান করি। কারণ, আমার বড় ভাইও ছিলেন। আমিতে। ১৯৬১ সালে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত একজন লেফটেনেন্ট-এর পদে ছিলাম। ১৯৬১-এ শেষের দিকে জেনারেল ওসমানীর নির্দেশে আমার পদোন্নতি ঘটে— আমি ক্যাপ্টেন হই। বড় ভাই হায়দার সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলেন। ছোট ভাই এ টি এম সাফদার (জিতু) মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিভিন্ন খবর এবং গোপনবার্তা পৌঁছে দেবার কাজে নিয়োজিত ছিল।

১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে আমি ছিলাম কুমিল্লায়। বড় ভাই মেজর হায়দার পিণ্ডির চেরাট থেকে এই সময় বদলি হয়ে তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নে চলে আসেন। যদ্দুর মনে পড়ে তারিখটা ছিল ৫ ফেব্রুয়ারি, রোজার দিন। দুভাইবোন কিশোরগঞ্জে বেড়াতে এসেছি। আমার ছুটি ছিল ১ মাস আর বড় ভাই হায়দারের ছুটি ছিল ২ সপ্তাহের। তিনি কুমিল্লায় ফিরে গেলেন একমাস পর ছুটি শেষ হবার আগেই। আর তখুনি শুরু হয়ে গেল দেশে রাজনৈতিক সজঘাতজনিত আলোড়ন।

মার্চের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি ঢাকায় ফিরে আসি। বড় ভাই তখন ক্যান্টনমেন্টে। আমার এক ফুপার বাসায় এসে তিনি লুকিয়ে-ছুপিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতেন। তাঁর কথা মতো, ছুটির পর সেনাবাহিনীতে আবার যোগ দিয়ে কিশোরগঞ্জে বাসায় ফিরে আসি। কিন্তু যেদিন কিশোরগঞ্জ ক্টেশনে air-raid হলো, সেদিনই আমরা পালালাম। মামার শ্বশুরবাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে ৩ মাইল দূরে ছিল। চলে গেলাম। সেখানেই।

এক সপ্তাহ থাকার পর আবার কিশোরগঞ্জে ফিরে এলাম। ক্যাপ্টেন নাসের এবং বড় ভাই হায়দার ময়মনসিংহের দুটো ব্রিজ উড়িয়ে দিতে এখানে এলেন। এই সময় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট হেড কোয়ার্টার্স থেকে ২/৩টা টেলিগ্রাম এলো জয়েন করার জন্য চাপ দিয়ে। আকাবাই এগুলোর উত্তর দিতেন এই লিখে–she is sick, অর্থাৎ আমি অসুস্থ।এক সপ্তাহ কিশোরগঞ্জে থাকার পর মিলিটারি আসার মাত্র দুদিন আগে দশ-বারো মাইল উত্তরে হোসেনপুরে আম্মার নানার বাড়ি পালিয়ে গেলাম।

ওখানে থাকার সময় বড় ভাইয়ের খবর পেতাম। লোক মুখে শুনতাম, তিনি আগরতলায় আছেন, ট্রেনিং দিচ্ছেন। বিশ্বাস করতাম না। কিশোরগঞ্জে সেই তখন আমার বড় ভাই ও আকবার নামে কাগজে বেরুত যে, তাদেরকে ধরে দিলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। জুলাইয়ের শেষের দিকে বড় ভাই একজন মুক্তিবাহিনীর সদস্যকে আমাদের কাছে পাঠালেন বাবা-মাকে পাকবাহিনী মেরে ফেলেছে–এই খবর পেয়ে। তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন খবরটার সঠিকতা সম্পর্কে।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে একটানা আট-দশদিন নৌকায় চেপে কিশোরগঞ্জের গোজদিয়া ঘাটি হয়ে মেঘালয় পৌঁছলাম। তারপর সিলেটের টেকেরহাটে ছিলাম এক সপ্তাহ। এরই মধ্যে বড় ভাই কী করে যেন আমার খবর পেলেন, জানি না। সেখান থেকে ট্রারেন্স করে পৌঁছলাম শিলং-এ। পথে আকবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিলং-এ থাকলাম। ৪/৫ দিন। পরে গৌহাটি হয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পৌঁছলাম মেলাঘরে। দুতিন সপ্তাহ পরে যোগ দিলাম। বাংলাদেশ হাসপাতালে।

আমি ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিলাম। মেলাঘরের বাংলাদেশ হাসপাতালটি বাশের তৈরি ছিল এবং তাতে বেড ছিল চারশোর মতো। মেডিকেল কলেজের তিন-চারজন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র সেখানে নিয়োজিত ছিলেন। লন্ডন থেকে মবিন এসেছিলেন, এসেছিলেন ডা. জাফরউল্লাহ, ডা. কিরণ সরকার দেবনাথ, ডা. ফারুক মাহমুদ, ডা. নাজিমুদ্দিন এবং ডা. মোর্শেদ।

এদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দশ-বারো জন ভলান্টিয়ারও আমি থেকে এসেছিলেন। তবে সুবেদারের ওপরে কেউ ছিলেন না। কোনো ভারতীয় ডাক্তার আমাদের সাথে নিয়মিতভাবে থাকতেন না। তবে ওষুধের জন্য আগরতলা ও উদয়পুরে যেতে হতো। উদয়পুরের ডিসি মি. ব্যানার্জি, আগরতলা এড়ুকেশন বোর্ডের পরিচালক ডা. চ্যাটার্জি, ডা. মজুমদার এবং ডা. চক্রবর্তী ঐরা আমাদের প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।

আমাদের OT অর্থাৎ Operation Theatre ছিল প্লাস্টিক ক্লথ দিয়ে চারদিকে ঘের দেয়া একটা ঘর। এর মেঝেও আবৃত ছিল প্লাস্টিক ক্লথে। আমি ওখানে থাকার সময় কেবল দুজন রোগী ডায়রিয়া-ডিসেন্ট্রিতে মারা গিয়েছিল।ভারতীয় আর্মিরও অনেক সৈন্য আসতো এখানে চিকিৎসার জন্য। আমি আগরতলা IA HOSPITAL-এ মাঝে-মধ্যে যেতাম। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকেও আমরা প্রচুর সাহায্য পেয়েছি। আমাদের রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই থাকত ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত।

একবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটা ট্রাক রাস্তার খাদে উল্টে পড়ে গিয়েছিল। ট্রাকটি সেনা সদস্যে ছিল। ঠাসা। আহতদেরকে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে এনে এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। জেনারেল রবি-এর হেলিকপ্টারে গুলি লেগেছিল। তিনিও এখানে চিকিৎসা গ্ৰহণ করেছিলেন।

যখন হাসপাতালে ছিলাম, তখনো বড় ভাই হায়দারের সঙ্গে দেখা করতে পারতাম না। অধিকাংশ সময় অসম্ভব ব্যস্ত থাকতেন তিনি। মাঝে সাঝে দেখা হতো। আকবা-আৰ্ম্মা মেলাঘর ক্যাম্পের কাছেই একটা মাটির ঘর ভাড়া নিয়ে মেঝেতে প্লাস্টিক ব্যাগ বিছিয়ে দিনরাত যাপন করতেন। তাদের সাথেও ভাইয়া দেখা করার সময় পেতেন না।

শ্রাবণ মাসের এক দুপুরে (১৬ আগষ্ট) নাইমুল ঢাকা শহরে ঢুকে পড়ল। তার তেমন কোনো অসুবিধা হলো না। সে ঢুকেছে নরসিংদী এলাকার গ্রামের ভেতর দিয়ে। বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চে ঢুকলে চেকপোষ্টের সমস্যায় পড়তে হতো। ডান্ডি কার্ড (আইডেনটিটি কার্ড) দেখানো, নানান প্রশ্নের জবাব দেয়া হাজারো ফ্যাকড়া। সন্দেহ হলেই আটক। তার মতো রোদে পোড়া শহুরে ধরনের চেহারা হলে কথাবার্তা ছাড়াই আটক। ইসকুরুপের চাবি আঁটা।

গ্রামের ভেতর দিয়ে যাতায়াতও যে খুব নিরাপদ তা না। রাজাকারবাহিনী ভালোমতো গজিয়ে গেছে। লুটপাট করার সুযোগ থাকায় তারা বেশ উৎসাহী। শান্তি কমিটিও উৎসাহী। অচেনা কেউ গ্রামে ঢুকলেই–আপনের নাম? আপনের পরিচয়?

নাম-পরিচয় সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র নাইমুলের সঙ্গে আছে। শান্তি কমিটির এক চেয়ারম্যান সাহেব হাজী আসমতউল্লাহর চিঠি আছে। টাইপ করা এবং পিস কমিটির সীল দেয়া চিঠিতে লেখা–

বিসমিল্লা হে রাহমানের রহিম

পত্ৰবাহক সিরাজগঞ্জ নিবাসী ফরহাদ খান পাকিস্তানের একনিষ্ঠ সেবক। তাহাকে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করা যাইতেছে।

নাইমুলকে সেই চিঠি একবার শুধু দেখাতে হয়েছে। ঢাকায় ঢোকার মুখে এক রাজাকার কমান্ডার গম্ভীর ভঙ্গিতে চিঠি উল্টেপাল্টে দেখেছে। তার চিঠির দিকে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে কমান্ডার সাহেব চিঠি পড়তে পারছেন না।আপনার পরিচয় বলেন। নাইমুল বলেছে, পরিচয় এখানে লেখা আছে। কমাণ্ডার সাহেব ধমক দিলেন–লেখা তো জানি, মুখে বলেন। মুখে তো তালা নাই। তালা থাকলে বলেন, চাবি দিয়া খুলব। আমার কাছে মুখের চাবি আছে।

আমার নাম ফরহাদ খান।

কই মেলা দিছেন?

ঢাকা।

কী জন্যে?

আমার স্ত্রী ঢাকায়, তাকে দেখতে যাচ্ছি।

স্ত্রীর নাম বলেন।

নাইমুল সত্যি কথাই বলল, মরিয়ম।

হাত তুইল্যা খাড়ান। চেকিং হবে।

নাইমুল হাত তুলে দাঁড়াল। অন্য একজন এসে গায়ে থাবা দিয়ে চেকিং পর্ব শেষ করল। নাইমুলের মনে হলো কাজটা করতে গিয়ে দুজনই মজা পাচ্ছে। এই মজার উৎস নাইমুল জানে। বন্দুকের সামনে মানুষ ভয়ে ছোট হয়ে থাকে। এই ভয়টা দেখতে ভালো লাগে।

নাইমুল বলল, ঢাকা শহরের অবস্থা কিছু জানেন?

কমান্ডার বলল, অবস্থা ভালো।

শহরে কি মুক্তি আছে?

টুকটাক দুই-একটা থাকতে পারে। আমাদের অঞ্চলে নাই।

তারপরেও সাবধানে থাকবেন। এখন নাই, হঠাৎ চলে আসবে।

কমান্ডার সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, এত প্যাচালের দরকার নাই। যেখানে যাইতেছেন যান। আমাদের পান খাওয়ার খরচ দিয়া যান।নাইমুল দশ টাকার একটা নোট দিল। কমান্ডার সাহেব সেই নোট অনগ্রহের সঙ্গে হাতে নিলেন।শ্রাবণ মাসে আকাশ মেঘলা থাকবে। রোদ থাকবে না। আর থাকলেও রোদের তেজ থাকবে না। এটাই নিয়ম। আজ নিয়মের ব্যতিক্রম। ঝকঝকি করছে রোদ। শহর তোতে আছে। শহর থেকে ভাপ বের হচ্ছে।

দীর্ঘদিন গ্রামগঞ্জের কাঁচা সড়ক, চাষা মাঠের উপর হাঁটাহাঁটি করার পর শহরের পাকা রাস্তায় হাঁটতে নাইমুলের চমৎকার লাগছে। রাস্তাঘাট পরিষ্কার। দেয়ালে লেখা নেই। পথে ভিড় নেই। প্রতিটি বাড়িতে পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। রিকশার সঙ্গেও কাগজের পতাকা।নাইমুল যাচ্ছে শান্তিবাগের দিকে। সেখানে তার পরিচিত একটা হোটেল আছে। হোটেল জিন্দাবাহার। বেশ কিছুদিন এই হোটেলের একটা ঘর (রুম নং ১৮) ভাড়া করে সে ছিল।

হোটেলের লোকজন তার চেনা। সেই হোটেলে ওঠাই তার জন্যে সম্ভবত নিরাপদ। সে প্রথমে হোটেলের একটা ঘর (চেষ্টা করবে রুম নং ১৮) নেবে। বয়কে একটা টাকা দিয়ে বলবে দুই বালতি গরম পানি দিতে। দুই বালতি গরম পানি গায়ে ঢেলে আরামের একটা গোসল তাকে দিতে হবে। সে আস্ত একটা সাবান গায়ে ডলবে। অনেকদিন আরাম করে গোসল করা হয়। না। আরামের গোসলের জন্যে শরীর খাপ ধরে অপেক্ষা করছে।

গোসলের পর খাওয়া-দাওয়া। এই হোটেলের ইলিশ মাছের ডিমের তরকারি এবং কাতল মাছের মাথার মুড়িঘণ্ট তুলনাবিহীন। সে রুমে অর্ডার দিয়ে আরাম করে খাওয়া-দাওয়া করবে। খাওয়ার পর একটা মিষ্টি পান। একটা সিগারেট। কিছুক্ষণ আরামের ভাতসুম।

মরিয়মের খোঁজে। সে যাবে ঘুম ভাঙার পর। তাদের কোনো খোঁজ যে পাওয়া যাবে না। এই বিষয়ে সে প্রায় নিশ্চিত। তাদের ঢাকায় থাকার কথা না। নিরাপদ কোনো জায়গায় চলে যাবার কথা। ঢাকা কি এখন নিরাপদ? পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নগরী কি নিরাপত্তার কথা বলে?

ঢাকা এখন কুকুর এবং কাকমুক্ত নগর। কুকুরমুক্ত হবার পেছনে যুক্তি আছে। মিলিটারিরা না-কি কুকুর সহ্য করছে না। দেখলেই গুলি করে মারছে। কিন্তু কাক গেল কোথায়? তারা নিশ্চয়ই কাকও গুলি করে মারে নি।

নাইমুল হাঁটছে আর মনে মনে কাক খুঁজছে।

কাক বলে কা কা

ঢাকা শহর খা খা।

বাহ সুন্দর মিলেছে তো! কুকুরের দেখা নাইমুল কিছুক্ষণের মধ্যে পেয়ে গেল। মোটামুটি স্বাস্থ্যবান একটা ঘিয়া রঙের কুকুর ফুটপাতে শুয়ে আছে। তার শুয়ে থাকার ভঙ্গি বিষণ্ণ। নাইমুল বলল, এই তোর খবর কিরে? কুকুর সঙ্গে সঙ্গে উঠে এলো। ঢাকা শহরে এই প্রথম নাইমুলের কারো সঙ্গে কথা বলা। ডায়েরি লেখার অভ্যাস থাকলে এই ঘটনাটা সুন্দর করে লেখা যেত– আমি ঢাকায় প্রবেশ করি ১৬ আগস্ট দুপুরে। প্রথম কথা যা বলি তা হলো–এই তোর খবর কিরে?

প্রশ্নটি করা হয় একটা কুকুরকে। কুকুরের গায়ের রঙ ঘিয়া। সে পা খুঁড়িয়ে হাঁটে। এই কুকুরটা আমার সঙ্গে অনেকদূর হেঁটে হেঁটে আসে। আমি যখন শান্তিনগরের মোড় পার হই। তখনই শুধু সে থেমে যায়। তবে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। তার তাকানোর ভঙ্গি এরকম যে আমি একটু ইশারা দিলেই সে আবারো আমার পেছনে পেছনে আসবে। আমি তাকে ইশারা দিতাম। কিন্তু দেই নি, তার কারণ আমার চোখে পড়ল একটা নাপিতের দোকান। সঙ্গে সঙ্গে চুল কাটার কথা মনে পড়ল। আমি ঢুকে গেলাম নাপিতের দোকানে।

চুল কাটার সময় কথা বলা সব নাপিতের অভ্যাস। যে নাইমুলের চুল কাটছে তার মুখে কোনো কথা নেই। কচকচ করে চুল কেটে যাচ্ছে। নাইমুলের খুবই আরাম লাগছে। চুলকাটার ব্যাপারটা যে আরামদায়ক নাইমুল তা আগে কখনো টের পায় নি। তার ঘুম ঘুমও পাচ্ছে। চুল কাটাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া কোনো কাজের কথা না। নাইমুলকে বেশ কষ্ট করে জেগে থাকতে হচ্ছে। নাইমুল হাই তুলতে তুলতে বলল, আপনার নাম কী?

নাপিত চাপা গলায় বলল, তৈয়ব।

দোকান আপনার?

মহাজনের দোকান।

কারিগর কি আপনি এক?

হুঁ।

কাস্টমার কেমন হয়?

হয় কিছু।

মিলিটারিরা চুল কাটতে আসে?

তৈয়ব এই প্রশ্নের জবাব দিল না। মিলিটারি প্রসঙ্গে কোনো কথা বলা বোধহয় নিষেধ।শহরে কি মুক্তি আছে? নাপিত কিছুক্ষণের জন্যে কাচির ক্যাচ ক্যাচ বন্ধ করে আবার শুরু করল। এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। নাইমুল বলল, আপনারা শহরে আছেন, মুক্তির নাড়াচাড়া বুঝেন না? বোঝার তো কথা।

আছে, নাড়াচাড়া আছে। আপনে কি মুক্তি?

নাইমুল সহজ ভঙ্গিতে বলল, হুঁ।

আপনেরে দেইখ্যাই বুঝেছি।

কীভাবে বুঝলেন?

এইসব বোঝা যায়। মাথা মালিশ কইরা দিব?

দেন। আগে শেভ করেন।

মাথা মালিশ এতই আরামদায়ক হলো যে, নাইমুল সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ল। ছোটখাটো ঘুম না, লম্বা ঘুম। তৈয়ব তার ঘুম ভাঙালি না। খবরেব কাগজ ভাঁজ করে পাশে বসে রইল। মাছি খুব উপদ্রব্য করছে। ঘুমন্ত লোকটার মুখে বারবার এসে বসছে। তৈয়ব খবরের কাগজ দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে।নাইমুলের ঘুম ভাঙল বিকেলে। তখন শহরে রোদ নেই। আকাশ মেঘলা। শ্রাবণ মাসের আকাশে মেঘ মানেই বৃষ্টি। বৃষ্টি নামলে খুবই সমস্যা হবে। নাইমুল এক কাপড়ে ঢাকা এসেছে।

তৈয়ব তাকিয়ে আছে। তার মুখ ভাবলেশহীন।

নাইমুল বিরক্ত গলায় বলল, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ডাকলেন না কেন?

তৈয়ব জবাব দিল না।

কত হয়েছে আমার? চুল কাটা, শেভ, মাথা মালিশ। কত হয়েছে বলেন।

তৈয়ব বলল, আপনের কিছু দিতে হবে না।

নাইমুল বলল, দিতে হবে না কেন?

তৈয়ব এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না।

নাইমুল বলল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। ভাই, তাড়াতাড়ি বলেন–কত?

তৈয়ব আগের মতোই আবেগশূন্য গলায় বলল, আপনে মুক্তি। আমি মুক্তির কাছে টেকা নেই না। আমারে টেকা দেওনের চেষ্টা কইরা ফয়দা নাই। দিতে পারবেন না।বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। নাইমুল রাস্তায় নেমে পড়ল। সে হোটেলে জায়গা পেল না। হোটেলের মালিক বদল হয়েছে। মালিকের সঙ্গে নোমও পাল্টেছে। এখন নতুন নাম পাকিস্তান হোটেল। নতুন মালিক নাইমুলকে কঠিন গলায় বলল, হোটেলে লোক নেওয়া নিষেধ আছে। রেস্টুরেন্ট আছে, খানা খাইতে পারেন। থাকার জায়গা নাই।

মিলিটারির নিষেধ?

হুঁ। মাঝে মধ্যে চেকিং হয়। বিরাট দিগদারি।

আশেপাশে কোনো হোটেল আছে?

খুঁজেন। খুঁইজ্যা দেখেন।

নাইমুল আরো দুটা হোটেলে চেষ্টা করল। একটাতে বলল, ফ্যামিলির সাথে বাচ্চাকাচ্চা থাকলে ঘর দিতে পারে। একা মানুষকে ঘর দেবে না।নাইমুল বলল, একটা রাতের জন্যে আমার কোথাও থাকা দরকার। একটু ব্যবস্থা করে দেন।হোটেল মালিক ক্লান্ত গলায় বলল, আত্মীয়স্বজনের বাসায় যান। এইটা ছাড়া পথ নাই। হোটেলে আপনেরে কেউ রাখব না। ঢাকা শহরে আপনের স্বজন আছে না?

নাইমুল দেরি না করে স্বজনের খোঁজে বের হলো। অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার তো ঘটেও যেতে পারে। দেখা যাবে মরিয়মরা ঢাকাতেই আছে, ঐ বাড়িতেই আছে। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর মরিয়মের মার ভীত গলা শোনা যাবে–কে? কে? এই মহিলা মেয়েদের কখনো দরজা খুলতে দেন না। নিজে আসেন দরজা খুলতে। পরিচয় দেয়ার পরেও আরো কয়েকবার বলেন, কে কে? নাইমুল কড়া নাড়ার পর তিনিই দরজার ওপাশ থেকে ভয়ে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া গলায় বলবেন, কে?

নাইমুল গলা নামিয়ে বলবে, মা আমি। আমি নাইমুল। দরজাটা খুলুন। তবে কাউকে বলবেন না যে আমি এসেছি। আমি একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই।তিনি দরজা খুলবেন, তবে নিজেকে নিশ্চয়ই সামলাতে পারবেন না। চিৎকার করে বলবেন, মরিয়ম, দেখে যা কে এসেছে! মরিয়ম কী করবে–দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা মচকে ফেলবে।

এই মেয়ের সিঁড়িতে পা পিছলানো রোগ আছে। সে সিড়ি দিয়ে নামবে অথচ পা পিছলাবে না–এটা হতেই পারে না।তাকে দেখে মরিয়ম কী করবে? ঝাপ দিয়ে তার গায়ের উপর পড়বে এবং তাকে সুদ্ধ মেঝেতে ফেলে দেবে। এরকম ঘটার সম্ভাবনা আছে। মরিয়ম এমনই মেয়ে যে উত্তেজনার মুহুর্তে চিন্তাই করবে না। আশেপাশে কে আছে। মা দাঁড়িয়ে আছে। বোন দাঁড়িয়ে আছে। থাকুক দাঁড়িয়ে।

আমি আমার মানুষটার গায়ে ঝাপ দেবী। যার যা ইচ্ছা মনে করুক, আমার কিছু যায় আসে না। মানুষটা যখন দোতলায় উঠবে, আমি শক্ত করে তার হাত ধরে রাখব। মানুষটা যদি লজ্জা পেয়ে হাত ছাড়িয়ে নিতে চায় তাতেও লাভ হবে না। আমি আরো শক্ত করে হাত চেপে ধরব।মরিয়মদের বাড়ির সদর দরজা তালাবন্ধ। একটা না, দুটা বড় বড় তালা। নাইমুল কিছুক্ষণ তালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। কেন দাঁড়িয়ে থাকল। সে নিজেও জানে না।

রাত নটা থেকে কারফিউ। আগে ছিল রাত এগারোটা থেকে। গত এক সপ্তাহ হলো এই সময় এগিয়ে এনে নটা করা হয়েছে। এর মধ্যেই থাকার জন্যে নাইমুলকে একটা জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। ঢাকা শহরে তার পরিচিত মানুষ নেই বললেই চলে। সে রওনা হলো আগামসি লেনের দিকে। অনেকদিন সেই অঞ্চলে থেকেছে। যে বাড়িতে ছিল তার বাড়িওয়ালা নিশ্চয়ই তাকে ফেলে দেবে না।আগামসি লেনে ঢোকা গেল না। কোনো সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়ই। এলাকা কর্ডন করে মিলিটারি বাড়িতে বাড়িতে ঢুকছে।

কমলাপুর রেল স্টেশনে চলে যাওয়া যায়। একরাত স্টেশনের বেঞ্চিতে গড়াগড়ি করে কাটিয়ে দেয়া। কমলাপুর স্টেশনে থাকাও বিপদজনক। সেখানে কঠিন মিলিটারি পাহারা। সঙ্গে ব্যাগ সুটকেস নেই, একটা লোক ঘোরাঘুরি করছে–অতি সন্দেহজনক ব্যাপার।রাত আটটা বেজে গেছে। আর এক ঘণ্টা পরেই কারফিউ শুরু হবে। শেষ চেষ্টা হিসেবে নাইমুল রওনা হয়েছে শাহেদের বাসার খোঁজে।

কয়েকবারই সে এই বাসায় গিয়েছে, তারপরেও রাতে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। পঁচিশে মার্চের পর শহর মনে হয় নিজে নিজেই নিজেকে বদলে ফেলেছে। কিছুই চেনা যায় না। নাইমুল ঠিক করল শাহেদকে পাওয়া না গেলে দরজার ফাঁক দিয়ে আসমানীর চিঠিটা ঢুকিয়ে দেবে। এতে একটা বড় দায়িত্ব শেষ হবে। তারপর যে-কোনো একটা বাড়ির কড়া নেড়ে বলবে, আমার রাতে থাকার জায়গা নেই।

আজকের রাতটা আপনাদের বাসায় থাকতে দিন। কারফিউ ভাঙলেই আমি চলে যাব।নাইমুলের এখন মনে হচ্ছে, তার ঢাকা আসাটা ভুল হয়েছে। ঝোঁকের মাথায় সে চলে এসেছে। মাথায় একটা জিনিস কাজ করেছে–ছুটি কাটাতে যাচ্ছি। ছুটি। ভালো খাবার খাব। ভালো বিছানায় ঘুমাব। গরম পানি দিয়ে সাবান ডলে গোসল দিব। ভাগ্য ভালো হলে মরিয়মের সঙ্গে দেখা হবে।

এখন দেখা যাচ্ছে সবই এলোমেলো হয়ে গেছে। শুধু চুলটা কাটা হয়েছে। এখন পর্যন্ত গোসল হয় নি। খাওয়া হয় নি। আরামের কোনো বিছানায় শোয়ার প্রশ্নই আসছে না। রাতে কেউ যদি থাকতে দেয়, তাকে ঘুমাতে হবে বসার ঘরের সোফায়। তার জন্যে নিশ্চয়ই বিছানা ছেড়ে দেবে না।

কারফিউ শুরু হবার পাঁচ-সাত মিনিট আগে শাহেদের বাসা পাওয়া গেল। ভেতরে বাতি জ্বলছে। দরজা-জানালা বন্ধ। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। শাহেদ না থাকলেও কেউ না কেউ নিশ্চয়ই আছে। ঝুমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। নাইমুল এক দৌড়ে বারান্দায় উঠে পড়ল। উঁচু গলায় ডাকল, শাহেদ, বাসায় আছিস?

দ্বিতীয়বার ডাকার আগেই দরজা খুলে গেল। শাহেদ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে গভীর বিস্ময়। নাইমুল প্রথম যে বাক্যটা বলল তা হচ্ছে–ঘরে গায়ে মাখা সাবান আছে তো? সাবান দিয়ে হেভি গোসল দিতে হবে। তুই এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমাকে চিনতে পারছিস তো?

Leave a comment

Your email address will not be published.