তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৯) হুমায়ূন আহমেদ

 তার মানে ? 

তন্দ্রাবিলাস- চার 

, কিছু না। 

আন্টি বিছানায় উঠে বসলেন। হাত বের করে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বললেন, কি বলতে চাও ভাল করে বল। অর্ধেক কথা বলবে, অর্ধেক পেটে রাখবে 

তন্দ্রাবিলাসতা হবে না।। 

আমি চুপ করে রইলাম। নীতু আন্টি কঠিন গলায় বললেন, উঠে বস। আমি উঠে বসলাম। 

এখন বল মৃত মানুষের আসার কথা আসছে কেন? তুমি কি কোনও মৃত মানুষকে আসতে দেখেছ? 

হ্যা। সে কি আজ এসেছিল ? 

হ্যা।। 

মৃত মানুষটা কি তােমার মা? না, আমার ছােট মা।। পুরাে ঘটনাটা আমাকে বল। কিছু বাদ দেবে না। বলতে ইচ্ছা করছে না। 

ইচ্ছে না করলেও বল। পুরাে ব্যাপারটা আমাকে তুমি তােমার ভালাের জন্যে বলবে। 

এটা বললে আমার ভাল হবে না।। 

তুমি বাচ্চা একটা মেয়ে—কিসে তােমার মঙ্গল, কিসে তােমার অমঙ্গল তা বােঝার ক্ষমতা তােমার হয়নি। বুল ব্যাপারটা কি? 

আরেক দিন বলব। আরেক দিন না। আজই বলবে। এখনই বলবে। 

আমি বলতে শুরু করলাম। কিছুই বাদ দিলাম না। নীতু আন্টি চুপ করে শুনে গেলেন। কথার মাঝখানে একবারও বললেন না— তুমি এসব কি বলছ! – 

গল্প বলা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝলাম আমি কি বলছি না বলছি। সবই ছােট মা শুনছেন। তিনি ঘরের ভেতর নেই— কিন্তু কাছেই আছেন। পর্দার ওপাশেই আছেন। পর্দার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যে নিঃশ্বাস ফেলছেন আমি তাও শুনতে পাচ্ছিলাম | গল্প শেষ করার পর পর নীতু আন্টি বললেন, ঘুমিয়ে পড়। বলেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি সারা রাত জেগে রইলাম। এক ফোটা ঘুম হল না। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৯) হুমায়ূন আহমেদ

শুরু হল আমার রাত জাগার কাল।। 

ছােটদের উদ্ভট অস্বাভাবিক কথা বড়রা সব সময় হেসে উড়িয়ে দেন। সেটাই 

স্বাভাবিক। ছােটদের উদ্ভট গল্প গুরুত্বের সঙ্গে কখনও গ্রহণ করা হয় না। গ্রহণ। করা হয়ত ঠিকও নয়। আন্টি আমার গল্প কি ভাবে গ্রহণ করলেন কিছুদিন আমি তা বুঝতেই পারলাম না। ছােট মা’র প্রসঙ্গ তিনি আমার সঙ্গে দ্বিতীয়বার তুললেন

যেন কিছু শােনেন নি। পুরােপুরি স্বাভাবিক আচার আচরণ। শুধু রাতে আমার সঙ্গে ঘুমুতে আসেন। তখন অনেক গল্প টল্প হয় — ছােট মা’র প্রসঙ্গ কখনও আসে না। 

আপনাকে তাে আগেই বলেছি আমার ইনসমনিয়ার মত হয়ে গিয়েছিল। শেষ রাতের দিকে ঘুম আসত । রাত একটার দিকে বাড়ি পুরােপুরি নিঃশব্দ হয়ে যেত তখন বিচিত্র সব শব্দ শুনতে পেতাম। যেমন খাটের চারপাশে কে যেন হাঁটত। সে কে তা 

আমার কাছে পরিষ্কার না। ছােট মা হতে পারেন — অন্য কেউও হতে পারে। প্রচন্ড ভয়ে আমি অস্থির হয়ে থাকতাম। যেহেতু রাতে ঘুম আসত না — দিনটা কাটত ঝিমুনিতে। ক্লাসে বসে আছি, স্যার অংক করাচ্ছেন। আমার তন্দ্রার মত চলে এল ।। আধাে ঘুম আধাে জাগরণে চলে গেলাম। স্যারের দিকে তাকিয়ে থেকেই স্বপ্ন পর্যন্ত দেখতে শুরু করতাম। এই স্বপ্নগুলি খুব অদ্ভুত। অদ্ভুত এই কারণে যে আমি তন্দ্রায় যে সব স্বপ্ন দেখতাম তার প্রতিটি সত্য হয়েছে। আমি তন্দ্রায় যা দেখতাম তাই ঘটত। তারচেয়ে মজার ব্যাপার, স্বপ্নগুলিকে আমি ইচ্ছামত বদলাতে পারতাম। তবে আমি যে স্বপ্ন বদলাতেও পারি এটা বুঝতে সময় লেগেছিল। আগে বুঝতে পারলে খুব ভাল হত। আমি বােধ হয় ব্যাপারটা আপনাকে বুঝাতে পারছি না। উদাহরণ দিয়ে বুঝাই।। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৯) হুমায়ূন আহমেদ

ধরুন আমি স্বপ্নে দেখলাম বাবা চেয়ারে বসে লিখছেন। তিনি বসেছেন সিলিং ফ্যানের নীচে, হঠাৎ সিলিং ফ্যানটা খুলে তাঁর মাথায় পড়ে গেল। রক্তে চারদিক ভেসে যাচ্ছে। আমার তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল। আমার এই স্বপ্ন দেখা মানে—ব্যাপারটা ঘটবে। আমি তৎক্ষণাৎ ঠিক করলাম–না ব্যাপারটা এ রকম হবে না। স্বপ্নটা যে ভাবেই হােক বদলে দিতে হবে তখন নতুন স্বপ্নের কথা ভাবলাম। যেমন ধরুন আমি ভাবলাম বাবা লেখার টেবিলে বসেছেন। কি মনে করে হঠাৎ সিলিং ফ্যানের দিকে তাকালেন। তারপর সরে দাড়ালেন— ওমনি ঝপাং শব্দ করে ফ্যান পড়ে গেল। বাবার কিছু হল না। পুরাে ব্যাপারটা ভেবে রাখার পর—অবিকল যেমন ভেবে রেখেছি তেমনি স্বপ্ন দেখতাম । আপনি এটাকে কি বলবেন, কোনও ক্ষমতা? 

না আপনি তা বলবেন না। মানুষের যে আধ্যাত্বিক ক্ষমতা থাকতে পারে এইসব আপনি বিশ্বাস করেন না। আপনার কাছে মানুষ যন্ত্রের মত। একটা ছেলে যদি একটা মেয়েকে ভালবাসে তাহলে আপনি ধরেই নেবেন— ব্যাপারটা আর কিছুই 

একজন আরেকজনের প্রতি শারীরিক আকর্ষণ বােধ করছে। শারীরিক আকর্ষণ যেহেতু নােংরা একটা ব্যাপার কাজেই ভালবাসা নামক মিষ্টি একটা শব্দ ব্যবহার করছে। কুইনাইনকে সুগার কোটেড করা হচ্ছে। আমি কি ভুল বললাম ? 

আমি ভুল বলিনি। আপনি যাই ভাবেন—কিন্তু শুনুন স্বপ্ন তৈরি করার ক্ষমতা আমার আছে। এবং আমি এখনও পারি। ঘটনা বলি। ঘটনা বললেই আপনি বুঝবেন। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৯) হুমায়ূন আহমেদ

শরিফা তাে বাড়ি থেকে চলে গেল। ওর বিয়ে হবার কথা। বিয়ে হলে আর ফিরবে না। আমি একদিন স্বপ্ন দেখলাম ওর বিয়ে হচ্ছে। চেংড়া টাইপের ছেলে। পান খেয়ে দাঁত লাল করে আছে—আর ভ্যাক ভ্যাক করে হাসছে। স্বপ্ন দেখে খুব মেজাজ খারাপ হল। তখন ভাবলাম, বিয়ে হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু বরের সঙ্গে ওর খুব ঝগড়া হয়েছে, ও চলে এসেছে আমাদের বাড়িতে। যেরকম ভাবলাম অবিকল সেরকম স্বপ্ন দেখলাম। হলও তাই। এক সন্ধ্যাবেলা শরিফা উপস্থিত। তার বিয়ে হয়ে গেছে কিন্তু বর তাকে নিচ্ছে না। বিয়ের সময় কথা হয়েছিল বরকে একটা সাইকেল এবং নগদ পাঁচ হাজার এক টাকা দেয়া হবে। কোনওটাই দেয়া হয়নি বলে তারা কনে উঠিয়ে নেবে না। যেদিন সাইকেল এবং টাকা দেয়া হবে সেদিনই মেয়ে তুলে নেবে। আমি শরিফাকে বললাম, তােমার কি মন খারাপ? 

শরিফা বলল, মন খারাপ কইরা লাভ আছে আফা ? তােমাকে যে তুলে নিচ্ছে না তােমার রাগ লাগছে না? 

না। সাইকেল আর টেকা দিব বইল্যা দেয় নাই। তারার তাে আফা কোনও দোষ নাই। একটা জিনিস দিবেন বলবেন, তারপরে দিবেন না—এইটা কেমন কথা? 

তােমার বর পছন্দ হয়েছে ? 

হু। তােমার সঙ্গে তােমার বরের কথা হয়েছে ? 

ওমা কথা আবার হয় নাই? এক রাইত তার লগে ছিলাম না ? রাতে তােমরা কি করলে? 

কওন যাইব না আফা। বড়ই শরমের কথা। লােকটার কোনও লজ্জা নাই। এমন বেহায়া মানুষ জন্মে দেখি নাই। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। 

বল আমি শুনব। অসাম্ভাব কথা আফা। ছিঃ। তুমি বলবে না? জীবন থাকতে না। আমি নিষিদ্ধ কথা শােনার জন্যে ছটফট করছিলাম। এবং আমি জানি। 

শরিফাও নিষিদ্ধ কথাগুলি বলার জন্যে ছটফট করছিল। 

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৯) হুমায়ূন আহমেদ

দেখলেন তাে স্বপ্ন পাল্টে কি ভাবে শরিফাকে বাড়িতে নিয়ে এলাম? আপনি বলবেন, কাকতলীয়। মােটেই না। শরিফার বরকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করল, কাজেই একদিন খুব ভাবলাম, শরিফার বর এসেছে। যেমন ভাবলাম, ঠিক সেরকম স্বপ্ন দেখলাম। শরিফার বর চলে এল। নীল রঙের একটা লুঙ্গি। রবারের জুতা। সিল্কের চক্রাবক্রা একটা শার্ট। এসেই বাসার সবাইকে পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলল। এমন কি আমাকেও | শরিফার বরের নাম– সিরাজ মিয়া। সে নারায়ণগঞ্জে একটা লেদ মেশিনের হেল্পার। 

আন্টি তাকে খুব বকা দিলেন। কঠিন গলায় বললেন, তুমি পেয়েছ কি ? যৌতুক পাও নি বলে বউ ঘরে নেবে না। তুমি কি জান পুলিশে খবর দিলে তােমার পাঁচ বছরের জেল হয়ে যাবে। বাংলাদেশে যৌতুক নিবারনী আইন পাশ হয়েছে। দেব পুলিশে খবর ? 

সিরাজ মিয়া বলল, ইচ্ছা হইলে দেন। আফনেরা বড় লােক। আফনেরা যা বলবেন সেইটাই ন্যায়। 

আন্টি আরও রেগে গেলেন। তাঁর ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল এখনই তিনি ধানমন্ডি থানার ওসিকে খবর দেবেন। আমাকে বললেন, ফারজানা দাও তাে টেলিফোনটা। ওসি সাহেবকে আসতে বলি। আমি টেলিফোন এনে দিলাম। আমার একটু ভয় ভয় করছিল, কিন্তু সিরাজ মিয়া নির্বিকার। তাকে চা আর কেক খেতে দেয়া হয়েছে। সে চায়ে কেক ডুবিয়ে বেশ মজা করে খাচ্ছে। 

আন্টি ধানমন্ডি থানার ওসিকে খবর দিলেন না। কাকে যেন টেলিফোন করে বললেন, একটা নতুন সাইকেল কিনে বাসায় নিয়ে আসতে।

তন্দ্রাবিলাস-পর্ব-(৯) হুমায়ূন আহমেদ

 সিরাজ মিয়া নির্লজ্জের মত বলল, আমারে টেকা দেন। আমি দেইখ্যা শুইন্যা কিনব। বাজারে নানান পদের সাইকেল— সব সাইকেল ভাল না। 

আন্টি বললেন, তােমাকে দেখে শুনে কিছুই কিনতে হবে না। তুমি তােমার আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে আস। আমি তােমাকে সাইকেল আর পাঁচ হাজার এক টাকা দিয়ে দেব। তুমি শরিফাকে নিয়ে যাবে। যদি শুনি এই মেয়ের উপর কোনও অত্যাচার হয়েছে আমি তােমার চামড়া খুলে ফেলব। গরুর চামড়া যে ভাবে খােলে ঠিক সেই ভাবে খােলা হবে। 

সিরাজ মিয়া চা কেক খেয়ে হাসি মুখে চলে গেল। বলে গেল আগামী বুধবার সে তার বাবাকে নিয়ে আসবে। এবং সেদিনই বউ নিয়ে চলে যাবে । 

আন্টির এই ব্যাপারটা আমার কি যে ভাল লাগল। আনন্দে আমার চোখে প্রায় পানি এসে গেল। আর শরিফা যে কি খুশী হল।এক্কেবারে পাগলের মত আচরণ। এই হাসছে। এই কাঁদছে।। 

বুধবার সকালে শরিফাকে নিয়ে যাবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.