তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৭) হুমায়ূন আহমেদ

জাফর সাহেব ভুরু কুঁচকে বললেন, আপনাদের কাজ শেষ করতে কতক্ষণ লাগবে

ধরেন খুব বেশি হইলে আধা ঘণ্টা। 

তিথির নীল তোয়ালে

জাফর সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, আধঘণ্টা অপেক্ষা করা যেতে পারেএই ফাঁকে শায়লার সঙ্গে কি কথা বলে নেবেন? বিনীত ভঙ্গিতে বলবেন, সব 

অপরাধ আমারবাসায় ফিরে আসদুটি মাত্র বাক্য, বলা কঠিন হবার কথা নাসব অপরাধ আমারএই বাক্যটা বলাটাই সমস্যাতিনি জানেন, সব অপরাধ 

তাঁর নাএটা বলা মানে মিথ্যা কথা বলা। 

মিথ্যা বলা মানে আত্মার ক্ষয়জন্মের সময় মানুষ বিশাল এক আত্মা নিয়ে পৃথিবীতে আসেমিথ্যা বলতে যখন শুরু করে তখন আত্মা ক্ষয় হতে থাকেবৃদ্ধ বয়সে দেখা যায়, আত্মার পুরােটাই ক্ষয় হয়ে গেছেজাফর সাহেব সতেরাে বছর বয়সের পর থেকে আত্মর ক্ষয়রোধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেনমানুষের সব চেষ্টা সফল হয় নাএটিও হচ্ছে নাপদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেনশায়লার সঙ্গে প্রায়ই মিথ্যা বলতে হচ্ছেএই যে তিনি বলবেন, সব অপরাধ আমার এতে আত্মার 

অনেকটা ক্ষয় হবে। 

জাফর সাহেব টেলিফোনের ডায়াল ঘুরালেনতার মেজো মেয়ে ইরা ধরলহাসিখুশি গলাবাড়ি ছেড়ে এই যে এতদিন বাইরে আছে তার কোন রকম ছাপ মেয়ের গলায় নেই। 

হ্যালো বাবা, কেমন আছি?ভালতুমি কি অফিস থেকে টেলিফোন করছ

বাবা শােন, আমরা সিলেট বেড়াতে যাচ্ছিছােট মামার চা বাগানেকবে যাবি

আজ রাতের ট্রেনে, সুরমা মেইলমামা বলছিল গাড়িতে করে যেতেবাই রােড। মা রাজি হল না। 

আচ্ছা। 

বাবা শোন, তুমি আমাদের সামনের মাসের হাত খরচের টাকাটা এডভান্স দিতে পারবে? একদম খালি হাতে সিলেট যাচ্ছি তোভাল লাগছে না। 

দিন থাকবি?” 

দিন থাকব বলতে পারছি নামা যতদিন থাকতে চায় ততদিনবাবা, তুমি হাতখরচের টাকা দেবে কি দেবে না তা তাে বললে না

পাঠিয়ে দেবথ্যাংকস। তাের মা কি আছে?আছেকথা বলবে

ধর তুমি, ডেকে দিচ্ছিতবে মা তােমার সঙ্গে কথা বলবে কিনা তা তাে জানি মনে হয় বলবে নাযা রেগে আছে

তুই ডেকে দেআচ্ছা। 

জাফর সাহেব টেলিফোন হাতে বসে আছেনতিনি লক্ষ্য করলেন, মিস্ত্রী দুজন কাজ ফেলে হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছেটেলিফোনের কথা শুনছেএই দুটার মাথা কামিয়ে দিলে কেমন হয়? শায়লার গম্ভীর গলা পাওয়া গেল – 

হ্যালাে। 

জাফর সাহেব বললেন, কেমন আছ? আমি কেমন আছি সেটা দিয়ে তোমার দরকার নেইকি বলতে চাচ্ছ বলসিলেট নাকি যাচ্ছ?কেন কোন অসুবিধা আছে ? স্বামীর অনুমতি ছাড়া নড়তে পারব নাঅনুমতির কথা তাে আসছে নাযেতে চাচ্ছ যাবেশায়লা গম্ভীর গলায় বললেন, রাখি

শােন শায়লা, হ্যালাে আমি অনেক ভেবেটেরে দেখলাম, অপরাধটা আসলে আমারঅর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, সংসারে চলার পথে ...

খট করে শব্দ হলশায়লা টেলিফোন নামিয়ে রাখলেনজাফর সাহেবের দিকে মিস্ত্রী দুজন এখনাে তাকিয়ে আছেতিনি এমন ভাব করলেন যেন টেলিফোনে খুব আনন্দজনক সংবাদ পেয়েছেনতিনি হাসিমুখে বললেন, আপনার কাজ কতদূর

কাজ বন্ধ স্যারবন্ধ কেন ? পার্টস নাইপার্টস নাই, তাহলে শুধু শুধু বসে আছেন কেন?স্যার চলে যাব ?” 

অবশ্যই চলে যাবেনএক থেকে পাঁচ গুনার আগেই যাবেনওয়ান টু থ্রি ফোর...

মেশিনটা জায়গায় ফিট কইরা থুইয়া যাই ? নোএক্ষুণি বিদায় হতে হবেরাইট নড়ি। 

জাফর সাহেব বুঝতে পারছেন তাঁর রাগ বিপদসীমা অতিক্রম করতে যাচ্ছেএক্ষুণি ভয়াবহ কিছু হবেএদের উপর রাগ করাটা অর্থহীনস্ত্রীর উপর রাগ তিনি এদের উপর ঝাড়তে পারেন না ...

এমন এক বিপজ্জনক মুহূর্তে নুরুজ্জামান দরজা ঠেলে মাথা বের করে বলল

স্যার আসি

জাফর সাহেব থমথমে গলায় বললেন, কি ব্যাপার

কোন ব্যাপার না স্যারআপনার অফিসের ঠিকানা ছিলভাবলাম দেখা করে যাইমৌচাক মার্কেটে যাচ্ছিলাম। 

আমার সঙ্গে কি কোন দরকার আছে?*জি না স্যারতাহলে এলে কেন?” 

নুরুজ্জামান ভয়ে ভয়ে বলল, মন্ত্রী সাহেবের পিএসঙ্গে কথা হয়েছেউনি আবার নেত্রকোনায় বিবাহ করেছেন। 

উনি নেত্রকোনা বিয়ে করেছেন তাতে কি হয়েছে?যােগাযােগের একটা সুবিধা হয়ে গেল। 

জাফর সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেনএতটা নির্বোধ কোন সুস্থ মানুষ হতে পারে তা তার ধারণায় নেইচতুস্পদরা এরচে কিছু বেশি বুদ্ধি ধরে। 

নুরুজ্জামান বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সামনের চেয়ারে বসেছেজাফর সাহেব যে রেগে আগুন হয়ে আছেন তাও তার মাথায় ঢুকছে নানুরুজ্জামান উৎসাহের সঙ্গে বলল, পি সাহেবের বাসায় একদিন চলে যাবএকটা ব্যবস্থা তখন হবেই। 

হুট করে একজন অপরিচিত মানুষের বাসায় উঠে যাবে? হুট করে যাব না। আগে টেলিফোন করবটেলিফোন নাম্বার নিয়ে এসেছি

জাফর সাহেব লক্ষ্য করলেন নুরুজ্জামান টেলিফোন সেটটার দিকে তাকাচ্ছেমনে হচ্ছে এখান থেকে টেলিফোন করবে এই মতলব করেই এসেছেএই যদি মতলব হয় তাহলে তাকে খুব নির্বোধ বলা যাবে নাজাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক 

আছে। 

স্যার একটা টেলিফোন করব?কাকে করবে পি সাহেবের স্ত্রীকে

জ্বী নাআমাদের দেশের একজন মানুষ আছে রামপুরায় বাসাউনি আমাকে একটা সুযােগ করে দিবেন বলেছিলেন। 

কিসের সুযাে?বাঁশি বাজাবার সুযােগ

Leave a comment

Your email address will not be published.