তেঁতুল বনে জোছনা-পর্ব-(২২) হুমায়ূন আহমেদ

নবনী বলল, কেন ? রাতে বের হলে সমস্যা কী ? সমস্যা আছেইমাম সাব বড় ত্যক্ত করতেছে মানে কী? পরিষ্কার করে বলপরিষ্কার করে না বললে বুঝতে পারছি নাডাক্তার সাব চিঠিতে কিছু লেখে নাই

তেঁতুল বনে জোছনা

মতি আগ্রহ নিয়ে গল্প শুরু করলগলা নামিয়ে গােপন খবর ফাঁস করার

ভঙ্গিতে বললএইটা একটা মারাত্মক ইতিহাসআমরার বিরাটনগরের ইমাম সাব তেতুলগাছে ফাঁস দিয়া মারা গেছিল। 

নবনী বিস্মিত হয়ে বলল, কোন ইমাম সাহেব ? খুব সুন্দর চেহারা মাথায় পাগড়ি পরেন

জ্বি উনি। 

উনাকে তাে চিনিআমার জন্যে পাকা তেতুল নিয়ে এসেছিলেনউনি ফাঁস নিয়ে মারা গেছেন ? কেন ? | সেইটা অন্য ইতিহাস, আরেক দিন শুনবেনবর্তমান ইতিহাসটা শুনেনফঁসের মরার জানাজা হয় না, এইটা তাে আপনে জানেন? জানেন না

জানি না। 

অপঘাতে মৃত্যুর জানাজা হওনের নিয়ম নাইকবর খুইড়া বিসমিল্লাহ বইল্যা লাশ নামাইয়া দিতে হবে, এইটাই নিয়মইমাম সাবেরে তাই করা হইল। প্রথমে অবশ্যি চেষ্টা করা হয়েছে দেশের বাড়িতে লাশ পাঠাইতেদেশের বাড়িত ইমাম সাবের মেয়ে আছে, পরিবার আছেতারার যা ইচ্ছা করবদেশের বাড়ির ঠিকানা কেউ জানে নাএইদিকে ফাসির মরা সুরতহাল করা লাগেসব মিলাইয়া বেড়া ছেড়ালাশ গেল পইচা নাড়ি উল্টাইয়া যাওয়ার মতাে বাস ছুটলতখন সিদ্ধান্ত হইল জানাজা ছাড়াই তেতুল গাছের নিচে কবর হইব

তেঁতুল বনে জোছনা-পর্ব-(২২) হুমায়ূন আহমেদ 

তারপর

কবর হইলশুরু হইল ইতিহাসবিরাটনগরের কোনাে মানুষ এখন আর রাইতে একলা বাইর হইতে পারে নাকেউ যদি একলা বাইর হয়পিছন থাইক্যা ইমাম সাব তারে চিকন গলায় ডাক দেয়। 

নবনী অবাক হয়ে বলল, যে মরে গেছে সে পেছন থেকে ডাক দিবে কীভাবে? 

এইটাই তাে ইতিহাসইমাম সাহেব পিছন থাইক্যা ডাক দিয়া বলে, জনাব আমার জানাজাটা পড়েনজানাজা ছাড়া কবরে শুইয়া আছিবড় কষ্ট

কী বল এইসব 

সত্য কথা বলতেছি আফাযদি মিথ্যা বলি তাইলে যেন আমার মাথাত ঠান্ডা পড়েআমার যেন কলেরা হয়গু মুতের মধ্যে যেন মইরা পইরা থাকিআমারে এক রাইতে নিয়া পুসকুনিত ফেলছে। 

ভ্যানগাড়ির চালক পেছন ফিরে বলল, ঘটনা সত্যবিরাটনগরের কোনাে মানুষ সইন্ধ্যার পরে ঘর থাইক্যা বাইর হয় নাপিসাব পায়খানাও ঘরের মধ্যে করে। 

মতি বলল, হাতে আগুন থাকলে ভয়ের কিছু নাইআগুন না থাকলে সমস্যাএরা আগুন ভয় পায়। আগুন হইল ভূতের সাক্ষাত যম। 

নবনী বলল, একটা মানুষ ভূত হয়ে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে

মতি বলল, ভয় না আফা, হে চায় তার জানাজা হউক এর বেশি কিছু নাতবে আজিজ মিয়ারে এক রাইতে দৌড়ান দিছেআজিজ মিয়া দৌড়াইতে দৌড়াইতে পুসকুনির মধ্যে লাফ দিয়া পড়ছেচিৎকার শুরু করছে মাঝপুকুর থাইক্যালােকজন হারিকেন দা বল্লম নিয়া তারে উদ্ধার করছেএখন আজিজ মিয়া আর গেরামে থাকে নাবাজারে থাকেবাজারে তার দুইটা দোকান আছেতার থাকার অসুবিধা নাইতার মতাে অবস্থা তো অন্য সবের না । বাড়ি ঘর ছাইড়া যাইব কই

তেঁতুল বনে জোছনা-পর্ব-(২২) হুমায়ূন আহমেদ 

আনিস ঘরে ছিল নাকলে গিয়েছেবাড়িতে আছে সুজাত মিয়া। সে বলতে পারল না ডাক্তার সাহেব কলে কোথায় গিয়েছেন, কখন ফিরবেন। 

মতি বলল, আফা কোনাে দুশ্চিন্তা নাইডাক্তার সাব না ফিরা পর্যন্ত আমি আছিডাক্তার সাবের হাতে আপনেরে সােপার্দ কইরা দিয়া তারপরে বিদায়। 

নবনী বলল, তােমার থাকার দরকার নেই। তুমি তােমার কাজে যাওআমার অসুবিধা হবে না। 

আমি পাহারা দেই বাংলা ঘরের বারান্দাত বইস্যা থাকি ভয় টয় যদি পানসময় খারাপএখন আবার চলতাছে কৃষ্ণপক্ষ। 

কৃষ্ণপক্ষ হােক বা শুক্লপক্ষ হােক তােমাকে পাহারা দিতে হবে নাআমার ভয় কম। তেলাপােকা আর টিকটিকি এই দুটা জিনিস ছাড়া কোনাে কিছুকেই ভয় পাই না। 

মতির মন খারাপ হয়ে গেল। 

ভ্যানগাড়ি চলে গেছেএখন নান্দাইল রােডে যেতে হলে হেঁটে হেঁটে যেতে হবেতাছাড়া সেখানে গিয়েইবা করবে কী ? বাতাসীর কাছে যাওয়া যাবে না বাতাসী জেনে গেছে মতি বিরাটনগর হাইস্কুলের শিক্ষক নাএতে সে খুবই রেগেছেআগে সে মতিকে আপনি আপনি করে বলতঘটনা জানার পর 

থেকে সে তুই তুকারিকরছেএটিও অত্যন্ত অপমানসূচক ব্যাপারবাতাসী চোখ কপালে তুলে সাপের মতাে হিসহিস শব্দ করতে করতে বলেছেতুই না কুলি? ইস্টিশনে কুলির কাম করসআমারে বলছস তুই মাস্টর। 

মতি উদাস গলায় বলেছে, তুই তােকারি বন করহারামজাদা মিসকুর তুই ভাবছস কী

মতি অতি বিরক্ত হয়ে বলেছে, আমি যেমন কুলি তুইও তেমন বাজারের নটি বেটিকাটাকাটি। 

তেঁতুল বনে জোছনা-পর্ব-(২২) হুমায়ূন আহমেদ 

তুই বাইর । বাইর হ কইলাম। মতি বের হয়ে চলে এসেছেএরপর আর বাতাসীর ঘরে যাবার প্রশ্ন ওঠে মতি যা পারে তা হলাে নিজের বাড়িতে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারে সেখানেও সমস্যা আছেতার বাড়ি মসজিদের ইমাম সাহেবের বাড়ির কাছাকাছিনিশি রাতে ইমাম সাহেব এসে যদি বলেনমতিরে, আমার জানাজার ব্যবস্থা করতখন কী হবে? মতি মন খারাপ করে রাস্তায় নামল। 

নবনী সুজাত মিয়াকে গরম পানি করতে বললবালিতে শরীর কিচকিচ করছেগরম পানিতে ভালাে গােসল দিতে হবেআগের বারে গােসলখানা বলে আলাদা কিছু ছিল নাএখন গােসলখানা বানানাে হয়েছেচৌবাচ্চা ভর্তি পানিচৌবাচ্চা ব্যাপারটা ঢাকা শহর থেকে উঠেই গেছে। নবনী অনেক দিন পর চৌবাচ্চা দেখলচৌবাচ্চা দেখলেই চৌবাচ্চার অঙ্কের কথা মনে পড়েএকটা নল দিয়ে পানি আসছে, অন্য একটা নল দিয়ে পানি চলে যাচ্ছে। কত সময়ে চৌবাচ্চাটি শূন্য হয়ে যাবে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলায় অঙ্কের ধরনও বদলাবেএকটা সময়ে অঙ্ক বইতে চৌবাচ্চার অঙ্ক বলে কিছু থাকবে নানতুন ধরনের অঙ্ক থাকবে মােবাইল ফোন নিয়ে অঙ্কযদি একটি মােবাইল টেলিফোনে ইনকামিং চার্জ প্রতি মিনিটে দুই টাকা হয় তবে...‘ 

নবনীর ভালাে লাগছেভ্যানগাড়ির ঝাকুনিতে শরীরের কলকজা নড়ে গিয়েছিলএখন মনে হচ্ছে জায়গামতাে বসছেচৌবাচ্চার পানি হিম শীতল

শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। 

বাড়িঘর সুন্দর করে গােছানাে এটা দেখতেও ভালাে লাগছেখাটের চাদর টানটান করে বিছানােখাটের পাশের টেবিলে টেবিল ল্যাম্প

Leave a comment

Your email address will not be published.