দেবী উপন্যাস -পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

জিতু মাথা নাড়ল। 

কী স্বপ্ন?’ এক জন মাইয়া মানুষ পাকের ঘরে হাঁটতে আছিলএই দেখেছিস স্বপ্নে?স্বপ্নে দেখি নাইনিজের চোখে দেখলামদূর ব্যাটা, অন্ধকারে তুই মানুষ দেখলি কীভাবে? যা, ঘুমােজিতু শুয়ে পড়ল

আনিস বলল, ভয়ের কিছু নেই, আমি জেগে আছি, ঘুমাে 

আচ্ছা। 

আর শােন, রান্নাঘরে বাতি জ্বালানাে থাকুকআচ্ছা‘ 

জিতু শুয়ে পড়লকিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলআনিস একটি সিগারেট ধরালঘুম চটে গেছেতাকে এখন দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে হবেএক পেয়ালা চা খেতে পারলে মন্দ হত নারাত তাে বাজে প্রায় সাড়ে তিনটাবাকি রাতটা তার জেগেই কাটবে মনে হয়সিগারেট টানতে ভালাে লাগছে না। পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠছে। 

ঘুমের মধ্যে রানু শব্দ করে হাসল আনিস মৃদু স্বরে ডাকল, এই রানুরানু খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, কি

জেগে আছ নাকি?” 

হ্যা। 

কী আশ্চর্য, কখন জাগলে? অনেকক্ষণতুমি বাথরুমে গেলেবারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলেআমাকে ডাকলে না কেন? শুধুশুধু ডাকব কেন?” 

আনিস সিগারেট টানতে লাগলরানু বলল, বড় গরম লাগছেজানালা বন্ধ করলে কেন?” 

গরম কোথায়? বেশ ঠাণ্ডা তাে! আমার গরম লাগছেফ্যানটা ছাড় নাএই ঠাণ্ডার মধ্যে ফ্যান ছাড়ব কি, কী যে বল!

দেবী উপন্যাস -পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

রানু ছােট একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তুমি যখন বাথরুমে ছিলে তখন কি নূপুরের শব্দ শুনেছ?” 

আনিস ঠাণ্ডা স্বরে বলল, না তাে, কেন

এমনিআমি শুয়েশুয়ে শুনছিলামঘুমাও রানুআমার ঘুম আসছে নাঘুম না এলে উঠে বস, গল্প করিচা খাওয়া যেতে পারে, কি বল?” 

রানু উঠে বসল, কিন্তু জবাব দিল নাআনিস দেখল রানু কোন ফাঁকে গায়ের কাপড় খুলে ফেলেছেক্লান্ত স্বরে বলল, বড্ড গরম লাগছেতুমি আমার দিকেতাকিও না, প্লীজ!’ 

এইসব কী রানু? ঘরে একটা বাচ্চা ছেলে আছে। 

‘কী করব, বড় গরম লাগছেতুমি বরং রান্নাঘরের বাতি নিভিয়ে সব অন্ধকার করে দাও। 

বাতি জ্বালানাে থাকআনিস দ্বিতীয় সিগারেট ধরালরানু বলল, আমাদের গ্রামে একটা মন্দির আছে, তার গল্প এখন শুনবে না?‘ 

আহু, মন্দিরফন্দিরের গল্প এখন শুনব না। 

‘আহ্, শোন না! আমার বলতে ইচ্ছে করছে। আমি যখন খুব ছােট, তখন একাএকা যেতাম সেখানে। 

কি মন্দির? কালীমন্দির?। 

নাহ্, বিষ্ণুমন্দির বলত ওরাতবে কোনাে বিষ্ণুমূর্তি ছিল নাএকটি দেবী ছিলহিন্দুরা বলত রুকমিনী দেবী। 

তুমি মন্দিরে যেতে কী জন্যে? এমনি যেতামছােট বাচ্চা পুতুল খেলে না?” 

কী করতে সেখানে?দেবীমূর্তির সাথে গল্পগুজব করতামছেলেমানুষি খেলা আর কি

বলতেবলতে রানু খিলখিল করে হেসে উঠলআনিস স্পষ্ট শুনল সঙ্গেসঙ্গে ঝমঝম করে কোথাও নূপুর বাজছেরানু তীক্ষ কণ্ঠে বলল, শুনতে পাচ্ছ?” 

কী শুনব?নূপুরের শব্দ শুনছ না?আনিস দৃঢ় স্বরে বলল, নাতুমি ঘুমাও রানুআমার ঘুম আসছে নাশুয়ে থাকতুমি অসুস্থরানু ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, হ্যা, আমি অসুস্থতােমাকে খুব বড় ডাক্তার দেখাব আমিআচ্ছাএখন শুয়ে থাকরানু মৃদু স্বরে বলল, আমি দেবীকে গান গেয়ে শােনাতামসব অন্য দিন শুনবআজ রাতে আমার বলতে ইচ্ছে করছে‘ 

দেবী উপন্যাস -পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

আনিস এসে রানুর হাত ধরল গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরেআনিস অবাক হয়ে বলল, তােমার গা তাে পুড়ে যাচ্ছে

হুঁ, বড় গরম লাগছেফ্যানটা ছাড়বে?আনিস উঠে গিয়ে জানালা খুলে দিলঘর ভর্তি হয়ে গেল ফুলের গন্ধেআর তখনি রানু অত্যন্ত নিচু গলায় গুনগুন করে কী যেন গাইতে লাগলঅদ্ভুত অপার্থিব কোনােএকটা সুরযা জগতের কিছু নয়অন্য কোনাে ভুবনেররান্নাঘর থেকে জিতু ডাকতে লাগল, ভাইজান, ভাইজান‘ 

আনিস রানুকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে গায়ের চাদর টেনে দিল জিতুকে বলল, ঘরে যেন না আসেতারপর নেমে গেল নিচে, বাড়িঅলার মেয়েটিকে খবর দিয়ে নিয়ে আসতে। 

নীলু এল সঙ্গে সঙ্গেআনিস দেখল রানু শিশুর মতাে ঘুমাচ্ছেজিতু মিয়া শুধু জেগে আছেকাঁদছে ব্যাকুল হয়েনীলুর সঙ্গে তার বাবাও আসছেনতিনি অবাক হয়ে বললেন, হয়েছেটা কি?আনিস ভাঙা গলায় বলল, বুঝতে পারছি 

, কেমন যেন করছে। 

কী করছে?” 

আনিস জবাব দিল নানীলু বলল, ‘বাবা, তুমি শুয়ে থাক গিয়ে, আমি এখানে থাকিরাত তাে বেশি নেইভদ্রলােক কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিচে নেমে গেলেনযাবার সময় বলে গেলেন, হাসপাতালে নিতে হলে বলবেন, ড্রাইভারকে ডেকে তুলব‘ 

দেবী উপন্যাস -পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

জ্বি আচ্ছারানু বাকি রাতটা ঘুমিয়ে কাটালএকবারও জাগল নানীলু সারাক্ষণ তার পাশে রইল আনিসের সঙ্গে তার কথাবার্তা কিছু হলাে নাআনিস বসার ঘরের সােফায় বসে ঝিমুতে লাগল। 

মিসির আলি লােকটির ধৈর্য প্রায় সীমাহীনহাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি দ্বিতীয় দফায় রানুদের গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হলেনতার সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক ভদ্রলােক, জয়নাল সাহেবউদ্দেশ্য রুমিনী দেবীর মন্দির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। 

জয়নাল সাহেব মন্দির দেখে বিশেষ উল্লসিত হলেন নাতিন বৎসরের বেশি এর বয়স হবে নারকম ভগ্নস্তুপ দেশে অসংখ্য আছেমিসির আলি বললেন, তেমন পুরােনাে নয় বলছেন?” 

না রে ভাইইটের সাইজ দেখলেই বুঝবেনভেঙে টেঙে কী অবস্থা হয়েছে দেখেন!‘ 

যত্ন হয় নিমন্দির যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি হয়তাে মারা গেছেন কিংবা তার উৎসাহ মিইয়ে গেছে‘ 

গ্রামের লােকজনের কাছ থেকে অল্প কিছু তথ্য পাওয়া গেলপালবাবুদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরপালরা স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেনতার পরপরই তাদের ভাগ্যবিপর্যয় শুরু হয়তিনচার বছরের মধ্যে পালরা নির্বংশ হয়ে পড়েদেবীকে তুষ্ট করার জন্যে তখন এক রাতে কুমারী বলির আয়ােজন করা হয়বার বছরের একটা কুমারীকন্যাকে অমাবস্যার রাত্রিতে মন্দিরের সামনে বলি দেয়া হয়দেবীর তুষ্টি হয় না তাতেওপাথরের মূর্তি এত সহজে বােধহয় তুষ্ট হয়

তবে গ্রামের মানুষেরা নাকি বলি দেয়া মেয়েটিকে এর পর থেকে গ্রামময় ছুটোছুটি করতে দেখেময়মনসিংহ থেকে ইংরেজ পুলিশ সুপার এসে মন্দির তালাবন্ধ করে পালদের দুই ভাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান। 

Leave a comment

Your email address will not be published.