তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৪) হুমায়ূন আহমেদ

চিত্রা দু ঘন্টার ভেতর ফিরে আসবে এ ব্যাপারে মিসির আলি নিশ্চিত ছিলেন। নিশ্চিত ব্যাপারগুলি মানুষের জীবনে প্রায় কখনও ঘটে না। চিত্রা দু ঘন্টা কেন দদিনের মাথাতেও ফিরে এল না। তার হ্যান্ডব্যাগ এবং স্যুটকেসে ধুলা জমতে লাগল।

তন্দ্রাবিলাসসে একটা টেলিফোন নাম্বার দিয়ে গিয়েছিল। টেলিফোন নাম্বার লেখা চিরকুট তিনি ড্রয়ারে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। অযত্নে অবহেলায় রাখা কাগজপত্র সবসময় পাওয়া যায়। যত্নে রাখা কাগজ কখনও পাওয়া যায় না। মারফির এই সূত্র ভুল প্রমানিত হল। মিসির আলি ড্রয়ার খুলেই চিরকুটটি পেলেন এবং সেই চিরকুট দেখে তিনি ছােটখাট একটা চমক খেলেন। চিরকুটে টেলিফোন নাম্বার লেখা নেই। শুধু সুন্দর অক্ষরে লেখা Help me! 

মিসির আলির একটু মন খারাপ হল। মেয়েটির সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনলেই হত। তিনি এতটা অধৈর্য হলেন কেন? বাড়ি ঘর ছেড়ে নিতান্ত অকারণে এই বয়সের একটা মেয়ে চলে আসে না। এই বয়সের মেয়েদের মাথায় নানান উদ্ভট ব্যাপার খেলা করে তারপরেও বাড়ি ঘর ছাড়ার ব্যাপারে তারা খুব সাবধানী হয়। আশ্রয় মেয়েদের কাছে অনেক বড় ব্যাপার! প্রকৃতি মেয়েদের সেই ভাবেই তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এরা সন্তানের জন্ম দেবে। সেই জন্যে তাদের নিরাপদ আশ্রয় দরকার। কাজেই“হে মাতৃজাতি তােমরা আশ্রয় কখনাে ছাড়বে না” এই হল ডি এন এ’র অনুশাসন। ডি এন এ অনুশাসনের বাইরে যাবার ক্ষমতা তাদের নেই।

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৪) হুমায়ূন আহমেদ 

মেয়েটি তার সঙ্গে যােগাযােগের কোনও পথ রাখেনি। পথ রাখলে তিনি বলতেন— হ্যা আমি এখন তােমার কথা শুনব। সত্যি মিথ্যা সব কথাই শুনব । আগের বারে তােমার কথা শুনতে চাইনি । তােমার হাত থেকে রক্ষা পাবার ব্যাপারটাই আমার মাথায় প্রবল ভাবে ছিল। তার জন্যে আমি দুঃখিত। 

মেয়েটি তার হ্যান্ডব্যাগ বা স্যুটকেসে কোনও ঠিকানা কি রেখে গেছে ? 

স্যুটকেস খুললে কোনও গল্পের বই কি পাওয়া যাবে যেখানে তার নাম এবং বাড়ির ঠিকানা লেখা? বই পেলেও লাভ হবে না। এখনকার মেয়েরা বই-এ নিজের নাম লিখলেও বাড়ির ঠিকানা লেখে না। বাড়ির ঠিকানা লেখাটাকে গ্রাম্যতা বলে ধরা হয়। ডায়েরি পেলে সবচে ভাল হত। ডায়েরিতে নাম ঠিকানা থাকে। তবে ডায়েরি পাবার সম্ভাবনা অতি সামান্য। আজকালকার মেয়েদের ডায়েরি লেখার মত সময় নেই। নিজেদের কথা তারা শুধু গােপন করতে চায়। লিখতে চায় না। 

মিসির আলি মেয়েটির স্যুটকেস খুললেন। কয়েকটা শাড়ি, পলিথিনে মােড়া দু জোড়া স্যান্ডেল, হেয়ার ড্রায়ার, ট্রাভেলার্স আয়রন, কিছু কসমেটিকস, এক বােতল পানি, সুন্দর একটা চায়ের কাপ। একটা ফুলতােলা বেডশীট। 

বই এবং ডায়েরি পাওয়া গেল না। তবে বেডশীটের নীচে এক গাদা কাগজ পাওয়া গেল। দামী ওনিয়ন স্কিন পেপার। কাগজে চিকন নিবের কালির কলমে গুটি গুটি করে ঠাস বুনন লেখা । যত্ন করে কেউ অনেক দিন ধরে লিখেছে। মনে হচ্ছে দীর্ঘ কোনও চিঠি। কাকে লেখা ? মিসির আলি ভুরু কুঁচকে সম্বােধন পড়লেন 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৪) হুমায়ূন আহমেদ 

শ্রদ্ধাষ্পদেষু জনাব মিসির আলি সাহেব। 

চিঠিতে তারিখ নেই। যে লিখছে তার নামও নেই। এর হাতের লেখা এবং চিত্রার হাতের লেখা কি এক? ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট ছাড়া বলা যাবে না। চিত্রা ইংরেজিতে লিখেছে হেল্প মি, আর এই দীর্ঘ চিঠি লেখা বাংলায়। ইংরেজি এবং বাংলা হাতের লেখায় মিল-অমিল চট করে চোখে পড়ে না। তার পরেও মিসির আলির মনে হল দীর্ঘ এই চিঠির লেখিকা এবং চিত্রা এক মেয়ে নয়। 

মেয়েটি বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে তার ব্যাগ গােছায় নি। মেয়েরা ব্যাগ গুছানাের সময় অবশ্যই প্রথম নেবে আন্ডার গার্মেন্টস, পেটিকোট, ব্লাউজ, ব্রা, প্যান্টি। এইসব কাপড়ের ব্যাপারে তারা অতিরিক্ত সেনসেটিভ। ব্যাগে আগে এইসব গুছান হবে তারপর অন্য কিছু। কিন্তু মেয়েটির স্যুটকেস বা হ্যান্ডব্যাগে এইসব কিছু নেই। টাওয়েলও নেই। মেয়েটি ঘর ছাড়ার জন্যে ব্যাগ গােছায় নি। তার অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য কি তাকে দীর্ঘ চিঠিটা নাটকীয় ভঙ্গিতে দেয়া ? 

শ্রদ্ধাস্পদেষু 

জনাব আপনাকে কেমন ভড়কে দিলাম। সরাসরি চিঠিটা আপনার কাছে দিলে আপনি এত আগ্রহ নিয়ে পড়তেন না। কাজেই সামান্য নাটক করতে হল। আশা করি আমার এই ছেলেমানুষি নাটকে আপনি বিরক্ত হন নি। 

আমি আপনাকে চিনি না । আপনার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয় নি। আপনার সম্পর্কে যা জানি বই পড়ে জানি। বইয়ে লেখকরা সব কিছু ঠিকঠাক লিখতে পারেন না। মূল চরিত্রগুলিকে তারা মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেন। আমি ধরেই নিয়েছি আপনার বেলাতেও তাই হয়েছে। বইয়ের মিসির আলি এবং ব্যক্তি মিসির আলি এক নন। কে জানে আপনি হয়ত বইয়ের মিসির আলির চেয়েও ভাল মানুষ। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৪) হুমায়ূন আহমেদ 

আমি আপনার সম্পর্কে মনে মনে একটা ছবি দাড় করিয়েছি—আচ্ছা দেখুন তাে সেই ছবিটার সঙ্গে কতটুক মেলে। তারও আগে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে নেই। আমার ধারণা আপনি এখন ভরু কুঁচকে ভাবছেন, চিঠির মেয়ে এবং চিত্রা কি এক? ব্যাপারটা আমি ধীরে ধীরে পরিষ্কার করব। আপাতত আপনি এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। আপনাকে লেখা চিঠিটা মন দিয়ে পড়ুন। এই চিঠি আমি দু’ বছর ধরে রাত জেগে লিখেছি। অসংখ্য বার কাটাকুটি করেছি। বানান ঠিক করেছি। যেন চিঠি পড়ে আপনি কখনও বিরক্ত হয়ে না ভাবেন—মেয়েটা এই সহজ বানানও জানে না ! আশ্চর্য তাে! 

ভাল কথা আপনার সম্পর্কে আমার ধারণা কি এখন বলি, দেখুন তাে মেলে কি না। আমার ধারণা আপনি হাসি খুশি ধরনের মানুষ। বইয়ে আপনার যে গম্ভীর প্রকৃতির কথা লেখা হয় সেটা ঠিক না। আপনার চেহারার যে বর্ণনা বইয়ে থাকে সেটাও ঠিক না। আপনার বিশেষত্বহীন চেহারার কথা লেখা হলেও আমি জানি আপনার চেহারা মােটেও বিশেষত্বহীন নয়। আপনার চোখ ধারাল ও তীব্র। সার্চ 

লাইটের মত। তবে সেই ধারাল চোখেও একটা শান্তি শান্তি ভাব আছে। আমার খুব ইচ্ছা কোনও একদিন আপনাকে এসে দেখে যাব। শান্ত ভঙ্গিতে আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। এক সময় আপনাকে বলব, আমাকে একটা হাসির গল্প বলুন তাে। আমার কেন জানি মনে হয় কেউ আপনার কাছে গল্প শুনতে আসে না। সবাই আসে ভয়ংকর সব সমস্যা নিয়ে। দিনের পর দিন এই সব সমস্যা শুনতে কি আপনার ভাল লাগে ? মাঝে মাঝে আপনার কি ইচ্ছা করে না সহজ স্বাভাবিক গল্প শুনতে এবং বলতে ? যেমন আপনি একটা ভূতের গল্প শুনে ভয় পাবেন। ভুরু কুঁচকে ভাববেন না— ভূত বলে কিছু নেই। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৪) হুমায়ূন আহমেদ 

আমাদের চার পাশের জগৎটা সহজ স্বাভাবিক জগৎ, এই জগৎ—এ মাঝে মাঝে বিচিত্র এবং ভয়ংকর কান্ড ঘটে। আমার নিজের জীবনেই ঘটে গেল। এবং আমি আপনাকে সেই গল্পই শুনাতে বসেছি। না শুনালেও চলত। কারণ আমি আপনার কাছ থেকে কোনও সাহায্য চাচ্ছি না। বা আপনাকে বলছি না আপনি আমার সমস্যার সমাধান করে দিন। তারপরেও সব মানুষেরই বােধ হয় ইচ্ছা করে নিজের কথা কাউকে না কাউকে শুনাতে | আমার চারপাশে তেমন কেউ নেই। 

এখন আমি আপনার একটা অস্বস্তি দূর করি। চিত্রা নামের যে মেয়েটি আপনার কাছে এসেছিল আমি সেই মেয়ে। কাজেই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। চিত্রার সেদিন আপনাকে কেমন লেগেছিল তা আর আপনাকে কোনদিন জানান হবে না। কারণ চিত্রার সঙ্গে আপনার আর কোনদিন দেখা হবে না। আপনাকে খানিকটা ধাধায় ফেলে চিত্রা বিদেয় নিয়েছে। আমিও বিদায় নেব। আমার দীর্ঘ চিঠি শেষ করার পর আপনি ভাববেন—আচ্ছা মেয়েটার কি মাথা খারাপ ? সে এইসব কি লিখেছে ? কেনই বা লিখেছে? দীর্ঘ লেখা পড়তে আপনার যেন ক্লান্তি না লাগে সে জন্যে আমি খুব চেষ্টা করেছি। চেষ্টা কতটুকু সফল হল কে জানে। চ্যাপ্টার দিয়ে দিয়ে লিখলাম। চ্যাপ্টারের প্রথম কয়েক লাইন পড়ে আপনি ঠিক করবেন আপনি পড়বেন কি পড়বেন না। সব চ্যাপ্টার যে পড়তেই হবে তা না। 

পরিচয় নাম ও চিত্রা (নকল নাম)। 

বয়স  ২৩ বছর। (যখন লেখা শুরু করেছিলাম তখন বয়স ছিল ২০ বছর তিন মাস)। 

উচ্চতা  পঁাচ ফুট আট ইঞ্চি। আমার প্রিয় রঙ ও চাপা। আমার দেখতে ভাল লাগে চাদ এবং পানি। 

পড়াশােনা ও এস এস সি পাশ করার পর আর পড়াশােনা করতে পারি নি। তবে আমি খুব পড়ুয়া মেয়ে। শত শত বই পড়ে ফেলেছি। শুধু গল্পের বই না। সব ধরনের বই। বাড়িতে আমি যেন পড়তে পারি সে জন্যে আমার একজন শিক্ষক আছেন। দর্শনবিদ্যার শিক্ষক। তবে দর্শন আমার প্রিয় বিষয় নয়।।

Leave a comment

Your email address will not be published.