তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১৪) হুমায়ূন আহমেদ

পারছি। কাজেই মেয়েটিকে দেখতে যাওয়া অর্থহীন। তুমি যাচ্ছ না? না। 

আমি ফিরে আসছি বাবা পেছন থেকে ডাকলেন- নিশি দাঁড়াও আসছি। আমি দাঁড়ালাম। বাবার মদ্যপান আজ মনে হয় একটু বেশিই হয়েছে। তিনি সহজ ভাবে হাঁটতেও পারছেন না। সামান্য টলছেন। আমি বললাম, বাবা তােমার হাত 

তন্দ্রাবিলাসধরব ? তিনি বললেন, না। আই অ্যাম জাস্ট ফাইন। 

বাবা আমার ঘরে ঢুকলেন। ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে—মােটামুটি আলাে আছে। বাবা নিচু হয়ে খাটের নীচে তাকালেন। আমি তাকিয়ে রইলাম বাবার দিকে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম— বাবার শান্ত ভঙ্গি বদলে যাচ্ছে তাঁর চোখে ভয়ের ছায়া। সেই ছায়া গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। তিনি হতভম্ব চোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন খাটের নীচে। তাঁর চোখে পলক পড়ছে 

আমি বললাম, বাবা কিছু দেখতে পাচ্ছ? 

তিনি হঁা না কিছুই বললেন না। অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ করতে লাগলেন। যেন তার বুকে বাতাস আটকে গেছে তিনি তা বের করতে পারছেন না। খুব যারা বুড়াে মানুষ তারা এ ধরনের শব্দ করে। তবে নিজেরা সেই শব্দ শুনতে পায় না। 

অন্যরা শুনতে পায়। 

আমি বাবাকে হাত ধরে টেনে তুললাম। তাঁকে ধরে ধরে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলাম। তিনি প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বললেন— প্রচুর মদ্যপান করেছি। আমার আবার লিমিট পাচ পেগ সেখানে আট পেগ খেয়েছি তােতাই হেলুসিনেশন হচ্ছে। খাটের নীচে কিছুই ছিল না। কিছুই না। অন্ধকার তাে, আলাে ছায়াতে মানুষের মত দেখাচ্ছে। টর্চ লাইট নিয়ে গেলে কিছুই দেখব না।

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১৪) হুমায়ূন আহমেদ 

টর্চ লাইট নিয়ে দেখতে চাও বাবা? তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন না। 

পরের সপ্তাহে আমি বাবার সঙ্গে মেরীল্যান্ড চলে গেলাম। মিসেস জেন ওয়ারেন নামের এক মহিলা সাইকিয়াট্রিস্ট আমার চিকিৎসা শুরু করলেন। মিসেস জেন ওয়ারেন এম ডি-র বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। আমেরিকান বৃদ্ধা মহিলারা খুব সাজ গােজ করেন। ঠোটে কড়া করে লিপস্টিক দেন, চুল পার্ম করেন, কানে রঙচঙা প্লাস্টিকের দুল পরেন। হাটুর উপরে খুব রঙিন ঝলমলে স্কার্ট পরেন। তাঁদের দেখেই মনে হয় তাঁরা খুব সুখে আছেন। 

মিসেস জেন ওয়ারেনও তার ব্যতিক্রম নন! এত নাম করা মানুষ কিন্তু কেমন খুকি সেজে ছটফট করছেন। আহ্লাদী ভঙ্গিতে কথা বলছেন। 

সাইকিয়াট্রিস্টদের অনেক ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি। তাঁরা প্রথম যে কাজটি করেন তা হচ্ছে রােগীর সঙ্গে অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে কথা বলেন। যেন রােগী তার অনেক দিনের চেনা প্রায় বন্ধু স্থানীয়। মিসেস জেন ওয়ারেন এই কাজটা ভালই করেন। আমাকে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে যে কথাটা বললেন তা হল – “ও ডিয়ার, তােমাকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন ?” ভাবটা এ রকম যেন তিনি আমাকে 

আগেও দেখেছেন তখন এত সুন্দর লাগে নি। বিদেশীরা গায়ে হাত দিয়ে কথা বলে না— ইনি প্রথমবারেই গায়ে হাত রাখলেন। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১৪) হুমায়ূন আহমেদ 

তােমার নাম হল নিশি। আমার উচ্চারণ ঠিক হয়েছে? হয়েছে। নিশি অর্থ হল Night. 

হ্যা। মুন লিট নাইট ? জানি না। 

অফকোর্স মুন লিট নাইট। তােমাকে দেখেই মনে হচ্ছে তােমার জীবন আলােময়। 

থ্যাংক য়ু। তােমার বয় ফ্রেন্ডের নাম কি? আমার কোনও বয় ফ্রেন্ড নেই। 

এমন রূপবতী কন্যার বয় ফ্রেন্ড থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। তুমি বলতে চাচ্ছ না? এইসব চলবে না তােমার বয় ফ্রেন্ডের নাম বল, তার ছবি দেখাও | 

ভদ্র মহিলা আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছেন, আমিও কিন্তু তাঁকে বুঝতে চেষ্টা করছি। আমি যে তাকে বুঝতে চেষ্টা করছি সেটা মনে হয় তিনি ধরতে পারছেন না। বেশির ভাগ মানুষ নিজেদেরকে অন্যের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান মনে করে। মিসেস জেনও তাই করছেন। আমাকে কিশােরী একটা মেয়ে ভেবে কথা বলছেন, মন জয় করার চেষ্টা করছেন। আমি এমন ভাব করছি যেন ভদ্রমহিলার কথা বার্তায় অভিভূত। আমি তার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ঠিক যে জবাবগুলি তিনি শুনতে চাচ্ছেন – সেই জবাবগুলিই দিচ্ছি। কোনও মানুষ যখন প্রশ্ন করে তখন সে যে জবাব শুনতে চায় সেই জবাবটা কিন্তু প্রশ্নের মধ্যেই থাকে। 

জেন ওয়ারেন বললেন, আচ্ছা নিশি বাবাকে কি তুমি খুব ভালবাস? 

প্রশ্ন করার মধ্যেই কিন্তু যে জবাবটা তিনি শুনতে চাচ্ছেন সেটা আছে। তিনি শুনতে চাচ্ছেন যে বাবাকে আমি মােটেই ভালবাসি না। এই জবাব শুনলে হয়ত তার রােগ ডায়গনােসিসে সুবিধা হয়। কাজেই তার এই প্রশ্নের জবাবে আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম এবং খুব অনিচ্ছার ভঙ্গিতে হ্যা সূচক মাথা নাড়লাম। 

ভদ্রমহিলা দারুণ খুশি হয়ে গেলেন। 

শােন নিশি— ইয়াং লেডি। যদিও তুমি এফারমেটিভ ভঙ্গিতে মাথা নেড়েছ তারপরেও মনে হয় তুমি সত্যি কথা বলছ না। আমরা বন্ধু, একজন বন্ধু অন্য 

বন্ধুকে অবশ্যই সত্যি কথা বলবে তাই না ! এখন বল— তুমি কি তােমার বাবাকে খুব ভালবাস? 

আমি হ্যা না কিছুই বললাম না। 

ভদ্রমহিলা আমায় আরও কাছে ঘেঁষে এসে বললেন, তুমি কি বাবাকে পছন্দ কর না? 

আমি আবারও চুপ করে রইলাম। ভদ্রমহিলা এবার প্রায় ফিস ফিস করে বললেন- তুমি কি তােমার বাবাকে ঘৃণা কর? আচ্ছা ঠিক আছে মুখে বলতে না চাইলে এখানে দু’টা কাগজ আছে একটাতে লেখা Yes এবং একটাতে No, যে কোনও একটা কাগজ তুলে নাও। প্রশ্নটা মন দিয়ে শােন – 

তুমি কি তােমার বাবাকে ঘৃণা কর ? 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১৪) হুমায়ূন আহমেদ 

আমি Yes লেখা কাগজটা তুললাম। এবং এমন ভাব করলাম যে লজ্জায় দুঃখে আমায় মরে যেতে ইচ্ছা করছে। আমার চোখে পানি চলে এল। আমি এমন ভাব করছি যেন চোখের জল সামলাতে আমার কষ্ট হচ্ছে। এক সময় হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললাম। বিদেশীরা চোখের পানি কম দেখে বলে চোখের পানিকে তারা খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। বাঙালী মেয়েরা যে অতি সহজে চোখের পানি নিয়ে আসতে পারে এই তথ্য তারা জানে না। তা ছাড়া আমি যে কত বড় অভিনেত্রী তাও তিনি জানেন না।

তিনি ছুটে গিয়ে টিস্যু পেপার নিয়ে এলেন। নিজেই চোখ মুছিয়ে দিলেন। করুণা বিগলিত গলায় বললেন, শােন মেয়ে তােমার লজ্জিত বা দুঃখিত হবার কিছু নেই। আমেরিকান স্ট্যাটিসটিকস বলছে শতকরা ২৮ ৬০ ভাগ আমেরিকান পুত্র কন্যারা তাদের বাবাকে ঘৃণা করে। তুমি আমাকে যা বলেছ তােমার বাবা তা কোনও দিন জানবেন না। এই বিষয়ে তােমাকে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এখন একটু শান্ত হও। কফি খাবে ? 

আমি ফেঁপাতে ফেঁপাতে বললাম, খাব। 

আমরা কফি খেলাম। ভদ্রমহিলা আনন্দিত গলায় বললেন— আমার ধারণা তােমার সমস্যা আমি ধরতে পারছি। সেই সমস্যার সমাধান করা এখন আর কঠিন হবে না। অবশ্যি তুমি যদি আমাকে সাহায্য কর। তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে ? 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১৪) হুমায়ূন আহমেদ 

ভেরী গুড। আমরা দুজনে মিলে তােমার সমস্যা সমাধান করব। কেমন? আচ্ছা।। তােমার বাবাকে তুমি কেন ঘৃণা কর ? বাবা মদ খায়। 

শুধু মদ্যপান করে বলেই ঘৃণা কর ? 

মাতাল হয়ে তিনি একদিন গাড়ি চালাচ্ছিলেন তখন অ্যাকসিডেন্ট হয়। সেই অ্যাকসিডেন্টে আমার মা মারা যান। 

তােমার বাবা আমাকে তােমার মা’র মৃত্যুর কথা বলেছেন। কিন্তু কি ভাবে মারা গেছেন তা বলেন নি। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। 

জেন ওয়ারেন সিগারেট ধরালেন। তিনি বেশ কায়দা করে সিগারেট টানছেন। নিশি, সিগারেটের ধোয়ায় তােমার অসুবিধা হচ্ছে না তাে? জ্বি না।। 

আমি সিগরেট ছাড়ার চেষ্টা করছি পারছি না। যে কোনও ভাল অভ্যাস সামান্য চেষ্টাতেই ছেড়ে দেয়া যায় – খারাপ অভ্যাস হাজার চেষ্টাতেও ছাড়া যায় । ঠিক না ? 

ঠিক। 

এখন বল তুমি না কি তােমার মাকে দেখতে পাও এটা কি সত্যি? 

সত্যি না। তাহলে বল এই মিথ্যা কথাটা কেন বলতে ? বাবাকে ভয় দেখাবার জন্যে বলতাম। 

বাবাকে ভয় দেখানাের জন্যে তুমি তাহলে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথাই বলেছ ? 

জ্বি। যা বলেছ তােমার বাবা তাই বিশ্বাস করেছেন ? 

আচ্ছা আজকের মত তােমার সঙ্গে আমার কথা শেষ। কাল আবারও আমরাবসব। কেমন! 

জি আচ্ছা। মেরীল্যান্ডে দেখার মত সুন্দর সুন্দর জিনিস অনেক আছে। তুমি কি দেখেছ? জ্বি না। কাল আমি তােমাকে লিস্ট করে দেব। দেশে যাবার আগে তুমি দেখে যাবে। আচ্ছা।। তুমি কি জান যে তুমি খুব ভাল মেয়ে ? জানি। ভদ্রমহিলা আমার সঙ্গে আরও তিন দিন সিটিং দিলেন। আমি তাকে 

বন্ধুকে অবশ্যই সত্যি কথা বলবে তাই না! এখন বল— তুমি কি তােমার বাবাকে খুব ভালবাস? 

আমি হা না কিছুই বললাম না। 

ভদ্রমহিলা আমায় আরও কাছে ঘেঁষে এসে বললেন, তুমি কি বাবাকে পছন্দ কর না ? 

আমি আবারও চুপ করে রইলাম। ভদ্রমহিলা এবার প্রায় ফিস ফিস করে বললেন— তুমি কি তােমার বাবাকে ঘৃণা কর ? আচ্ছা ঠিক আছে মুখে বলতে না চাইলে এখানে দুটা কাগজ আছে একটাতে লেখা Yes এবং একটাতে No, যে কোনও একটা কাগজ তুলে নাও প্রশ্নটা মন দিয়ে শােন – 

তুমি কি তােমার বাবাকে ঘৃণা কর ? 

Leave a comment

Your email address will not be published.