দুই দুয়ারী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ুন আহমেদ

সাবের খানিক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলএক সময় চোখ মেলে বলল, ওরা বলেছে ওরা অসম্ভব কষ্ট পাবে। 

তাহলে ওদের আপনি বলুন না আপনাকে মুক্তি দিতেওদের তাে ক্ষণস্থায়ী জীবনসেই জীবন তাে ওরা ভােগ করল আর কত। 

দুই দুয়ারীবলব?হ্যা বলুন?এটা বলতে লজ্জা করছেলজ্জার কিছু নেই, আপনি বলুন। 

সাবের চোখ বন্ধ করলপ্রায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে বলল, ওরা আমাকে বাঁচতে দেবেওরা চায় না আমার মৃত্যু হােক। 

এখন তাহলে অষুধ খাবেন

অষুধ খেতে হবে নাওরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করবেওদের সে ক্ষমতা আছেআচ্ছা আমি যেসব কথাবার্তা বলছি তা কি আপনি বিশ্বাস করছেন?” 

করছিঅবশ্যই করছিভাই, আমি তাহলে যাই? কোথায় যাবেন ? জানি নাআমার মনে হচ্ছে আপনার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। 

দুই দুয়ারী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ুন আহমেদ

হতেও পারে, কিছুই বলা যায় নাএই জগৎ বড়ই রহস্যময় ভাই, আমি যাইসূর্য ওঠার আগে আমাকে বিদেয় হতে হবে। 

মিস্টার আগস্ট ঘর থেকে বের হওয়ামাত্র সাবের তার মাকে ডেকে তুললসহজ স্বাভাবিক গলায় বলল, এক কাপ চা খাওয়াতে পার, মা। 

সুরমা ছেলের গায়ে হাত রাখলেনজ্বর নেমে গেছেসাবেরের মুখ হাসিহাসি। 

মা, কড়া করে চা বানাবেনােন্ত বিকিট থাকলে চায়ের সঙ্গে নােন্তা বিসকিট দিও প্রচণ্ড ক্ষিদে লেগেছে। 

হরিপ্রসন্ন বাবু ঘুমিয়ে ছিলেনমিস্টার আগস্ট তাকে ডেকে তুলে বলল, আপনার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি 

আমি কিছুক্ষণের মধ্যে রওনা হববেশ কয়েকদিন আপনার সঙ্গে একসঙ্গে কাটালামকথাবার্তা তেমন হয় নিহলে ভাল লাগতাে। 

হরিপ্রসন্ন বাবু বললেন, রাতের বেলা কোথায় যাচ্ছেন? আসতে হয় দিনে যাবার জন্যে তাে রাতই ভাল আপনার কথা বুঝলাম নাকথার কথা বলেছিআপনি ঘুমিয়ে পড়ুনসরি, ঘুম থেকে ডেকে তুললামনা, না, অসুবিধা নাইআচ্ছা ভাল কথা আপনি কি যাবেন আমার সঙ্গে? 

দুই দুয়ারী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ুন আহমেদ

হরিপ্রসন্ন বাবু চমকে উঠে বললেন, আমি ! আমি কোথায় যাব? না, না, কি বলছেন আপনি

আপনি রাজি থাকলে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যেতামআরে নাআচ্ছা, ভাই, তাহলে ঘুমানঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছেচাদরটা গায়ে দিয়ে নিন। মিস্টার আগস্ট দরজা ভেজিয়ে বারান্দায় এল

বাইরে বৃষ্টি পড়ছেসেই বৃষ্টিতে সে নেমে গেল নিঃশব্দেএকবারও পেছনে ফিরে তাকাল নাপেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পেত দোতলার বারান্দা থেকে মতিন সাহেব তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। 

কুড়ি বছর পরের কথা। 

আমেরিকার মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটিইউনিভার্সিটি কফি শপে একজন বাংলাদেশী ছাত্রীকে বসে থাকতে দেখা 

যাচ্ছেতার হাতে কফির মগটেবিলে স্থানীয় পত্রিকা বিছানােমেয়েটি অলস ভঙ্গিতে পত্রিকার বিজ্ঞাপনগুলি দেখছে। মেয়েটির নাম মিতুসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইভার অপটিকসপােষ্ট ডক করছেএকা একা থাকেবেশীর ভাগ সময়ই তাকে খুব বিষন্ন দেখা যায়জীবন তার প্রতি খুব সুবিচার করেনিআমেরিকায় পড়তে আসা তার এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসন। 

মিতু বিজ্ঞাপন পড়তে পড়তে হঠাৎ চমকে উঠলএতটা চমকাল যে হাতের কফির মগ থেকে গরম কফি ছিটকে পড়ল গায়েচব্বিশপঁচিশ বছরের একজন হাসিখুশী যুবকের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছেবিজ্ঞাপনে লেখা এই যুবকটি নিম্ন ঠিকানায় আছেযুবকটি এক ধরনের এ্যামনেশিয়ায় ভুগছেপুরােনাে স্মৃতি মনে নেইতার কোন খোজখবর বের করা যাচ্ছে নাযদি কেউ এই যুবকটি সম্পর্কে কিছু জানেন তাহলে যােগাযােগ করতে অনুরােধ করা হচ্ছেবিজ্ঞাপন দিয়েছে স্টেট পুলিশ

দুই দুয়ারী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ুন আহমেদ

যুবকটির ছবির দিকে মিতু অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। 

মিতু তাকে চেনে তার নাম মিস্টার আগস্টব্যাপারে মিতুর মনে কোন সন্দেহ নেই মিতু পত্রিকা হাতে উঠে দাঁড়ালচোদ্দ নম্বর পুলিশ প্রিসিংক্টযুবকটি আছেউনিশ ডাউন শ্রটি নর্থএই হল ঠিকানাকতক্ষণ লাগবে সেখানে যেতে? বড়জোর কুড়ি মিনিটমিতুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। 

যুবকটির মুখােমুখি দাঁড়িয়ে মিতু খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেলনীল চোখ এবং সােনালী চুলের একজন আমেরিকান যুবক তার সামনে বসে আছেযুবকটির চোখে মুখে চাপা হাসিমিতু নিশ্চিত যে, সুদূর শৈশবে দেখা মিস্টার আগস্টের সঙ্গে এই যুবকের চেহারার অসম্ভব মিল তবু এই আমেরিকান যুবক মিস্টার আগস্ট হতে পারে নাপুলিশের জনৈক কর্মকর্তা বললেন, মিস আপনি কি এই যুবককে চেনেন? . মিতু বলল, না। 

সে ফিরেই আসছিলহঠাৎ কি মনে করে যুবকের দিকে তাকিয়ে ইংরেজীতে বলল, এক সময় আমার নাম ছিল পাঁচ হাজার ছয় শত চুয়ান্নআজ আমার নাম বার হাজার তিনশএকুশতুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?

দুই দুয়ারী-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ুন আহমেদ

যুবকটি মিতুর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইংরেজীতে বলল, কেমন আছ মিতু

এঃ 

মিতুর চোখে পানি এসে গেল। 

পুলিশ অফিসার অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, মিস আপনি কি যুবকটিকে চিনতে পারছেন? তাকে কি আপনার পরিচিত মনে হচ্ছে

মিতু তাকিয়ে আছে যুবকের দিকেযুবক মাথা নীচু করে বসে আছেপা নাচাচ্ছে। তার মুখ হাসিহাসি

মিতু বলল, আমি চিনি নাআমি এই যুবককে চিনি না

Leave a comment

Your email address will not be published.