দেবী উপন্যাস -পর্ব-(২)-হুমায়ুন আহমেদ

ঝন্‌ঝন্ করে আরেকটা কাচ ভাঙলরানু বলল, জিনিসটা হাসছেশুনতে পাচ্ছ না?বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আনিস কিছু শুনতে পেল না

দেবী উপন্যাস

তুমি বস তােআমি হারিকেন জ্বালাচ্ছি‘ 

না, তুমি আমাকে ধরে বসে থাক। 

আনিস অস্বস্তির সঙ্গে বলল, তুমি জানালাটার দিকে আর তাকিও না তাে!আনিস লক্ষ্য করল, রানু থরথর করে কাঁপছে, ওর গায়ের উত্তাপও বাড়ছেরানুকে সাহস দেবার জন্যে সে বলল, কোনাে দোয়াটোয়া পড়লে লাভ হবে? আয়াতুল কুর্সি জানি আমি আয়াতুল কুর্সি পড়ব?’ 

রানু জবাব দিল নাতার চোখ বড়বড় হয়ে উঠেছেমুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে নাকি? শ্বাস ফেলছে টেনেটেনে। 

এই রানু, এই। 

কোনােই সাড়া নেইআনিস হারিকেন জ্বালালরান্নাঘর থেকে খুটখুট শব্দ আসছেইদুর, এতে সন্দেহ নেইতবু কেন জানি ভালাে লাগছে নাআনিস বারান্দায় এসে ডাকল, রহমান সাহেব, রহমান সাহেবরহমান সাহেব বােধহয় জেগেই ছিলেনসঙ্গে সঙ্গে বেরুলেন। 

কী ব্যাপার? আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। 

কী হয়েছে? বুঝতে পারছি না।‘ 

হাসপাতালে নিতে হবে নাকি?বুঝতে পারছি নাআপনি যান, আমি আসছিএক্ষুণি আসছি। 

আনিস ঘরে ফিরে গেলমনের ভুল, নিঃসন্দেহে মনের ভুলআনিসের মনে হলাে সে ঘরের ভেতর গিয়ে দাঁড়ানােমাত্র কেউএক জন যেন দরজার আড়ালে সরে পড়লরােগা, লম্বা একটি মানুষআনিস ডাকল, রানুরানু তৎক্ষণাৎ সাড়া দিল, কি?‘ 

ইলেকট্রিসিটি চলে এল তখনইতার কিছুক্ষণের মধ্যেই রহমান সাহেব এসে উপস্থিত হলেনউদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, এখন কেমন অবস্থা?রানু অবাক হয়ে বলল, কিসের অবস্থা? কী হয়েছে

রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেনআনিস বলল, তােমার শরীর খারাপ করেছিল, তাই ওঁকে ডেকেছিলামএখন কেমন লাগছে

ভালােরানু উঠে বসলরহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, এখন আমি ভালাে। 

রহমান সাহেব তবুও মিনিট দশেক বসলেনআনিস বলল, আপনি কি ছাদে দাপাদাপি শুনেছেন

সে তাে রােজই শুনিবাঁদরের উৎপাতআমিও তাই ভাবছিলাম।’ খুব জ্বালাতন করেদিনেদুপুরে ঘর থেকে খাবারদাবার নিয়ে যায়‘ 

তাই নাকি?” 

জ্বি। নতুন এসেছেন তাে! কয়েক দিন যাক, টের পাবেনবাড়িঅলাকে বলেছিলাম গ্রিল দিতেতা দেবে নাআপনার সঙ্গে দেখা হলে আপনিও বলবেনসবাই মিলে চেপে ধরতে হবে‘ 

জ্বি, আমি বলবআপনি কি চা খাবেন নাকি এক কাপ?” 

আরে না না! এই রাত আড়াইটার সময় চা খাব নাকি, কী যে বলেন! উঠি ভাই কোনাে অসুবিধা দেখলে ডাকবেন। 

ভদ্রলােক উঠে পড়লেনরানু চাপা স্বরে বলল, এই রাতদুপুরে ভদ্রলােককে ডেকে আনলে কেন? কী মনে করলেন উনি

তুমি যা শুরু করেছিলে! ভয় পেয়েই ভদ্রলােককে ডাকলাম। 

কী করেছিলাম আমি? অনেক কাণ্ড করেছএখন তুমি কেমন, সেটা বলভালাে‘ 

কী রকম ভালাে?বেশ ভালাে‘ 

ভয় লাগছে না আর?নাহ‘ 

রানু বিছানা থেকে নেমে পড়লসে বেশ সহজ স্বাভাবিকভয়ের কোনাে চিহ্নও নেই চোখেমুখেশাড়ি কোমরে জড়িয়ে ঘরের পানি সরাবার ব্যবস্থা করছে। 

সকালে যা করবার করবেএখন এসব রাখ তােইস্, কী অবস্থা হয়েছে দেখ না! হােক, এস তাে এদিকেরানু হাসিহাসি মুখে এগিয়ে এলএখন আর তােমার ভয় লাগছে না?না‘ 

জানালার পাশে কে যেন দাঁড়িয়েছিল বলেছিলে?এখন কেউ নেইআর থাকলেও কিছু যায় আসে না। 

আনিস দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরালহালকা গলায় বলল, এক কাপ চা করতে পারবে?‘ 

চা, এত রাতে!এখন আর ঘুম আসবে না, কর দেখি এক কাপ‘ 

রানু চা বানাতে গেলকিছুক্ষণের মধ্যেই পানি ফোটার শব্দ হলােবাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝম করেরানু একাএকা রান্নাঘরে। কে বলবে এই মেয়েটিই অল্প কিছুক্ষণ আগে ভয়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিল! ছাদে আবার ঝুপঝুপ শব্দ হচ্ছেএই বৃষ্টির মধ্যে বানর এসেছে নাকি? আনিস উঠে গিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিলহালকা গলায় বলল, ছাদে বড় ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে?রানু জবাব দিল না। 

আনিস বলল, এই বাড়িটা ছেড়ে দেবসস্তায় রকম বাড়ি আর পাবে নাদেখি পাই কি না‘ 

চায়ে চিনি হয়েছে তােমার?হয়েছেতুমি নিলে না?” 

নাহ্, রাতদুপুরে চা খেলে আমার আর ঘুম হবে নারানু হাই তুলল। আনিস বলল, এখন বল তাে তােমার স্বপ্নবৃত্তান্তকোন স্বপ্নের কথা?যে স্বপ্ন দেখলে! একটা বেঁটে লােক। 

কখন আবার এই স্বপ্ন দেখলাম? কী যে তুমি বল

Leave a comment

Your email address will not be published.