• Wednesday , 25 November 2020

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার ক্ষিধে নেই পুষ্প। 

আপনি কি রাগ করেছেন? রাগ করি নিকি নিয়ে রাগ করব আমি?” 

বাবু ভাই বলছিল, আপনি নাকি তাকে খুব বকা দিয়েছেনসে আপনার রাগ দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেতার ধারণা ছিল আপনি ফেরেশতার মত মানুষ। 

তােমার কি ধারণা ? আপনি খাওয়া শুরু করুন তারপর বলব। 

শওকত সাহেব খেতে বসলেনপুষ্প ঠিক তার সামনে বসেছেতার মুখ হাসি হাসিযেন কোন একটা ব্যাপারে সে খুব মজা পাচ্ছে। 

শওকত সাহেব বললেন, খাওয়া শুরু করেছি এখন বল আমার সম্পর্কে তােমার কি ধারণা

আজ বলবনাআপনি যেদিন চলে যাবেন সেদিন বলবতাছাড়া মার 

মনে হয় আপনাকে বলার দরকার নেইআমার মনে কি আছে তা আপনি ভালই জানেন। 

পুষ্প এত নিশ্চিন্ত হয়ে কথাগুলি বলল যে তিনি চমকে উঠলেনসেই চমক পুষ্পের চোখ এড়াল না। 

বাবু ছেলেটিকে তােমার কি খুব পছন্দ? হা পছন্দকতটুক পছন্দ? আপনি যতটুক ভাবছেন তার চেয়ে অনেক কমকেন পছন্দ বলতাে?” 

ওর মধ্যে কোন ভান নেইলুকোছাপা নেইযা তার মনে আসে সে তাই বলেযা তার ভাল লাগে করেআমরা কেউ তা পারি নাআপনার যা ইচ্ছা করে আপনি কি তা করতে পারবেন

নীল অপরাজিতা-পর্ব-শেষ

কেন পারবাে না?” 

না আপনি পারবেন নাআপনার সেই সাহস নেই, সেই ক্ষমতা নেইএই যে আমি আপনার এত কাছে বসে আছি আপনার যদি ইচ্ছেও করে আপনি আমার হাত ধরতে পারবেন না। 

পুষ্প। 

আমি তােমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি তুমি সত্যি জবাব দেবে?” 

পুষ্প বলল, আমি কখনাে, কোনদিনও আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলব নাআমি প্রতিজ্ঞা করেছি। 

কখন প্রতিজ্ঞা করলে

যেদিন আপনাকে প্রথম দেখলাম সেই দিনযেদিন পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। 

ভালবাসা সম্পর্কে আমার একটি থিওরী আছে তুমি কি শুনতে চাও? না আমি কিছুই শুনতে চাই নাআপনি কি প্রশ্ন করতে চাইছিলেন করুন। 

আমার সব সময় মনে হয়েছে বাবু ছেলেটিকে তুমি খবর দিয়ে এনেছতুমিআমার সঙ্গে এক ধরনের খেলা খেলতে চেয়েছতার জন্যে বাবুকে তােমার প্রয়ােজন ছিলআমার কথা কি ঠিক

‘হ্যা ঠিকআপনি আমাকে অবহেলা করছিলেন আমার সহ্য হচ্ছিল না। 

আপনি জানতে চেয়েছেন তাই বললামজানতে না চাইলে কোনদিনও বলতাম 

না। 

বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছেকরিম সাহেব ছাতা হাতে, মেয়েকে নিতে এসেছেনতিনি শওকত সাহেবকে বললেন, স্যার আপনিও চলুনবৃষ্টির মধ্যে একা একা থাকবেন। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-শেষ

শওকত সাহেব শীতল গলায় বললেন, আপনারা যানআমার অসুবিধা হবে 

আমার একা থাকতে ইচ্ছে করছে। 

রাত নটার দিকে বৃষ্টি নামল। 

তুমুল বর্ষণশওকত সাহেব বজরার ছাদে আরাম কেদারায় এসে গা এলিয়ে দিলেনতার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে তীব্র ইচ্ছামানুষ তার জীবনের 

অধিকাংশ সাধই পূর্ণ করতে পারে না, কিছু ছােট খাট সাধ পূর্ণ করতে পারে। 

বর্ষণ চললাে সারা রাতকখনাে একটু কমে আসে কখনাে বাড়েবাতাসে বজরা দুলতে থাকেতার বড় ভাল লাগে। 

শেষ রাতের দিকে জ্বরের ঘােরে তিনি আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেনতাঁর মনে হলাে রেনু যেন এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশেরেনু অবাক হয়ে বলছে কি হয়ছে তােমার, তুমি বৃষ্টিতে ভিজছ কেন

তিনি হাসি মুখে বললেন, বৃষ্টিতে ভিজলেও আমার কিচ্ছু হবে না রেনুআমি হচ্ছি ওয়াটার প্রুফযখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন W.P. টাইটেল পেয়েছিলামতােমার মনে নেই

রেনু বলল, তুমি কি কোন কারণে আমার উপর রাগ করেছ? নাকারাে উপর আমার কোন রাগ নেইতােমার উপর একেবারেই নেইকেন নেই বলতাে?” 

আমাদের ছােট মেয়েটি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেল, সেই সময়ের কথা কি তােমার মনে নেই রেনু? বেচারী দিনের পর দিন অসহ্য যন্ত্রণায় কি কষ্ট করলআমি তাকে একদিনও দেখতে যাই নি কারণ ওর রােগ যন্ত্রণা দেখাএবং দেখে সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল নাতােমার কোলে মাথা রেখেছটফট করছে, আমি ঘরে বসে লিখছিমারা যাবার সময়ও বার বার বলছিল বাবা কোথায় বাবা ?” 

থাক ওসব কথা। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-শেষ

না না থাকবে কেন তুমি শশান মেয়ে মারা যাবার পরেও তুমি কিন্তুআমার উপর রাগ করনিতুমি আমাকে সান্তনা দেয়ার জন্যে ছুটে এসেছিলে সেই তােমার উপর আমি কি করে রাগ করি?বৃষ্টির তােড় বাড়ছেবজরা খুব দুলছেশওকত সাহেবের মনে হল তিনি রেনুকে আর দেখতে পারছেন নানদীর তীরে পূষ্পকে দেখতে পাচ্ছেনপুষ্প ব্যাকুল হয়ে বলছেআপনি খুব ভাল করে আমাকে দেখে বলুনতাে আপনি যে ডিজাইনের অর্ধেক অংশের কথা বলছিলেন সেই অর্ধেক কি আমার কাছে? দুটি ডিজাইন একটু মিলিয়ে দেখবেন? তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের হাতে সময় বেশী নেই। 

কাছেই কোথাও বজ্রপাত হলবজ্রপাতের শব্দে সাধারণত পাখিরা চেঁচামেচি করে নাএইবার কেন জানি খুব চেঁচামেচি করছে

Related Posts

Leave A Comment