তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(১২) হুমায়ূন আহমেদ

তার হবে 

কেন? তিথি যদি তার প্যারিস যাবার ব্যাপারটা বিশ্বাস করে তাহলেই পরের ধাপটা সহজ হয়ে যায়সে বলতে পারে শােন তিথি, প্লেনে উঠার আগে আমি বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে চাইকারণ আমি চাচ্ছি প্যারিসে পৌছার তেরাে দিনের মাথায় তুমি আমার সঙ্গে জয়েন কর। 

তিথির নীল তোয়ালে

এই মিথ্যায় কারাে কোন ক্ষতি হবে নাবরং সবারই লাভ হবেযে বিয়ে অনেকদিন ধরে ঝুলছে সেই বিয়েটা হয়ে যাবেতিথি অসুখী হবে না কারণ সে মানুষ হিসেবে প্রথম শ্রেণীর না হলেও উপরের দিকে দ্বিতীয় শ্রেণীচারপাশে তৃতীয় শ্রেণীর মানুষের ভীড়ে উপরের দিকেদ্বিতীয় শ্রেণী খারাপ কি? কৌশল ছাড়া বিয়ে সম্ভবও হবে নাযার পেশা প্রাইভেট টিউশানী তাকে কে মেয়ে দেবে

তিথি ঠিক তার জায়গায় বসে আছেপিজা কিংএর এক কোণায়হাতে পানির গ্লাসমন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেমারুফের ধারণা, মেয়েরা ঘরে কখনাে খবরের কাগজ পড়ে নাতারা কাগজ পড়ে ঘরের বাইরে অদ্ভুত অদ্ভুত সব জায়গায়এবং পড়ার সময় জগৎসংসার ভুলে যায়তিথি একবারও তাকাচ্ছে। 

পেছন থেকে টুক করে মাথায় টোকা দিলে হয়তিথি অবশ্যি মাথায় টোকা দিলে রেগে যায়এই সকাল বেলাতেই রাগিয়ে দিলে মুশকিল হবেমেয়েরা চট করে রাগ ধুয়ে ফেলতে পারে নাতারা অনেকক্ষণ রাগ পুষেপাখি পােষার মত রাগ পুষেও তারা আনন্দ পায়। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(১২) হুমায়ূন আহমেদ

মারুফ সামনের চেয়ারটায় বসলতিথি খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল, দাড়ি রাখছ নাকি

মেয়েদের বােধহয় দৃশ্যমান চোখ ছাড়াও কয়েক জোড়া অদৃশ্য চোখ আছেনা তাকিয়েই কি করে দেখল? মারুফ বলল, হুঁ। 

দাড়িতে তােমাকে ভাল দেখাচ্ছেনূর সাহেবের মত লাগছেনূর সাহেবটা কে? আসাদুজ্জামান নূর অভিনয় করেআচ্ছা। 

তিথি খবরের কাগজ ভঁজ করতে করতে বলল, তােমার জরুরী কথাটা কি চট করে বলে ফেলআমাকে উঠতে হবে। 

মারুফের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলসে শুকনো গলায় বলল, উঠতে হলে উঠজরুরী কথা আরেকদিন বলা যাবে। 

রেগে গেলে নাকি ? না, রাগিনি। 

মুখ গম্ভীর করে রেখেছ কেন?” 

আমার মুখটাই গম্ভীর টাইপেরখুব হাসিখুশি অবস্থাতেও আমাকে দেখলে মনে হবে কয়েকরাত ঘুম হচ্ছে নাডিসপেপসিয়ায় ভুগছি এবং আমার পিঠে কার্বাঞ্চল হয়েছে।” 

পিঠে কি হয়েছে? কার্বাঙ্কল‘সেটা কি

মারুফ কফি দিতে বললপিজা কিংওর ছেলেটাকে পাঠালাে এক প্যাকেট সিগারেট আনতেতিথি হাসিমুখে বলল, তােমার জরুরী কথাটা কি আমাকে বলে ফেল তাে। 

থাকথাকবে কেন? বলমারুফ হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি একটু বাইরে যাচ্ছিএইটাই তােমার জরুরী কথা?” 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(১২) হুমায়ূন আহমেদ

বাইরে কোথায় ? চাঁদপুর না কুমিল্লা

কফির কাপ দিয়ে গেছেসিগারেট আনেনিআগে সিগারেট না ধরিয়ে চা বা কফির কাপে চুমুক দিতে কুৎসিত লাগেহঠাৎ মুখ মিষ্টি হয়ে যায়মারুফ বিমর্ষ ভঙ্গিতে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, ব্রিসভেন যাচ্ছি। 

সেটা কোথায়?” 

ফ্রান্সের একটা ছােট শহরবল কি ! কবে? আঠারাে তারিখশেষ রাতের ফ্লাইটতিনটা কি সাড়ে তিনটায়কোন মাসের আঠারাে তারিখ? এই মাসের ?” 

কি সর্বনাশ! আর তাে মােটে দশ দিন আছেদশদিন না, দিনআজকের দিনটা বাদ দাও। 

তিথির নিজেকে সামলাতে সময় লাগছেসে খানিকটা ঝুঁকে এসে বলল, তুমি তাে সারাজীবন চেয়েছ আমেরিকা যেতে, এখন আমেরিকা বাদ দিয়ে ফ্রান্স ?। 

কি করব আমেরিকা যাবার সুযােগ পেলাম না | হাতে যা পেয়েছি তাই সইকানা মামা যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন অন্ধমামা। 

কতদিনের জন্যে যাচ্ছ?” 

পিএইচ.ডি. করতে যতদিন লাগে ধরে নাও চার বছর। 

মারুফের সিগারেট চলে এসেছেসে সিগারেট ধরিয়েছেএতগুলি মিথ্যা কথা এক নাগাড়ে বলায় কেমন ক্লান্ত লাগছেদ্রুত কয়েকটা সিগারেট টেনে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। 

তিথি খুশি খুশি এবং আনন্দিত চোখে তাকিয়ে আছেএরকম চোখের মেয়ের কাছে মিথ্যা বলাও কষ্টের ব্যাপারমিথ্যাটা কাঁটার মত বুকে বিধে থাকেতিথি বলল, তাে খুব আনন্দের ব্যাপারতুমি এমন মুখ কালাে করে আছ কেন

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(১২) হুমায়ূন আহমেদ

অনেক ঝামেলা বাকি আছেভিসা হয়নিপাসপোর্ট রিনিউ করতে হবেএর মধ্যে দেশে গিয়ে মাকে দেখে আসতে হবে। 

দেশে যাবে কবে

আজ রাতের ট্রেনে চলে যাবএকদিন থেকে পরশু আসবকপড়চোপড়ও বানাতে হবেভাল কাপড় তাে কিছুই নে। 

আমি দেখেশুনে তোমার জন্যে কাপড় কিনে দেবচল আজই চলতােমার নাকি কাজ আছে বলছিলে?এমন কোন কাজ নেই। 

কাচা বাজার করব ভেবেছিলামপরে যাবচল, গুলশান মাকেট যাইওখানে সুন্দর সুন্দর শার্ট পাওয়া যায়। 

আজ থাকটাকা আনিনিচল পছন্দ করে আসি, পরে কিনবেচল। 

মারুফ কফির বিল দিলদশটাকার একটা ময়লা নােট দোকানের ম্যানেজারের কাছ থেকে বদলে নিয়ে যে সিগারেট এনে দিয়েছে তাকে বখশীশ দিল। 

তিথি বলল, তুমি একটু হাস তেতােমাকে দেখে খুব খারাপ লাগছেমনে হচ্ছে তােমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে। 

আকাশ ভেঙে পড়ার মতইতিথি, রিকশা নেবার আগে চল খানিকক্ষণ হাঁটিতােমার সঙ্গে কিছু কথা আছেকথাগুলিই জরুরীএতক্ষণ যা বললাম তা জরুরী 

না। 

ঢাকার রাস্তাগুলি এখন আর হেঁটে বেড়ানাের জন্যে নয় গাদাগাদি ভিড়পাশাপাশি গল্প করতে করতে দুজন যাবে, তা হবে নাযেতে হবে একজনের পছনে একজন এবং সারাক্ষণই টেনশান থাকবে এই বুঝি সামনের লােকটা হারিয়ে গেল। 

যন্ত্রণার উপর যন্ত্রণাতিথির পেছনে তখন থেকে এক ফুলওয়ালী হাঁটছেআফা, মালা নেন না, আফা, মালা নেন নাফুলের মালার মত একটি উঁচু শ্রেণীর পণ্যদ্রব্য বিক্রি করলেও এদের আবার আচরণ নিম্ন শ্রেণীর

Leave a comment

Your email address will not be published.