তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২১) হুমায়ূন আহমেদ

তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মনে করতে পারলেন না আরবীতে আছে কিনামনে মনে আলিফ বে তে ছে পড়তে লাগলেন – 

স্যার আপনি বলুন আছে ?তিনি অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, মূল ব্যাপারটা বলুন। 

তিথির নীল তোয়ালে

সূরা নাসএর বাঙলা উচ্চারণ লিখেছে মিন শাররিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাসিল লাযি ইউয়াসভিসু ফী সুদূরিম্নাসদেখুন অবস্থা ইউয়াসভিসুলেখা উচিত ইউয়াসফিসুয়ের জায়গায় হয়েছে । 

তিনি বললেন, জরুরী ব্যবস্থা নিতে হবে স্যারছাত্ররা খােদার পাক কালাম ভুল শিখবে ?তিনি আবারও বললেন, হুঁ। 

আপনি স্যার এই বই নিষিদ্ধ করুননতুন করে বই ছাপা হবে, তারপর ছাত্ররা পড়বে। 

ছােটখাট ভুল তাে থাকতেই পারেশিক্ষকরা সেগুলি শুধরে দেবেন। 

আপনি কি বলছেন স্যার ! খােদার পাক কালামে ভুল থাকবে? এটা কি স্যার বিবেচনার কথা হল ? ...‘ 

প্রতিদিন এরকম কিছু সমস্যা নিয়ে তাকে সময় নষ্ট করতে হয়আর শুনতে হয় তদবিরকত ধরনের তদবির নিয়ে লােকজন যে আসে তা আল্লাহ জানেন এবং তিনিই জানেন। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২১) হুমায়ূন আহমেদ

স্থানীয় দারােগা ঘুষ খাচ্ছেতাকে বদলি করতে হবে। 

সেই একই দারােগা অত্যন্ত সৎতাকে এখানেই রাখতে হবে। 

এজি অফিসে টিএ বিল অটিকে রেখেছেবিল পাশ করতে হবে“অমুক ছেলে সন্ত্রাসী মামলায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেঅতি ভাল ছেলেপাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েশেষ রাতে ফজরের নামাজ পড়তে বের হয়েছিল, টহল পুলিশ ধরে ফেলেছেলম্বা চুল দেখে সন্দেহ করেছেআশেপাশের লােকজনের শত্রুতাও আছেতারাও তাল দিয়েছেকিন্তু ছেলে সরকার পার্টি করেআপনি স্যার এক্ষুণি আই, জি, সাহেবকে টেলিফোন করুনআপনি না বললে আমাদের অন্য সাের্স ধরতে হবে। 

চৌধুরী সাহেব সন্ধ্যা থেকে রাত টা পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দেনদরবার শুনেনসন্ধ্যা থেকে তার মাথাধরা শুরু হয়রাত টায় সেই ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠেতিনি এক সঙ্গে দুটা প্যারাসিটামল এবং একটা সিডাকসিন খেয়ে বাতি নিভিয়ে চুপচাপ চেয়ারে বসে থাকেনমাথাব্যথা খানিকটা কমলে এশার নামাজ পড়েনচার রাকাত নামাজ, তাতেই গণ্ডগোল হয়ে যায়রাকাত পড়েছেন তার হিসাব থাকে নাতার ধারণা, প্রতিবারই চার রাকাতের জায়গায় তিনি হয় তিন রাকাত কিংবা পাঁচ রাকাত পড়েনএকবার অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলেন, তিনি রুকুতে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতিহা বাদ দিয়ে আত্তাহিয়াতু পড়েছেনমাখারাপের লক্ষণ ছাড়া আর কি

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২১) হুমায়ূন আহমেদ

আজ সন্ধ্যা থেকেই তার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। তিনি পি, .কে বললেন, আজ আর কাউকে পাঠিও নাশরীর খারাপ। 

কাউকেই না ?আচ্ছা পাঠাও এতক্ষণ ধরে বসে আছে। 

আপনি স্যার শুধু শুনে যানআমিও বলে দেব যেন বেশিক্ষণ আপনাকে বিরক্ত না করে। 

‘রাত আটটার পর আর কাউকে পাঠাবে নাজি আচ্ছা স্যার। 

নুরুজ্জামান মন্ত্রীর ঘরে ঢুকল রাত ঠিক আটিটায়ঢুকেই সে বলল, স্যার, আপনার কি শরীর খারাপ? | চৌধুরী সাহেব দর্শনপ্রার্থীর মধ্যে এই প্রথম জাতীয় কথা শুনলেনঅন্যরা ঘরে ঢুকেই তাদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করেসময় নষ্ট করতে চায় না। 

চৌধুরী সাহেব বললেন, আপনি বসুন। 

নুরুজ্জামান বলল, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার শরীরটা খুবই খারাপস্যার, আমি আরেকদিন আসব। 

শরীর এমন কিছু খারাপ নাবসুন। 

নুরুজ্জামান বলল, আপনার ঘরে খুব ভয়ে ভয়ে ঢুকেছিলামমন্ত্রীর ঘরমন্ত্রীদের আগে শুধু দূর থেকে দেখেছি। 

ভয় কেটেছে ? জি স্যার, কেটেছে। 

চৌধুরী সাহেব বেল টিপে দুকাপ চা দিতে বললেননুরুজ্জামান বলল, স্যার, আমি চা খাই নাগ্রামাঞ্চলে থাকিচায়ের অভ্যাস হয় নাই| অভ্যাস না হলেও খানমন্ত্রীর ঘরের চা খেয়ে দেখুন কেমন লাগেদেশে ফিরে গল্প করতে পারবেনবলতে পারবেন, মন্ত্রী সাহেব আমাকে খুব খাতির করেছেননিজের হাতে চা বানিয়ে খাইয়েছেন। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২১) হুমায়ূন আহমেদ

জি আচ্ছা স্যার, চা খাব” 

চৌধুরী সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবেগশূন্য গলায় বললেন, এখন বলুন দেখি কি তদবির নিয়ে এসেছেন। 

একটা স্কুলের ব্যাপারে এসেছি স্যারআমি একটা গার্লস স্কুল দিয়েছিনাম দিয়েছি বেগম রােকেয়া গার্লস হাইস্কুলপায়রাবন্দের বেগম রােকেয়া। 

ব্যাখ্যা লাগবে নাবেগম রােকেয়ার নাম আমি জানি। শিক্ষামন্ত্রী মানেই যে মূখ হতে হবে এমনতাে কথা নেই‘ 

আগে নাম ছিল মমিনুন্নেছা গার্লস হাইস্কুলমমিনুন্নেছা আমার ফুপুর নামতারপর শেষ রাতে একটা স্বপ্ন দেখে নামটা বদলে দিলাম” 

স্বপ্নে দেখলেন বেগম রােকেয়া আপনাকে বলছেন তার নামে স্কুলের নাম রাখতে

জিনাব্যাপারটা কি আপনাকে বলব?” 

বলুনযতক্ষণ আমি চা খাব ততক্ষণই বলবেনচা শেষ হওয়া মাত্র আপনার ইতিহাস বর্ণনা বন্ধ করবেন এবং চলে যাবেনপারবেন না

পারব স্যারআমার ফুপু মমিনুন্নেছা খুব দুঃখী মহিলা স্যারবিয়ের দুবছরের মধ্যে স্বামী মারা গিয়েছিলতার তখন দুটা জমজ সন্তান একটা ছেলে একটা মেয়েমেয়েটার নাম সাবেরা, ছেলেটার নাম ...” 

নামের দরকার নেইবলে যাননাম বলতে গিয়ে সময় নষ্ট করছেনআমার চা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২১) হুমায়ূন আহমেদ

জমজ বাচ্চা দুটাকে নিয়ে স্বামীর সংসারে পড়ে রইলেনকোথাও গেলেন নাবিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলবিয়েও করলেন নাবাচ্চা দুটার বয়স যখন সাত বৎসর তখন দুজন একসঙ্গে পানিতে ডুবে মারা গেলভাইটা পানিতে পড়ে 

গিয়েছিল, তাকে বাঁচাতে গিয়ে বােনটাও মারা গেল। 

বলেন কি?তারপরেও ফুপু দীর্ঘদিন বেঁচে গেলেনমারা গেলেন গত বৎসর শ্রাবণ মাসেমরার সময় তার সব জমি জমা আমার নামে লিখে দিয়ে গেলেনআমাকে খুব স্নেহ করতেনআমি ভাবলাম, ফুপু খুব কষ্ট নিয়ে পৃথিবী থেকে গেছেনতার জন্য যদি ভাল কিছু করতে পারি তাহলে তার আত্মা শান্তি পাবেতখন তার সবটা জমি আমি স্কুলের জন্যে দিয়ে দিলামস্কুলের নাম দিলাম ফুপুর নামেতারপর স্বপ্ন দেখলাম। 

Leave a comment

Your email address will not be published.