নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১৫)

তাঁর যুক্তি হচ্ছে জরীর মতাে একটি ভালাে মেয়ের জন্যে এরকম এক জন ভাবুক ছেলেই দরকার, যে গল্পকবিতা লেখেজরী সুখ পাবে। কিন্তু আপত্তি উঠল সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে। বড়ােচাচা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। | তিনি সেদিন শয্যাশায়ী। দাঁতের ব্যথায় কাতর। সন্ধ্যাবেলা ঘরের বাতি জ্বালেন 

নির্বাসননি। অন্ধকারে শুয়ে আছেন। জরী এসে কোমল গলায় ডাকল, ‘বড়ােচাচা। 

কি জরী? ‘আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি।’ বড়ােচাচা বিছানায় উঠে বসলেন। বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘বাতি জ্বালা, জরী। ‘না, বাতি জ্বালাতে হবে না। 

জরী এসে বসল তাঁর পাশে। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে, জরী? বড়ােচাচা, আমি “বল, কী ব্যাপার! জরী থেমে থেমে বলল, ‘বড়ােচাচা, আমি ঐ ছেলেটিকে বিয়ে করব না। ‘কেন, কী হয়েছে? ‘বড়ােচাচা, আমি আনিস ভাইকে বিয়ে করতে চাই।’ জুরী কাঁদতে লাগল। বড়ােচাচা স্তম্ভিত হয়ে বললেন, আনিস জানে? 

জরী ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘জানে। তাকে আসতে বলেছিলাম, তার নাকি লজ্জা লাগে। 

 দু জনেই বেশ কিছু সময় চুপচাপ কাটাল। বড়ােচাচা এক সময় বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। 

সে-রাতে তিনি একটুও ঘুমুতে পারলেন না। অনেক বার তাঁর ইচ্ছে হল তিনি আনিসের কাছে যান, কিন্তু তিনি নিজের ঘরেই বসে রইলেন। তাঁর অনেক পুরনাে কথা মনে পড়তে লাগল। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

জরীর অনেক অদ্ভুত আচরণ অর্থবহ হল। একটি মেয়ে তাে শুধু শুধু একা ছাদে বসে কাঁদতে পারে না। সে চোখের জলের কোনােনাকোনাে কোমল কারণ থাকে। আশ্চর্য! এ সব তার চোখ এড়িয়ে গেল কী করে? 

বিয়ে বড়ােচাচাই ভেঙে দিয়েছিলেন। যদিও কাউকেই বলেন নি, এত আগ্রহ যেবিয়ের জন্য ছিল হঠাৎ তা উবে গেল কেন। 

আজ জরীর বিয়ে হচ্ছে। এবং আশ্চর্য, সেই ছেলেটির সঙ্গেই। মাঝখানে একটি ভালােবাসার সবুজ পর্দা দুলছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কী? জীবন বহতা নদী। একটি মৃত্যুপথযাত্রী যুবকের জন্যে তার গতি কখনাে থেমে যায় না। থেমে যাওয়া উচিত নয়।। 

বড়ােচাচার কষ্ট হতে লাগল। জরীর জন্য কষ্ট। আনিসের জন্য কষ্ট। এবং সেই সঙ্গে তাঁর মৃত্যু স্ত্রীর জন্যে কষ্ট। তাঁর ইচ্ছে হল আবার আনিসের ঘরে যান। তার মাথায় হাত রেখে মৃদু গলায় বলেন, ‘আনিস তাের মনে আছে, এক বার আমার সঙ্গে জন্মাষ্টমীর মেলায় গিয়েছিলি, সেখানে 

তিনি আবার আনিসের ঘরে ফিরে এলেন। 

আনিস পা দোলাতে দোলাতে সিগারেট টানছিল। বড়ােচাচাকে দেখে সে সিগারেট লুকিয়ে ফেলল। 

‘কিছু বলবেন চাচা? ‘নানা, কিছু বলব না।’ বড়ােচাচা আবার ফিরে গেলেন। 

দুপুরের রােদ সরে গেছে। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

শীতের বিকেল বড় দ্রুত এসে যায়। বেলা তিনটে মােটে বাজে, এর মধ্যেই গাছের ছায়া হয়েছে দীর্ঘ, রােদ গিয়েছে নিভে। বৈকালিক চায়ের যােগাড়ে ব্যস্ত রয়েছেন জরীর মা। হাতে সময় খুব অল্প, সন্ধ্যা সাতটার আগেই বরাত্রী এসে যাবে। তারা খবর পাঠিয়েছে, নটার মধ্যেই যেন সব শেষ করে কনে বিদায় দিয়ে দেওয়া হয়। 

রান্নাবান্না হয়ে গিয়েছে। ছাদে টেবিলচেয়ার সাজানও শেষ। এক শবরযাত্রীকে এক বৈঠকেই খাইয়ে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে। বাড়ির সামনে ডেকোরেটররা চমৎকার গেট বানিয়েছে। সন্ধ্যার পরপরই ইলেকট্রিক বাল্বের আলােয় সেই গেট ঝলমল করবে। 

রীর বাবার অফিস সুপারিনটেনডেন্ট কি মনে করে যেন দুপুরবেলাতে এসে পড়েছেন। জয়ীর বাবা সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গেই আছেন। জরীর মার হাতে যদিও কোনাে কাজ নেই তবু তিনি মুহূর্তের জনেও ফুরসত পাচ্ছেন না। আজ তাঁর গােসলও করা 

হয় নি, দুপুরের খাওয়া হয় নি। সারাক্ষণই ব্যস্ত হয়ে ঘুরঘুর ক1%। | এখন তার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। তবু এই মাথাধরা নিয়েই বিরাট এiণ * চা বানিয়ে নিয়ে এসেছেন। 

পাড়ার মেয়ে এবং জরীর বন্ধুরা জরীকে ঘিরে বসেছিল। চা আসতেই অকারণ একটা ব্যস্ততা শুরু হল। কনক বলল, ‘জরী, তুই চা খাবি এক কাপ ? 

না, আমার শরীর খারাপ লাগছে। ‘খা না এক ঢােক।

Leave a comment

Your email address will not be published.