তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১০) হুমায়ূন আহমেদ

আন্টি তার বরের জন্যে শুধু যে সাইকেল আনালেন তা না একটা নতুন শার্ট কেনালেন। শরিফাকে দিলেন দুটা শাড়ি- কানের দুল | শরিফা নিজেই দোকান থেকে রূপার নুপুর কিনে এনে পায়ে পরেছে। যখন হাঁটে ঝমঝম শব্দ হয়। খুব হাস্যকর ব্যাপার। 

তন্দ্রাবিলাসমঙ্গলবার আমাদের স্কুল ছুটি ছিল। বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি। আমি দুপুরে শুয়ে আছি– হঠাৎ স্বপ্নে দেখি–ছােট মা এসে আমাকে বলছেন, ফারজানা আমি বলেছিলাম না এই মেয়েটাকে শাস্তি দেব? ও চলে যাচ্ছে যাবার আগে শাস্তি দিয়ে দেয়া দরকার তাই না? 

আমি চুপ করে রইলাম। ছােট মা বললেন— কথা বলছ না কেন? কি ধরনের শাস্তি দেয়া যায় বল তাে। তুমি যেরকম শাস্তির কথা বলবে আমি ঠিক সেরকম শাস্তি দেব। 

আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন। 

আমি ক্ষমা করব না। ওকে শাস্তি পেতেই হবে। ওর চোখ দুটা গেলে দি কি বল ? উলের কাঁটা দিয়ে চোখ গেলে দি ? 

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। তবে খুব চিন্তিত হলাম না। কারণ আমি স্বপ্ন বদলাতে পারি। আমি স্বপ্নটা বদলে ফেলব। কি ভাবে বদলাব সেটাও ঠিক করে ফেললাম। বিকেলে গানের টিচার চলে যাবার পর দরজা বন্ধ করে আমি স্বপ্নটা বদলাব। গানের টিচার গেলেন সন্ধ্যাবেলা। আমি আমার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই শরিফার গলা শুনতে পেলাম। সে ফিস ফিস করে ডাকছে – আফা। ও আফা। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১০) হুমায়ূন আহমেদ

শব্দটা আসছে খাটের নীচ থেকে। আমি নিচু হয়ে দেখি শরিফা হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নীচে বসে আছে। কুকুর যেভাবে বসে থাকে ঠিক সেভাবে শরিফা বসে আছে। কুকুরের মত জিভ বের করে খানিকটা হাঁপাচ্ছেও | তাকে কেমন যেন ভয়ংকর দেখাচ্ছে। আমি বললাম, তুমি এখানে কি করছ? বের হয়ে আস। খাটের নীচ থেকে বের হয়ে আস। 

সে বলল, আফাগাে আমি বাইচ্যা নাই। আমারে মাইরা ফেলছে। ছাদে কাপড় আনতে গেছিলাম আমারে ধাক্কা দিয়া ফেলছে। আমি অনেক দূর চইল্যা যাব । যাওনের আগে আফনেরে দেখা দেখতে আইছি গাে । 

এই বলেই সে হামাগুড়ি দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে গেল। আমি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। সবাই ছুটে এলেও তখনই আমার ঘরে ঢুকতে পারল না। আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তাদের ঢুকতে হল দরজা ভেঙ্গে। 

আমি বলছি সন্ধ্যাবেলার ঘটনা। শরিফা যে সত্যি সত্যি মারা গেছে এই খবর জানা গেল রাত আটটার দিকে। আমাদের বাড়ির পেছনের দেয়ালে পড়ে তার মাথা থেতলে গিয়েছিল। কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। প্রচন্ড শক্তিশালী কেউ — কারণ দেয়ালটা বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে—ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে এত দূরে ফেলতে অনেক শক্তি দরকার। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১০) হুমায়ূন আহমেদ

আমার মাথা ধরছে। আমি আপাতত লেখা বন্ধ করলাম। 

এই মুহূর্তে আপনি আমার সম্পর্কে কি ভাবছেন বলব ? | আমি অন্তর্যামী নই। অন্য একজনের মনের খবর আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি কি ভাবছেন তা আমি বলতে পারব। কারণ আপনার চিন্তার পদ্ধতি আমি জানি। 

আপনি আমার লেখা পড়ছেন। যতই পড়ছেন আমার সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে উঠছে। ধারণাগুলি করছেন যুক্তির ভেতর দিয়ে। পুরােপুরি অংক কষা হচ্ছে। দুই যােগ তিন হচ্ছে পাঁচ, কখনও ছয় বা সাত নয়। এ জাতীয় মানুষের মনের ভাব 

আঁচ করা মােটেই কঠিন না।। 

অতিপ্রাকৃত কোনও ব্যাপারে আপনার সামান্যতম বিশ্বাসও নেই। যেই আমি ছােট মা’কে দেখার কথা বলেছি ওমনি আপনি ভুরু কুঁচকেছেন। কঠিন কিছু শব্দ মনে মনে আওড়েছেন, যেমন স্কিজোফ্রেনিক, সাইকোপ্যাথ তাই না? 

শরিফার মৃত্যুর খবর শুনে আপনি খানিকক্ষণ ঝিম মেরে ছিলেন। তারপর সিগারেট ধরালেন। ধূমপায়ী মানুষরা সামান্যতম সমস্যার মুখােমুখি হলেই ফস করে সিগারেট ধরায়। ভাবটা এমন যে নিকোটিনের ধোয়া সব সমস্যা উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সিগারেট ধরিয়ে মনে মনে বলেছেন—খুনটা কে করেছে ? কারণ আপনার কাছে অতিপ্রাকৃত ব্যাপার বলে কিছু নেই। একটা মেয়ে খুন হয়েছে। ভুত প্রেত তাকে খুন করবে না। মানুষ খুন করবে। সেই মানুষটা কে? 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১০) হুমায়ূন আহমেদ

ডিটেকটিভ গল্পে কি থাকে? একটা খুন হয়— আশেপাশের সবাইকে সন্দেহ করা হয়। সবচে কম সন্দেহ যাকে করা হয় দেখা যায় সেই খুন করেছে। গল্প উপন্যাসের ডিটেকটিভদের মত আপনি যদি খুন রহস্যের সমাধান করতে চান তাহলে প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি হচ্ছি আমি। এখন আপনি ভাবছেন মেয়েটা যে 

খুন করল তার মােটিভ কি? একটু চিন্তা করলে আপনি মােটিভও পেয়ে যাবেন। আমি আপনাকে সাহায্য করি? 

ক) মেয়েটি মানসিক ভাবে অসুস্থ। স্কিজোফ্রেনিক এবং সাইকোপ্যাথ। একজন অসুস্থ মানুষ যে কোনও অপরাধ করতে পারে। অসুস্থতাই তার মােটিভ। খ) শরিফা মেয়েটি তার স্বামীর কাছে বুধবারে চলে যাবে। সে ছিল ফারজানার সঙ্গিনী। ফারজানা চাচ্ছিল মেয়েটিকে রেখে দিতে। খুন করা হয়েছে সে কারণে। অসুস্থ মেয়েটি ভাবছে শরিফা খুন হয়েছে ঠিকই কিন্তু চলে যায় নি এই তাে সে বাস করছে খাটের নীচে। কুকুরের মত হাঁটু গেড়ে বসে আছে। 

মিসির আলি সাহেব আপনি কি তাই ভাবছেন? না আপনি তা ভাবছেন না। মানুষের মনের ভেতরে যে আরেকটি মন বাস করে আপনি সেই মন নিয়ে কাজ করেন। যুক্তির ক্ষমতা আপনি যেমন জানেন যুক্তির অসারতাও আপনি জানেন। দুই যােগ তিন পাঁচ হয় এটা আপনি যেমন জানেন ঠিক তেমনি জানেন মাঝে মাঝে সংখ্যাকে যুক্ত করা যায় না। যােগ চিহ্ন কোনও কাজে আসে না। এই তথ্য জানেন বলেই আমি আমার জীবনের বইটি আপনার সামনে খুলে দিয়েছি। আপনাকে পড়তে দিয়েছি 

আপনি হয়ত ভাবছেন—এতে লাভ কি? মেয়েটির সঙ্গে তাে আমার কখনও দেখা হবে না। সে তার ঠিকানা দেয় নি। ঠিকানা দেই নি এটা ঠিক না। ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা এমন ভাবে দিয়েছি যেন ইচ্ছা করলেই আপনি বের করতে পারেন আমাদের বাড়িটা কোথায়। ধানমন্ডি থানার ওসিকে আন্টি টেলিফোন করতে চাচ্ছে তা থেকে আপনি কি অনুমান করতে পারছেন না আমাদের বাড়ি ধানমন্ডিতে। টু ইউনিট বাড়ি এটিও বলেছি। আরও অনেক কিছু বলেছি। থাক এখন টেলিফোন নাম্বার দিয়ে | দিচ্ছি। যদি মনে করেন আমার সঙ্গে কথা বলা দরকার টেলিফোন করবেন। নাম্বারটা

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১০) হুমায়ূন আহমেদ

 হচ্ছে ষষ্ঠ মৌলিক সংখ্যা, পঞ্চম মৌলিক সংখ্যা, চতুর্থ মৌলিক সংখ্যা, তৃতীয় | মৌলিক সংখ্যা। সংখ্যাগুলির আগে আট বসাবেন। 

সরাসরি টেলিফোন নাম্বার লিখে দিলে হত। সেটা আপনার মনে থাকত না। এই ভাবে বলায় আর কখনও ভুলবেন না।। 

৮, (ষষ্ঠ মৌলিক সংখ্যা = ১১), (পঞ্চম মৌলিক সংখ্যা = ৭), (চতুর্থ মৌলিক সংখ্যা = ৫), (তৃতীয় মৌলিক সংখ্যা = ৩) 

অর্থাৎ আমার টেলিফোন নাম্বার হচ্ছে— 

৮১১৭৫৩৫৬ 

আমাদের টেলিফোন নাম্বারটা রহস্যময় না? আমাদের বাসায় তিনটা টেলিফোন আছে। সবচে রহস্যময় নাম্বারটা আপনাকে দিলাম। এই টেলিফোন বাবা আমাকে দিয়েছেন। নাম্বারটা আমি কাউকে দেইনি। কাজেই আমার টেলিফোনে কেউ আমাকে পায় না। অথচ আমি অন্যদের পাই। ব্যাপারটা মজার না? তােমরা আমাকে খুঁজে পাবে না—কিন্তু আমি ইচ্ছা করলেই তোমাদের পেয়ে যাব। 

মাঝে মাঝে আমার যখন ইনসমনিয়ার মত হয়—আমি এলােমেলাে ভাবে টেলিফোনের ডায়াল ঘুরাতে থাকি। অচেনা কোনও একটা জায়গায় রিং বেজে ওঠে। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা গলায় কেউ একজন ভারী গলায় বলে—কে ? 

আমি করুণ গলায় বলি, আমার নাম ফারজানা।। কাকে চাই? 

কাউকে চাই না। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব, প্লীজ টেলিফোন রেখে দেবেন না। প্লীজ! প্লীজ ! এই সময় পুরুষ মানুষরা যে কি অদ্ভুত আচরণ করে আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। শতকরা সত্তর ভাগ পুরুষ প্রেম করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পরে। অতি মিষ্টি গলায় উত্তর দিতে থাকে। শতকরা দশ ভাগ কুৎসিত সব কথা বলে। অতি নােংরা, অতি কুৎসিত সব বাক্য। গলার স্বর থেকে মনে হয় মধ্য বয়স্ক পুরুষরা এই নােংরামীগুলি বেশি করেন। এই পুরুষরাই হয়ত স্নেহময় পিতা, প্রেমময় স্বামী ! অফিসে আদর্শ অফিসার। কি অদ্ভুত বৈচিত্রের ভেতরই না 

আমাদের জীবনটা কাটে। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১০) হুমায়ূন আহমেদ

আমরা সবাই ডঃ জেকেল এবং মিষ্টার হাইড। আপনিও কিন্তু তাই– একদিকে অসম্ভব যুক্তিবাদী মানুষ অন্যদিকে যুক্তিহীন জগতেও চরম আস্থা আছে। এমন একজন। তাই না? খুব ভুল কি বলেছি? 

একটি তরুণী মেয়ে বাড়ির ছাদ থেকে পা ফসকে পড়ে গিয়ে মরে গেছে। ঘটনা খুব বিশ্বাসযােগ্য নয়। বয়স্কা মহিলা পা ফসকে পড়ে গেছেন বিশ্বাসযােগ্য, অল্প বয়েসী মেয়ে পড়ে গেছে এটিও বিশ্বাসযােগ্য। তরুণী মেয়ের অপঘাতে মৃত্যু মানেই নানান প্রশ্ন। বিশেষ করে সেই মেয়ে যদি কাজের মেয়ে হয়। 

Leave a comment

Your email address will not be published.