পাখি আমার একলা পাখি-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

 অপেক্ষা করতে থাক। 

মুনিয়া উঠে চলে গেল। 

আমি অলস ভঙ্গিতে সফিকের উপন্যাসের পাতা উল্টাচ্ছিআমারাে কিছু করার নেইরূপা খুব ভােরবেলায় সেজেগুজে বের হয়ে গেছেকোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করি নিসেও কিছু বলেনি

পাখি আমার একলা পাখিশুধু ঘর থেকে বেরুবার সময় বলল, দুদিন ধরে তুমি দাড়ি গােফ কামাচ্ছ নাতােমাকে দেখাচ্ছে ব্যর্থ প্রেমিকের মতআজ ফিরে এসে যেন তােমাকে ক্লীন শেভড় দেখতে পাই। 

এই পর্যায়ে আমি খুব সহজেই বলতে পারতাম, কখন ফিরবে? বলিনিবলতে ইচ্ছা করল না। 

রূপা যখন ঘরে থাকে না তখন আমারাে ঘরে থাকতে ইচ্ছা করে নাতারপরেও আজ সারাদিন ঘরেই ছিলামএখন আর ঘরে থাকতে ইচ্ছা করছে নাসফিকের উপন্যাসের নায়কের মত রাস্তায় নেমে পড়তে ইচ্ছা করছেসাইকেল থাকলে ভাল হতসাইকেলে করে ঘুরতামসফিকের উপন্যাসের নায়ক লােকমান রাতের বেলা সাইকেলে করে ঘুরে এবং মাঝে মাঝে সাইকেলের সঙ্গে গল্প করেসাধারণত সাইকেলের সঙ্গে আলাপ আলােচনা খুব দার্শনিক ধরনের হয়যেমন নায়ক বলল

পথের শেষ কোথায়

সাইকেল টুনটুন করে ঘণ্টা বাজিয়ে ঘণ্টাতেই উত্তর দিল, পথের শুরুতেই হচ্ছে পথের শেষ। 

তার মানে কি? মানে খুব সহজশুরুই শেষআবাশেষই শুরুবুঝতে পারছি না

পাখি আমার একলা পাখি-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

বুঝতে না পারার কিছু নেইপথ হচ্ছে জীবনের মতজীবনের শেষ হচ্ছে জীবনের শুরুতেপথের বেলাতেও তাই। 

তাহলে ভালবাসার শেষ কোথায়

ভালবাসার শেষ হচ্ছে ঘৃণার শুরুতে ...। 

লােকমান সাহেব এবং সাইকেলের কথাবার্তার এই হচ্ছে সামান্য নমুনাউপন্যাস যত এগুতে থাকে কথাবার্তা ততই জটিল হতে থাকে। এমন দার্শনিক ধরনের সাইকেল লােকমান কোথায় পেয়েছে কে জানে। 

আমি কাপড় পাল্টালামঠিক করলাম রাত এগারোটা পর্যন্ত বাইরে থাকববাসায় ফিরে এসে যেন দেখি লাবণ্য ফিরেছে, রূপাও ফিরেছেমুনিয়া শান্ত হয়েছে। 

বাড়ি থেকে বের হবার আগে বাবার ঘরে উকি দিলামবাবা অবেলায় বিছনায় শুয়ে আছেনতিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, কে

বাবা আমি রঞ্জুকি ব্যাপার ? আপনার কাছে কি হাজার তিনেক টাকা হবে?কি জন্যে ? আমার একটু দরকার ছিল, ব্যক্তিগত প্রয়ােজন। 

আমার টাকা তােমার ব্যক্তিগত প্রয়ােজন মেটানাের জন্যে তা মনে করার কোন কারণ দেখছি না‘ 

পাখি আমার একলা পাখি-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

আচ্ছা, তাহলে থাকপ্রয়ােজনটা কি ? ভাবছি একটা সাইকেল কিনববাবা বিছানায় উঠে বসলেনতীক্ষ গলায় বললেন, কি বললে

একটা সাইকেল কিনব।” হােয়াই?রাতে রাস্তায় ট্রাফিক কম থাকেতখন সাইকেলে করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব।” 

‘রাতের বেলা সাইকেলে করে ঘুরে বেড়ানাে খুন ইন্টারেস্টিং। 

তােমাকে কে বলেছে? লােকমানলােকমানটা কে? সফিক একটা উপন্যাস লিখেছে তার নায়কতুমি সামনের চেয়ারটায় বস। 

আমি বসলামবুঝতে পারছি বাবা নিজেকে গুছিয়ে নিতে সময় নিচ্ছেনকি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না।  

দ্ধি। 

তােমার ব্যাপার আমি কিছুই বুঝতে পারছি নাএইসব কি বলছ? বাবুর কাণ্ডকারখানারও কোন আগা মাথা পাচ্ছি না সে দেখি বারান্দায় ক্যাম্পখাটে ঘুমুচ্ছেতাকে বললাম, কি ব্যাপার ? সে বলল, চিলেকোঠার ঘরে তার নাকি একা ঘুমুতে ভয় লাগে। ভূতের উপদ্রপ। 

আমি সহজ গলায় বললাম, একটা ভূত তাকে খুব বিরক্ত করছেঘুমুলেই কড়া নেড়ে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়জন্যেই বারান্দায় ঘুমুচ্ছে। বারান্দায় তাে আর কড়া নাড়ার কোন ব্যবস্থা নেই

পাখি আমার একলা পাখি-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

বাবা অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আচ্ছা তুমি যাওতিন হাজার টাকা আমি তােমাকে দেবএখন দিতে পারছি নাব্যাংক থেকে তুলতে হবেলােকমানের মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। 

লােকমানের মত আমি ঘণ্টাখানিক রাস্তায় হাঁটলামতারপর গেলাম সফিকের খোঁজে। 

যথারীতি সফিক নেই। তার বােন সুমি বিস্মিত হয়ে বললাে, আপনি? আপনি কোখেকে

আমি বললাম, যাচ্ছিলাম এইদিক দিয়েভাবলাম, দেখি সফিক আছে কিনাতার বইটা পড়া ধরেছিদশপাতা পড়েছি। 

এক সপ্তাহে মাত্র দশপাতা

ধীরে ধীরে পড়ছিআমি তােদের মতাে দ্রুত পড়তে পারি নাচা খাওয়াতে পারিস? বিকেলে চা খাওয়া হয়নি। 

এখন তাে চা খাওয়াতে পারবাে নাআমরা সব বিয়েবাড়িতে যাচ্ছিএম্নিতেই আমাদের দেরি হয়ে গেছে। 

আচ্ছাআমি ভেবেছিলাম খানিকক্ষণ তাের সঙ্গে গল্প করবােসুমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলকি একটা বলতে গিয়েও বলল নাসে বিয়েবাড়ি উপলক্ষে সাজসজ্জা করেছেকিছু কিছু মেয়ে আছে যাদের সাজলে খারাপ দেখায়সুমি তাদের একজনতাকে রীতিমতো কুৎসিত দেখাচ্ছে

পাখি আমার একলা পাখি-পর্ব-(২০)-হুমায়ুন আহমেদ

সুমি বলল, আপনি কি বিশেষ কোনাে প্রসঙ্গে আলাপ করতে চান ?

আজ নাঅন্য আরেকদিন আসুনঅবশ্যি আমার মনে হয় না আপনি 

আলাপ করতে চানআপনি কথার কথা বলেছেনকেউ যখন কথার কথা বলে তখন সেটা বােঝা যায়আচ্ছা আপনার কি কোনাে কারণে মনটন খারাপ

না তাে” 

আপনাকে কেমন যেন অসুস্থ অসুস্থ লাগছেআপনি বাসায় চলে যানবাসায় গিয়ে আরাম করে ঘুমানভাবী কেমন আছেন?” 

ভালােভাবী সিনেমা করছেন এটা কি সত্যি?হ্যা সত্যি। 

আচ্ছা, উনি নাকি অসম্ভব রূপবতীভাইয়া বলছিল হেলেন অব ট্রয় তাঁকে দেখলে অপমানে গলায় দড়ি দিতসত্যি

সেটা হেলেন অব ট্রয়কে জিজ্ঞেস করাটাই কি উচিত না?উনাকে তাে পাচ্ছি নাতাই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি” 

Leave a comment

Your email address will not be published.