নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

নীল অপরাজিতা

তিনি ট্রেন থেকে নামলেন দুপুর বেলাদুপুর বলে বােঝার কোন উপায় নেইচারদিক অন্ধকার হয়ে আছেআকাশ মেঘে মেঘে কালােবৃষ্টি এখনাে নামেনি, তবে যে কোন মুহূর্তে নামবে বলে মনে হয়আষাঢ় মাসে বৃষ্টিবাদলার কোন ঠিক নেইএই বৃষ্টি এই রোদ

ময়মনসিংহ থেকে যখন ট্রেন ছাড়ল তখন আকাশ ছিল পরিষ্কারজানালার ওপাশে ঝকঝকে রােদতিন ঘণ্টা ট্রেনে কাটিয়ে ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন ঠাকরােকোনা নামের ষ্টেশনেকত দূর হবে, চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মাইল ! এই অল্পদূৱেই আকাশের এমন অবস্থা ? নাকি মেঘে মেঘে ময়মনসিংহ শহরও এখন ঢেকে গেছে

ট্রেন ছেড়ে যাবার পর তার মনে হল ঠিক ষ্টেশনে নেমেছেন তাে? ষ্টেশনের নাম পড়েন নিপাশে বসা এক ভদ্রলােক বললেন, এটাই ঠাকরােকোনা নামেন নামেনতিনিই অতি ব্যস্ত হয়ে জানালা দিয়ে স্যুটকেস, বেতের ঝুড়ি, হ্যাণ্ডব্যাগ নামিয়ে দিলেনতাঁর ব্যস্ততার কারণ অবশ্যি সঙ্গে সঙ্গে বােঝা গেল এখানে ট্রেন এক মিনিটের জন্যে থামেজিনিসপত্র সব নামানাের আগেই ট্রেন ছেড়ে দিলদুটি পানির বােতল ছিল, একটি নামানাে হলঅন্যটি রয়ে গেল সিটের নীচে। 

স্লমালিকুমআপনি কি শওকত সাহেব?তিনি জবাব দিলেন নাঅসম্ভব রােগা এবং আষাঢ় মাসের গরমে কালাে কোট পরা লােকটির দিকে তাকিয়ে হাসলেনস্যার আমার নাম মােফাজ্জল করিমআমি ময়নাতলা হাইস্কুলের এ্যাসিসটেন্ট হেডমাস্টার। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

মােফাজ্জল করিম সাহেব দুটো হাত বাড়িয়ে দিলেনমনে হচ্ছে হ্যাণ্ডশেক জাতীয় প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে চানমফস্বলের লােকজন হ্যাণ্ডশেক করার জন্যে দুটো হাত বাড়ায়এরা যা করে তাকে পাশ্চাত্যের হ্যাণ্ডশেক বলা যাবে নাপ্রক্রিয়াটির নাম খুব সম্ভব মােসাহাবাযার দ্বিতীয় অংশে আছে কোলাকুলি এই মুহূর্তে লােকটিকে জড়িয়ে ধরার কোন রকম ইচ্ছা তঁার হচ্ছে নাতিনি এমন ভাব করলেন যেন বাড়িয়ে দেয়া হাত দেখতে পাননিমােফাজ্জল করিম সাহেব তাতে খানিকটা অস্বস্তি ঠিকই বােধ করবেনতবে মফস্বলের লােকরা এই সব অস্বস্তি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে। 

‘করিম সাহেব আপনি ভাল আছেন তাে?জি স্যার ভালখুব ভালআপনার কোন তকলিফ হয় নাই তাে? আমি একবার ভেবেছিলাম ময়মনসিংহ থেকে আপনাকে নিয়ে আসবঘরে লােকজন নাইআমার স্ত্রী গত হয়েছেন দুই বৎসর আগে ভাদ্র মাসেসংসার দেখার কেউ নাইস্যার আপনার মালপত্র সব এইখানেজিতবে একটা পানির বােতল সীটের নীচে রয়ে গেছেকি সর্বনাশ

মােফাজ্জল করিম দ্রুত ষ্টেশনের দিকে রওনা হলেনতাঁর ভঙ্গি দেখে মনে হল পানির বােতল না, এক বাক্স হীরেজহরত সীটের নীচে রয়ে গেছেশওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেনপরিষ্কার বােঝা যাচ্ছে এই লােকটা যন্ত্রণা দেবেপ্রচুর কথা বলবেকারণে অকারণে এসে সময় নষ্ট করবেতিনি কুড়ি দিননিরিবিলিতে থেকে যে কাজটা করতে যাচ্ছেন তা করতে দেবে নাপানির বােতল ট্রেনে রয়ে গেছে শুনে লােকটি স্টেশনের দিকে ছুটে গিয়ে প্রমাণ করল, সে বেআক্কেল ধরনের এবং অতিরিক্ত উৎসাহীদুটা জিনিসই খুব বিপদজনক। 

নীল অপরাজিতা পর্ব-(১)

মােফাজ্জল করিমকে আসতে দেখা যাচ্ছেশওকত সাহেব আগে লক্ষ্য করেন নি, এখন লক্ষ্য করলেন লােকটির বগলে ছাতাডান বগলে ছাতা, সেই হিসেবে ডান হাতটা অকেজো থাকার কথা, দেখা যাচ্ছে লােকটার ডান হাত খুবই  সক্রিয়ছাতাটা যেন শরীরেরই অঙ্গ। 

স্যার ব্যবস্থা করে আসলামকি ব্যবস্থা করে আসলেন? স্টেশন মাস্টারকে বলেছি সে টেলিগ্রাফ পাঠিয়ে দিয়েছে বারহাট্টাবারহাট্রা স্টেশনে আমার ছাত্র আছেসে বােতল পাঠিয়ে দিবে। এত ঝামেলার কোন দরকার ছিল নাঝামেলা কিসের স্যার? কোন ঝামেলা নাআপনি আমাকে স্যার স্যার করছেন কেন?” 

মােফাজ্জল করিম বিস্মিত গলায় বললেন, স্যার বলব না? আপনি কি বলেন? এত বড় একজন মানুষ আপনি, এত বড় লেখকঅজ পাড়াগায়ে এসেছেনআমাদের পরম সৌভাগ্যআমি একবার ভেবেছিলাম স্কুল ছুটি দিয়ে সব ছাত্রদের নিয়ে আসি। 

শওকত সাহেব আঁৎকে উঠলেনকি ভয়াবহ কথাএই বিপদজনক মানুষটিই কি তার কেয়ার টেকার হিসাবে থাকবে? মনে হচ্ছে প্রথম দিনেই জীবন অতিষ্ট করে তুলবে। স্যার, স্টেশন মাস্টার সাহেব এক কাপ চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেনচলেন যাইচা এখন খেতে ইচ্ছা করছে না। 

একটা চুমুক দিবেননা হলে মনে কষ্ট পাবেএরা বিশিষ্ট লোকতাে কখনাে দেখে নাআপনার নামও শােনে নাইবই পড়াতাে দূরের কথাদোষ নাই কিছুঅজ পাড়া গা জায়গাস্যার আসেনজিনিসপত্র নিয়ে চিন্তা করবেন নালােক লাগিয়ে দিয়েছিএরা নৌকায় নিয়ে তুলে ফেলবে। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

নৌকায় যেতে হয় নাকি?” জিবেশী সময় লাগে নাদেড় থেকে দুঘন্টা। বাতাস আছেপাল তুলে দিব সঁ সঁ করে চলে যাবস্যার চলেনচাটা খেয়ে আসি। শওকত সাহেব বিরক্ত মুখে রওনা হলেন। 

মােটাসােটা থলথলে ধরনের স্টেশন মাস্টার সাহেব বিনয়ে প্রায় গলে পড়ে যাচ্ছেনতার চোখে দেব দর্শন জনিত আনন্দের আভাতিনি তার চেয়ার শওকত সাহবের জন্যে ছেড়ে দিয়ে নিজে একটা টুলে বসেছেন। অন্য একটা টুলে চায়ের কাপ, একটা পিরিচে দুটো নিমকিঅন্য আরেকটা পিরিচে বানানাে পান, পানের পাশে একটা সিগরেট এবং ম্যাচ

আয়ােজনের অভাব নেই। কিছু না বললে খারাপ দেখা যায় বলেই শওকত সাহেব বললেন, কি ভাল?  জ্বি স্যার ভালএকটু দোয়া রাখবেনজঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছি আজ নয়বছরবদলির জন্যে চেষ্টা কম করি নাইঅনেক ধরাধরি করেছি লাভ হয় নাই

মফস্বল থেকে চিঠি গেলে এৱা স্যার ফেলে দেয়খাম খুলে পড়েও নাপ্রসঙ্গ ঘুরাবার জন্য শওকত সাহেব বললেন, স্টেশন ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বিরাট একটা গাছ দেখলামকি গাছ এটা? | এটা স্যার শিরীষ গাছগত বৈশাখ মাসে গাছের ডাল ভেঙ্গে স্টেশন ঘরের উপরে পড়লঘর জখম হয়ে গেল। বৃষ্টি বাদলা হলে ঘরে পানি ঢুকে। রিপেয়ার কররি জন্য এই পর্যন্ত দুটা চিঠি লিখেছি কোন লাভ নাইওদের স্যার মফস্বলের জন্য আলাদা ফাইল আছেচিঠি গেলেই ঐ ফাইলে রেখে দেয়খুলেও পড়ে নাস্যার, সিগারেটটা ধরান, আপনার জন্য আনিয়েছি। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

শওকত সাহেব সিগারেট ধরালেনস্টেশন মাস্টার বললেন, গোল্ড লীফ ছাড়া ভাল কিছু পাওয়া যায় নাবেনসন আনতে পাঠিয়েছিলামপায় নাইমাঝে মধ্যে পাওয়া যায়দামী সিগারেট খাওয়ার লােক কোথায়? সবাই হত দরিদ্র। শওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, এই অঞ্চলের সবাই বেশী কথা বলে? যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে সেই কথা বলছেঅনবরত কথা বলছে

ভাগ্যিস মােফাজ্জল করিম সাহেব নেইতিনি নৌকার খোজ খবরে গেছেনতিনি থাকলে দু’জনের মধ্যে কথা বলার কম্পিটিশন শুরু হয়ে যেতমােফাজ্জল করিম সাহেব সম্ভবত জিততেনমাস্টারদের সঙ্গে কথা বলায় কেউ পারে না

 

Read More

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *