তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(১) হুমায়ূন আহমেদ

হাসন রাজায় কয় আমি কিছু নয়রে, আমি কিছু নয়। 

হাসন রাজা 

“May I know your name? I don’t have a name. May I know who you are? I don’t know who I am.” 

Book of Maya 

সেলিম চৌধুরী এবং তুহিন মাঝে মাঝে চিন্তা করি আমার এক জীবনের সঞ্চয় কি? কিছু প্রিয় মুখ, কিছু সুখ স্মৃতি প্রিয়মুখদের ভেতর তােমরা আছ। এই ব্যাপারটা তােমাদের কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ আমি জানি না, আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণতন্দ্রাবিলাসভাের বেলায় মানুষের মেজাজ মােটামুটি ভাল থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হতে থাকে, বিকাল বেলায় মেজাজ সবচে বেশি খারাপ হয়, সন্ধ্যার পর আবার ভাল হতে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম। 

এখন সকাল এগারােটা, মেজাজের সাধারণ সূত্র মতে মিসির আলির মেজাজ ভাল থাকার কথা। কিন্তু মিসির আলির মন এই মুহূর্তে যথেষ্টই খারাপ। তিনি বসার ঘরে বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে আছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে। তাঁর মেজাজ খারাপের দুটি কারণের প্রথমটা হল একটা মাছি। অনেকক্ষণ থেকেই মাছিটা তার গায়ে বসার চেষ্টা করছে। সাধারণ মাছি না—নীল রঙের স্বাস্থ্যবান ডুমাে মাছি। আম -কাঁঠালের সময় এই মাছিগুলিকে দেখা যায়। এখন শীতকাল— এই মাছি এল কোত্থেকে? মাছিটা তার গায়েই বার বার বসতে চাচ্ছে কেন? তাঁর সামনে বসে থাকা মেয়েটির গায়ে কেন বসছে না? 

মিসির আলির মেজাজ খারাপের দ্বিতীয় কারণ এই মেয়েটি। তাঁর ইচ্ছা করছে মেয়েটিকে একটা ধমক দেন। যদিও ধমক দেবার মত কোনও কারণ ঘটেনি। মেয়েটি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। দেখা করতে আসার অপরাধে কাউকে ধমক দেয়া যায় না। ধমক দেয়ার বদলে মিসির আলি শব্দ করে কাশলেন। প্রচন্ড শব্দে কাশলে, কিংবা কুৎসিত শব্দে নাক ঝাড়লে মনের রাগ অনেকখানি কমে। মিসির আলির কমল না বরং আরও যেন বাড়ল। মাছিটাও মনে হচ্ছে এই শব্দে উৎসাহ পেয়েছে। এতক্ষণ গায়ে বসতে চাচ্ছিল এখন উড়ে ঠোটে বসতে চাচ্ছে। কি যন্ত্রণা ! 

স্যার, আমার নাম সায়রা বানু। সায়রা বানু নামটা কি আপনার মনে থাকবে? মিসির আলি বললেন, মনে থাকার প্রয়ােজন কি আছে ? 

অবশ্যই আছে। আমি এত আগ্রহ করে আমার নামটা আপনাকে কেন বলছি, যাতে মনে থাকে সেই জন্যেই তাে বলছি। 

মিসির আলি রােবটের গলায় বললেন, মানুষের নাম আমার মনে থাকে না। 

মেয়েটি তাঁর রােবট গলা অগ্রাহ্য করে হাসি মুখে বলল, আমারটা মনে থাকবে। কারণ একজন বিখ্যাত সিনেমা অভিনেত্রীর নাম সায়রা বানু। 

 মিসির আলি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। অর্থহীন কথা শুনতে ভাল লাগছে না। তা ছাড়া শীতও লাগছে। চেয়ারটা টেনে রােদে নিয়ে গেলে হয়। তাতে কিছুক্ষণ আরাম লাগবে তারপর আবার রােদে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। শীতকালের এই এক যন্ত্রণা। ছায়া বা রােদ কোনটাই ভাল লাগে না। মিসির আলি মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাছিটার কারণে নিজেকে এখন কাঁঠাল কাঁঠাল মনে হচ্ছে। 

মেয়েটি খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনি দিলীপ কুমার, সায়রা বানু এদের নাম শােনেন নি? 

দিলীপ কুমারের নাম শুনেছি। 

সায়রা বানু হচ্ছে দিলীপ কুমারের বউ! আমার বন্ধুরা অবশ্যি আমাকে সায়রা বানু ডাকে না, তারা ডাকে এস বি। সায়রার এস, বানুর বি—এস বি। এস বি তে আর কি হয় বলুন তাে? 

বলতে পারছি না। 

এস বি হচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। আমার বন্ধুদের ধারণা আমার চেহারায় একটা স্পাই স্পাই ভাব আছে। এই জন্যেই তারা আমাকে এস বি ডাকে। আচ্ছা আপনারও কি ধারণা আমার চেহারায় স্পাই স্পাই ভাব? ভাল করে একটু আমার দিকে তাকান না। আপনি সারাক্ষণ এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন কেন? 

মিসির আলি এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন না। মাছিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মাছিটা এদিক ওদিক করছে বলেই এদিক ওদিক তাকাতে হচ্ছে। আচ্ছা পৃথিবীতে মােট কত প্রজাতির মাছি আছে ? 

এই যে শুনুন। তাকান আমার দিকে। 

মিসির আলি মেয়েটির দিকে তাকালেন। অতিরিক্ত ফর্সা একটি মেয়ে। বাঙ্গালী মেয়েদের গায়ের রঙের একটা মাত্রা আছে। কোনও মেয়ে যদি সেই মাত্রা অতিক্রম করে যায় তখন আর ভাল লাগে না। তার মধ্যে বিদেশী বিদেশী ভাব চলে আসে। তাকে তখন আর আপন মনে হয় না। সায়রা বানুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাকে পর পর লাগছে। মেয়েটির মাথা ভর্তি চুল। সেই চুলেও লালচে ভাব আছে। অতিরিক্ত ফর্সা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই হয়। তাদের গায়ের রঙের খানিকটা এসে চুলে লেগে যায়। চুল লালচে দেখায় খানিকটা এসে লাগে চোখে।

চোখ তখন আর কালাে মনে হয় না। মেয়েটির মুখ লম্বাটে। একটু বোচা ধরনের নাক। বোচা নাক থাকায় রক্ষার্বোচা নাকের কারণেই মেয়েটিকে বাঙ্গালী মনে হচ্ছে। খাড়া নাক হলে মেডিটেরিনিয়ান সমুদ্রের পাশের গ্রীক কন্যা বলে মনে হত। বয়স কত হবে? উনিশ থেকে পঁচিশের ভেতর। মানুষের বয়স চট করে ধরতে পারার কোনও পদ্ধতি থাকলে ভাল হত। গাছের রিং গুনে বয়স বলা যায়। মানুষের তেমন কিছু নেই। মানুষের বয়স তার মনে বলেই বােধ হয়। আচ্ছা, একটা মাছি কতদিন বাঁচে? 

স্যার কথা বলছেন না কেন? আমাকে কি স্পাই মেয়ে বলে মনে হচ্ছে ? 

স্পাই মেয়েদের চেহারা আলাদা হয় বলে আমি জানি না। 

একটু আলাদা হয়। স্পাই মেয়েদের মুখ দেখে এদের মনের ভাব বােঝা যায় এদের মুখে এক রকম ভাব মনের ভেতর আরেক রকম। 

তােমারও কি তাই? 

জ্বি। ও আপনাকে বলতে ভুলে গেছি এস বি ছাড়াও আমার আরেকটা নাম আছে। নাম ঠিক না খেতাব। নববর্ষে পাওয়া খেতাব। আমাদের কলেজে পহেলা বৈশাখে খেতাব দেয়া হয়। আমার খেতাবটা হচ্ছে সাদা বাঘিনী। এস বি তে সাদা বাঘিনীও হয়। সাদা বাঘিনী টাইটেল কেন পেয়েছিলাম শুনতে চান? খুবই মজার গল্প। | মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন।

তাঁর কিছুই শুনতে ইচ্ছা করছে না। মাথার যন্ত্রণা এবং শীত ভাব দুইই বাড়ছে। গায়ে পাতলা একটা চাদর দিয়ে শীত ভাবটা কমান যেত | চাদরটা ধুবিখানায় দিয়েছেন। পােয়া নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, স্লিপের অভাবে আনতে পারছেন না। স্লিপটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। কড়া এক কাপ চা খেলেও শীতটা কমত। ঘরে চায়ের পাতা আছে, চিনি, দুধও আছে। গত কালই কিনে এনেছেন। কিন্তু গ্যাসের চুলায় কি একটা সমস্যা হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগুন জ্বলেই হুস করে নিভে যায়। মিস্ত্রী ডাকিয়ে চুলা ঠিক করা দরকার। গ্যাস মিস্ত্রীরা কোথায় থাকে কে জানে? 

সায়রা বানু মেয়েটি হড়বড় করে কথা বলে যাচ্ছে, তার কথা তিনি মন দিয়ে শুনছেন না। মাথায় দুঃশ্চিন্তা নিয়ে অন্য কিছুতে মন বসান বেশ কঠিন। তবে মাছিটা এখন শান্ত হয়েছে। টেবিলের উপর চুপ করে বসে আছে। ডিম পাড়ছে না তাে? 

আমার সাদা বাঘিনী টাইটেল পাওয়ার ঘটনাটা খুব ইন্টারেস্টিং। শুনলে আপনি খুব মজা পাবেন। বলব? 

মিসির আলি কিছুই বললেন না। তিনি খুব ভাল করেই জানেন মেয়েটি তার গল্প বলবেই। তিনি বলতে বললেও বলবে, বলতে না বললেও বলবে। 

হয়েছে কি শুনুন— সায়েন্স ল্যাবরেটরীর সামনে দিয়ে আমি যাচ্ছি। আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধু, রাকা। রাকা হচ্ছে বােরকাওয়ালী। বােরকা পরে। সউদি বােরকা। বেশ কয়েক টাইপ বােরকা পাওয়া যায় তা কি আপনি জানেন? সউদি বােরকা, পাকিস্তানী বােরকা। সউদি বােরকা ভয়াবহ, শুধু চোখ দুটো বের হয়ে থাকে। এমনিতে সে অবশ্যি খুব স্টাইলিস্ট। বােরকার নীচে স্লিভলেস ব্লাউজ পরে। যাই হােক বােরকাওয়ালী রাকা হঠাৎ বলল, সে একটা পেনসিল কিনবে। আমি তাকে নিয়ে একটা দোকানে ঢুকলাম পেনসিল কিনতে। স্টেশনারীর দোকান তবে তার সঙ্গে কনফেকশনারীও আছে। চা বিক্রি হচ্ছে। কেক বিক্রি হচ্ছে। দোকানটায় বেশ ভিড়। ভিড়ের সুযােগ নিয়ে এক লােক করল কি বােরকাওয়ালীর গায়ে হাত দিল। গায়ে মানে কোথায় তা আপনাকে বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগবে। বােরকাওয়ালী এমন ভয় পেল যে প্রায় অচেতন হয়ে পরে যাচ্ছিল। আমি বােরকাওয়ালীকে ধরে ফেললাম তারপর বদমাশ লােকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি ওর গায়ে হাত দিলেন কেন? ষন্ডা গন্ডা টাইপের লােক। লাল চোখ।

গরিলাদের মত লােম ভর্তি হাত। সে এমন ভাব করল যে আমার কথাই শুনতে পায়নি। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে বলল—দেখি একটা লেবু চা। তখন আমি খপ করে তার হাত ধরে ফেললাম। সে ঝটকা দিয়ে তার হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল কিন্তু তার আগেই আমি তার হাত কামড়ে ধরলাম। যাকে বলে কচ্ছপের কামড়। কচ্ছপের কামড় কি তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। কচ্ছপ একবার কামড়ে ধরলে আর ছাড়ে 

 আমিও ছাড়লাম না। আমার মুখ রক্তে ভরে গেল। লােকটা বিকট চিৎকার শুরু করল। ব্যাপার স্যাপার দেখে বােরকাওয়ালী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এর পর থেকে আমার টাইটেল হয়েছে সাদা বাঘিনী। গল্প শেষ করে সায়রা বানু খিলখিল করে হাসছে। মিসির আলি মেয়েটির হাসির মাঝখানেই বললেন, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ ? 

 গল্প করার জন্যে এসেছি। বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে গল্প করতে আমার খুব ভাল লাগে। 

আমি বিখ্যাত মানুষ ? 

অবশ্যই বিখ্যাত। আপনাকে নিয়ে কত বই লেখা হয়েছে। আমি অবশ্যি একটা মাত্র বই পড়েছি। ঐ যে সুধাকান্ত বাবুর গল্প। একটা মেয়ে খুন হল আর আপনি কেমন শার্লক হােমসের মত বের করে ফেললেন সুধাকান্ত বাবুই খুনটা করেছেন। বই পড়ে মনে হচ্ছিল আপনার খুব বুদ্ধি কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না। 

আমাকে দেখে কেমন মনে হচ্ছে? 

খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। আপনার মধ্যে একটা গৃহ শিক্ষক গৃহ শিক্ষক ব্যাপার আছে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিয়মিত বেতন পান না এমন একজন অংকের স্যার। আপনি রােজ ভাবেন আজ বেতনের কথাটা বলবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলতে পারেন না। আচ্ছা আপনি এমন গম্ভীর মুখে বসে আছেন কেন ? মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনে মজা তাে পাচ্ছেনই না উল্টো বিরক্ত হচ্ছেন। সত্যি করে বলুন আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন? 

কিছুটা হচ্ছি। 

মাছিটা তাে এখন আর বিরক্ত করছে না। কেমন শান্ত হয়ে টেবিলে বসে আছে। তারপরেও আপনি এত বিরক্ত কেন বলুন তাে? 

তুমি অকারণে কথা বলছ এই জন্যে বিরক্ত হচ্ছি। অকারণ কথা আমি নিজেও বলতে পারি না অন্যের অকারণ কথা শুনতেও ভাল লাগে না। 

আপনার সঙ্গে কথা বলতে হলে সবসময় একটা কারণ লাগবে ? তাহলে তাে আপনি খুবই বােরিং একটা মানুষ। এত কারণ আমি পাব কোথায় যে আমি রােজ রােজ আপনার সঙ্গে কথা বলব ? 

মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বল। 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *