পারুল ও তিনটি কুকুর – হুমায়ূন আহমেদ

হিমুর বিয়ে – হুমায়ূন আহমেদ

টক-টক করে ঘড়ির শব্দ

কিছুক্ষণ আগেও টক-টক করে ঘড়ির শব্দ হচ্ছিল।

এখন সেই শব্দও শোনা যাচ্ছে না। পুরো বাড়িটা হঠাৎ করেই যেন শব্দহীন হয়ে গেল। এত বড় একটা বাড়িতে কত রকমের শব্দ হবার কথা–বাতাসের শব্দ, পর্দা নড়ার শব্দ, টিকটিকি ডেকে ওঠার শব্দ। এখন কিছু নেই। এই যে পারুল নিঃশ্বাস ফেলছে সেই নিঃশ্বাসের শব্দও সে নিজে শুনতে পাচ্ছে না। আজ যে এটা প্রথম হচ্ছে তাই না, আগেও কয়েকবার হয়েছে। কেন এ রকম হয়? না কি পারুলের কোন অসুখ করেছে? বিচিত্র কোন অসুখ, যাতে মানুষ কিছু সময়ের জন্যে বধির হয়ে যায়। তার পৃথিবী হয় শব্দশুন্য। পৃথিবীতে কত ধরনের অসুখ আছে–এ ধরনের অসুখ থাকতেও তো পারে।

রাত কটা বাজে? দুটা না তিনটা? সময় জানার উপায় নেই। পারুল যে কামরায় শুয়েছে সেখানে কোন ঘড়ি নেই। ঘড়ি দেখতে হলে পাশের কামরায় যেতে হবে। সেখানে মানুষের চেয়েও উঁচু একটা ঘড়ি আছে। গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। সেই ঘড়ির। পেন্ডুলামই এতক্ষণ টক-টক করছিল। এখন করছে না, কিংবা হয়তো এখনো করছে, পারুল শুনতে পারছে না, কারণ তার বিচিত্র কোন অসুখ করেছে।

পারুল পাশ ফিরল। কান পেতে রাখল–পাশ ফেরার কারণে তোষকে কোন শব্দ হয় কি না। তাও হল না। কি আশ্চর্য কথা। সে ভয়ার্ত গলায় ডাকল, এই এই। শুনছ, এই।

তাহের সঙ্গে সঙ্গে বলল, উঁ।

এতে পারুলের ভয় কাটল। যে ভয় হঠাৎ আসে, সেই ভয় হঠাৎই কাটে। পারুল এখন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত বোধ করছে। দেয়াল ঘড়ির টক-টক শব্দটাও এখন পাওয়া যাচ্ছে। না, টক-টক শব্দ না, শব্দটা হল টক টকাস, টক টকাস। পারুল তাহেরের গায়ে একটা হাত তুলে দিল। তাহের কিছু বলল না। কারণ তার ঘুম ভাঙেনি। পারুলের ডাক শুনে সে উ বলেছে ঠিকই, সেই কথা ঘুমের মধ্যে বলা। জেগে থাকলে তাহেরের গায়ে হাত রাখা যেত না। বিরক্ত হয়ে সে হাত সরিয়ে দিত। শরীবের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে ঘুমুতে তার নাকি অসহ্য লাগে।

ঘামে তাহেরের গা ভেজা।

সে পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে শুয়েছে। ঘামে সেই পাঞ্জাবি ভিজে চপচপ করছে। অথচ গরম তেমন না। আজকের আবহাওয়া এম্নিতেই ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, তার উপর সিলিং ফ্যান রছে ফুল স্পীডে। মশারি খাটানো হয়নি বলে ফ্যানের পুরো বাসটা গায়ে লাগছে। জানালা খোলা। খোলা জানালা দিয়ে ভাল হাওয়া আসছে। পারুলের বরং শীত শীত লাগছে। অথচ মানুষটা কেমন ঘামছে। ঘামে ভেজা একটা মানুষের শরীরে হাত রাখতে ভাল লাগে না। কিন্তু হাতটা সরিয়ে নিতেও পারুলের ইচ্ছা করছে না। তার মনে হচ্ছে হাত সরিয়ে নিলেই আবার আগের মত হবে। জগৎ আবারো শব্দহীন হয়ে যাবে। তারচে ঘামে ভেজা মানুষের গা ঘেঁসে থাকা অনেক ভাল। পারুল তাহেরের আরো কাছে এসে ডাকল, এই এই।

তাহের সঙ্গে সঙ্গে বলল, উঁ।

কেমন জানি ভয় ভয় লাগছে। বাতি জ্বালিয়ে রাখি?

আচ্ছা।

তুমি কি ঘুমের মধ্যে কথা বলছ না, জেগে আছ?

উঁ!

উঁ আবার কি? ঠিক করে বল, জেগে আছ?

আছি।

পারুল মনে মনে হাসল। পৃথিবীতে কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষ থাকে। লোকটা ঘুমের মধ্যে কি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই না কথা বলছে। তার স্বভাব-চরিত্র না জানা থাকলে অন্য যে কেউ ভাববে সে জেগে।

ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলার অনেক মজা। পারুল তাহেরের সঙ্গে এই মজাটা মিই করে। এখনো করতে ইচ্ছা করছে। পারুল বলল, এই, ঠাণ্ডা পেপসি খাবে?

হুঁ।

আনব?

আন।

বরফ দিয়ে আনব না বরফ ছাড়া?

বরফ।

আচ্ছা বেশ, বরফ দিয়েই আনব। পেপসি খাবার পর কি খাবে? ইঁদুর মারা বিষ বে? র‍্যাটম?

হুঁ।

হুঁ না, মুখে বল। যদি খেতে চাও বল–খাব।

খাব।

পারুল খিলখিল করে খানিকক্ষণ হাসল। এই বাড়ির ছাদ অনেক উঁচু সে জন্যেই বোধহয় হাসির শব্দ অনেকক্ষণ ঘরে হলে থাকল। হাসা উচিত হয়নি। আসার কারণে। পারুলের ঘুম পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এখন আর বিছানায় শুয়ে থেকেও কিছু হবে না। শুধু শুধু শুয়ে থেকেই বা কি হবে? সে খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামল। এই ঘরের বাতি জ্বালানো যাবে না। কারণ বাতি চোখে পড়া মাত্র তাহের উঠে বসে বিরক্ত ভঙ্গিতে। বলবে–ব্যাপার কি? লাইট জ্বালাল কে?

পারুল পা টিপে টিপে পালের ঘরে যাচ্ছে। পাশের ঘরের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের সামনে বসে থাকতে তার মন্দ লাগে না। লম্বা পেন্ডুলামটা এমনভাবে দুলে মনে হয় ওটা কোন মন্ত্র না, জীবন্ত কিছু। হাত-পা দুলছে। এই ঘরে স্ট্যান্ড বসানো ছয় ফুট লম্বা একটা আয়নাও আছে। আয়নাটা পারুলের ভাল লাগে না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে সে অন্য একটা মেয়ে। অচেনা কেউ। বুকের মধ্যে ধ্বক করে ওঠে। তাহেরকে সে বেশ কয়েকবার বলেছে, আচ্ছা, এই আয়নায় নিজেকে দেখে আমি চমকে উঠি কেন?

তাহের বলেছে– এত বড় আয়না দেখে তো তোমার অভ্যেস নেই। সারাজীবন দেখেছ ছোট ছোট আয়না। এখন হঠাৎ করে নিজের পুরো শরীর দেখে চমকাচ্ছ। তাছাড়া…

তাছাড়া কি?

তোমার চমকানো রোগ আছে। অকারণেই তমি চমকাও।

কে বলল অকারণে চমকাই?

ঐদিন নিজের ছায়া দেখে চমকে চিৎকার করে উঠলে না?

ছায়া দেখে চমকানোর অবশ্যি কারণ ছিল। এই বাড়ির বাতিগুলি এমন যে, বিশ্রী বিশ্রী ছায়া পড়ে। গতকাল রাতে তার একটা সরু ছায়া পড়েছিল দেয়ালে। লম্বাটে লাঠির মত ছায়া–সেই লাঠিতে আবার হাত আছে, পা আছে। যে কোন মানুষ এটা দেখলে ভয়ে চিৎকার দিত।

এই বাড়িটায় কিছু আছে কি না কে জানে। কিছু কিছু বাড়ি থাকে দেশ লাগা। জীবন্ত প্রাণীর মত স্বভাব থাকে সেসব বাড়ির। জীবন্ত প্রাণী যেমন মানুষকে আগ্রহ। নিয়ে দেখে–দোষ লাগা বাড়িগুলিও তাই করে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। এই যে পারুল চুপি চুপি পাশের ঘরে যাচ্ছে–বাড়িটা সে ব্যাপারটা দেখছে। আগ্রহ নিয়েই দেছে। পারুলের ভয় ভয় করছে–ইচ্ছা করছে আবার তাহেরের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়তে। এই বাড়িতে বেশিদিন থাকা ঠিক হবে না। বেশিদিন থাকলে ভয়েই পারুলের কোন অসুখ-বিসুখ হয়ে যাবে। শরীরের এই অবস্থায় অসুখ-বিসুখ হওয়া ভাল না। পারুলের এখন দুমাস চলছে। এই সময়টাই সবচে খারাপ সময়। বেশিরভাগ এবোরশন এই সময়ে হয়।

তাদের অবশ্যি বেশিদিন থাকতে হবে না। আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত থাকবে। মঙ্গলবার আসতে আর মাত্র চারদিন।

অন্ধকারে সুইচ বোর্ড খুঁজে পাওয়া যায় না। দিক এলোমেলো হয়ে যায়। পুবকে মনে হয় পশ্চিম। পশ্চিমকে মনে হয় দক্ষিণ। পারুলের ভাগ্য ভাল, প্রথমবারেই সে সুইচ খুঁজে পেল। বাতি জ্বালাল। তার সামনেই আমন। পানি দেখলে যেমন ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে, আয়না দেখলেই তেমন তাকাতে ইচ্ছা করে। আয়নার ভেতর। নিজেকে দেখতে ইচ্ছা করে। পারুল কিন্তু তাকাল না। চোখ ঘুরিয়ে নিল এ্যাডফাদার ক্লকে। কি সুন্দর তালে তালে শব্দ হচ্ছে—টক-টকাস, টক-টকাস। তার প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে মাথা ঘুরিয়ে আয়নাটার দিকে তাকাতে। এত জোরালো ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করতে হলে এই ঘরে থাকা যাবে না। পারুল বসার ঘরের দিকে রওনা হল।

বসার ঘরের সুইচ বোর্ডে অনেকগুলি সুইচ। তার ইচ্ছা করছে ঝাড়বাতির সুইচটা জ্বালাতে। এই বাড়ির ঝাড়বাতি কি যে সুন্দর! মনে হয় দশ হাজার মোমবাতি এক সঙ্গে জ্বলে ওঠে। শুধু জ্বলেই শেষ না–জোনাকি পোকার মত মিটমিট করতে থাকে। এরকম একটা ঝাড়বাতির দাম কত হবে? তাহের সারা জীবন কত টাকা রোজগার করবে তা দিয়ে কি একটা ঝাড়বাতি কেনা যাবে? মনে হয় না। তবে মানুষের ভাগ্য তো। কিছুই বলা যায় না। পথের ফকিরও কোটিপতি হয়। তাদের জীবনেও এমন কিছু ঘটতে পারে। যদি ঘটে তাহলে পারুল ঠিক করে রেখেছে সে প্রথম যে জিনিসটা করবে তা হচ্ছে–ঝাড়বাতি কেনা। ঠিক এরকম একটা ঝাড়বাতি। ঝাড়বাতিটা সে শুধু জ্বালাবে বিশেষ বিশেষ রাতে। যেমন তাদের বিয়ের রাত।

পারুল সুইচ টিলপ। ফ্যানের শব্দ হচ্ছে। ফ্যান ঘুরছে। সুইচ অফ করতে ইচ্ছা করছে না। ঘুরুক ফ্যান। ইলেকট্রিসিটি খরচ হচ্ছে? হোক না। তাদের তো আর ইলেকট্রিসিটির বিল দিতে হবে না। যার বাড়ি তিনি দেবেন এবং তিনি নিশ্চয়ই লেকট্রিসিটির বিলের মত তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামান না। হয়ত কোনদিন দেখেনও কত বিল এসেছে। পারুল আরেকটা সুইচ টিপল–রকিং চেয়ারের পাশে লম্বা চার ল্যাম্প জ্বলে উঠল। জোর ল্যাম্পের আলো নীলভি। কেমন যেন চাঁদের আলোর ত মায়া মায়া ধরনের আলো। সবগুলি সুইচ টিপে ধরলে কেমন হয়? যার বাড়ি তিনি তো আর আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখেছেন না–পারুল কি করছে।

যার বাড়ি তার নাম মেসবাউল করিম। তিনি আছেন হাজার হাজার মাইল দূরে। সুইজারল্যান্ড নামের একটা দেশে। যে শহরে আছেন সে শহরের নাম কেপহর্ন সিটি। সেই সিটি পাহাড়ের উপর। পাহাড়ি বরফে ঢাকা। সবই তাহেরের কাছে শোনা। তাহের এমনভাবে চোখ বড় বড় করে গল্প করে যে পারুলের মনে হয়–সে বোধহয় বরফে ঢাকা কেপহর্ন সিটির পাহাড় নিজে গিয়ে দেখে এসেছে।

বুঝলে পারুলমণি–সে এক দেখার মত দৃশ্য। ঢেউয়ের মত পাহাড়ের সাড়ি। চূড়াগুলি বরফে ঢাকা। পাহাড়ের নিচে ঝাউবন। ঝাউবনের ফাঁকে ফাঁকে ছবির মত সব ভিলা। এরা বলে উইন্টার রিসোর্ট। ঐসব বাড়িতে যারা থাকে তারা কি করে জান? তারা ফায়ার প্রেসে আগুনের সামনে বসে। হাতে থাকে বিয়ারের ক্যান। বিয়ারের ক্যানে একটা করে চুমুক দেয় আর অলস চোখে তাকায় জানালার দিকে…

তুমি জানলে কি করে? তুমি কি দেখেছ কখনো?

সিনেমায় দেখেছি। বুঝলে পারুল, ঐ সব দেশ হচ্ছে যাকে বলে ভূস্বর্গ। আর আমাদের দেশ সেই তুলনায় ভূক। ময়লা নর্দমা। ডাস্টবিনে পচাগলা বিড়ালের। ডেডবড়ি, মুরগীর পাখনা, নাড়িভুড়ি। ফুটপাথগুলি হচ্ছে–হোমলেস মানুষের লেট্রিন। কোন সুন্দর দৃশ্য বলে কিছু নেই।

চল এক কাজ করি, এই দেশ ছেড়ে সুন্দর কোন দেশে চলে যাই।

তাহের কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, ঠাট্টা করছ? তোমাকে না বলেছি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবে না। ঠাট্টা করলে মনে কষ্ট পাই।

ঠাট্টা না। একদিন আমাদের প্রচুর টাকা হবে। লক্ষ লক্ষ টাকা। তখন আমরা। একটা ঝাড়বাতি কিনব। ঝাড়বাতিটা সঙ্গে নিয়ে এই দেশ ছেড়ে দূরের কোন সুন্দর দেশে চলে যাব।

তোমার মাথাটা খারাপ পারুল। সত্যি খারাপ।

পারুল সব কটা সুইচ জ্বালিয়ে দিল। বসার ঘটা এখন আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। সুন্দর লাগছে। পারুল নীল রঙের রকিং চেয়ারটায় বসল। চেয়ারটা। আপনাআপনি দুলছে। পারুলের মনে হল, এখন যদি কোন কারণে তাহেরের ঘুম ভেঙে যায়, সে ভয়ানক অবাক হবে। পারুলের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলবে–তোমার মাথাটা খারাপ পারুল। তোমার মাথাটা সত্যি খারাপ।

যার বাড়ি তিনি যদি পারুলকে দেখেন তাহলে তিনি কি ভাববেন? ধরা যাক, তিনি কেপহর্ন সিটি থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। পেন থেকে নেমে বিকল্প ট্যাক্সি ভাড়া করে সোজা চলে এসেছেন। দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছে। তিনি গেটের ভেতর ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলেন, কারণ ড্রয়িং রুমের সব বাতি জ্বলছে। তিনি দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বাতি জ্বলছে কেন? দারোয়ান বলল, জানি না, স্যার।

তিনি রাগী চোখে দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। দারোয়ান মাথা চুলকাতে কবে। তখন ড্রয়িং রুমে খুট করে শব্দ হবে। তিনি বলবেন না–ড্রয়িং রুমে কে? রোয়ান সে কথার জবাব না দিয়ে আরো দ্রুত মাথা চুলকাতে থাকবে।

মেসবাউল করিম সাহেবের কাছে চাবি আছে, তিনি সেই চাবি দিয়ে ড্রয়িং রুমের প্রজা খুলে দেখবেন অত্যন্ত পিবতী একটি মেয়ে রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে। গর ল্যাম্পের আলোয় তাকে পরীর মত দেখাচ্ছে। মেয়েটার গায়ে কাপড়ও বেশি ই। শুধু একটা শাড়ি। ঘুমুবার সময় সে শাড়ি ছাড়া আর কিছু পরতে পারে না। তিনি হতভম্ব গলায় বললেন, হু আর ইউ? তুমি কে?

আমি পারুল।

পারুল। পারুল কে? তুমি এখানে কি করছ?

দোল খাচ্ছি।

দোল থাছি মানে কি?

আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করছি না। আপনার রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছি। আর বাতিগুলি শুধু জ্বালিয়ে রেখেছি।

তুমি কে? তুমি আমার বাড়িতে ঢুকলে কি করে?

এত চেঁচিয়ে কথা বলছেন কেন? আমার স্বামী ঘুমুচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেলে ও খুব করে।।

স্বামী-সংসার নিয়ে উঠে এসেছ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কে তোমার স্বামী?

ওর নাম তাহের। আপনার গ্রাম সম্পর্কের চেনা মানুষ। আপনি যখন দেশের রে যান তখন ওকে বলেন মাঝে মাঝে আপনার বাড়ি পাহারা দিতে। ও হচ্ছে একজন পাহারাদার। ভদ্র ভাষায় কেয়ারটেকারও বলতে পারেন। বছরে এক মাস দু মাস সে আপনার বাড়ি পাহারা দেয়। বিনিময়ে প্রায় কিছুই পায় না। তারপরও হাসিমুখে পাহারা দেয় এই আশায় যে, একদিন আপনি তাকে কোন একটা সুবিধা করে দেবেন। কোন একটা চাকরি জোগাড় করে দেবেন। ও বেকার। এখন কি আপনি ওকে চিনতে পেরেছেন? সুন্দর মত চেহারা। লম্বা, মাথা ভর্তি চুল। সুন্দর হলে কি হবে—মাকাল ফল। কোন কাজের ফল না। চিনতে পারলেন?

হ্যাঁ। কিন্তু ও যে বিয়ে করেছে তা তো জানতাম না।

ওর বিয়ে তো এমন কোন বড় ব্যাপার না যে আপনার মত মানুষ জানবে। গরীব মানুষের আবার বিয়ে কি? আমরা বিয়ে করেছি কাজির অফিসে। আমাদের বিয়েতে কত খরচ হয়েছিল জানেন? সর্বমোট খরচ হয়েছে তিনশ একুশ টাকা। তারপরেও তাহের মুখ কালো করে বলেছে–ইস, এতগুলি টাকা চলে গেল।

তোমার এইসব কেচ্ছা কে শুনতে চাচ্ছে?

আহা, একটু শুনুন না। কেউ তো শুনতে চায় না। বিয়ের পর কি ঘটনা ঘটল শুনলে আপনার আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাবে। আমাদের গোপন বিয়ের ছবির পরদিন রাত। দশটার দিকে জানাজানি হয়ে গেল। আমি থাকি বড়চাচার সঙ্গে। তিনি হাউই বাজির মত লাফালাফি করতে লাগলেন। কি রাগ! তারপর তিনি করলেন কি জানেন–চাচীকে বললেন–লাথি দিয়ে হারামজাদীকে বের করে দাও। আমাকে রাত এগারোটায় সত্যি সত্যি বের করে দিল। আচ্ছা, গল্পটা কি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে? ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছেন কেন?

তুমি আমার বাড়িতে এসে জুটলে কি করে?

ও এনে তুলেছে। ওর একা একা থাকতে খারাপ লাগে, তাই নিয়ে এসেছে। নতুন বিয়ে তো, বৌকে সব সময় কাছে রাখতে ইচ্ছে করে। এর মত অবস্থায় পড়লে আপনিও তাই করতেন। ভাল কথা, আপনার স্ত্রীর নাম কি?

আমার স্ত্রীর নাম দিয়ে তোমার দরকার নেই। তাহের কোথায়?

একটু আগেই না আপনাকে বললাম, ঘুমুচ্ছে। পাশের ঘরে ঘুমুচ্ছে। ডাকব?

তোমরা কি আমার বেডরুমে ঘুমুচ্ছ?

ছি না। আপনার বেডরুম তালাবন্ধ। তালা খোলা হয়নি। এখন ঘুমুচ্ছি গেস্টরুমে। একতলায় আপনি যে ঘরে ওকে ঘুমুতে বলেছিলেন ও সেখানেই থাকত। কিন্তু আপনি বোধহয় জানেন ঐ ঘরের ফ্যানটা নষ্ট। ও আবার গরম সহ্য করতে পারে না। কাজেই আমরা দোতলায় গেস্টরুমে চলে এসেছি। ওর খুব ইচ্ছা ছিল গেস্টরুমের এসিটা চালানোর। চেষ্টাও করেছে। চলে না। আচ্ছা, আপনার গেস্টরুমের এসিটা কি নষ্ট?

গেস্টরুম তো তালাবন্ধ ছিল, তোমরা ঢুকলে কি করে?

আমি তালা খুলেছি। কি ভাবে খুলেছি জানেন? চুলের কাটা দিয়ে। চুলের কাটা দিয়ে তালা খোলায় আমি একজন বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশের যে কোন চোরের দল আমার এই প্রতিভার খবর পেলে আমাকে তাদের দলে নিয়ে নিত।

ঢং ঢং করে দুটা ঘন্টা পড়ল। গ্রান্ডফাদার ক্লকে দুটা বাজার সংকেত দিচ্ছে। পারুল চমকে উঠল। মনে হল ঘণ্টাগুলি ঠিক বুকের মধ্যে পড়েছে। অবিকল পরীক্ষার হলের ঘন্টার মত। আশ্চর্য, ঘণ্টার শব্দ থেমে যাচ্ছে না, ঘরে ভেসে বেড়াচ্ছে। টননননন শব্দ হচ্ছেই। এরকম তো কখনো হয় না। আজ হচ্ছে কেন? ঝাড়বাতিটাও দুলছে। আগে তো দুলেনি। ঘরে এত আলো। দিনের মত চরিদিক ঝক ঝক করছে, তারপরেও তীব্র ভয়ে পারুল অস্থির হয়ে গেল। ভয়ের আসল কারণ ঘণ্টার শব্দ না, ঝাড়বাতির দুলুনিও না–আসল কারণ হচ্ছে পারুলের মনে হচ্ছে মেসবাউল করিম নামের ঐ ভদ্রলোক সত্যি সত্যি চলে এসেছেন। একা আসেননি, পুলিশ নিয়ে এসেছেন। পুলিশ তাদের ধরিয়ে দেবেন। পুলিশ তাদের কোন কথাই শুনবে না–সরাসরি জেলখানায় ঢুকিয়ে দেবে। কখন ছড়িবে কে জানে? যদি সাত-আট মাস রেখে দেয় তাহলে তো সর্বনাশ। তখন বাবুর পৃথিবীতে আসার সময় হয়ে যাবে। তার জন্ম কি জেলখানায় হবে নাকি? তাদের যেন জেলখানায় না দেয়া হয় এই ব্যবস্থা করতে হবে। পারুল বলল–

আমরা যে আপনার গেস্টরুম দখল করে বসে আছি তার জন্যে কি আপনি রাগ করেছেন?

রাগ করারই তো কথা।

প্লীজ, রাগ করবেন না। আমাদের পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না। যদি না দেন তাহলে…।

তাহলে কি?

আপনাকে খুশি করার ব্যবস্থা করব।

আমাকে কিভাবে খুশি করবে?

পারুল বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসল, আর ঠিক তখন তাহেরের বিস্মিত গলা শোনা গেল–পারুল।

পারুল পাশ ফিরে দেখল–তাহের ঠিক তার পেছনে পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ শুকিয়ে এতটুক। সে তাকিয়ে আছে চোখ বড় বড় করে।

তার লঙ্গির গিঁট খুলে গেছে। এক হাতে সে লুঙ্গি সামলাচ্ছে। অন্য হাতে পর্দা ধরে।

পারুল!

কি?

করছ কি তুমি এখানে?

কিছু করছি না। ঘুম আসছে না তাই চেয়ারে বসে আছি। দোল খাচ্ছি।

তোমার কাণ্ডকারখানা আমি কিছুই বুঝি না। দুনিয়ার সব বাতি জ্বালিয়ে রেখেছ।

কি করব, ভয় লাগে যে!

ভয় লাগলে আমাকে ডেকে তুলবে। কত করে বলেছি বাতি জ্বলাবে না। বাড়ির দারোয়ান আছে, সে দেখে কি না কি রিপোর্ট করবে।

রিপোর্ট করলে ভালই হয়।

ভাল হয় মানে?

পারুল চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, তুমি তো আর এই বাড়ির মালিকের র চাকরি কর না যে রিপোর্ট করলে তোমার চাকরি চলে যাবে। যা হবে তা হচ্ছে উনি তোমাকে আর কখনো পাহারা দিতে বলবেন না। তুমি বেঁচে যাবে।

বেঁচে যাবার কি আছে এর মধ্যে? বাড়ি পাহারা দেয়া এমন কি কঠিন কাজ?

তোমার জন্যে কঠিন না, আমার জন্যে কঠিন। এই বাড়িতে আর কিছুদিন থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব।

পারুল উঠে দাঁড়াল। তাহের বলল, তুমি যাচ্ছ কোথায়?

খিদে লেগেছে। আমি একটা বিস্কিট খাব আর এক কাপ চা খাব। তুমি চা খাবে।

রাত দুটার সময় আমি কোন দিন চা খাই?

খাও না বলেই খেতে বলছি। আজ খেয়ে দেখ, ভাল লাগবে।

তাহের বসার ঘরের সবগুলি বাতি নেভাল। ঘুমে তার চোখ জুড়িয়ে আসছে, তারপরেও সে গেল পারুলের পেছনে পেছনে। মেয়েটাকে এই বাড়িতে আনাই ভুল হয়েছে। বড়লোকি কাণ্ডকারখানা দেখে মাথা গেছে খারাপ হয়। মাথা খারাপ হবারই কথা।

স্টোভ থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। স্টোভে চায়ের কেতলি চাপিয়ে পারুল বসে আছে। এ বাড়িতে বিশাল রান্নাঘর আছে। একটি না, দুটি। একতলায় একটা, দোতলায় একটা। করিম সাহেব রান্নাঘর তালাবন্ধ করে গেছেন। তাহেরের জন্যে স্টোভ দিয়ে গেছেন। চাল-ডাল আছে, তার উপর প্রতিদিন ২৫ টাকা হিসেবে ৭৫০ টাকা, হাতখরচ হিসেবে আরো ২৫০। সব মিলিয়ে এক হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। সবই চকচকে ৫০ টাকার নোট–খরচ হতে মায়া লাগে। মাস প্রায় শেষ হতে চলল, খরচ হয়েছে চারশ। আর ছয়শ টাকা আছে। তাহের পারুলকে বাকি টাকা দিয়ে দিয়েছে। বিয়ের পর থেকে তো কখনো হাতে কিছু দেয়া হয়নি–থাকুক এই টাকাগুলি।

তাহের দেখল, পারুল দুকাপ চা বানাচ্ছে। গরম খানিকটা মিষ্টি পানি। কি হয় খৈলে? এই জিনিস পারুল এত আগ্রহ করে কেন খায় সে বুঝতে পারে না। রাত তিনটার সময় চা খেলে ঘুমের দফা রফা। তব খেতে হবে। বানানো জিনিস নষ্ট করা যায় না। চা বানাতে দেখেই তাহেরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সে প্রকাশ করল না। পোয়াতী বউয়ের সঙ্গে মেজাজ করতে নেই। মেজাজ করলে বাচ্চাও মেজাজী হবে। বড় হয়ে বাপ-মার সঙ্গে মেজাজ করবে। বাবার সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করবে।

পারুল বলল, আচ্ছা, তুমি কখনো হাত দেখিয়েছ?

তাহের কিছু বলল না। হাত দেখার প্রসঙ্গ কেন আসছে বুঝতে পারছে না। রাত তিনটা হল ঘুমের সময়, বকবকানির সময় না।

হাত দেখাও নি?

না।

আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন একজন বড় জ্যোতিষকে হাত দেখিয়েছিলাম। তিনি আমার হাত দেখে বলেছিলেন আমার হাতে মীন পুচ্ছ আছে।

তাহের চায়ের কাপে বিরক্ত মুখে চুমুক দিচ্ছে। স্ত্রীর হাতের মীন পুচ্ছের ব্যাপারে তার কোন আগ্রহ দেখা গেল না। পারুলের চোখ গল্প বলার উত্তেজনায় চকচক করছে।

মীন পুচ্ছ কাকে বলে জান? মনিবন্ধের কাছে মাছের লেজ্জের মত একটা চিহ্ন।

মীন পুচ্ছ থাকলে কি হয়?

টাকা হয়–লক্ষ লক্ষ টাকা। কোটি কোটি টাকা।

ও, আচ্ছা।

শুধু টাকা না–গাড়ি বাড়ি…দেখি তোমার হাতটা দেখি। আমার মনে হয় তোমার হাতে মীন পুচ্ছ আছে। কারণ আমার টাকা হওয়া মানে তো তোমারও হওয়া।–আমার মীন পুচ্ছ থাকলে তোমারও থাকতে হবে। হাতটা দাও তো।

তাহের চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বলল, চল শুয়ে পড়ি।

হাতটা দিতে বললাম না।

মীন পুচ্ছ-তুচ্ছ দেখে লাভ নেই। ঘুমতে চল।

এর আমার এখন ঘুম আসবে না।

ঘুম না আসলেও বিছানায় শুয়ে থাক।

পারুল বলল, শুধু শুধু বিছানায় শুয়ে থাকতে পারব না।

কি করবে? এখানে বসে থাকবে?

হুঁ।

এইসব পাগলামির কোন মানে হয়?

পারুল হাসছে। মনে হচ্ছে তাহেরের বিরক্তিতে সে মজা পাচ্ছে।

হাসছ কেন?

একটা কথা মনে করে হাসছি।

কি কথা।

ব্যাঞ্জের মাথা।

তাহেরের এখন রাগ লাগছে। কি কথা ব্যান্ডের মাথা জাতীয় ছেলেমানুষীর বয়স কি পারুলের আছে? দুদিন পর যে মেয়ে মা হতে যাচ্ছে। তাহের উঠে দাঁড়াল। পারুল বলল, চলে যাচ্ছি না কি?

হুঁ।

কথাটা শুনে যাবে না? আমি কেন হাসলাম না জেনেই চলে যাবে? কেন হাসছি জেনে তারপর চলে যাও। যখন চা বানাচ্ছিলাম তখন ঐ জ্যোতিষের কথা আমার মনে পড়ল। উনিও খুব চা খেতেন। এক কাপ চায়ে চার চামুচ করে তাঁর চিনি লাগত।

ঘাটনটি কি সেটা বল।

বলছি তো–তুমি এত তাড়াহুড়া করছ কেন? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এক্ষণি টন ধরতে যাবে। আরাম করে বোস তো। বাসে একটা সিগারেট খাও। আমি সিলেট এনে দিচ্ছি।

সিগারেট আনতে হবে না–আমি বসছি। কি বলবে তাড়াতাড়ি বল। স্টোটা নিভিয়ে দাও না–খামাখা তেল খরচ হচ্ছে।

আমি আরেক কাপ চা খাব। এই জন্যে স্টোভ জ্বালিয়ে রেখেছি।

তাহের হতাশ ভঙ্গিতে বসল। পারুল কেতলি আবার স্টোভে বসাতে বসাতে বয়ল, ঐ জ্যোতিষ ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ায় হঠাৎ গায়ে কাঁটা দিল। কেন বল তো?

আমি কি করে বলব কেন?

গায়ে কাঁটা দিল, কারণ উনি বলেছিলেন–অন্যের অর্থ আমার হাতে চলে সিলে। আমি ধনী হব পরের ধনে।

এতে গায়ে কাঁটা দেবার কি আছে?

গায়ে কাঁটা দেবার অনেক কিছুই আছে। পরের ধনে ধনী হবে কথাটা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল–আচ্ছা, এই মেসবাউল করিম সাহেবের ধনে আমরা ধনী হব না তো?

এইসব কি নাই, আজেবাজে কথা?

আমার যা মনে হল বললাম। রেগে যাচ্ছ কেন?

পাগলের মত কথাবার্তা বললে রাগব না?

পাগলের মত কথা তো বলছি না। এটা কি খুব অসম্ভব ব্যাপার?

তুমি নিজে খুব ভাল করেই জান এটা কত অসম্ভব।

মোটেই অসম্ভব না। ধর, ভদ্রলোক ঠিক করলেন–তিনি আরো এক বছর সুইজারল্যান্ড থাকবেন। কাজেই আমরা এক বছর থাকলাম এ বাড়িতে। এক বছর পর ভদ্রলোক মারা গেলেন। আমরা তখন…

তাহের রাগী গলায় বলল, এইসব আজেবাজে জিনিস কখনো ভাববে না। উনি মারা গেলে সব কিছু আমাদের হয়ে যাবে–এটা কেন মনে করছ? আমরা কে?

পারুল চায়ের কাপে চা ঢালছে। তাহের লক্ষ করল, পারুল চায়ে চার চামচ চিনি দিল। এম্নিতে সে দুচামচ চিনি খায়। আজ চার চামচ চিনি কেন নিচ্ছে? জ্যোতিষের কথা মনে করে? সেই বেটা চার চামচ চিনি স্মেত বলে পারুলকেও খেতে হবে?

তাহের বলল, ঐ জ্যোতিষ ভদ্রলোকের নাম কি?

উনার নাম অরবিন্দ দাস।

হিন্দু না কি?

হুঁ। চিরকুমার।

রেগুলার আসত তোমাদের বাসায়?

হুঁ। এসেই আমার হাত দেখতেন। আমার নাকি খুব ইন্টারেস্টিং হাত। হাতে। সোলেমানস রিংও আছে।

তাহের বিরক্ত গলায় বলল, সোলেমানস রিং-ফিং কিছু কিছু না। তোমার হাত ধরার লোভে আসত। এক ধরনের লোকই থাকে যারা মেয়েদের হাত ধরতে ওস্তাদ। ও নির্ঘাৎ এই কারণে আসত।

পারুল হাসতে হাসতে বলল, শেষের দিকে আমারও সেই রকম মনে হত। কারণ একদিন কি হল জান … একদিন হঠাৎ ভরদুপুরে তিনি এসে উপস্থিত। বড়চাচী ঘুমে, বাচ্চারা সব স্কুলে, শুধু আমি মেট্রিকের পড়া পড়ছি। আমি উনাকে এনে বসালাম। উনি বললেন–ঘরে খুব গোমট লাগছে, চল ছাদে যাই। আজ ম্যাগনিফ্রাইং গ্লাস নিয়ে এসেছি, তোমার হাত ভাল করে দেখব। আমি বললাম–চলুন। ছাদে যাওয়ার পর সিঁড়িতে…

তাহের অস্বস্তির সঙ্গে বলল, থামলে কেন? সিঁড়িতে কি?

থাক, শোনার দরকার নেই।

বল, কি হয়েছে শুনি।

তেমন কিছু হয়নি।

যা হয়েছে সেটাই শুনি …।

পারুল হাই তুলতে তুলতে বলল, কোন স্বামীরই উচিত না তার সুন্দরী স্ত্রীর জীবনের সব ঘটনা শোনা। একটা রূপবতী মেয়ের জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটে যা বলে বেড়ানোর না। চল ঘুমাতে যাই। আমার এখন ঘুম পাচ্ছে।

অরবিন্দ দাস–ঐ ভদ্রলোক থাকেন কোথায়?

কোথায় থাকেন জেনে কি করবে? দেখা করবে?

তাহের কিছু বলল না। তার মুখ খানিকটা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। পারুল জানে রেগে গেলে এই মানুষটার মুখে বিষণ্ণ ভাব চলে আসে। পারুল উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ভদ্রলোক ইন্ডিয়া চলে গছেন।

কবে গেছেন?

কবে গেছেন সেই দিন-তারিখ তো আমি জানি না। অনেকদিন বাসায় আসেন না, তারপর এক সময় শুনলাম ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন।

ছাদের সিঁড়িতে ঐ লোক কি করেছিল? চুমু খাবার চেষ্টা করেছিল?

প্রায় সে রকমই।

প্রায় সে রকমটা আবার কি?

বললাম তো স্ত্রীর জীবনকথা সব শুনতে নেই।

তুমি তখন কি করলে?

কখন কি করলাম?

এখন ঐ হারামজাদা তোমাকে চুমু খেতে চাইল তখন?

ভদ্রলোককে শুধু শুধু গালি দিচ্ছ কেন?

চুমু খেয়ে বেড়াবে আর আমি গালি দেব না?

গালি দিতে হলে আমি দেব। তুমি কেন দেবে? তোমাকে তো চুমু খায়নি।

তোমার সঙ্গে কথা বলাই উচিৎ না।

দুজন আবার এসে বিছানায় বসল। পারুল তাহেরের দিকে ঘন হয়ে এল। ঘুম জড়ানো হালকা গলায় বলল–অরবিন্দ দাসের কথা ভেবে মাথা গরম করো না তো। অরবিন্দ দাসের কথা আমি তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছি। আমার বাসার অবস্থা তুমি জান না? আমার চাচা-চাচী থাকতে কার কি সাধ্য আছে রোজ রোজ আমাদের বাসায় এসে আমার হাত ধরে বসে থাকার? আমার চাচা তাকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে। না? শুধু কি খাবে? খাওয়ার আগে কচলে ভর্তা বানিয়ে ফেলবে।

বানিয়ে বানিয়ে এ রকম গল্প বলার মানে কি?

তোমার ঘুম চটিয়ে দেবার জন্যে গল্পটা বলেছি। আমার চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই–আর তুমি আরাম করে ঘুমাবে, তা হবে না। এখন নিশ্চয়ই তোমার আর ঘুম দুম ভাব নেই–না কি আছে?

না, নেই।

তাহলে এক কাজ কর। আমাকে আদর কর। এমন রূপবতী একটা মেয়ে, তাকে তোমার আদর করতে ইচ্ছা করে না। আশ্চর্য!

০২. বাড়ির নাম নীলা হাউস

বাড়ির নাম নীলা হাউস।

বিনয় করে নাম রাখা হয়েছে হাউস। প্যালেস হলে মানাত। না, প্যালেস মানাত না। প্যালেসে প্রকাশ্য ব্যাপার থাকে। প্যালেস মানে দর্শনীয় কিছু। লোকজন দেখবে, অভিভূত হবে। এ বাড়ি বাইরে থেকে দেখা যায় না। তের ফুট উঁচু পাঁচিল দিয়ে বাড়ি ঘেরা। পাঁচিলের উপর আরো দুই ফুট ঘন করে কাটাতারের বেড়া। বাড়ির গেট লোহার। সাধারণত গেটের ফোঁকর দিয়ে বাড়ির খানিকটা দেখা যায়। এ বাড়ি গেটটি নিশ্চিদ্র লোহার। লখিন্দরের সূতা-সাপের ঢোকার ব্যবস্থাও নেই।

গেট পেরিয়ে কোনক্রমে ঢুকতে পারলে–কি সুন্দর বলে একটা চিৎকার দিতেই হবে। কারণ দোতলা বাড়ির ঠিক সামনেই নকল ঝিল করা হয়েছে। ঝিলে বাড়ির ছায়া পড়ে। আকাশের ছায়া পড়ে। বাড়িটাকে তখন মনে হয় আকাশ-মহল।

পারুল প্রথম দিনে বাড়ি দেখে চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে গেল–কারণ তার চোখে পড়ল তিনটা কুকুর। লাইন বেঁধে বসার মত এরা বসে আছে। গানের কালো পশম চিকচিক করে জ্বলছে। কুকুরের চোখ সাধারণত অন্ধকারে জ্বলে–এদের দিনেও জ্বলছে। তাহের বলল–কোন ভয় নেই।

পারুল প্রায় ফিস ফিস করে বলল, ভয় নেই কেন? এরা কি অতি ভদ্র কুকুর?

এরা মোটেই ভদ্ৰ না। ভয়ংকর কুকুর গ্রে হাউন্ড। নিমিষের মধ্যে তোমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।

করছে না কেন?

বিচার-বিবেচনা করছে।

তাহের স্ত্রীর কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে ডাকল, কামরুল, এই কামরুল।

বাড়ির পেছন থেকে লুঙ্গি পরা খালি গায়ের একটা লোক বের হয়ে এল। তার নাম কামরুল। কুকুর তিনটার দেখাশোনার দায়িত্ব তার। পারুল বিস্মিত হয়ে দেখল কামরুল নামের এই লোকটাও কুকুরগুলির মতই ছিপছিপে। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, লোকটার চোখও কুকুরের চোখের মতই জ্বল জ্বল করছে। পারুলের মনে হল–এই মানুষটা যদি হামাগুড়ি দিয়ে মার্টিতে হাঁটে, তাকে গ্রে হাউন্ডদের মতই দেখাবে।

তাহের হড়বড় করে বলল, শোন কামরুল, এ হল পারুল, আমার স্ত্রী, ও কয়েকদিন আমার সঙ্গে থাকবে। কুকুরগুলির সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দাও।

কামরুল নামের লোকটা হুম করে শব্দ করতেই একসঙ্গে তিনটা কুকুর জুটে এল। পারুল কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনটি কুকুরই তার গা শুকছে। তাদের গরম নিঃশ্বাস এসে গায়ে লাগছে। অস্বস্তিকর অবস্থা। পারুলের শরীর শিরশির করছে।

তাহের হাসিমুখে কলল, এরা তোমার গায়ের গন্ধ জেনে গেল। তোমাকে এরা আর কখনোই কিছু বলবে না।

ভুলে যদি কিছু বলে ফেলে? মানুষেরই ভুল হয় আর কুকুবের হবে না?

কুকুরের কখনো ভুল হবে না। ভয়ে শক্ত হয়ে যাবার কোন দরকার নেই। গায়ে হাত দাও–কিছু বলবে না।

পারুল তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এই শয়তানগুলির গায়ে হাত দেবার আমার কোন ইচ্ছা নেই। এরা যে গা শোঁকাশুঁকি করছে তাও আমার অসহ্য লাগছে। লোকটাকে বল কুকুর সরিয়ে নিয়ে যাক।

গন্ধ নেয়া হয়ে গেলে এরা আপনাতেই চলে যাবে এদের কিছু বলতে হবে না।

তাহেরের কথা শেষ হবার আগেই কুকুররা সরে গেল। ঠিক আগের জায়গায় গিয়ে মূর্তির মত বসে রইল। পারুল বলল, মরে গেলেও কুকুরগুলির সঙ্গে এই বাড়িতে আমি থাকতে পারব না।

তোমার কোন ভয় নেই। এরা হাইলি ট্রেইন্ড কুকুর। কখনো বাড়িতে ঢুকবে না। দরজা খোলা থাকলেও ঢুকবে না। এদের দায়িত্ব হচ্ছে বাড়ির চারপাশে ঘোরা। বাড়িতে ঢোকা নয়।

কই, এখন তো ঘুরছে না।

রাত নটার পর থেকে ঘোরা শুরু করে। খুব ইন্টারেস্টিং।

পারুল ব্যাপারটায় ইন্টারেস্টিং কিছু দেখল না। তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে কুকুর খুবই ভয় পায়। ছেলেবেলায় তাকে কুকুর কামড়ে ছিল। চৌদ্দটা ইনজেকশন নিতে হয়েছে নাভিতে। ইনজেকশনের পর নাভি ফুলে গেল। সেই ফোলা এখনো আছে। এখনকার মেয়েরা কত কায়দা করে নাভির নিচে শাড়ি পরে। সে তার ফোলা নাভির জন্যে পরতে পারে না। কুকুরের কামড় খাবার পর থেকে তার কুকুর-ভীতি তাও একটা কুকুর হলে কথা ছিল–তিন তিনটা কুকুর। লোকটাও প্রায় কুকুরের মতই। এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। শুধু তাহের যখন বলেছে–আমার স্ত্রীকে কুকুরগুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও–তখন ঘেউ জাতীয় একটা শব্দ করেছে–যে শব্দ শুনে কুকুর তার গা শোঁকার জন্যে ছুটে এসেছে। লোকটা নিশ্চই কুকুরদের ভাষাতেই কথা বলেছে নয়ত কুকুরগুলি বুঝল কি করে?

পারুল নীলা হাউসে ঢুকল মন খারাপ করে। যত সুন্দর বাড়িই হোক, পরের বাড়ি। পরের বাড়ি পাহারা দেবার মধ্যে অনিন্দজনক কিছু নেই। পারুল লক্ষ্য করল–তাহের আনন্দিত। বাড়ির খুঁটিনাটি বলে সে খুব আরাম পায়।

পারুল, দেখো–পুরো বাড়ি মার্বেলের। ইটালীয়ান মার্কেল, তাজমহল ইন্ডিয়ান মার্বেলের তৈরি। ইন্ডিয়ান মার্বেলের চেয়ে ইটালীয়ান মার্বেল দশগুণ দামী।

তোমার ধারণা–নীলা হাউস তাজমহলের চেয়েও দশগুণ দামী?

তা বলছি না। মার্বেলের কথা বলছি। এ বাড়ির মাস্টার বেডরুমে যে বাথরুম ফিটিংস আছে সব আঠারো ক্যারেট গোল্ডের।

আমরা তাহলে আঠারো ক্যারেট গোলেডর কমোডে বসে বাথরুম করতে পারব?

না–তা পারবে না। সব তালা দেয়া। বাড়িটা কেমন বল।

আছে মন্দ না।

তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, মন্দ না বলছ কেন? তোমার বাড়ি পছন্দ হয়নি?

পছন্দ হলে কি করবে? কিনে দেবে?

তাহের বিরক্ত হয়ে বলল, এটা কি রকম কথা? পছন্দ হলেই কি কিনে দিতে হবে? আমাদের কত কিছুই তো পছন্দ হয়। পছন্দ হলেই কি আমরা কিনে ফেলি?

তাহের অতক্ষণ বিরক্ত থাকে ততক্ষণই তাহেরের কপালের চামড়া কুঁচকে থাকে। চোখ জাপানিদের মত ছোট ছোট হয়ে যায়। এরকম মুখ বেশিক্ষণ দেখতে ভাল লাগে না। কাজেই পারুল তাহেরকে খুশি করার চেষ্টা করল। অকারণ উচ্ছ্বাসের বন্যা বইয়ে দিল। বারান্দায় টবের সারির দিকে তাকিয়ে বলল, ও আল্লা, বারান্দায় এত ফুলের গাছ? মনে হচ্ছে কয়েক লক্ষ গাছ।

তাহের হৃষ্ট গলায় বলল, কয়েক লক্ষ না, মোট দুশি তেতত্রিশটা চারা গাছ আছে।

তুমি বসে বসে নেছ না কি?

এটাই তো আমার কাজ।

গাছ গোনা তোমার কাজ?

গাছে পানি দেয়া। স্যার বাইরে যথন যান তখন আমাকে রেখে যান গাছে পানি দেয়ার জন্যে।

কেন, কামরুল যে সে পানি দিতে পারে না?

এক এক জনের এক এক কাজ। কামরুলের কাজ হচ্ছে করে দেখা–সব কাজ তো আর সবকে দিয়ে হয় না?

পারুল হাসি মুখে বলল, গাছে পানি দেয়ার মত জটিল কাজে বুঝি তোমার মত জ্ঞানী মানুষ দরকার?

তাহের আবার বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। অর্থাৎ সে রাগ করেছে। পারুলকে বলতে হল–সে ঠাট্টা করছে। বলার পর তাহের স্বাভাবিক হল। তার মুখে কোমল ভাব ফিরে এল। পারুলের ধারণা, এই পথিবীর শ্রেষ্ঠ দশজন মানুষের মধ্যে তাহের একজন। তাহেরের সমস্যা একটাই–সে ঠাট্টা বুঝতে পারে না। রাগ করলে এখনও শিশুদের মত খাওয়া বন্ধ করে দেয়।

প্রথম দিন এ বাড়িতে এসে পারুলকে কোন রান্নাবান্না করতে হয়নি। তাহের প্যাকেটে করে খাবার নিয়েয়ে এসেছিল। শিক কাবাব—তন্দুর রুটি। শিক কাবাব কতদিনের বাসি কে জানে–শুকিয়ে চিমসা হয়ে গেছে। টক টক স্বাদ। পারুল বলল, মাংসটা মনে হয় নষ্ট হয়ে গেছে। টক লাগছে।

তাহে বলল, মোটেও নষ্ট হয়নি। এরা কাবাবের উপর লেবুর রস চিপে দেয়, এজন্য টক টক লাগে। আরাম করে খাও তে।

পারুল খেতে পারেনি, তবে তাহের মহানন্দে বাসি মাংস চিবিয়েছে। আনন্দে এক একবার তার চোখ বুজে যাচ্ছে। তাহের বলল–এত বড় বাড়িটার বলতে গেলে আমরাই এখন মালিক, তাই না? দারুণ লাগছে না? পারুলের মোটেই দারুণ লাগছে না। তবু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

তাহের বলল, মেয়েরা এবং শিশুরা হল বাড়ির শোভা। একটা বাড়িতে যদি কোন মহিলা বা কোন শিশু না থাকে তাহলে সেটা আর বাড়ি থাকে না–হোটেল হয়ে যায়। তুমি আসার আগ পর্যন্ত এই বাড়ি হোটেল ছিল–এখন বাড়ি হয়েছে।

পারুল অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আরও সাত মাস এ বাড়িতে থাকতে পারলে শিশুও চলে আসবে। তখন এটা হবে পুরোপুরি বাড়ি–তাই না?

তাহের তাকাচ্ছে, কিছু বলছে না–পারুল ঠাট্টা করছে কি না তা সে বুঝতে পারছে না। পারুল কখন ঠাট্টা করে, কখন করে না সে বুঝতে পারে না বলে পারুল কিছু বললেই সে কিছু সময়ের জন্যে হলেও অস্বস্তির মধ্যে থাকে।

পারুল বলল, এ বাড়ির যিনি মালিক তিনি কি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এখানে থাকেন?

না। এটা বাগানবাড়ি।

পারুল কৌতূহলী গলায় বলল, তার বান্ধবীদের নিয়ে মজা করতে আসেন? এজন্যই এতো নিরিবিলিতে বাড়ি?

তাহের বিরক্ত মুখে বলল, মানুষকে এত ছোট ভেবো না তো। সুখী মানুষ বলতে যা বোঝায় করিম সাহেব তাই। এ বাড়িতে একটা নামাজ-ঘর আছে, সেটা জান?

তিনি এখানে তাহলে নামাজ পড়বার জন্য আসেন?

বিশ্রাম করার জন্যে আসেন। একনাগাড়ে কয়েকদিন থেকে চলে যান। একা আসেন, একা চলে যান।

একা আসেন কেন? স্ত্রীকে আনতে অসুবিধা কি?

তার স্ত্রীর প্যারালাইসিস। আঙুল পর্যন্ত নাড়াতে পারেন না। নার্সিং হোমে আছেন গত ছয় বছর ধরে।

এদের বাচ্চাকাচ্চা কি?

কোন বাচ্চা-কাচ্চা নেই।

পারল বিস্মিত গলায় বলল, কোন বাচ্চা-কাচ্চা নেই, তাহলে টাকাপয়সা কে উড়াবে? ধনী বাবার সম্পদ নষ্ট করার জন্যে পুত্র-কন্যা দরকার।

একবার একটা ছেলেকে পালক নিয়েছিলেন। বার তের বছর বয়স হবার পর ঘাড় ধরে সেই ছেলেক বের করে দিলেন।

কেন?

জানি না কেন। পছন্দ হয়নি আর কি। যতই হোক পরের ছেলে–পরের ছেলের উপর কি আর মায়া হয়?

হবে না কেন? তুমি তো পরের ছেলে, তোমার উপর আমার মায়া হচ্ছে না?

সব সময় কেন ঠাট্টা কর?

ঠাট্টা করছি না। সত্যি কথা বলছি।

সত্যি কথা বলা দরকার নেই।

পারুল হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ঐ ভদ্রলোক পালক ছেলে হিসেবে তোমাকে নিয়ে নিলে খুব ভাল করতেন। এক সঙ্গে ছেলে, ছেলের বউ দুটাই পেয়ে যেতেন। কিছুদিন পরই নাতি বা নাতনী। এক ঢিলে তিন পাখি।

তাহের বিরক্ত মুখে বলল, তুমি সব সময় বাঁকা বাঁকা কথা বল তার কি মানে সেটাই বুঝি না।

পারুল গম্ভীর গলায় বলল, তুমি একটা কাজ করো না, ভদ্রলোক এলে তাঁর কাছে পালকপুত্র হবার জন্যে একটা দরখাস্ত দাও। দরখাস্তের শেষে বায়োডাটা।

পারুল। একটু আগে কি বললাম? আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবে না। আমার অসহ্য বোধ হয়।

আমি তো কখনো ঠাট্টা করি না। সিরিয়াস কথাগুলি হালকাভাবে বলি বলে ঠাট্টা মনে হয়।

হালকাভাবে কথা তাহলে বলো না।

আচ্ছা যাও, এখন থেকে খুব ভারি ভারি কথা বলব। হে স্বামী, রাত্রি গাভীর হইয়াছে–আপনি কি এখন শয্যা গ্রহণ করিবেন, না গল্প করিয়া কালক্ষেপণ করিবেন?

পারুল হেসে গড়িয়ে পড়ছে। তাহের রাগ করে উঠে গেল। মনে হচ্ছে এই রাগ অনেকক্ষণ থাকবে। রাগ ভাঙানোর জন্যে সাধ্যসাধনা করতে হবে। রাগ ভাঙানোর সাধ্যসাধনা করতে পারুলের খারাপ লাগে না, ভালই লাগে। তবে এই মুহূর্তে রাগ ভাঙানোর দরকার নেই। থাকুক মুখ ভোতা করে। রাতে রাগ ভাঙ্গানো যাবে। পারুল একা একা বাড়ি দেখে বেড়াতে লাগল। এত বড় বাড়ি, মনে হচ্ছে সারাদিন হাঁটলেও দেখা হবে না। তবে বেশির ভাগ ঘরই তালাবন্ধ। চাবি থাকলে ঘরগুলি দেখা যেত।

রাতে ঘুমূবার সময় তাহের অন্যদিকে পাশ ফিরে শুয়ে রইল। রাগ দেখানো হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে কপট ঘুমের ভানও করা হবে। পারুল বলল, এই, ঘুমিয়ে পড়েছ না কি?

তাহের জবাব দিল না। জবাব দেবে না জানা কথা। পারুলকে কথাবার্তা এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যেন নিজের অজান্তেই তাহের অংশ গ্রহণ করে ফেলে। পারুল বলল, কি শক্ত খটখটে বিছানা। মনে হচ্ছে ইটের উপর শুয়ে আছি। এদের শোবার ঘরের বিছানাও কি এমন না কি?

তাহের বলল–কি পাগলের মত কথা! এদের শোবার ঘরের বিছানা এরকম হবে কেন? ওয়াটার বেড।

সেটা কি রকম?

তোষকের ভেতর তুলার বদলে পানি ভরা।

সে কি?

বিছানায় শোয়ামাত্র চোখে ঘুম চলে আসবে। মনে হবে পানির উপর ভাসছ।

পারুল উঠে বসে আগ্রহের সঙ্গে বলল–চল ঐখানে শুয়ে থাকি। করাত ধরেই আমার ঘুম আসছে না। ঐ ঘরে আরাম করে ঘুমাই।

বললাম না ঐ ঘর তালাবন্ধ। তাছাড়া তালা না থাকলেও এখানে শোব কেন?

বাড়িটাই যখন আমাদের, সব কিছুই আমাদের।

বাড়িটা আমাদের তোমাকে বলল কে?

তুমি তো বললে। তুমি বললে না ওদের অনুপস্থিতিতে আমরাই বাড়ির মালিক।

কখন বললাম এরকম কথা?

বলেছ, এখন ভুলে গেছ। চল যাই।

তুমি কি যে বিরক্ত কর!

আচ্ছা যাও। শুধু ঘরটা দেখে চলে আসি। ঘরটা দেখব আর সোনার বাখরুমে গোসল করব। আমার গা কুটকুট করছে।

সোনার বাথরুম তো না। বাথরুমের ফিটিংসগুলি সোনার। আঠারো ক্যারেট।

পারুল অন্ধকারেই হাসল। তাহেরের রাগ জলে ভেসে গেছে। সে মনের কথা আনন্দে বলে যাচ্ছে। তাহেরকে আবারো রাগিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে। এমন কিছু বলতে ইচ্ছা করছে যাতে তাহের রেগে আগুন হয়ে যায়–। রেগে যাবে, সে আবার রাগ ভাঙাবে।

পারুল নিচু গলায় বলল, এই, একটা কথা শোন।

শুনছি তো।

কাছে এসে শোন। গোপন কথা। আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়।

কি কাজ? চল আমরা বাথরুমের ফিটিংসগুলি খুলে নিয়ে পালিয়ে যাই। সব জড় করলে দুই-তিন সে সোনা তো নিশ্চয়ই হবে। হবে না? সোনার ভরি এখন ছ হাজার টাকা। তিন সের সোনা বিক্রি করলে আমরা পাব–আচ্ছা, কত ভরিতে এক সের হয় তুমি জান?

তাহের গম্ভীর গলায় বলল–শোন পারুল, এক কথা কতবার বলব? আজেবাজে। তুমি একেবারেই পছন্দ করি না।

ঠাট্টা করছি না তো। সোনার বাথরুম এই খবরটা জানার পর থেকে আমার মাথার মধ্যে ব্যাপারটা ঘুরছে। আমরা কি করব শোন…

কিচ্ছু শুনব না। আর একটা কথা না। ঘুমাও।

তোমার বাথরুম পাচ্ছে না? বড়টা?

তাহের রাগী গলায় বলল–বাথরুম পাবে কেন?

পচা গোসতের কাবাব কপ কপ করে সবটা খেয়ে ফেললে এই জন্যে। স্ট্রং ডাইরিয়া তো ইতিমধ্যে শুরু হবার কথা…।

পারুল খিলখিল করে হসিছে। তাহেরের রাগ করা উচিত। রাগ করতে পারছে না। মায়া লাগছে। হাসি শুনতে ভাল লাগছে। মেয়েটা এত সুন্দর করে হাসে। হাসি শুনলে মনে হয় এই মেয়ের জীবনে কোন দুঃখ কষ্ট নেই। শুধুই সুখ। অথচ তাহে জানে পারুল কত দুঃখী মেয়ে। মাত্র সাত মাস পর তার কোলে শিশু আসবে–অথচ কোন আয়োজন নেই। পারুলকে ক্লিনিকে ভর্তি করাবার টাকাও নেই। ক্লিনিক তো দূরের ব্যাপার–এখন পর্যন্ত সে তাকে ডাক্তারের কাছেও নিতে পারেনি।

গর্ভবতী মেয়েদের ভাল ভাল খাবার খেতে হয়। দুধ, ডিম, ফল-মূল কত কি! কিছুই করা যাচ্ছে না। তাহের অবশ্যি পকেটে করে প্রায়ই পেয়ারা, কলা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। দোকান থেকে কলা কেনাও অস্বস্তির ব্যাপার। মানুষ কলা কেনে ডজন হিসেবে, সে কেনে একটা। একটামাত্র কলা পাঞ্জাবির পকেটে নিয়ে ফিরলে পারুলও খুব হাসাহাসি করে। উল্টা-পাল্টা কথা বলে।

আচ্ছা শোন, এই যে এত কলা খাচ্ছি সমস্যা হবে না তো?

কি সমস্যা?

বাচ্চা হলে দেখা যাবে বাচ্চার আধ হাত লম্বা লেজ। অতিরিক্ত কলা খাওয়ায় পেটের বাচ্চা বানর হয়ে গেছে।

উদ্ভট কথা তুমি কেন যে বল!

তুমি উদ্ভট কাজ কর এই জন্যে আমি উদ্ভট কথা বলি।।

উদ্ভট কাজ কি করলাম?

এই যে পকেটে একটা করে কলা নিয়ে আস। প্লীজ আর কখনো আনবে না। এক সঙ্গে বেশি করে নিয়ে এসো। রোজ একটা করে খাব।

এক সঙ্গে বেশি করে আনবে কোত্থেকে? মাঝে মধ্যে একটা দুটা আনছে তাই অনেক বেশি। তাহেরকে বিয়ে করে পারুল যে ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে পড়েছে তার জন্যে তাহের নিজেকে অপরাধী মনে করছে না। কারণ এই বিপদ পারুল নিজে ডেকে এনেছে। তাহের তাকে কখনো বলেনি আমাকে বিয়ে কর। বিয়ের চিন্তাই তার মাথায় ছিল না। নিজে খেতে পায় না–তার আবার বিয়ে কি? পারুলের বিয়ে যখন ঠিকঠাক হয়ে গেল তখন সে বরং হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। যাক, দুঃশ্চিন্তা দূর হল। খুব ভাল সম্বন্ধ। মেয়েটা সুখে থাকবে। মাঝে মধ্যে সে পারুলের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে টা-টা খেয়ে আসবে। সেটাও তো কম না। সম্বন্ধও খুব ভাল। ছেলের বাবা ডাক্তার। মুগদাপাড়ায়। চারতলা বাড়ি। তিনি নিজে একতলা দুতলা নিয়ে থাকেন। দুই ছেলের জন্যে ওপরের তিনতলা আর চারতলা।

তাহের নিজেই একদিন বাড়িঘর দেখে এল। সে মুগ্ধ। বাড়ির সামনে অনেকখানি জায়গা। সেখানে বাগান করা হয়েছে। বাড়ির পেছনে অনেক জায়গা। আম গাছ, কাঠাল গাছ। ছেলের সঙ্গে কথা বলেও সে খুশি। ছেলে বিজনেস করছে। শাড়ির দোকান আছে, চায়নীজ রেস্টুরেন্টে শেয়ার আছে। পারুলকে সে উৎসাহের সঙ্গেই খবরাখবর দিল। পারুল বিরক্ত হয়ে বলল, আশ্চর্য কাণ্ড! তুমি ঐ বাড়িতে কি পরিচয় দিয়ে উঠলে?

বললাম, আমি পারুলের দূর সম্পর্কের মামা।

মামা? মামা বললে কেন?

প্রথমে ভেবেছিলাম দূর সম্পর্কের ভাই বলব–এতে সন্দেহ করতে পারে। কি দরকার, এরচে মামাই ভাল।

তোমাকে খুব খাতির-যত্ন করেছে?

হ্যাঁ, করেছে। ছেলের বাবা বাড়িঘর ঘুরে ঘুরে দেখালেন। তাদের একটা গাছে এবার ছিয়াত্তরটা নারকেল হয়েছে।

তুমি গাছে উঠে নাকেল গুনলে?

না, উনিই বললেন। নিতাই ভদ্রলোক। ছেলের সঙ্গেও কথা হয়েছে। বেশিক্ষণ কথা হয়নি। অল্প কিছুক্ষণ কথা হয়েছে, তার আবার একটা চায়নীজ রেস্টুরেন্টে। শেয়ার আছে–সন্ধ্যাবেলা খানিক বসতে হয়।

তুমি তাহলে আমার শ্বশুরবাড়ি দেখে মুগ্ধ?

মুগ হব না কেন?

চা-নাসতা খেলে?

হু। পাপড় ভাজা, সেমাই, নিমকপাড়া…

থাক, মেনু শুনতে চাচ্ছি না। যথেষ্ট শুনেছি।

তোমার শ্বশুরের একটা গাড়ি আছে। ওল্ড মডেলের টয়োটা, নতুন একটা কিনবেন। বাজেটের জন্যে অপেক্ষা করছেন। বাজেটে গাড়ির দাম কমার কথা।

সব দেখেশুনে তোমার কি মনে হচ্ছে আমার বিয়ে করে ফেলা উচিত?

অবশ্যই।

তুমি যখন বলছ, করে ফেলব।

আজকাল ভাল ছেলে পাওয়া আসমানের চাঁদ পাওয়ার মত। একজন যখন পাওয়া গেছে।

পারুল শীতল গলায় বলল, তার উপর ওদের চায়নীজ রেস্টুরেন্ট আছে। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট। যখন-তখন চাননীজ খাওয়া যাবে। ধর, তুমি বিকেলে বেড়াতে এলে, ঘরে কোন খাবার নেই, একটা স্লীপ লিখে তোমাকে চাইনীজ রেস্টুরেন্টে পাঠিয়ে দিলাম। আচ্ছা, এদের রেস্টুরেন্টের নাম কি?

নিউ সিচুয়ান। খুব চলি রেস্টুকেন্ট।

চল, ওদের রেস্টুরেন্ট থেকে একটু স্যুপ খেয়ে আসি।

তাহের হকচকিয়ে গেল। পারুলের কথাবার্তার ঠিক-ঠিকানা নেই। কাজকর্মেরও ঠিক-ঠিকানা নেই। হয়তো সত্যি সত্যি স্যুপ খেতে চাচ্ছে।

পারুল বলল, তোমার কাছে কি এক বাটি স্যুপ কেনার টাকা আছে? এক বাটি স্যুপের দাম একশ টাকার বেশি হবে না। একশ টাকা সুপ, পাঁচ টাকা টিপস। যেতে আসতে রিকশাভাড়া পনের–একশ কুড়ি টাকা হলেই আমাদের চলে। আছে তোমার কাছে, একশ কুড়ি টাকা?

তাহেরের কাছে তেত্রিশ টাকা ছিল। একশ কুড়ি টাকা থাকলেও যে সে পারুলকে নিয়ে যেত তা না। অকারণে টাকা নষ্ট করার কোন মানে হয় না। তাছাড়া যে মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে সেই মেয়েকে নিয়ে চায়নীজ রেস্টুরেন্টে ঘোরাঘুরি করা যায় না। কখন কে দেখে ফেলবে!

কি, কথা বলছ না কেন? আছে এক কুড়ি টাকা?

না, তেত্রিশ টাকা আছে।

তাহলে তো বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। চল না বাকিতে খেয়ে আসি। খাওয়া দাওয়ার পর তুমি রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকে বলবে–এই যে মেয়েটি খাওয়া-দাওয়া করল তার সঙ্গেই আপনাদের মালিকের বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে। এখন বিবেচনা করুন, তার কাছ থেকে কি স্যুপের দাম রাখা ঠিক হবে?

তাহের বিরক্ত মুখে বলল, তোমার ব্রেইনে কোন সমস্যা আছে। তুমি সবসময়। আজেবাজে কথা বল। একজন স্বাভাবিক মানুষ তো আর সারাক্ষণ ঠাট্টা করে না। তোমাকে বোঝা খুবই মুসকিল।

পারুল উদাস গলায় বলল, মেয়েদের বোঝা এত সহজ না। তুমি যদি আমাকে বুঝতে তাহলে চিন্তায় তোমার ব্রহ্মতালু শুকিয়ে যেত।

কেন?

কারণ আমি অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছি তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না। এবং বিয়েটা হবে সামনের মাসের প্রথম সপ্তাহে।

সত্যি সত্যি দুশ্চিন্তায় তাহেরের গলা-টলা শুকিয়ে গেল। বিয়ে কোন ছেলেখেলা না। তার নিজের রাতে শোবার জায়গা নেই। জসিমের মেসে এতদিন থাকত। খাটে ডাবলিং করত। গত সপ্তাহেই জসিম বলেছে, অন্য কোথাও একটু থাকার ব্যবস্থা কর দোস্ত। গরমের মধ্যে এক খাটে দুজন–চাপাচাপি হয়–। তারপরও তাহের জসিমের সঙ্গেই আছে, যাবে কোথায়?

বিয়ে করে সে বউকে কোথায় নিয়ে তুলবে? জসিমের মেসে?

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পরের মাসের প্রথম সপ্তাহেই তাদের বিয়ে হবে গেল। কাজী অফিসে নাম সই করতে গিয়ে তাহেরের হাত কাঁপতে লাগল। অথচ পারুল কি স্বাভাবিক–যেন কিছুই হয়নি। সে রুমালে মুখ মুছে বলল, খুব গরম এক কাপ চা খেতে ইচ্ছা করছে। কোথায় পাওয়া যায় বল তো?

এই প্রশ্নের জবাবে তাহের বলল–এখন তোমাকে নিয়ে আমি কী করব? কোথায় যাব?

পারুল বলল, আমাকে নিয়ে তোমাকে কিছু করতে হবে না, কোথাও যেতে হবে। তুমি যেমন আছি তেমন খাক। চাকরির চেষ্টা করতে থাক।

চাকরি পাব কোথায়?

এখন হয়ত পাবে। স্ত্রী-ভাগ্যে কিছু নিশ্চয়ই জুটে যাবে।

তোমার কোন টেনশন হচ্ছে না, পারল?

বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত হচ্ছিল–এখন হচ্ছে না।

চাকরি-বাকরি কিছুই যদি না পাই তখন কি হবে?

পাবে। অবশ্যই পাবে। আমি খুব ভাগ্যবতী মেয়ে।

তুমি ভাগ্যবতী মেয়ে?

অবশ্যই–যাকে বিয়ে করতে চেয়েছি তাকে বিয়ে করতে পেরেছি। কটা মেয়ের এরকম সৌভাগ্য হয়? টাকাপয়সার ভাগ্য হল ছোট ধরনের ভাগ্য। ভালবাসার ভাগ্য অনেক বড়। অনেক দিন ধরেই আমি রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। আজ রাতে আমার খুব ভাল ঘুম হবে।

সেই রাতে তাহেরের একেবারেই ঘুম হয়নি। কি যন্ত্রণায় পড়া গেল। গোদের উপর মানুষের হয় বিষ ফোড়া, তার হয়েছে ক্যানসার। বিয়ে করা বৌ থাকে এক জায়গায়, সে থাকে আরেক জায়গায়। বন্ধুর খাটের অর্ধেকটা শেয়ার করে। পারুলকে নিয়ে কোনদিন সংসার করা যাবে তা মনে হয় না।

বিয়ের ব্যাপারটা জানাজানি হবার পর পারুলকে তার বড় চাচা বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। মধুর গলায় বললেন–যাও, স্বামীর সঙ্গে সুখে ঘর-সংসার কর। ভুলেও এদিকে আসবে না। যদি কোনদিন তোমাকে কিংবা তোমার গুণবান স্বামীকে এ বাড়িতে দখি তাহলে স্পঞ্জের স্যান্ডেল দিয়ে পিটাব। আল্লাহর কসম।

স্যান্ডেলের পিটা খাবার জন্যে না–চাচীর সঙ্গে তার কিছু গয়না ছিল, গয়নাগুলির জন্যে পারুল একাই একদিন গিয়েছিল। তার মায়ের গয়না–চাচীর কাছে গচ্ছিত। মেয়ের বিয়ের সময় যেন দেয়া হয় এরকম কথা। পারুলের চাচী বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বললেন, গয়না! কিসের গয়না?

পারুল বাল, মার মায়া চাচী।

তোমার মা তো রাজরাণী ছিলেন, গাদা গাদা গয়না বানিয়ে মেয়ের জন্যে রেখে গেছেন!

গাদা গাদা গয়না না চাচী–গলার একটা চন্দ্রহার।

ওরে বাপরে, হারের নামও জান–চন্দ্রহার?

মার একটা স্মৃতিচিহ্ন। দিয়ে দিন না চাচী।

তুমি কি বলতে চাচ্ছি–তোমার মায়ের গয়না আমরা চুরি করেছি? আমরা চোর? এতদিন খাইয়ে পরিয়ে এই জুটল কপালে! চোর বানালে আমাদের? তুমি যেও না বস, তোমার চাচা আসুক অফিস থেকে। তারপর ফয়সালা হবে।

পারুল বসেনি, চাচার জন্য অপেক্ষা করে লাভ হত না। মার স্মৃতি রক্ষার জন্যে পারুল যে খুব ব্যস্ত ছিল তাও না। গয়নাটা পেলে তার লাভ হত–চার ভরি ওজনের হার। খাদ কেটেও সাড়ে তিন ভরির দাম পাওয়া যেত… টাকাটা কাজে লাগত।

তাহের বৌকে দিয়ে তার মার এক দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের বাসায় গেল। তিনি দীর্ঘ সময় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলেন। এক সময় চোখ স্বাভাবিক করে বললেন, তোমাকে তো চিনতে পারলাম না। তাহের তার নাম, তার মায়ের নাম, গ্রামের নাম সব বলল। ভদ্রলোক বললেন, ও আচ্ছা আচ্ছা। বলার ভঙ্গি থেকে মনে হল এখনো চিনতে পারেননি।

তাহের বিড় বিড় করে বলল, মামা, কয়েকটা দিন আমি আপনার বাড়িতে। থাকব। বিপদে পড়ে গেছি–হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেলক…

কয়েকটা দিন মানে কতদিন?

ধরেন দশ-পনেরো দিন। এর মধ্যে একটা কিছু ব্যবস্থা করে ফেলব।

ভদ্রলোক বললেন—ও।

এই ও-র মানে কি? থাকতে দিচ্ছেন, না দিচ্ছেন না তাহের ধরতে পারল না। তাহের রাস্তায় রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পলি দুটি স্যটকেস আর একটা বেতের ঝুড়ি নিয়ে রিকশায় চুপচাপ বসে আছে। তাকে অবশ্যি তেমন চিন্তিত মনে হচ্ছে না। তাহের বলল–মামা, আমি এমন বিপদে পড়েছি ..

ভদ্রলোক বললেন, বিপদে যে পড়েছ তা তো বুঝতেই পারছি। চিনি না জানি না, সম্পর্ক ধরে উপস্থিত হয়েছ..।

মামা, পারুলকে কি রিকশা থেকে নামতে বলব?

পারুলটা কে?

আমার স্ত্রী। রিকশা থেকে নামতে বলব?

বল।

তাহেরের সেই দূর সম্পর্কের মামার নাম সিরাজউদ্দিন। প্যারালিসিস হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। ঢাকায় নিজের বাড়িতে থাকেন। ঢাকা শহরের সবচে নোংরা বাড়িটা তাঁর। বাড়ি নোংরা, আসবাবপত্র নোংরা, সবই নোংরা। বাড়ি প্রথম তৈরির সময় যে চুনকাম হয়েছিল, তারপর সম্ভবত আর চুনকাম হয়নি। দোতলা বাড়ির দোতলা এবং একতলার অর্ধেকটা ভাড়া দেয়। ভাড়ার টাকাতেই সম্ভবত সংসার চলে।

সিরাজউদ্দিন সাহেব তাহেরকে চিনতে না পারলেও তার থাকার জন্যে একটা কামরা ছেড়ে দিলেন। কামরার সামনে এক চিলতে বারান্দা আছে।বারান্দার টবে বকমভিলিয়া গাছে লাল লাল পাতা। বারান্দা আলো হয়ে আছে। এটাচড্‌ বাথরুম। বাড়ি নোংরা হলেও বাথরুমটা পরিচ্ছন্ন। সিরাজউদ্দিন সাহেব তার স্ত্রীকে ডেকে বলেছিলেন–আমার খালাতো বোনের ছেলে, নতুন বৌ নিয়ে এসেছে, দেখবে কোন অযত্ন যেন না হয় …।

তাদের বাসর হল সিরাজউদ্দিন সাহেবের বাসায়। এতটুকু একটা খাট, তার ওপর ময়লা খয়েরি রঙের একটা চাদর। দুটি বালিশ আছে। একটায় ওয়ার নেই। পারুল বলল, মাগো! এত ছোট বিছানা হয়। একজনও তো আরাম করে শুতে পারবে না।

তাহের বলল, তুমি বিছানায় ঘুমাও। আমি মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে থাকব। আমার কোন অসুবিধা হবে না। আমার অভ্যাস আছে।

পারল বলল, আজি আমাদের বাসর রাত। আমরা দুজন বুঝি দু জায়গায় শুয়ে থাকব? তুমি যাও তো, কয়েকটা জিনিস কিনে আন। একটা সুন্দর চাদর, দুটা বালিশের কভার, আর কয়েকটা গোলাপ ফুল। যদি পাও সাত আটটা বেলী ফুলের মালা।

তাহের ইতঃস্তত করছে। পারুল বলল, কিছু টাকা অকারণে রাত হলে। হোক না।

সামান্য জিনিস দিয়ে পারুল কি সুন্দর করেই না ঘরটা সাজাল। তাহেরের চোখ প্রায় ভিজে এল। পারুল বলল, আজ রাতে আমরা খুব আনন্দ করব। কষ্টে কষ্টে আমার জীবন কেটেছে তোমারও তাই। আজ রাতে যেন আমাদের মনে কোন কষ্ট না থাকে। বলতে বলতে পারুল চোখ মুছল। চোখ মুছতেই থাকল। কিছুতেই সে কান্না থামাতে পারছে না। তাহের তাকিয়ে আছে বিষণ্ণ চোখে। সে যে স্ত্রীকে সান্তনা দেবে সে সাহস তার হচ্ছে না। তার শুধুই মনে হচ্ছে, এত কাছে বসে থাকা মেয়েটি আসলে এ্ত কাছের না–অনেক দূরের কেউ। ধরা-ছোঁয়ার বাইরের একজন।

দিন সাতেক থাকার কথা বলে তাহের এ বাড়িতে উঠেছিল। ছ মাস পার করে দিল। সিরাজউদ্দিন এই ছ মাসে একবারও বলেননি–আর কত? এবার বিদেয় হও।

ভাল মানুষ পৃথিবীতে আছে। সিরাজউদ্দিন নামের রাগী-রাগী চেহারার এই মানুষটা না থাকলে কি ভয়াবহ অবস্থাই হত তাদের। লোকটা পুরোপুরি আবেগশূন্য। যখন তাহের তাদের বাড়িতে থাকতে গেল তখন তিনি যন্ত্রের মত মুখ করেছিলেন। দিন চলে আসে সেদিনও তেমন।

তাহের বলল, আপনার উপকার আমি জীবনে ভুলব না।

ভদ্রলোক বললেন, ও আচ্ছা।

আপনাকে আমরা অনেক যন্ত্রণা করেছি .দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন।

আচ্ছা।

ভদ্রলোক জানতেও চাননি তাহেররা কোথায় যাচ্ছে। যে মানুষের কোন কৌতূহল নেই সেও জিজ্ঞেস করবে–তোমরা যাচ্ছ কোথায়? ভদ্রতা করে হলেও করবে। তিনি তাও করলেন না। হাই তুললেন। তাহের নিজ থেকে বলল–মামা, আমরা যাচ্ছি নীলা হাউসে–শহরের বাইরে এক ভদ্রলোক একটা বাড়ি বানিয়েছেন–ঐ বাড়ির দেখাশোনা…

আচ্ছা আচ্ছা।

ভদ্রলোক আবেগশূন্য হলেও তাহেরের চোখ ভিজে আসছে। সে ধরা গলায় বলল, যদি কোনদিন আপনার কোন কাজে আসতে পারি, বলবেন।

আচ্ছা আচ্ছা।

মাঝে মাঝে এসে আপনাকে দেখে যাব।

আচ্ছা আচ্ছা।

তাহের কদমবুসি করার জন্যে নিচু হতেই তিনি বললেন, পায়ে হাত দিও না। পায়ে হাত দিলে ব্যথা লাগে।

০৩. পারুল রান্না বসিয়েছে

পারুল রান্না বসিয়েছে। যেহেতু সে স্টোভে রান্না করে তার রান্নাঘর চলমান। একেক সময় একেক জায়গায় থাকে। এখন সে রান্না করছে বারান্দায়। খোলামেলা বারান্দা, একদিকে গ্রীল দেয়া। বাতাস আসছে–স্টোভের আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে। রান্না হতে দেরি হবে। হোক। তার এমন কোন কাজকার্য নেই। সারাদিনে একবেলা রান্না। রান্নাটা তাড়াতাড়ি হয়ে গেলেই বরং তার সমস্যা–বাকি সময় কাটবে কিভাবে?

তাহের সকাল বেলা ঢাকা চলে গেছে। মেসবাউল করিম সাহেবের অফিসে যাবে। তিনি ঠিক কবে আসবেন, কোন প্লেনে আসবেন জেনে আসবে। তাঁর ঢাকা এসে উপস্থিত হবার আগেই পারুলকে বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে।

এত বড় একটা বাড়িতে পারুল একা। বাড়ির বাইরে চারটি প্রাণী আছে–তিনটা এলসেসিয়ান কুকুর, একজন কুকুরের সর্দার। কুকুর তিনটার নাম আছে নিকি, মাইক, ফিবো। এর মধ্যে নিকি হল মেয়ে কুকুর। নিকির নাকে শাদা ফুটকি। মাইক এবং ফিবো দেখতে অবিকল এক রকম। কামরুল নামের কুকুরের সর্দার এদের আলাদা করে কি করে, সেই জানে। পারুলের ধারণা গন্ধ শুঁকে শুঁকে। কুকুরের সঙ্গে থেকে থেকে তারও নিশ্চয়ই ঘ্রাণশক্তি বেড়েছে।

রান্না করতে করতে পারুল দেখল, কুকুরের সর্দারটা এখন কুকুর তিনটাকে খেলা দিচ্ছে। ক্রিকেট বলের মত একটা চামড়ার বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। দুটা কুকুর সেই বল নিয়ে খুব নাচানাচি করছে কিন্তু তিন নম্বর কুকুরটা করছে না। সে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। যে দূরে দাঁড়িয়ে, তাকে বল খেলায় আকৃষ্ট করার অনেক চেষ্টা করা হচ্ছে, লাভ হচ্ছে না। আদুরে গলায় কামরুল বলছে–যাও নিকি, যাও। খেলটু কর, খেলটু।

নিকি খেলটু করার দিকে আগ্রহী নয়, বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছে অন্য দুজনের ছেলেমানুষী খেলা দেখে নিকি বিরক্ত। সে খুব ধীর লয়ে লেজ নাড়ছে। কুকুর তার বেশিরভাগ কথাই নাকি লেজ মারফত বলে। সাইন ল্যাংগুয়েজ। ধীরে ধীরে লেজ নাড়ার অর্থ কি কুকুরের সর্দার জানে? পারুল মনে মনে একটা অর্থ করল–ধীর গতিতে লেজ নাড়ার অর্থ আমি বিরক্ত হচ্ছি, আমি খুব বিরক্ত হচ্ছি। পারুল নিজের অজান্তেই ডাকল–নিকি, এই নিকি।

নিকির লেজ নাড়ানো বন্ধ হয়ে গেল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। অন্য দুজনও খেলা বন্ধ করে তাকালো। কুকুরের চোখের ভাষা পড়া যায় না। পড়া গেলেও এতদূর থেকে নিশ্চয়ই যায় না। পারুল বলল, এই নিকি, কাছে আয়।

বলমাত্র পারুলকে বিস্মিত করে নিকি ছুটে এল। গ্রীলের ফাঁক দিয়ে মুখ খানিকটা বের করে দিল। পারুলের ইচ্ছা হল–ও মাগো বলে বিকট একটা চিৎকার দেয়। নিজেকে সে চট করে সামলালো–যত ভয়ংকর কুকুরই হোক, গ্রীল ভেঙে নিশ্চয়ই আসতে পারবে না।

কিরে নিকি, তুই খেলাট করছিস না কেন? লেটু করতে ভাল লাগে না?

নিকি জবাব দিল না। মুখে তো কিছু বললই না, লেজ নেড়েও না। নিকির লেজ এখন স্থির হয়ে আছে। মাইক এবং ফিবো এসে দাঁড়াল নিকির কাছে। পারুলের মনে হল, অভিজাত কুকুরেরও আত্মসম্মানবোধ তেমন তীব্র না। এদের ডাকা হয়নি। তারপরেও এরা উপস্থিত হয়েছে।

পারুল বলল, তারপর তোদের খবর কি? তোর এমন ভয়ংকর চেহারা করে রেগেছিস কেন? ভয় দেখাতে ভাল লাগে?

ফিবি ও মাইক স্থির হয়ে আছে কিন্তু নিকি তার লেজ সামান্য নাড়ল। সাইন ল্যাংগুয়েজে এই সামান্য লেজ নাড়ার অর্থ কি?

কামরুল দূর থেকে ডাকল–কাম অন, কাম অন। নিকি, মাইক, ফিবো কাম অন প্লে টাইম। প্লে টাইম।

এরা ফিরেও তাকাল না। কামরুল বিরক্ত মুখে এগিয়ে আসছে। গ্রীলের কাছে এসে থু করে একদলা থুথু ফেলল। খুব সবটা পড়ল না, খানিকটা তার ঠোঁটের কাছে ঝুলে রইল। সে পারুলের দিকে তাকিয়ে চাপা সর্দি-বসা গলায় বলল, এদেরে ডাকলা কেন? কেন ডাকলা?

পারুল লোকটির দুঃসাহসে অবাক হয়ে গেল। দারোয়ান শ্রেণীর একটা মানুষ, কুকুরের সর্দার, অথচ কত অবলীলায় পারুলকে সে তুমি করে বলছে। যে পারুল এবার জিওগ্রাফীতে অনার্স পরীক্ষা দিয়েছে, উপরের দিকে সেকেন্ড ক্লাস থাকার কথা। ফোর্থ পেপারটা ভাল হলে সে ফাস্ট ক্লাসের স্বপ্ন দেখতে পারত। ফোর্থ পেপারটা একেবারে যাচ্ছেতাই হয়ে গেল। ক্র্যাশ করলেও করতে পারে। ক্র্যাশ করুক বা না করুক, ইউনিভার্সিটিতে পড়া একটা মেয়েকে কি অবলীলায় লোকটা তুমি ডাকল। এই সাহস তাকে কে দিয়েছে? কুকর তিনটা, না-কি তাহেরের কারণে সে তাকে তুমি বলছে? দারোয়ান-টাইপ একজন মানুষের স্ত্রী, তাকে তো তুমি বলাই যায়।

কামরুল বলল, খবর্দার, এদের ডাকাডাকি করব না।

পারুল খুব দ্রুত চিন্তা করল–লোকটাকে তুমি বলার জন্যে প্রথমেই কড়া একটা ধমক দেবে কি না। যাকে বলে ডাইরেক্ট কনফ্রন্টেশান। অবশ্যি অনেকের অভ্যাস থাকে সবাইকে তুমি বলার। লোকটা হয়ত মেসবাউল করিমকেও তুমি বলে। কুকুর নিয়ে যার কাজ তার বোধ, জ্ঞান কুকুরের কাছাকাছি থাকারই কথা। তাই যদি হয় তাহলে তুমি বলার জন্যে তার উপর রাগ করা যায় না। পারুল রাগ মুছে ফেলে প্রায় হাসিমুখে বলল, কুকুরকে ডাকা কি নিষেধ?

হ নিষেধ।

কুকুর তিনটার নাম আছে। নাম দেয়া হয় ডাকার জন্য। কাজেই আমার মনে হয়। এদের ডাকা নিষেধ না।

তুমি তোমার কাজ করা, কুকুর ডাকাডাকি করবা না।

কামরুল আবার থুথু ফেলল এবং আবারও থুথুর খানিকটা ঠোঁটের কাছে ঝুলে রইল। পারুলের মনে হল লোকটার জিব খানিকটা বাঁকা এই জন্যে থুথু সরাসরি ফেলতে পারে না, বাঁকা করে ফেলে, বাঁকা করে ফেলার জন্যে খানিকটা ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকে।

কামরুল চলে যাচ্ছে। আগের জায়গায় গিয়ে চামড়ার বলটা হাতে নিয়ে বলল, কাম অন বেবী। কাম অন। প্লে টাইম।

কুকুর তিনটা নড়ল না। গ্রিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। পারুল ফিস ফিস করে বলল, তোরা নড়িস না, দাঁড়িয়ে থাক। তোরা দাঁড়িয়ে থাকলে লোকটার একটা উচিত শিক্ষা হবে। তুই বলায় আবার রাগ করছিস না তো? তোদের সর্দার আমাকে তুমি বলায় আমি রাগ করিনি। কাজেই তোদেরও রাগ করা উচিত না।

পারুলের এই কথায় ফিবো খুব লেজ নাড়তে লাগল। ফিবোর দেখাদেখি অন্য দুজনও লেজ নাড়া শুরু করল। ব্যাপারটা স্নায়ুযুদ্ধের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। একদিকে কুকুরের সর্দার, অন্যদিকে সে, মাঝখানে তিনটা ভয়াবহ দর্শন গ্রে হাউন্ড।

পারুল বলল, কিরে, তোরা কিছু খাবি? চাল খাবি, চাল?

কুকুর কি চাল খায়? গরু ভেড়া এরা খায়। মুঠি ভর্তি চাল ধরলে খুব আগ্রহ করে খায়। পারুল কুকুরকে কখনো চাল খেতে দেখেনি তবে ভাত খেতে দেখেছে। চাল আর ভাতে তফাৎ তো তেমন নেই। দেবে না কি খানিকটা চাল?

কামরুল আবার ডাকল–কাম অন। কাম অন।

এরা তিনজন নড়ল না। পারুল মুঠি ভর্তি চাল এদের সামনে ধরল। তিনজনই একসঙ্গে চাল শুঁকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেল। মনে হচ্ছে এরা চাল খায় না।

কিরে ভাত খাবি? ভাত খেলে অপেক্ষা করতে হবে। এখন গোশত রান্না হচ্ছে। ও কোত্থেকে হাফ কেজি গরুর গোশত নিয়ে এসেছে। খুবই এক্সপেরিয়েন্সড বুড়ো গরুর গোশত বলে সিদ্ধ হচ্ছে না। গোশত নেমে গেলেই ভাত চড়াব। তখন তোদের গরম গরম খেতে দেব।

মাইক ঘরঘর ধরনের শব্দ করল। কুকুরের ভাষায় কিছু বলল। পারুলের ধারণা, মাইক বলল, আপনাকে ধন্যবাদ। আমরা অপেক্ষা করছি। রান্না হোক, তারপর গরম গরম খাব।

আধা সেদ্ধ গোশত খানিকটা খাবি না কি? খেতে চাইলে তিনজনকে তিন টুকরা দিতে পারি। তোদের সর্দার আবার রাগ না করলে হয়। কি বিশ্রী করে সে তাকাচ্ছে। তোদের সঙ্গে গল্প করছি তো, ওর সহ্য হচ্ছে না।

পারুল তিন টুকরা গোশত বের করল। পানিতে ডুবিয়ে ঠাণ্ডা করল। মেঝেতে ফেলে দিলে ওরা হয়ত খাবে না। সাহেব কুকুর–এদের খাবার দিতে হবে প্লেটে করে, আদবের সঙ্গে। পলি গোশত হাতে করেই ওদের সামনে ধরল। একজনের জন্য এক টুকরা। সবার প্রথম মাইক। মাইকের সামনে ধরতেই সে একটু পিছিয়ে গেল। পারুল বলল, কিরে খাবি না? না কি এখন তোদের লাঞ্চ টাইম না? মাইক এগিয়ে এল। গোশতের টুকরা মুখে নিয়ে নিল। নিকি এবং ফিবো কোন আপত্তি করল না।

কামরুল আসছে। তার মুখ থমথম করছে। রাগের কারণেই কুঁজো হয়ে গেছে। বেশি রেগে গেলে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। খানিকটা কুঁজো হয়ে পড়ে।

তুমি এরারে কি খাওয়াইতেছ?

গরুর গোশত। বী।

তুমি পাইছ কি? এরর খাওয়ার নিয়ম আছে, তুমি জান না?

না জানি না। আমি তো আর কুকুরের সর্দার না।

তুমি এই বাড়িতে থাকতে পারবা না।

সে তো আর বলে দিতে হবে না। আমি জানি থাকতে পারব না। বাড়ি তো আর আমার না।

আইজ দিনে দিনে বিদায় হইবা।

পারুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, রাণে মানুষটা কাঁপছে। থর থর করে কাঁপছে, মুখে ফেনা জমে গেছে–একটা মানুষ এত দ্রুত এতটা রাগতে পারে?

তোমার কত বড় সাহস। কুকুর নষ্ট কর। দাম জান? এই কুকুরগুলার দাম জান?

না, দাম জানি না। শুধু মরা হাতির দাম জানি। মরা হাতির দাম হচ্ছে লাখ টাকা। মরা কুকুরের দাম কত?

চুপ, চুপ। চুপ বললাম…

পারুল লক্ষ্য করল লোকটা আরো কিছু কঠিন কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ নিজেকে সামলাল। মুহূর্তের মধ্যে তার চেহারা পাল্টে গেল। তার রাগী মুখ মুহূর্তের মধ্যে হয়ে গেল ভীত সংকুচিত একজন মানুষের মুখ। এখনো সে কাঁপছে তবে রাগে নয়, আতংকে। হঠাৎ লোকটা এত ভয় পেল কেন?

কারণটা পারুলের কাছে স্পষ্ট হল। সে অবাক হয়ে দেখল, তিনটি কুকুরই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কামরুলের দিকে। তাদের শরীর স্থির হয়ে আছে। তিনজনেরই লেজ নামানো এবং তিনজনেই এক ধরনের গম্ভীর শব্দ করছে। কামরুল নামের মানুষটা আতংকে শাদা হয়ে গেছে কুকুরের এই মূর্তি দেখে। সে এদের জানে। জানে বলেই ভয় পাচ্ছে। পারুল ভেবে পেল না, সামান্য তিন টুকরা মাংস দিয়ে সে কি কুকুরগুলির কর্তৃত্ব তার হাতে নিয়ে নিয়েছে্রর? তাকে অপমান করা হচ্ছে এটা বুঝতে পেরে কুকুর তিনটা রুদ্র মূর্তি ধরেছে। আশ্চর্য তো!

কামরুল অস্পষ্ট গলায় কি বলতে গিয়েও থেমে গেল। কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার ভয় দেখে পারুলেরই এখন মায়া লাগছে। সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে সহজ গলায় কুকুরদের ডাকল–ফিবো, নিকি, মাইক। তিনজন চট করে ফিরল তার দিকে। পারুল হাসল। কুকুররা কি হাসি বুঝতে পারে?

তোরা মানুষদের ভয় দেখাস কেন? যে তোদের এত দিন আদর-যত্ন করে বড় করল তাকেই ভয় দেখাচ্ছিস–এটা কোন কাজের কথা হল? দেখি গলাটা আরেকটু লম্বা কর–আদর করে দি।

পারুল রেলিঙের ভেতর দিয়ে হাত চালিয়ে ফিবোর গায়ে রাখল। না, পারুলের মোটেই ভয় লাগছে না। এদের খুব আপন লাগছে। আদর করা হচ্ছে একজনকে কিন্তু তিনজনই প্রবল বেগে লেজ নাড়ছে। কামরুল দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। তার চোঙ্গভতি বিস্ময়।

তাহেরের দুপুরের আগেই চলে আসার কথা। সে ফিরলে দুজন এক সঙ্গে খেতে বসবে। খাবার সময় গল্পগুজব করে খেতে পারুলের ভাল লাগে। তাহের অবশ্যি নিঃশব্দে খায়। প্লেট থেকে চোখ পর্যন্ত তুলে না। কথা না বলার পারুল একাই বলে। কথা বলার জন্যেও তো কাউকে দরকার।

দুপুর গড়িয়ে গেল, তাহের এল না। একা একা ভাত নিয়ে বসতে পারুলের ইচ্ছা করছে না। যদিও সময় মত তার খেতে বসা দরকার। তার নিজের জন্যে না, যে শিশুটি তার শরীরে বড় হচ্ছে তার জন্যে।

পারুল বিছানায় শুয়ে আছে। খিদে ভালই লেগেছিল–এখন খিদে মরে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে আসা রোদের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই বকেল হয়ে যাবে। বিকেলে তাহের যদি ফিরে তখন কি করবে? অবেলায় খাবে? না কি কয়েকটা লুচি ভেজে দেবে? তাহের লুচি খুব পছন্দ করে। ঘরে ময়দা আছে, ডালডা আছে। লুচির জন্যে ময়দা ছেনে রাখা উচিত–পারুলের বিছানা ছেড়ে নামতে ইচ্ছা করছে না। ক্লান্ত লাগছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে।

একা একা শুয়ে থাকতে ভাল লাগে না। কথা বলার জন্যে একজন কেউ যদি থাকত, কোন প্রিয় বান্ধবী। পারুল মনে মনে তার শিশুটির সঙ্গেই কথা বলা শুরু করল।

কিরে, তুই কি করছিস? তোর কি খিদে লেগেছে। আমার খিদে লাগলে কি তোরও খিদে লাগে? না কি আমার খিদের সঙ্গে তোর খিদের সম্পর্ক নেই? আমি তোর বাবার জন্যে অপেক্ষা করছি। সে এলেই খেতে বসব।

আচ্ছা বড় হয়ে তুই কাকে বেশি পছন্দ করবি? আমাকে, না তোর বাবাকে? আমার মনে হয় তোর বাবাকেই তুই বেশি পছন্দ করবি। বোকা হলেও মানটা পছন্দ কবার মত। বাবাকে বোকা বলায় রাগ করিসনি তো? মে বোকা তাকে তো আর জোর করে বুদ্ধিমান বলা যায় না। বলা উচিত না।

যত দিন যাচ্ছে তোর বাবার বোকা ভাব ততই বাড়ছে। কেন বল তো? অভাবের কারণে। তুই দেখবি বোকা লোক বেশির ভাগই অভাবী। বোকার সঙ্গে টাকাপয়সার একটা সম্পর্ক আছে। হঠাৎ কোন কারণে আমরা যদি কোটি কোটি টাকা পেয়ে যাই তখন দেখবি তোর বাবাকে আর বোকা বোকা লাগছে না, বরং বেশ বুদ্ধিমান মনে হবে।

না না শোন, তোর বাবা কিন্তু বোকা না। ও চুপচাপ থাকে। নিজের মত করে ভাবে বলে একে বোকা লাগে।

আচ্ছা, তুই ছেলে না মেয়ে বল তো? আমার ধারণা, মেয়ে। এবং আমার ধারণা তুই অসম্ভব বুদ্ধিমতী হবি। মেয়েদের বেশি বুদ্ধি না হওয়াই ভাল। মেয়েদের বেশি বুদ্ধি হলে পদে পদে সমস্যা। বুদ্ধিমতী মেয়ে কখনোই জীবনে সুখী হয় না। কেন হয় না? এখন না, তুই বড় হ, তখন তোকে বুঝিয়ে দেব। অবশ্যি ততদিন যদি আমি টিকে থাকি তবেই। আমার মন বলছে, তোকে জন্ম দিতে গিয়েই আমি মারা যাব। আমার আবার এক ধরনের ক্ষমতা আছে। আমি আগে ভাগে সব কিছু বুঝতে পারি। আমার মনে হচ্ছে, তোর জন্ম হবে এই বাড়িতে। কেন এ রকম মনে হচ্ছে তা বলতে পারছি না। মনে হবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। মেসবাউল করিম সাহেব, যার এই বাড়ি, তিনি যে কোনদিন চলে আসবেন। তোর বাবা গেছে কবে আসবেন তাই জানতে। তিনি এলেই আমাদের এ বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা কোথায় যাব কিছুই জানি না। আমাদের যাবার জায়গা নেই, বুঝলি? ঘর নেই, বাড়ি নেই, তোর বাবার চাকরি নেই–কিছুই নেই। থাক, এসব নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। তুই থাক তোর মত। গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাক আমার পেটে। তোর ঘরটা তো খুব সুন্দর। এয়ার কন্ডিশান্ড ঘর। এই ঘরের তাপ বাড়ে না, কমেও না। তোর বিছানাও তো খুব মজার। পানির ওপর ভাসছে–এমন বিছনা। মেসবাউল করিম সাহেবের ওয়াটার বেডের চেয়েও ভাল।

পারুল মুমিয়ে পড়ল। তার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়। ঘরের ভেতর কেমন ছমছমে অন্ধকার। জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে–শরীরে কাঁপন লাগছে। পারুল ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল, দেখল–গেটের ফোকর দিয়ে তাহের ঢুকছে। অন্ধকার পরিষ্কার কিছু দেখা যাচ্ছে না, তবু তাহেরের মুখটা মনে হচ্ছে ভয়ে ও আতংকে এতটুকু হয়ে আছে। গেটের পাশে কামরুল দাঁড়িয়ে। তাহের তাকে ফিস ফিস করে কি বলল। কামরুল মাথা নাড়ছে। কুকুর তিনটা কোথায়? এদের কি চেইন দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছে। তাহের ক্লান্ত পায়ে এগুচ্ছে। তার হাতে পলিথিনের একটা প্যাকেট। পারুল দরজা খুলে দাঁড়াল।

পারুল বলল এত দেরি করলে যে?

তাহের ফ্যাকাসে ভঙ্গিতে হাসল।

দুপুরে কিছু খেয়েছ?

একটা সিঙ্গারা খেয়েছি।

শুধু সিঙ্গারা?

একটা সিঙ্গারা আর এক কাপ চা।

এখন কিছু খাবে? লুচি ভেজে দেব? লছি আর ডিম।

দাও, খুব খিদে লেগেছে।

হাত-মুখ ধুয়ে আস–লুচি ভেজে দিচ্ছি। এত দেরি হল কেন?

তাহের কিছু বলল না। হাত-মুখ ধুতে গেল। পারুল লুচি বেলতে বসল। তাহেরের মস্যাটা সে ধরতে পারছে না। খুব বড় কোন সমস্যা না। যারা সারাক্ষণ সমস্যার ভতর বাস করে তাদের ভেতর এক সময় না এক সময় এক ধরনের নির্বিকার ভঙ্গি চলে আসে। তাহেরের ভেতরও এসেছে। তাকে সব সময় মোটামুটি নির্বিকারই মনে হয়। তবে আজ তাকে কেমন যেন চিন্তিত মনে হচ্ছে।

লুচির সঙ্গে ডিম ভেজে দেয়া গেল না। একটাই ডিম ছিল, সেটা পচা বেরুল। পারুল বলল, কুকুরের সর্দারকে বল না চট করে দোকান থেকে একটা ডিম নিয়ে আসুক। ওকে টাকা দিয়ে দাও।

তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, কুকুরের সর্দার আবার কে?

কামরুল নামের লোকটা।

ওকে ডিম আনতে বললে ও শুনবে কেন? উল্টা ধমকধামক দেবে। আর শোন, কুকুরের সর্দার-ফর্দার এইসব বলার দরকার নেই—শুনে-টুনে ফেলবে।

শুনে ফেললে কি করবে? আমাকে মারবে?

আহা, কি দরকার।

তাহের শুধু লুচি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। খাওয়া দেখেই মনে হচ্ছে সে খুব ক্ষুধার্ত।

শুধু শুধু লুচি খাচ্ছ কেন? চিনি দেই? চিনি দিয়ে খাও। দেব?

দাও।

চায়ের পানি চাপাতে চাপাতে পারুল বলল, তোমার মন-টন খারাপ কেন? কোন দুঃসংবাদ আছে?

হুঁ।

দুঃসংবাদটা কি?

করিম সাহেব পরশু আসছেন। কালকের মধ্যে তোমাকে চলে যেতে হবে।

পরশু এসেই তো তিনি এই বাড়িতে ছুটে আসবেন না। কাজেই তোমার এত চিন্তিত হবার কিছু নেই। এখনো আমাদের হাতে কয়েক দিন সময় আছে। তাছাড়া আমার মনে হয় না তিনি পরশুই আসবেন। আমরা অনেকদিন থাকতে পারব। অহনা না আসা পর্যন্ত আমাদের নাড়তে হবে না।

অহনা কে?

অহনা হচ্ছে আমাদের মেয়ের নাম।

তোমার কথাবার্তা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

বুঝতে না পারার মত জটিল করে তো কিছু বলছি না। আমার ধারণা এই বাড়িতে আমরা অনেক দিন থাকতে পারব। আমার ইনট্যুইশন তাই বলছে।

ম্যানেজার সাহেবের কাছে ফ্যাক্স এসেছে, পরশু সন্ধ্যা সাতটা তিরিশ মিনিটে বৃটিশ এয়ারওয়েজে আসছেন।

আসলে আসুক। তোমার এত চিন্তিত হবার কিছু নেই।

তোমাকে নিয়ে তুলব কোথায়?

কোথাও তুলতে হবে না–আমি এই বাড়িরই কোন এক ফাঁক-ফোকরে লুকিয়ে থাকব। খাটের নিচে কিংবা আলমারির ভেতর…হি হি হি।

তাহের বিষণ্ণ মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। পারুলের সঙ্গে তর্কে-বিতকে যাওয়া অর্থহীন। বলুক তার যা ইচ্ছা। যে মেয়ে নিজের সমস্যা বুঝে না, হি হি করে হাসে, তাকে তো জোর করে কিছু বুঝানো যাবে না। পারুল বলল, আরেক কাপ চা দেব?

তাহের বিরক্ত গলায় বলল, এই তো খেলাম এক কাপ। আরেক কাপ কেন?

প্রথম কাপটা তাড়াহুড়া করে খেয়েছ। দ্বিতীয় কাশটা আরাম করে খাও। আমি করে চা খেতে খেতে হাসিমুখে কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প কর।

তাহের তাকিয়ে আছে–পারুল মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, এত চিন্তা করে তো কিছু হবে না। আমরা বাস করি বর্তমানে। আমরা বর্তমানটাই দেখব। ভবিষ্যতে কি হবে বা না হবে তা নিয়ে মাথা ঘামাব না। বর্তমানে আমি কোন সমস্যা দেখছি না। অন্তত আগামী পরশু পর্যন্ত আমাদের কোন সমস্যা নেই। বানাব চা?

বানাও।

চায়ের কাপে চিনি ঢালতে ঢালতে পারুল বলল, একটা মজা দেখবে?

কি মজা?

দেখবে কি না বল।

তাহের মজা দেখবে কি না সে বিষয়ে পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। মজা দেখাতে গিয়ে পারুল কি করে কে জানে। উদ্ভট কিছু করে বসবে, বলাই বাহুল্য। তখন মজা আর মজা থাকবে না।

কি, কথা বলছ না কেন? দেখবে?

হুঁ।

পারুল তাহেরের হাতে চায়ের কাপ দিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল। হেসেই ঠোঁট সরু করে ডাকল–মিকি, নিকি, কিবো।

তৎক্ষণাৎ তিনটি গ্রে হাউন্ড ছুটে এসে গ্রীলের ভেতর দিয়ে তাদের সরু মুখ বের করে দিল। তাহের এমন আঁতকে উঠল যে, তার চায়ের কাপ থেকে চা ছলকে গায়ে পড়ে গেল।

পারুল হাত বাড়িয়ে কুকুরগুলির গলায় হাত বুলাচ্ছে। তারা প্রবল বেগে লেজ নাড়ছে। তাহেরের বিস্ময়ের কোন সীমা রইল না। পারুল খুশি খুশি গলায় বলল, এদের আমি পুরোপুরি কনট্রোলে নিয়ে এসেছি। ইচ্ছা করলে তুমি এখন অমিকে কুকুরের দারুনী ডাকতে পার।

তাহের ক্ষীণ স্বরে বলল, এদের বশ করলে কি করে?

আমাকে কিছু করতে হয়নি, ওরা নিজে নিজেই বশ হয়েছে। নিম্নস্তরের বুদ্ধিবৃত্তির প্রাণীদের বশ করতে আমার নিজের কিছু করতে হয় না। তোমাকে বশ করতে কি আমার কিছু করতে হয়েছে?

তাহের তাকিয়ে আছে। পারুল বলল, আমার কথায় রাগ করনি তো?

রাগ করব কেন?

তোমাকে নিম্নস্তরের বুদ্ধিবৃত্তির প্রাণী বললাম এই জন্যে…

তোমার অদ্ভুত অদ্ভুত কথায় আমি অভ্যস্ত। অভ্যস্ত না হলে রাগ করতাম। তবে কুকুরের সঙ্গে তুলনা দেয়াটা ঠিক হয়নি। এটা অভদ্রতা।

সরি।

থাক, সরি বলতে হবে না। ওদের বিদেয় কর। বিদেয় করে সাবান দিয়ে হাত ধোও। ভাল করে ধুবে। কুকুর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি আমার পছন্দ না।

আমারও পছন্দ না। বাধ্য হয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি।

বাধ্য হয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করচ্ছ মানে?

পারুল চাপা গলায় বলল, এই কুকুরগুলি নিয়ে আমার একটা পরিকল্পনা আছে।

কি পরিকল্পনা?

এখন কিছুই বলব না। যথাসময়ে জানবে।

পারুল কুকুরের গা থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে। ওরা চলে যাচ্ছে না। আগে জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

কামরুল দূর থেকে কয়েকবার ডাকল, কাম অন, কাম অন। ওরা নড়ল না। তারা তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পারুলের দিকে। তাহেরও তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে গভীর বিস্ময়।

ঘুমুতে যাবার আগে দিনের শেষ সিগারেট ধরালো তাহেরের অনেক দিনের অভ্যাস। সিগারেট শেষ করে সে এক গ্লাস পানি খাবে। পানি খাবার পর পর বিশ্রী ভঙ্গিতে কয়েকবার হাই তুলে বিছানায় যাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুম। অভাবী মানুষেরা চট করে ঘুমুতে পারে না। বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে। তাহেরের সেই সমস্যা নেই।

তাহের দিনের শেষ সিগারেট ধরিয়েছে, তবে তেমন মজা পাচ্ছে না। ঠিক তার সামনেই পারুল বসে আছে। পারুল তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলবে। কিন্তু কিছু বলছে না। যতবারই পারুলের দিকে চোখ যাচ্ছে ততবারই তাহের অস্বস্তিতে নড়ে চড়ে উঠছে।

কিছু বলবে পারুল?

পারুল না-সূচক মাথা নাড়ল। মাথার সঙ্গে সঙ্গে হাতও নাড়ল। হাতের কাচের চুড়ি ঝনঝন করে শব্দ করল। তাহের চমকে উঠল শব্দ শুনে, যদিও চমকানোর কোন কারণ নেই। তাহের সিগারেট শেষ করে বলল, পানি দাও।

উহুঁ।

উই মানে, পানি খাব না?

খাবে, তবে এখানে না। আজ আমরা এ ঘরে ঘুমুব না।

কোথায় ঘুমুব?

মাস্টার বেডরুমে।

তাহের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। পারুল তার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে স্বাভাবিক গলায় বলল, এ বাড়ির মাস্টার বেডরুমের তালা আমি খুলে ফেলেছি। তুমি দুপুরে এলে না। আমার কিছু করার ছিল না। তখনি কাজটা করলাম। চুলের কাটা দিয়ে খুললাম।

মাস্টার বেডরুমের তালা খুলে ফেলেছ?

হুঁ।

কেন?

ওখানে ঘুমুব। ওয়াটার বেডে শুয়ে দেখি কেমন লাগে। বাড়ি তো কাল ছেড়েই দিতে হবে—শখ মিটিয়ে যাই।

তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে পারুল।

মাথা মোটেই খারাপ হয়নি। আমার মাথা ঠিক আছে।

উহুঁ। তুমি যে সব কাণ্ডকারখানা করছ–কোন সুস্থ মানুষ তা করবে না–অন্যের ঘর, অন্যের বাড়ি…

অন্যের বাড়ি খানিকক্ষণের জন্যে নিজের হয়ে যায়। তাতে দোষের হয় না। মেসবাউল করিম সাহেব এই বাড়ি দেখাশোনার জন্যে যখন তোমার কাছে দিয়েছেন তখন নিশ্চয়ই বলেছেন, নিজের বাড়ি মনে করে এই বাড়ির যত্ন করবে। বলেননি?

হুঁ।

কাজেই আমরা এক রাতের জন্যে এই বাড়িটাকে নিজের বাড়ি মনে করছি।

তাহের চিন্তিত গলায় বলল, কামরুল স্যারের কাছে লাগাবে।

লাগালে লাগবে। স্যার কি করবেন? তোমাকে মারধোর করবেন? ভদ্রলোকরা কখনো মারধোর করেন না। বকাঝকা হয়ত করবেন। বকাঝকায় কি যায় আসে? তুমি এসো তো আমার সঙ্গে।

তাহের যন্ত্রের মত উঠে দাঁড়াল। পারুল দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, আমার ভাল কোন শাড়ি নেই। ভাল শাড়ি থাকলে সুন্দর করে সাজতাম। তাহের বলল, হুঁ। পারুল বলল, তুমি শুকনো গলায় বললে, হুঁ। পৃথিবীর অন্য যে কোন স্বামী হলে কি করত জান? বলত–না সাজলেও তোমাকে পরীর মত লাগে।

তাহের বিড় বিড় করে বলল, কাৰ্জিটা ঠিক হচ্ছে না পারুল, অন্যায় হচ্ছে।

অন্যায় হলে হোক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো আমাদের অন্যায় করতে বলে গেছেন।

অন্যায় করতে বলেছেন!

অবশ্যই বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে, শুধু তোমারে জানি।

পারুল মাস্টার বেডরুমের দরজা খুলে বাতি জ্বালাল–বিশাল রুম, চারদিক আলোয় আলোয় ঝলমল করে উঠল। পারুল বলল, দেখলে কত সুন্দর।

তাহের হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখে পলক পড়ছে না। বিশাল ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা খাট। ঘরের মেঝে ধবধবে শাদা। খাটটা কুচকুচে কালো রঙের। মনে হচ্ছে–শাদা মেঘের উপর কালো গোলাপ ফুটে আছে। খাটের দুপাশের সাইড টেবিলে দুটি টেবিল ল্যাম্প। স্বচ্ছ শাদা কাচের টেবিল ল্যাম্প। ঘরে আর কোন আসবাব নেই। চারপাশের দেয়ালে সুন্দর সুন্দর পেইন্টিং। পারুল বলল, মাস্টার বেডরুমের সঙ্গের বাথরুমটা কত সুন্দর দেখতে চাও?

না।

মাস্টার বেডরুমের সঙ্গের বারান্দাটায় একটু অস। আমার ধারণা, ঐ বারান্দা পৃথিবীর সবচে সুন্দর বারান্দা। এসো, বারান্দায় একটু দাঁড়াই।

না।

কথায় কথায় না বলবে না। এসো।

পারুল তাহেরের হাত ধরে প্রায় টেনে বারান্দায় নিয়ে গেলে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আতংকে তাহের প্রায় জমে গেল। কারণ লনে কামরুল দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই। কামরুলের পাশে তিনটা কুকুর। এরাও কৌতূহলী চোখে দেখছে। চাঁদের আলোয় কুকুর তিনটার চোখ জ্বল জ্বল করছে। মনে হচ্ছে ছটি আগুনের ফুলকি।

পারুল খিলখিল করে হাসছে। তাহের বিরক্ত গলায় বলল, হাসছ কেন? পারুল হাসতে হাসতে বলল, কুকুরের সর্দার কি রকম অবাক হচ্ছে এই ভেবে হাসছি। তুমিও একটু হাস তো। দুজনে মিলে হাসলে ও পুরোপুরি ভড়কে মাবে। হি হি হি।

০৪. এক কেজি টক দৈ

তাহের এক কেজি টক দৈ কিনেছে। পঁয়তাল্লিশ টাকা বের হয়ে গেছে। বুকের ভেতর খচখচ করছে। দৈ না কিনলেও হত। মিষ্টির দোকানের সামনে সিগারেট কিনতে না দাঁড়ালে হয়ত দৈ কেনা হত না। ম্যানিব্যাগে নতুন ৫০ টাকার নোটটা থাকত। এখন আছে একুশ টাকা।

দৈ কেনা হয়েছে সিরাজউদ্দিন সাহেবের জন্যে। তাহের ঠিক করেছে মতিঝিল যাবার পথে তার বাড়ি হয়ে যাবে। সম্পর্কটা ঝালিয়ে রেখে যাবে। কে জানে পারুলকে নিয়ে এই বাড়িতেই হয়ত উঠতে হবে। নীলা হাউস ছেড়ে তাদের যদি চলে আসতে হয় তাহলে যাবে কোথায়? যাবার একটা জায়গা তো লাগবে। নানান রকম সম্ভাবনা নিয়ে তাহের চিন্তাভাবনা করছে। তার একটা হল–মেসবাউল করিম সাহেবের কাছে সমস্যার কথাটা বলা। তাঁর এত বড় বাড়ি–তার এক কোণায় সে পারুলকে নিয়ে কবে। কিছু বোঝাই যাবে না। সিন্ধুতে বিন্দু। এতে তারও লাভ হবে। দুজনে মিলে ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে। তিনি এই প্রস্তাবে রাজি না হলে তাহের তার চাকরির কথাটা তুলবে। তাহেরকে একটা ভদ্র চাকরি জোগাড় করে দেয়া তার কাছে কিছুই না। টেলিফোন তুলে দুটা কথা বললেই চাকরি হবে। তবে ক্ষমতাবান লোকদের সমস্যা হল তারা সহজে টেলিফোন তুলতে চান না।

তাহের সিরাজউদ্দিন সাহেবের বাড়িতে ঢুকে হকচকিয়ে গেল। বাড়ি ভর্তি মানুষ। এক তলায় প্যান্ডেলের মত করা হয়েছে। হৈচৈ-এ কান পাতা যাচ্ছে না। ভিডিও ক্যামেরা কাঁধে এক ছেলে ঘুরছে। তার সাথে একজন লাইটম্যান।

সিরাজউদ্দিন সাহেব ইস্ত্রী করা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বসার ঘরে ইজিচেয়ারে কাত হয়ে আছেন। তাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে–চুল কেটেছেন কিংবা চশমার ফ্রেম বদলেছেন। তাহেরকে দেখে তিনি আনন্দিত গলায় বললেন, আসুন আসুন। আপনি দেরি করে ফেলেছেন।

তাহের হকচকিয়ে গেল। মামা তাকে চিনতে পারছেন না। এই কয়েক দিনে তাকে বেমালুম ভুলে যাওয়াটাও খুবই অস্বাভাবিক। তাহেরের ক্ষীণ সন্দেহ হল–মামা হয়ত তাকে ইচ্ছে করেই চিনতে পারছেন না। সে শুকনো মুখে বলল, মামা, আমি তাহের।

ভাল আছ বাবা?

জি মামা, ভাল–বাড়িতে কি কোন উৎসব?

মীনার গায়ে-হলুদ–বরপক্ষের এরা এক কাতল মাছ এনেছে, একান্ন কেজি ওজন–যাও মাছটা দেখে আস। মাছের সাথে ছবি তুলবে? ছবি তুলতে চাইলে তোল। ভিডিও করতে চাইলে ভিডিওওয়ালাদের বলো। ভিডিও করবে।

তাহের পুরোপুরি নিশ্চিত হল সিরাজউদ্দিন সাহেব তাকে চিনতে পারছেন না। একান্ন কেজি ওজনের কাতল মাছের প্রতিও সে আগ্রহ বোধ করছে না। ছবি তোলার তো প্রশ্নই আসে না …।

সিরাজউদ্দিন হাসিমুখে বললেন, জামাই কাস্টমে আছে কাঁচা পয়সা। কাঁচা পয়সা না থাকলে একান্ন কেজি ওজনের মাছ কেউ আনে? তুমি বস, দাঁড়িয়ে আছ কেন?

আমার একটা কাজ আছে মামা–পরে আসব।

আচ্ছা আচ্ছা।

মামা, আমাকে কি চিনতে পেরেছেন?

হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। চিনতে পারব না কেন?

পারুল এবং আমি অনেকদিন ছিলাম আপনার এখানে।

ও আচ্ছা। ভাল। খুব ভাল।

তাহের দৈ-এর হাড়ি নিয়েই বের হয়ে এল। বিয়ে বাড়ির এই হৈচৈ-এর মধ্যে এক হাড়ি টক দৈ রেখে আসার প্রশ্নই ওঠে না। এরা হাড়ি খুলেও দেখবে না। এরচে বরং পারুলকে দিলে কাজ হবে। দৈ-এ নিশ্চয়ই অনেক পুষ্টি আছে। এই সময় পুষ্টিকর খাবার দরকার।

মতিঝিল অফিসের ম্যানেজার রহমান সাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে অনেকক্ষণ তাহেরর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হল সিরাজউদ্দিন সাহেবের মত তিনিও তাকে চিনতে পারছেন না।

স্যার, আমি তাহের। নীল হাউসের দেখাশোনা করছি।

কি চাই?।

বড় সাহেব কখন আসবেন এটা জানার জন্যে…

রহমান সাহেব চশমার ফাঁক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। হাতের ফাইলপত্র দেখতে লাগলেন। তার সামনে খালি চেয়ার আছে কিন্তু তিনি বসতে বলছেন না…।

কোন ফ্লাইটে আসছেন খবর পেয়েছেন স্যার?

ঘণ্টাখানিক পরে আস। হাতের কাজটা সেরে নেই। কাজের সময় তোমরা বিরক্ত কর। আশ্চর্য!

দৈ—এর হাড়ি হাতে নিয়ে এক ঘণ্টা বসে থাকা খুব সমস্যা। সমস্যা হলেই কি। বসে থাকতেই হবে। রহমান সাহেবের হাতে এমন কোন কাজ নেই যে, বড় সাহেব কোন ফ্লাইটে আসছেন এই বাক্যটা বলা যাবে না। হাজারো কাজের মধ্যেও বলে ফেলা। যায়। না বললে করার কিছু নেই। এক ঘণ্টা পরে যেতে বললে–এক ঘণ্টা পরেই যেতে হবে।

তাহের এক ঘণ্টা সাত মিনিট পর আবার ঢুকল। আবারও রহমান সাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে চিনতে পারছেন না। এর মধ্যে ভুলে গেছেন।

কি ব্যাপার?

স্যার, বড় সাহেব কখন আসবেন?

বললাম না একটু পরে আসতে–কাজ করছি।

জি আচ্ছা, স্যার।

লাঞ্চের পরে আস।

জি আচ্ছা।

লাঞ্চের অনেক দেরি। এতক্ষণ তাহের কোথায় বসবে? রিসেপশনিস্টের ঘরে বসা যায়। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অতিরিক্ত সুন্দর। এত সুন্দর মেয়ের সামনে মূর্তির মত দীর্ঘ সময় বসে থাকা যায় না। মেয়েটা কোন কথা বলে না। সবার দিকেই অবজ্ঞা এবং অবহেলার ভঙ্গিতে তাকায়। নিজের মনেই কিছুক্ষণ পর পর ভ্যানিটি ব্যাগ বের করে ঠোঁটে লিপিস্টিক দেয়।

তাহের দৈ—এর হাড়ি হতে রিসেপশনিস্টের ঘরে ঢুকল। মেয়েটা সরু চোখে বলল, কি ব্যাপার?

একটু বসব।

মেয়েটা অসম্ভব বিরক্ত মুখে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে লিপিস্টিক বের করছে।

তাহের মনে করতে পারছে না পারুল ঠোঁটে লিপিস্টিক দেয় কি না। মনে হয় দেয়। লিপিস্টিকের নিশ্চয়ই অনেক দাম। মেয়েটার গায়ে সবুজ শাড়ি। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপিস্টিক। সবুজ এবং লালে কি সুন্দর যে মেয়েটাকে লাগছে…।

এই যে, শুনুন।

তাহের মেয়েটির কথা শুনে এমন চমকে উঠল যে, কোল থেকে দৈ-এর হাড়ি পড়ে যাবার জোগাড় হল। মেয়েটি কঠিন গলায় বলল, আপনি এভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন না। এটা অসভ্যতা। এখানে শুধু শুধু বসেই-বা আছেন কেন?

ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে একটা কথা আছে।

ক্যান্টিনে গিয়ে বসুন।

জ্বি আচ্ছা।

খুব অপমানিত বোধ করার কথা–তাহের বোধ করছে না। সম্ভবত তার গায়ের চামড়া মোটা হয়ে গেছে। একবার চামড়া মোটা হতে থাকলে মোটা হতেই থাকে। এক সময় সেই চামড়া গণ্ডারের চামড়াকেও ছাড়িয়ে যায়। তাহেরের মনে হল–কিছুদিন পর কেউ অকারণে তার গায়ে থুথু দিলেও সে নির্বিকার থাকবে।

ক্যান্টিনে ঢুকে তাহের এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল। চা জিনিসটা তার কাছে অসহ্য। অসহ্য হলেও খেতে হবে–শুধু শুধু তো ক্যান্টিনে বসে থাকা যায় না। মনে হচ্ছে আজও দেরি হবে। ভাত না খেয়ে পারুল অপেক্ষা করবে। খাওয়ার সময় পার হয়ে যাবে–আর কিছু খাবে না। অথচ এই সময়ই খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত করা উচিত। তাহের চিন্তিত মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। পারুলের জন্যে হঠাৎ তার মনটা কেমন করছে। বাইরে বের হলে সচরাচর পারুলের কথা তার মনে পড়ে না। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে, তখন মনটা খুব অস্থির লাগে। তার খুব অস্থির লাগছে…

পারুল অনেকক্ষণ ধরে গোসলখানায়। গোসলখানাটা ছোট এবং স্যাঁতস্যাঁতে। মেঝেতে শ্যাওলা পড়ে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। অসম্ভব পিছল। পা টিপে টিপে হাঁটতে হয়। শরীরের এই অবস্থায় পা পিছলে পড়া বিপজ্জনক হবে। পারুল শ্যাওলা ধরা মেঝেতেই পা ছড়িয়ে বসেছে। তার সামনে গামলা ভর্তি পানি। মগে করে এক মগ পানি সে মাথায় ঢালল। শরীর কেঁপে উঠল। কি ঠাণ্ডা পানি। ঠাণ্ডার প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলে হিমশীতল পানিতে নাওয়ার মত আনন্দ আর কিছুতেই নেই। এক পর্যায়ে নেশার মত লাগে। তবে গায়ে ভেজা কাপড় থাকলে হয় না ভেজা কাপড়ে শীত বেশি লাগে। বরফের মত ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে হয় সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে। পারুল তার গায়ের কাপড় খুলে ফেলল। অন্ধকার বন্ধ গোসলখানা, নিজেকে দেখা যাবে এমন কোন আয়না পর্যন্ত নেই–এখানে নগ্ন হতে বাধা নেই। পারুল তার গায়ে পানি ঢালছে। তার। নেশার মত লাগছে। গামলার পানি শেষ হয়ে গেল। চৌবাচ্চায় পানি ভর্তি। চৌবাচ্চায় নেমে গেলে কেমন হয়? সারা শরীর ডুবিয়ে শুধু মাখাটা বের করে রাখবে। অনেক পানি। নষ্ট হবে–হোক না। পারুল উঠে দাঁড়াল আর তখনি তার বুকে একটা ধাক্কার মত লাগল। মনে হল কে যেন তাকে দেখছে। বাথরুমের কোন ফুটো, কোন ফাঁক-ফোকর দিয়ে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। পারুল চারদিকে তাকাল। না, কোথাও কোন ফুটো চোখে পড়ছে না। এটা নিশ্চয়ই তার মনের ভুল। কিন্তু তার শরীর ঝিম ঝিম করছে। কেউ একজন অবশ্যই তাকে দেখছে। পারুল কঁপা কাঁপা গলায় বলল, কে?

কেউ জবাব দিল না। জবাব দেবার কথাও না। কেউ যদি ফুটোর ওপাশে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে সে চুপ করেই থাকবে। মনে মনে খিক খিক করে হাসবে–ডাকলে সাড়া দেবে না।

পারুল হাত বাড়িয়ে কাপড় নিল। নিজেকে ঢাকিল। তার এখন কান্না পাচ্ছে। চোখে পানি আসছে না, কিন্তু চোখ জ্বালা করছে। লজ্জা ও অপমানে শরীর কাঁপছে—শরীর অশুচি মনে হচ্ছে। পারুল গোসলখানা থেকে বের হয়ে এল। না, আশেপাশে কেউ ইি। হালকা পায়ের শব্দ কি পারুল পাচ্ছে? যেন কেউ একজন স্যান্ডেল পায়ে সরে যাচ্ছে। স্যান্ডেলের ফট ফট শব্দ।

বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে বা দিকের আম গাছের নিচে রাখা পাথরগুলির উপর বসে আছে কামরুল। সে তাকিয়ে আছে অন্যদিকে। কুকুর তিনটা আশেপাশে নেই। দিনের বেলা বেশির ভাগ সময়ই তারা বাঁধা থাকে। আজও মনে হয় বাঁধা।

পারুল তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল জড়াল। তারপর নেমে গেল বাগানে। তার পায়ে স্যান্ডেল। সে স্যান্ডেলে শব্দ করতে করতে এগুচ্ছে। তারপরেও কামরুল তার দিকে ফিরছে না।

শুনুন তো।

কামরুল তাকাল। টকটকে লাল চোখ। এই মানুষটার চোখ কি আগেও এমন লাল ছিল? পারুল লক্ষ্য করেনি।

আপনি একটু আগে কোথায় ছিলেন?

কামরুল তাকিয়ে আছে। জবাব দিচ্ছে না। তাকে খুব বিচলিতও মনে হচ্ছে না। মাশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দাঁত খুটছে। কামরুল পিচ করে থুথু ফেলল। সেই আগের ত থুথু চোয়ালে লেগে আছে।

কথা বলছেন না কেন? একটু আগে আপনি কোথায় ছিলেন?

তা দিয়া তোমার কি দরকার?

দরকার আছে। আপনি কি বাথরুমের ফুটো দিয়ে আমাকে দেখার চেষ্টা করেছেন?

তোমায় দেইখ্যা আমার লাভ কি?

লাভ-লোকসানের কথা না–আপনি আমাকে দেখার চেষ্টা করেছেন কি না বলুন।

কামরুল আবার পিচ করে থুথু ফেলল। এবারের থুথু এসে পড়ল পারুলের পায়ের কাছে। সে এখনো নির্বিকার ভঙ্গিতে দেয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁচাচ্ছে।

পারুল কি করবে? সে কি লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, না কি সে ফিরে যাবে নিজের ঘরে? দাঁত খুটাতে খুটাতে লোকটা নিজের মনে হাসছে। হাসির দমকে তার শরীর একটু কেঁপে উঠল। পারুলের সারা শরীর কাঁপছে। আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সে সত্যি সত্যি লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। পারুল ফিরে যাচ্ছে ঘরের দিকে। সামান্য রাস্তা সে যেতে পারছে না। পা মনে হচ্ছে পাথরের মত ভারি। টেনে টেনে পা ফেলতে হচ্ছে।

কামরুল সত্যি সত্যি হাসছে। হাসির খিক খিক শব্দ আসছে। পারুল পেছনে ফিরল না। পারুল আবার বাথরুমে ঢুকে গেল। তার মুখ ভর্তি করে বমি আসছে। সমস্ত শরীর যেন কেমন করছে। সে কি মারা যাচ্ছে। শীত লাগছে। প্রচণ্ড শীত লাগছে। বাথরুম থেকে বের হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তে হবে। গায়ে একটা ভারী কম্বল দিতে হবে। দরজা খুব শক্ত করে বন্ধ করতে হবে। আচ্ছা, কুকুর তিনটা কোথায়? ওরা কি তার বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে না? ওদের নামগুলি কি? নাম মনে পড়ছে না। একজনের নাম কি সে? উহুঁ, সেন্টু না। সেন্টু তার ফুপাতো ভাইয়ের নাম।

দরজায় টক টক শব্দ হচ্ছে। পারুল ভাবছিল লালটা বোধহয় স্বপ্নের মধ্যে হচ্ছে। না, স্বপ্ন না। এখন সে জেগে আছে। তার সারা গা ঘেমে আছে। ঘর অন্ধকার। মাথার উপর শোঁ শোঁ শব্দে ফ্যান ঘুরছে।

পারুল! পারুল। কি হয়েছে তোমার?

তাহেরের গলা। কতক্ষণ হল সে এসেছে? ঘর এমন অন্ধকার কেন? সে কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? ঘুমের মধ্যেই রাত হয়ে গেছে? কত রাত? পারুল ধড়মড় করে উঠে বসল, ক্ষীণ স্বরে বলল, কে?

আমি। আমি … কি ব্যাপার পারুল?

পারুল দরজা খুলল। তাহের উদ্বিগ্ন গলায় বলল, অসুখ-বিসুখ নাকি? অনেকক্ষণ ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছি।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

পারুল বাতি জ্বালাল। সে এখনও পুরোপুরি ধাতস্থ হয়নি। এখনও নিজের কাছে সব এলোমেলো মনে হচ্ছে–এটা কাদের বাড়ি? তাদের নিজেদের? তাহের আবারও বলল, পারুল, কি হয়েছে?

কিছু না।

শরীর খারাপ?

হুঁ।

ভাত আছে? দুপুরে কিছু খাইনি–দারুণ খিদে লেগেছে।

পারুল নিজেকে সামলে নিয়েছে। দুপুরের ঘটনাটা সে অতি দ্রুত মাখা থেকে মুছে ফেলে স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে তাহেরের দিকে তাকিয়ে হাসল। সহজ গলায় বলল, ভাত ঠাণ্ডা কড়কড়া। গরম করলে খেতে পারবে না। পরোটা বানিয়ে দেই?

দাও। তোমার হাতে এটা কিসের হাড়ি–মিষ্টির?

টক দৈ।

টক দৈ কি জন্যে?

তাহের জবাব দিল না। হাত-মুখ ধুতে গেল। তার ভাত খেতেই ইচ্ছা করছে। খিদে যা লেগেছে তাতে ঠাণ্ডা-গরম কিছুই বোঝা যাবে না–পরোটা বানাতে দেরি হবে। হোক দেরি–পরোটা বানানোর সময় সে পাশে মোড়ায় বসে থাকবে–টুকটাক গল্প করবে। এও মন্দ না। স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করতে তার ভাল লাগে। সব সময় না—পারুল যখন কোন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে তখন পারুলের ব্যস্ত ভঙ্গির কাজকর্ম দেখতে তার ভাল লাগে কেন কে জানে।

পারুল ময়দা মাখছে। তাহের পাশে বসে আছে। ময়দা মাখার মত অতি সাধারণ একটা দৃশ্যও তার দেখতে ভাল লাগছে।

পারুল বলল, করিম ভাইয়া কবে আসছেন?

তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, করিম ভাইয়াটা কে?

মেসবাউল করিম, এই বাড়ির মালিক।

তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, তাকে করিম ভাইয়া বলছ কেন?

বয়সে বড়, এই জন্যেই বলছি।

সম্মানিত লোক, এদের নিয়ে ঠাট্টা-ফাজলামি করা ভাল না।

ভাইয়া ডাকছি। ঠাট্টা ফাজলামি তো করছি না। উনি কবে আসছেন?

বুঝতে পারছি না। মনে হয় না উনি আসছেন। উনি আসার আগে অফিসে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। আজ দেখলাম অফিস ঠাণ্ডা।

কাউকে জিজ্ঞেস করনি?

ম্যানেজার সাহেবের কাছে তিনবার গেলাম। যতবার যাই উনি বলেন–পরে আস।

তোমাকে তুমি করে বলেন?

হুঁ।

পারুল হালকা গলায় বলল–তুমি করেই তো বলবে। বাড়ির দারোয়ানকে ম্যানেজার জাতীয় মানুষরা তুই করে বলে–তোমাকে তাও খানিকটা সম্মান দেখাচ্ছে।

তাহের চুপ করে আছে। গভীর মনোযোগে পরোটা ভাজা দেখছে। ভাজা পরোটার খিদে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে–পারুলের কোন কথা এখন আর তার মাথায় ঢুকছে না।

ম্যানেজার সাহেব তোমাকে তাহলে কিছু বলেন নি?

না।

তার মানে হচ্ছে করিম ভাইয়ার প্রোগ্রামের পরিবর্তন হয়েছে। উনি আসছেন না। আসতে দেরি হবে। দুএকদিনের মধ্যে তার আসার কথা থাকলে ম্যানেজার সাহেব তোমাকে অবশ্যি জানাতেন। কারণ তোমাকে বাড়ি খালি করতে হবে…

কথাটা তো তুমি ভালই বলেছ।

ম্যানেজার সাহেবের নাম কি?

লুৎফুল কবীর। সিরাজগঞ্জ বাড়ি।

কবীর ভাইয়ার সঙ্গে তুমি কাল আবার দেখা করবে। আরো কতদিন তোমাকে বাড়ি পাহারা দিতে হবে জেনে আসবে। বাড়তি দিনগুলির জন্যে খরচ চাইবে। মনে থাকবে?

হুঁ।

পারুল তাহেরের খাওয়া দেখছে। গরম পরোটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে দিচ্ছে। গরমের জন্যে ঠিকমত চিবুতেও পারছে না। গিলে ফেলছে। আহ, বেচারার এতটা খিদে লেগেছে।

তাহের বলল, একা একা সারাদিন ছিলে, ভয় লাগেনি তো!

ভয় লাগবে কেন?

আমি প্রায়ই একা এই বাড়িতে থাকতাম, তখন ভয় ভয় লাগত।

কিসের ভয়? ভূতের?

জানি না কিসের। কুকুর তিনটাকে বেশি ভয় লাগত–এরা ডেঞ্জারাস। একটা মানুষ মারল একবার।

বল কি। কবে?

গত বৎসর। দেয়াল টপকে চোর ঢুকেছিল। চোর বেচারা জানত না এমন ভয়ংকর কুকুর আছে। ঝপ করে নিচে পড়েছে, ওম্নি কুকুর তিনটা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিঁড়ে খুঁড়ে শেষ করে দিয়েছে। চিৎকার করারও সময় পায়নি।

এই নিয়ে কিছু হয়নি?

না। কি হবে? একটা মানুষ মারা গেছে এটা কেউ বুঝতেও পারেনি। বড় সাহেব পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাতের বেলা ডেডবডি পার করে দিলেন। টাকাওয়ালা মানুষদের কখনো কোন সমস্যা হয় না।

আরেকটা পরোটা ভেজে দেব, খাবে?

দাও।

রাতে তাহলে কিন্তু ভাত খেতে পারবে না।

থাক, আজ তাহলে পরোটাই খাই–রাতে টক দৈ খেয়ে শুয়ে পড়ব।

পারুল মাথা নিচু করে হাসছে। তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, হাসছ কেন?

মজার একটা কথা ভেবে হাসছি।

আমাকে বল, আমিও হাসি।

তোমার শুনে হাসি আসবে না। সবাই সব ব্যাপারে হাসে না। কেউ কেউ হাসির শুনে রেগে যায়। তুমিও এই কথাটা শুনে রেগে যাবে।

হাসির কথা শুনে রাগব কেন? এইসব তুমি কি বল? কথাটা কি?

কথাটা হচ্ছে–কুকুর তিনটাকে দিয়ে আমরা কিন্তু অনেক মজা করতে পারি। যেমন, প্রথমে ওদের দিয়ে কুকুরের সর্দার কামরুলকে মেরে ফেললাম। ইশারা করলাম, ওরা ছুটে গিয়ে কামরুলকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে ফেলল। তারপর খোঁজ নিতে এলেন ম্যানেজার সাহেব কবীর ভাইয়া–যে তোমাকে তুমি করে বলে, আবারও ইশারা করলাম, ওরা কবীর–ভাইয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাকেও খেয়ে ফেলল … এক সময় এলেন মহা ক্ষমতাবন মেসবাউল করিম। আমি আবারও…

চুপ কর তো।

পারুল হাসছে। শব্দ করে হাসছে। তাহের কঠিন গলায় বলল, হাসি বন্ধ কর।

পারুল চেষ্টা করেও হাসি বন্ধ করতে পারছে না। তার হাসি বেড়েই যাচ্ছে। সে কোন মতে বলল, বললাম না হাসির কথা শুনে তুমি রেগে যাবে। এই তো রেগে গেছ।

এর মধ্যে হাসির কি আছে?

অনেক কিছুই আছে।

তাহের চিন্তিত মুখে পারুলের দিকে তাকিয়ে আছে। পারুলের কি মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? অভাবে, দুঃখে, দুঃশ্চিন্তায় মাথা এলোমেলো হয়ে যাওয়া অসম্ভব না। এখনো হাসছে। মুখে শাড়ির আঁচল চাপা দিয়ে এখন অবশ্যি হাসি চাপা দেবার চেষ্টা করছে, পারছে না।

হাসির শব্দে আকৃষ্ট হয়েই হয়ত কুকুর তিনটা ছুটে এসেছে। লোহার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে দিয়েছে। তারাও তাহেরের মতই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। পারুল হাসি থামিয়ে কুকুর তিনটার দিকে তাকিয়ে বলল, কি রে, তোরা কেমন আছিস? তোরা তো আর কথা বলতে পারিস না, লেজ নেড়ে বল, ভাল আছিস।

তিনজনই লেজ নাড়ছে। পারুল তাহেরের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল মুখে বলল, দেখছ, ওরা আমার কথা বুঝে। ওদের আমি যা করতে বলব তাই ওরা করবে। কিরে, তোরা আমার কথা শুনবি না?

কুকুর তিনটির ভেতর থেকে চাপা এক ধরনের শব্দ বের হল। তারা আবারও লেজ নড়ল। পারুল বলল, তোরা কিন্তু খাবি?

তাহের রাগী গলায় বলল, তোমার হয়েছেটা কি? তুমি কুকুরের সঙ্গে কথা বলছ কেন?

পারুল তাহেরের প্রশ্ন সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলল, আচ্ছা, এই তিন অতিথিকে কি খেতে দেয়া যায় বল তো? টক দৈ দেব? কুকুর কি টক দৈ খায়?

তাহের বিরক্ত গলায় বলল, টক দৈ খায় কি না জানি না, গু খেতে দেখেছি। টক দৈ খেতে কখনো দেখিনি।

পারুল উজ্জ্বল চোখে বলল, ওরা কি দুধ খায়? দুধ খেলে দৈও খাবে। কুকুরকে তুমি কখনো দুধ খেতে দেখেছ? আমি দেখিনি। আমি বিড়ালকে দুধ খেতে দেখেছি। বিড়াল যখন খায় তখন নিশ্চয়ই কুকুরও খাবে, তাই না?

বিড়াল খেলেই কুকুর খাবে এটা কেমন মুক্তি? কুকুর মানুষের গু খুব আরাম করে খায়। বিড়াল খায় না।

তুমি বার বার একটা বাজে প্রসঙ্গ টেনে আনছ কেন? চা খাবে?

না

এরকম রেগে গেলে কেন? খাও না একটু চা। তোমার সঙ্গে আমিও খাব। জান, আজ সারাদিন আমিও কিছু খাইনি।

সে কি!

শরীরটা ভাল ছিল না।

তাহের উদ্বিগ্ন গলায় বলল, শরীর ভাল না থাকলেও খেতে হবে। তুমি না খেলে পেটে যে আছে সে পুষ্টি পাবে কোত্থেকে?

ওকে অভ্যস্ত করে দিচ্ছি, জন্মের পর তো ওকে খেয়ে না খেয়েই কাটাতে হবে। জন্মের আগেই অভ্যস্ত হয়ে পৃথিবীতে আসুক।

পারুল চায়ের কেতলি চাপিয়ে উঠে দাঁড়াল। তাহের বলল, কোথায় যাচ্ছ?

ওদের জন্যে একটু টক দৈ নিয়ে আসি। চিনি মাখিয়ে দিলে ওরা নিশ্চয়ই খাবে। খাবে না?

তাহের কিছু বলল না। সে মোটামুটি নিশ্চিত পারুলের মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

এ বাড়িতে তাকে আর রাখা যাবে না। অন্য কোথাও নিয়ে যেতে হবে। কোথায় নিয়ে যাবে? গ্রামের বাড়িতে? বসতবাড়ি তো এখনো আছে। চারদিকে জঙ্গল-টঙ্গল হয়ে সাপখোপের আড্ডা হয়েছে। সাফ-সুতরা করে মোটামুটিভাবে বাসযোগ্য কি করা যাবে না?

বড় একটা বাটি ভর্তি টক দৈ নিয়ে পারুল কুকুর তিনটাকে খাওয়াচ্ছে। শুধু যে খাওয়াচ্ছে তাই না, গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বিড় বিড় করে খুব নিচু গলায় কি বলছে। কি বলছে তাহের শুনতে পাচ্ছে না। পারুল কথা বলছে প্রায় ফিস ফিস করে। দৈ খেতে খেতে মাঝে মাঝে মুখ তুলে তারা এমন ভঙ্গিতে পারুলকে দেখছে যে, তাহেরের মনে হল ওরা মন দিয়ে পারুলের কথা শুনছে।

তাহের কান পেতে আছে–পারুলের কথা শোনার চেষ্টা করছে। পারুল শুধু কথা বলছে তাই না–মাঝে মাঝে হাসছেও। আশ্চর্য কাণ্ড।

তোর কবিতা শুনবি? আমি একটাই কবিতা জানি–রবিঠাকুরের দুই বিঘে জমি। শুনবি? গোটা কবিটাই আমার মুখস্থ।

তাহের হতভম্ব হয়ে শুনছে সত্যি সত্যি পারুল বিড় বিড় করে কবিতা আবৃত্তি করছে। কুকুর তিনটাও মনে হচ্ছে আগ্রহ করে কবিতা শুনছে।

০৫. ভদ্রতার প্রশ্ন

রহমান সাহেব আজ তাহেরকে দেখামাত্র চিনলেন। হাতের ফাইল বন্ধ করে বললেন, ও তুমি।

তাহের বলল, স্যার কেমন আছেন?

ভদ্রতার প্রশ্ন। এই প্রশ্ন করার কোন অর্থ হয় না, তবু করতে হয়। সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে একটু উপরে যাদের অবস্থান তারা নিচের অবস্থান থেকে আসা এই প্রশ্নের জবাব দেন না। রহমান সাহেবও দিলেন না। তাহের বলল, বড় সাহেব কবে আসবেন একটু খোঁজ নিতে এসেছিলাম স্যার।

বোস।

তাহের হকচকিয়ে গেল। ম্যানেজার সাহেব তাকে বসতে বলবেন ভাবাই যায় না। হঠাৎ করে তিনি এই বাড়তি খাতির কেন করছেন তা বুঝতে না পেরে তাহের খানিকটা ঘাবড়ে গেল।

দাঁড়িয়ে আছ কেন, বোস।

তাহের বসল। রহমান সাহেব বললেন, স্যারের কাছে থেকে ফ্যাক্স পেয়েছি, তাঁর আসতে দেরি হবে।

কতদিন দেরি স্যার?

কতদিন দেরি এইসব কিছু লেখা নেই। উনার শরীর ভাল যাচ্ছে না। ফুল মেডিকেল চেক-আপ করবেন। তোমাকে আরো এক মাসের খরচ দিতে বলেছেন। আমি ক্যাশিয়ারকে বলে দিয়েছি, তুমি তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেও।

তাহের তো তোমার নাম?

জ্বি স্যার।

কিছু মনে করো না তাহের, বড় সাহেবের সঙ্গে তোমার কি কোন আত্মীয়তা আছে?

জি না। একই গ্রামে বাড়ি।

আচ্ছা।

স্যার, আমি উঠি?

একটু বোস, কি একটা কথা তোমাকে যেন বলতে চাচ্ছিলাম… ভুলে গেলাম, মনে পড়ছে না। একুট বস, দেখি মনে পড়ে কি না।

তাহের অস্বস্তি নিয়ে বসে রইল। ম্যানেজার সাহেব ভুরু কুঁচকে রাখলেন। তিনি আজ শেভ করেননি। খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি বের হয়ে এসেছে। তাকে বুড়ো বুড়ো লাগছে।

ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আচ্ছা শোন, তুমি কি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে ঐ বাড়িতে উঠেছ না কি?

তাহের খুক খুক করে কাশল। রহমান সাহেব সরু চোখে তাকালেন, আমি খবর পেয়েছি তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে উঠেছ। নিজেদের ঘরবাড়ি করে নিয়েছ।

কথাটা সত্যি না স্যার।

তুমি তাহলে স্ত্রীকে নিয়ে উনি?

উঠেছি স্যার।

তাহলে কথাটা সত্যি না বললে কেন?

তাহের হড়বড় করে বলল, আমি একা একা থাকি–কিভাবে থাকি দেখতে এসেছিল। আমি বললাম, দু-একটা দিন থাক আমার সঙ্গে…

কাজটা খুবই অন্যায় করেছ। আজ দিনের মধ্যে তুমি তোমার স্ত্রীকে সরিয়ে দেবে। স্যারের বাড়ি অন্যের সংসার পাতার জন্যে না। বুঝতে পারছ?

পারছি স্যার।

আমি তো খবর শুনে হতভম্ব। স্ত্রীকে নিয়ে বাস করছ–ভাল কথা, স্যারের শোবার ঘরে না কি রাতে ঘুমাও?

তাহের শুকনো মুখে বলল, জ্বি না স্যার। এই মিথ্যা কথাটা বলতে তার খুব কষ্ট হল। মিথ্যা বলা তাহেরের একেবারেই অভ্যাস নেই। মিথ্যা বলতে গেলেই কথা জড়িয়ে যায়। রহমান সাহেব বললেন, আমি অবশ্যি কামরুলের কথা বিশ্বাস করিনি। সে এক আধা পাগল। স্যারের শোবার ঘর চাবি দেয়া, সেখানে ঢুকবে কিভাবে? কামরুল এইসব বানিয়ে বানিয়েই বলেছে তা বুঝতে পেরেছি। যাই হোক, আজ দিনের মধ্যেই তোমার স্ত্রীকে অন্য কোথাও রেখে আসবে।

জি আচ্ছা। স্যার, আমি যাই।

যাও।

তাহের উঠে দাঁড়াল। রহমান সাহেব ফাইল খুলতে খুলতে বললেন, আজ রাতে আমি একবার তোমাদের এখানে যাব। স্বচক্ষে দেখে আসব।

জি আচ্ছা স্যার।

সন্ধ্যাবেলা গিয়ে যেন না দেখি তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে সংসারধর্ম করছ।

তাহের ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলল। নিঃশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথা ধরে গেল। দুঃশ্চিন্তার মাথা ধরা। দুঃশ্চিন্তা না কাটা পর্যন্ত এই ব্যথা কমবে না।

ম্যানেজার সাহেব বললেন, যাও, দাঁড়িয়ে আছ কেন? কিছু বলবে?

জি না।

তাহের এখন কি করবে? সিরাজ সাহেবের বাসায় যাবে? আজ তো যাওয়াই যাবে না। কাল যদি মেয়ের গায়ে হলুদ হয়ে থাকে আজই বোধহয় বিয়ে। বিয়েবাড়িতে সে তার বৌ নিয়ে উঠবে? এটাও মন্দ না। বিয়ে উপলক্ষে সে তার বৌ নিয়ে উঠল। বিয়েশাদীতে আত্মীয়স্বজনরা স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হয়। কয়েক দিন থাকে। এটা ছাড়া সে আর কি করতে পারে? জসিমের মেসে যাবে? সে একা হলে জসিমের কাছে যাওয়া যেত। স্ত্রী নিয়ে যাবে কিভাবে? পারুলের বড় চাচার সঙ্গে দেখা করতে পারে। বাসায় না গিয়ে উনার অফিসে চলে গেলে কেমন হয়? অফিসে তিনি তো আর রাগারাগি করতে পারবেন না। অফিস থেকে বের করে দিতে পারবেন না।

তাহের ক্যাটিনে ঢুকল। এক কাপ চা খাবে। চা খেলে যদি মাথাধরাটা কমে। পারুল মাথা ধরলেই চা খায়। তার না কি এতে মাথা ধরা কমে।

চা শেষ করেও তাহের বসে রইল। এক হাজার এক বার দোয়া ইউনুসটা পড়তে পারলে কাজ হত। চরম বিপদে এই দোয়া খুব কাজ করে। ইউনুস নবী মাছের পেটে বসে এই দোয়া পড়েছিলেন বলে অক্ষত শরীরে মাছের পেট থেকে বের হতে পেরেছিলেন। সেও বলতে গেলে এখন মাছের পেটের ভেতরই আছে।

পারুলের বড় চাচা অফিসে ছিলেন। তাহের ঘরে ঢুকেই টেবিলের নিচে ঝুঁকে পড়ে তাঁর পা খুঁজে বের করল। টেবিলের নিচ থেকেই বলল, চাচা ভাল আছেন?

আজহার সাহেব উত্তর দিলেন না। গলা টেনে কাশলেন। তাহের টেবিলের নিচ থেকে হাসি মুখে বের হয়ে এল। আবারও জিঞ্জেস করল, চাচা ভাল আছেন?

আজহার সাহেব ঘোঁৎ জাতীয় শব্দ করলেন। তাহের বলল, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম চাচাকে ভাল খবরটা দিয়ে যাই।

আজহার সাহেব চোখ ছোট ছোট করে বললেন, কি ভাল খবর?

তাহের বিপদে পড়ে গেল। কথার টানে সে বলে ফেলেছে চাচাকে ভাল খবরটা দিয়ে যাই। আসলে ভাল খবর কিছু নেই। সবই মন্দ খবর। ভয়ংকর ধরনের খবর।

তাহের ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। তার পা কাঁপছে। পা কাঁপার কিছু নেই, তবু কাঁপছে। খিদের জন্যে বোধহয়। এখন বাজছে দুটি। সে সকালে নাশতা না খেয়ে বের হয়েছে। এখন পর্যন্ত এক কাপ চা ছাড়া কিছু খায়নি।

আজহার সাহেব বললেন, বোস।

তাহের বসল। না বসতে বললেও সে বসত। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না।

ভাল খবরটা কি বললে না তো। চাকরি পেয়েছ?

জ্বি।

কি চাকরি?

তাহের রীতিমত ঘামছে। আশ্চর্য কাণ্ড। সে একের পর এক মিথ্যা বলছে কেন? একবার মিথ্যা শুরু করলে অনেকক্ষণ ধরে বলতে হয়। মিথ্যার এই নিয়ম। মিথ্যা হল চাকার মত। একবার চলতে শুরু করলে চলতেই থাকে।

আজহার সাহেব কে এসে বললেন, কি চাকরি?

চা বাগানের চাকরি।

চা বাগানে তো অনেক রকম চাকরি আছে। কুলীর চাকরিও আছে। তোমার পোস্টটা কি?

এ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার।

তাহের অবাক হয়ে লক্ষ করল, আজহার সাহেব তার এই মিথ্যা কথাটা বিশ্বাস করেছেন। এতক্ষণ সরু চোখে তাকিয়েছিলেন, এখন চোখের সরু ভাব দূর হয়েছে। সেখানে জমা হয়েছে বিস্ময়।

বেতন কি?

বেতন বেশ ভাল।

চা বাগানের চাকরিতে বেতন তো ভাল হবেই। বিদেশী কোম্পানী, এরা পেটে ভাতে কর্মচারি রাখে না। কোয়ার্টার দিয়েছে?

দি চাচা দিয়েছে। ফার্নিসড্‌ কোয়ার্টার।

ওদের নিয়মই এরকম। ফ্রী ফানিসড কোয়ার্টার–বেয়ারা বাবুর্চি। গাড়ি দিয়েছে?

ছি না, তবে দিবে বলেছে।

দিবে বলেছে যখন তখন অবশ্যই দেবে। আর এদের বাংলোগুলিও খুবই সুন্দর। ছবির মতন। আমি একবার একটা টি গার্ডেনে দুরাত ছিলাম অপূর্ব। তুমি এই চাকরি জোগাড় করলে কিভাবে?

আমার এক বন্ধুর খালু সাহেবের গার্ডেন…

বুঝেছি রেফারেন্সে চাকরি হয়েছে। এইসব চাকরি এডভাটাইজে হয় না। রেফারেন্সে হয়। তোমার ভাগ্য খুবই ভাল।

জঙ্গলে মন টিকলে হয়।

টিকবে, মন টিকবে। পেট শান্ত থাকলে মন শান্ত থাকবে। তোমার সুসংবাদ শুনে খুশী হয়েছি। তুমি কি খাওয়া-দাওয়া করেছ?

জ্বি না।

খাও, আমার সঙ্গে খাও। আমি টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে আসি। তোমার চাচী দিয়ে দেয়। দুজনের হবে না, কাচ্চি বিরিয়ানী খাবে? এখানে একটা বিহারীর দোকান আছে, ভাল বিরিয়ানী বানায়। আমার বয়স হয়ে গেছে, রিচ ফুড সহ্য হয় না।

আজহার সাহেব বিরিয়ানী আনতে তাঁর বয়কে পাঠালেন। হাফ বিরয়ানী আর একটা ঠাণ্ডা সেভেন আপ। তাহের বসে বসে ঘানতে পাগল। এ কি করছে সে? মিথ্যার পর মিথ্যা বলে যাচ্ছে। মিথ্যা বলতে একটু গলা পর্যন্ত কাঁপছে না। অভাব-অনটনে তার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? অভাবী মানুষরা কি বেশি মিথ্যা বলে?

তাহের।

জ্বি।

পারুল আছে কেমন?

ভাল আছে।

ওকে বাসায় নিয্যে এসো, অনেকদিন দেখি না।

আজই নিয়ে আসব।

আচ্ছা, এসো।

কয়েকদিন থাকুক আপনাদের সঙ্গে।

থাকুক।

বিকেলে নিয়ে আসব। ও আপনাদের দেখতে চাচ্ছে।

আজহার সাহেব টেবিল থেকে ফাইলপত্র সরিয়ে খবরের কাগজ বিছিয়ে দিলেন। নিজেই দুগ্লাস পানি এনে রাখলেন। তাঁর টিফিন ক্যারিয়ার খুললেন। তাহের বলল, আপনি খেতে শুরু করুন চাচা।

একসঙ্গেই খাই। তোমার চা বাগানের নাম কি?

তাহের অতি দ্রুত কোন একটা নাম ভাবতে চেষ্টা করল। নাম মনে আসছে না। মাথার যন্ত্রণাটা হঠাৎ আরও বেড়ে গেল। চোখ পর্যন্ত জ্বালা করছে। চোখে-মুখে পানির ঝাপ্টা দিতে পারলে ভাল হত। তাহের বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, চা বাগানের নাম মনে পড়ছে না চাচা।

আমাদের কোম্পানীর নাম জানতে চাচ্ছি।

কোম্পানীর নামটাও মনে পড়ছে না।

আজহার সাহেব বিস্মিত হয়ে তাকালেন। তাহের ঢোঁক গিলে বলল, আপনাকে এতক্ষণ মিথ্যা কথা বলেছি চাচা।

আজহার সাহেব অবাক হয়ে বললেন, মিথ্যা কথা বলেছ?

জ্বি। আমার চাকরি বাকরি এখনো কিছু হয়নি।

আজহার সাহেব তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে পলক পর্যন্ত পড়ছে না। তাহের খুক খুক করে কাশল। আজহার সাহেব বললেন, এতগুলি মিথ্যা বললে কেন? কারণটা কি?

তাহের অস্পষ্ট গলায় বলল, জানি না। এম্নি বলে ফেলেছি। চাচা, আমি তাহলে যাই?

আজহার সাহেব কিছু বললেন না। তাহের উঠে পাড়াল। টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ে কদমবুসি করল। আবারও বলল, চাচা যাই। আজহার সাহেব তাকিয়ে রইলেন। কিছুই বললেন না।

তাহের বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল–যদি আজহার সাহেব তাকে ডাকেন। কাচ্চি বিরিয়ানীর প্যাকেট থেকে আসা গন্ধটা বাতাসে ভাসছে। ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের গন্ধে খুব বিচলিত হয়–বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। তাহের দাঁড়িয়ে আছে বোধহীন একজন মানুষের মত। বয়টার হাত থেকে বিরিয়ানীর প্যাকেট এবং সেভেন আপের বোতল নিয়ে পালিয়ে গেলে কেমন হয়?

পারুল বাথরুমে–তার গায়ে কোন কাপড় নেই। খয়েরি রঙের একটা টাওয়েল দড়ি থেকে ঝুলছে। ইচ্ছা করলেই এই টাওয়েলটা সে তার গায়ে ফেলে খানিকটা আব্রুর ভেতর নিজেকে রাখতে পারে। তা সে করছে না। ইচ্ছে করেই করছে না। নগ্ন শরীরে সে অপেক্ষা করছে–আসুক, কুকুরের সর্দারটা আসুক। মনের সাধ মিটিয়ে তাকে দেখুক। তারপর দেখা যাবে। কেউ আসছে না। এলেই সে টের পাবে। সে তার সমস্ত চেতনা জাগ্রত করে অপেক্ষা করছে। তার সামনে গামলা ভর্তি পানি। পানির গামলায় তার ছায়া পড়েছে। অন্ধকারের ছায়া অলোর ছায়ার চেয়ে আলাদা।

ভক করে তামাকের কড়া গন্ধ নাকে এসে লাগল। কি বিশ্রী, কি উৎকট গন্ধ। লোকটা এসে দাড়িয়েছে। পারুল নিজের মনে হাসল। গামলার পানি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিল। পানিতে তার ছায়াটা লজ্জাবতী গাছের পাতার মত কুকড়ে গেল। পারুল উঠে দাড়াল। সে এখন দরজা খুলে লোকটাকে ধরবে। তার আগে সে কি গানে টাওয়েলটা। জড়াবে না, যেমন আছে তেমনি বেরুবে? যেমন আছে তেমন বেরুলেও ক্ষতি নেই। কেউ দেখছে না–বাড়ির দেয়ালের ভেতর তিনটি ভয়ংকর কুকুর এবং কামরুল নামের লোকটি ছাড়া আর কেউ নেই। কুকুরের চোখে পোশাক নিশ্চয়ই কোন বড় ব্যাপার না। কুকুরের জগৎ হচ্ছে গন্ধের জগৎ। মানুষের গায়ের গন্ধটাই তার কাছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। আর কামরুল? সে তো তাকে দেখছেই। পারুল দরজা খুলে বের হল। আশ্চর্য! তার লজ্জা লাগছে না, অস্বস্তি লাগছে না–তার কাছে কেমন যেন ঘোরের মত মনে হচ্ছে। কিশোরী বয়সে একবার তার ১০৫ ডিগ্রী জ্বর উঠেছিল, সে সময় সে এক ঘোরের জগতে চলে গিয়েছিল। আশেপাশের সবাইকে তখন কেমন চকচকে লাগছিল যেন সবার গায়ে তেলমাখা। আলো পড়ে তেলমাখা শরীর চকচক ঝকঝক করছে–এখনো তেমন হচ্ছে। পারুল তীক্ষ্ণ ও তীব্র গলায় ডাকল, কামরুল, এই কামরুল।

কামরুল বাথরুমের পেছনে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকে মুখ বের করল। পারুলের মনে হল বাথরুমের দেয়ালটা একটা কচ্ছপের খোলস। কামরুলের মাথাটা হচ্ছে কচ্ছপের মাথা। পারুল হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কিছু বোধহয় ছিল, ভয় পেয়ে কামরুল দৌড় দিল। সে দৌড়ে বাগান পেরুচ্ছে। ছুটে যাচ্ছে তার নিজের খুপড়ির দিকে। পারুল ডাকল—মিকি, মাইক, ফিবো।

তিনটি কুকুরই বিদ্যুতের মত ছুটে এল। কামরুল তখনো ছুটছে, প্রাণপণে ছুটছে। পারুল কুকুর তিনটির দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বলল, তোরা দেখছিস কি? ঐ বদ লোকটাকে ধর। এক্ষুণি পর। এক্ষুণি। এক্ষুণি।

পারুল তর্জনী দিয়ে কামরুলের দিকে ইঙ্গিত করছে। তার মুখ দিয়ে হিস হিস জাতীয় শব্দ হচ্ছে।

তিনটি কুকুই কামরুলের দিকে ছুটছে। কামরুল দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পেছন ফিরে সে দৃশ্যটা দেখল, তারপর ছুটে যেতে গিয়ে পা পিছলে মাটিতে পড়ে গেল। বাঘ যেমন শিকারের উপর ঝাঁপ দেয় অবিকল সেই ভঙ্গিতে ফিবো কামরুলের পিঠের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাকি দুজন ওদের ঘিরে চক্রাকারে ঘুরছে।

পারুল দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল।

মাথা দিয়ে আগুন বের হচ্ছে। পারুল তার মাথায় পানি ঢালছে। হিমশীতল পানি–গায়ে ঢালকেই গা জুড়িয়ে যায়। গামলার পানি শেষ হয়ে গেছে–এখন সে। চৌবাচ্চা থেকে পানি নিচ্ছে। চৌবাচ্চার পানি আরও ঠাণ্ডা। মনে হচ্ছে কেউ যেন। বরফের কুচি মিশিয়ে দিয়েছে। বরফের কুচি মেশানো এই হিমশীতল পানিতে গলা। পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করছে। পানির উপর শুয়ে থাকার কোন উপায় যদি থাকত। পাল চৌবাচ্চার ভেতর ঢুকে গেল।

বাড়ির প্রধান গেটটা বন্ধ। তাহের অনেকক্ষণ ধরেই কলিংবেল টিপছে। কেউ দরজা খুলছে না। তাহের প্রথমে ভেবেছিল, কলিংবেল কাজ করছে না–কলিংবেল টিপে সে কান পেতে রইল–এতে একটানা ক্রিইং শব্দ আসছে। গেটে মাঝে মাঝে সে ধাক্কা দিচ্ছে। কোন শব্দ নেই–। মাঝে মাঝে কুকুর তিনটার দ্রুত চলে যাবার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কুকুর তিনটা না থাকলে সে দেয়াল ডিঙ্গিয়ে নেমে যেত। তার ভয়ংকর দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। ছটা থেকে সে গেটে ধাক্কাধাক্কি করছে। এখন বাজছে, সাড়ে ছটা। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। পারুলের কোন বিপদ হয়নি তো! ভয়ংকর কোন বিপদ।

এখন তাহের আর কলিংবেল টিপছে না বা দরজাও পাকাচ্ছে না–ভীত গলায় ভাকছে, কামরুল। কামরুল মিয়া! এই কামরুল!

পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কে আসছে? কামরুল? তাহের বলল, কে কামরুল? ব্যাপার কি? কি হয়েছে?

কেউ জবাব দিল না। কিন্তু গেট খোলা হচ্ছে। তাহেরের বুকের ধ্বকধ্বকানি এখনও থামছে না। সে আবারও ডাকল, কামরুল! এই কামরুল!

আমি পারুল।

গেট খুলেছে। তাহের বিস্মিত গলায় বলল, কামরুল কোথায়?

আছে কোথাও।

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছি।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাছাড়া ঘরের ভেতর থেকে গেটের শব্দ শোনাও যায় না।

ভয় চলে যাওয়ায় তাহেরের এত শান্তি লাগছে! সারাদিন মে মাথাব্যথা ছিল হঠাৎ পাওয়া এই শান্তিতে তাও চলে গেছে। নিজেকে হালকা লাগছে।

তাহের বলল, সন্ধ্যাবেলা ঘুমের যে অভ্যাস করেছ–এটা ঠিক না। স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই খারাপ।

পারুল জবাব দিচ্ছে না। আগে আগে যাচ্ছে, তাহের যাচ্ছে তার পেছনে পেছনে। তাহের বলল, কামরুল ব্যাটাকে তো দরকার।

কেন?

বাড়ি তার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হবে। আজই যেতে হবে।

কেন?

ম্যানেজার সাহেবের কাছে অবর গেছে আমি এই বাড়িতে সংসার পেতেছি। তিনি অর্ডার দিয়েছেন তোমাকে অন্য কোথাও রেখে আসতে। বলেছেন, সন্ধ্যাবেলা চেক করতে আসবেন। উনি আসার আগেই আমরা চলে যাব। দেরি করা যাবে না। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে।

কোথায় যাবে।

আজকের রাতটা আপাতত কোন হোটেলে কাটাই, তারপর… পারুল, তোমার কি শরীরটা খারাপ? তোমাকে কেমন যেন লাগছে।

পারুল ক্ষীণ স্বরে বলল, শরীর একটু খারাপ।

কতবার বলেছি সন্ধ্যাবেলা ঘুমুবে না। সন্ধ্যাবেলা ঘুমানো খুব বেড হেভিট। শরীরের বারোটা বেজে যায়।

তাহের বাথরুমে ঢুকে হাত-মুখ ধুচ্ছে। বাথরুমের দরজা খোলা। পারুল বাথরুমের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাথরুমের বাল্ব নষ্ট বলে বাথরুমটা অন্ধকার। তাহের হাতে-মুখে শনি ঢালতে ঢালতে বলল–তুমি দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করো না। ব্যাগ দুটা চট করে গুছিয়ে নাও। ম্যানেজার ব্যাটা আসার আগেই কেটে পড়তে হবে।

কোন হোটেলে উঠবে, কিছু ঠিক করেছ?

উহুঁ। ওল্ড ঢাকার দিকে মোটামুটি সস্তায় ফ্যামিলি রুম পাওয়া যায়। আর একটা মাত্র রাত।

একটা রাত কাটিয়ে কোথায় যাবে?

এখনও ঠিক করিনি। গামছাটা দাও তো।

পারুল গামছা এনে দিল। খুব সহজ গলায় বলল, ছোট্ট একটা সমস্যা হয়েছে।

তাহের অবাক হয়ে বলল, কি সমস্যা?

কুকুর তিনটা কামরুলকে মেরে ফেলেছে। ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলেছে।

তাহের বিরক্ত গলায় বলল, সব সময় রসিকতা ফাজলামি ভাল লাগে না। সব কিছুর সময়-অসময় আছে।

পারুল শীতল গলায় বলল, রসিকতা না। সত্যি। বারান্দায় এসে দাঁড়াও। বারান্দায়। দাঁড়ালেই দেখবে। বারান্দা থেকে দেখা যায়।

এইসব তুমি কি বলছ?

যা সত্যি তাই বলছি।

তাহেরের হাত থেকে মগ পড়ে গেল। এইসব সে কি শুনছে? স্বপ্ন দেখছে না তো? মাঝে মাঝে স্বপ্ন বাস্তবের মত হয়।

পারুল বলল, তুমি কি আগে চা খাবে না সরাসরি ভাত দেব?

তাহেবের মাথায় কিছু না। এই সময় কি করে একটা মেয়ে ভাত খাওয়ার কথা বলতে পারে। তাহের বলল, দাও, চা দাও। বলেই সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। আশ্চর্য! সে চা চেয়েছে, সহজভাবেই চেয়েছে। ভয়ংকর দুঃসময়ে মানুষ কি খুব স্বাভাবিক আচরণ করে? তাহেরের মুখ ধোয়া হয়ে গেছে, তারপরে সে অন্ধকার বাথরুমে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে পারুল। চারদিকে সুনসান নীরবতা। নীরবতা ভঙ্গ করার জন্যেই তাহের আবারও বলল, ম্যানেজার সাহেব সন্ধ্যার পর আসবেন। কথাগুলি বলল নিজের কানে নিজের কথা শোনার জন্যে। ম্যানেজার সাহেব যে সন্ধ্যর পর আসবেন এটা তো সে আগেই বলেছে।

পারুল শান্তি গলায় বলল, আসুক। কুকুররা তাকেও খেয়ে ফেলবে।

কি বলছ তুমি!

যা ঘটবে তাই বলছি। এ বাড়ির গেটের ভেতর যেই ঢুকবে তাকেই কুকুররা খেয়ে ফেলবে। তোমাদের বড় সাহেব এলে তাকেও খাবে।

পারুল, তোমার তো পুরোপুরি মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

হুঁ।

ব্যাপারটা আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।

বিশ্বাস না হবার কিছু নেই। বারান্দায় এসে দাঁড়াও, আমি বাগানের বাতি জ্বেলে দিচ্ছি। সব দেখা যাবে। তবে না দেখাই ভাল। দেখলে তুমি চা-টা কিছু খেতে পারবে না। বমি করে ফেলবে। আস, বারান্দায় আস।

না থাক।

চা বানাচ্ছি–চা খেতে আস। সারারাত বাথরুমে দাঁড়িয়ে থাকবে?

তাহের বাথরুম থেকে বের হল। তার ডান পাটা পাথরের মত ভারি হয়ে আছে। প টেনে টেনে তাকে আসতে হচ্ছে। এটাও এক আশ্চর্য ব্যাপার। পা ভারি হলে পাই ভাবি হবে। একটা পা ভারি হয়েছে অন্যটা ঠিক আছে এটা কেমন কথা!

শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে স্টোভে। কেতলিতে পানি বিজ বিজ করে ফুটছে। চুলার আগুনের আঁচে কি যে সুন্দর দেখাচ্ছে পারুলকে! কুকুর তিনটি এই সময় গ্রীলের কি দিয়ে মুখ বের করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আজ তা করছে না, তবে মাঝে মাঝে তাদের ক্রুদ্ধ চাপা হুংকার শোনা যাচ্ছে। তাহের নিচু গলায় ডাকল, পারুল!

হুঁ।

তোমার চাচার সঙ্গে আজ দেখা হয়েছে। উনার অফিসে গিয়েছিলাম।

পারুল তার দিকে চোখ তুলে তাকালো। তাহের ভেবে পেল না। এই সময়ে সে চাচার অফিসে যাবার গল্পটা কি করে বলছে। একটা মানুষ তাদের কাছ থেকে মাত্র বিশ গজ দূরে মরে পড়ে আছে–আর সে চা খেতে খেতে গল্প করছে। মাথা তো পারুলের খারাপ হয়নি। মাথা তার খারাপ হয়েছে।

পারুল!

পারুল সঙ্গে সঙ্গে বলল, কি?

আমরা এখন কি করব?

চায়ের কাপে চা ঢালতে ঢালতে পারুল নরম গলায় বলল, তুমি কি করতে চাও?

পুলিশে খবর দেয়া দরকার। কুকুরে মেরে ফেলেছে–আমাদের তো কোন দোষ নেই। আমরা তো মারিনি।

কুকুর তো আর নিজ থেকে মারেনি। সে হচ্ছে কুকুরের সর্দার। কুকুর তাকে শুধু শুধু মারতে যাবে কেন? আমি বলেছি বলেই মেরেছে।

সে কি।

পারুল তার চায়ের কাপ তুলে নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, চা খাও। চা তো ঠাণ্ডা হচ্ছে।

চা ঠাণ্ডা হচ্ছে কি না তাহের জানে না, তার নিজের হাত-পা যে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে তা সে বুঝতে পারছে। আচ্ছা, এমন কি হতে পারে না যে পারুল ঠাট্টা করছে? মেয়ের মাঝে মাঝে বাজে ধরনের ঠাট্টা করে। মা-বাপ নেই টাইপ ঠাট্টা।

এ কি, কাপ হাতে নিয়ে বসে আছ কেন? ঠাণ্ডা হয়ে গেছে? ঠাণ্ডা হলে আবার গরম করে দেব।

তাহের চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিল। ঠাণ্ডা-গরম কিছুই বোঝা গেল না। তাহের বিড় বিড় করে বলল, সন্ধ্যার পর ম্যানেজার সাহেব আসবেন।

পারুল বলল, উনি আসবেন না। কার দায় পড়েছে ঢাকার বাইরে এত দূর এসে খোঁজ নেবার? তিনি তোমাকে ভয় দেখানোর জন্যে এইসব বলেছেন। যাতে তুমি ভয় পেয়ে সুর সুর করে চলে যাও।

উনি খুব কাজের। চলে আসবেন।

আসবেন না। আকাশের অবস্থা ভাল না–ঝড় বৃষ্টি হবে। এই রকম আবহাওয়ায় উত্তরখানের বিরান ভূমিতে কেউ আসবে না। তুমি অস্থির হয়ো না।

অস্থির হব না?

না। আর যদি এসেই পড়ে আমরা গেট খুলব না। সে তো আর দেয়াল টপকে ভেতরে আসবে না। আর যদি এসেই পড়ে তাহলে…

তাহলে কি?

আমার তিন বন্ধু আছে, ওরা মজা দেখাবে।

পারুল হাসছে। হাসতে হাসতে সে মুখে আঁচল দিল। মনে হচ্ছে গড়িয়ে পড়বে। তাহের বলল, এই পারুল, এই!

পারুলের হাসি থামছে না। খিলখিল করে সে হেসেই যাচ্ছে। তাহের পুরোপুরি নিশ্চিত হল পারুলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সুস্থ মানুষের হাসি না। কোন সুস্থ মানুষ এই অবস্থায় এমন ভঙ্গিতে হাসে না। বদ্ধ উন্মাদের লক্ষণ। উন্মাদ হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এত বড় বাড়িতে একটা ডেডবডি নিয়ে থাকলে যে কেউ উন্মাদ হয়ে যাবে।

পারুল, পারুল।

উঁ।

হাসি থামাও।

শুধু শুধু হাসি থামাব কেন? কেঁদে বুক ভাসাবার মত কিছু হয়নি। আমি হাসি থামাব না।

বলতে বলতেই পারুল হাসি বন্ধ করল। হাসি যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনি হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। পারুল সহজ গলায় বলল, রাতে কি খাবে?

কি খাব মানে?

রাতে ভাত তো খাবে। উপোস নিশ্চয়ই দেবে না। তেমন কিছু রাঁধতে পারিনি। আলু ভেজে দি। কড়া করে আলু ভেজে দেব। ভাজা শুকনো মরিচ ডলে আলু ভাজা দিয়ে খেতে খুব মজা। ঘি থাকলে খুব ভাল হত। আলু ভাজার উপর এক চামচ গাওয়া ঘি দিয়ে দিলে খেতে চমৎকার হয়। এমন এক ঘ্রাণ বের হয় যে ঘ্রাণ দিয়েই এক থালা ভাত খাওয়া যায়।

এই সময় তুমি খাওয়ার কথা ভাবছ? অবশ্যই ভাবছি। কেন ভাবব না? মৃত্যুর সঙ্গে খিদের কোন সম্পর্ক নেই। দুটা আলাদা ব্যাপার। আমার মার বেলায় কি হয়েছে শোন–মা মরে গেল ভোররাতে। বাবা কাঁদতে কাঁদতে অস্থির। চিৎকার করে বিকট কান্না। সারাদিন বাবা কিছু খেল না। দুপুরে আমার বড় খালা তাকে খেতে বলেছে–বাবা দিয়েছে ধমক। রাত আটটার দিকে বাবা নিজেই খেতে চাইল। বাবা ভাত নিয়ে বসেছে–আমাকে দেখে বলল, খুকি, দেখ তো লেবু আছে কি না। আর একটা পেঁয়াজ কুচি কুচি করে কেটে দিতে বল।

তাহের তাকিয়ে আছে। পারুল গল্প শেষ করে বলল, এই যে গল্পটা বললাম, তার সারমর্ম হচ্ছে–একটু দূরে একটা মানুষ মরে পড়ে আছে–তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা যথাসময়ে খাওয়া-দাওয়া করব। আরাম করে মুতে যাব। এবং যাতে তোমার যদি অন্য কোন আন্সার থাকে,

পারুল, চুপ করতো।

পারুলের ঠোঁট বেঁকে যাচ্ছে। কে জানে, সে হয়ত আবার হাসতে শুরু করবে। পাগলের হাসি একবার শুরু হলে শেষ হতে চায় না।

পারুলের কথাই বোধহয় ঠিক। ক্ষুধার্ত মানুষ মৃত্যু-টৃত্যু নিয়ে ভাবে না। তারা খেতে বসে যায়। রাত দশটার দিকে তাহের খেতে বসল। অনেক ভাত খেয়ে ফেলল। আরো থাকলে আরো খেত। পাতিলে আর ভাত ছিল না। পারুল বলল, তোমার বোধহয় পেট ভরল না।

ভরেছে। পেট ভরেছে। শরীরের খিদে মিটছে–চোখের খিদায় ভাত চেয়েছি।

চট করে একটা পরোটা ভেজে দেব, খাবে?

কি যন্ত্রণা। বললাম না পেট ভরেছে।

তাহের বারান্দায় মোড়ায় বসে সিগারেট টানছে। পারুল থালা বাসন মাজামাজি করছে। তাহের এই মুহূর্তে ভাবতে চাচ্ছে না যে তাদের কাছ থেকে মাত্র বিশ গজ দূরে একটা মানুষ মরে পড়ে আছে। আর ভাবতে ইচ্ছা করছে না। ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। শীত শীত লাগছে। এক ঘুমে রাতটা কার করে দিয়ে–সকাল বেলা ভেবে-চিন্তে একটা পথ বের করতে হবে। পথ আর কি–পুলিশকে গিয়ে বলা–কুকর বাড়ির দারোয়ানকে মেরে ফেলেছে।

থানার ওসি জিজ্ঞেস করবেন–কখন মেরেছে? তখন একটু ঘুরিয়ে বলতে হবে–কখন মেরেছে সেটা স্যার বলতে পারি না। আমরা দেখেছি সকালে। দেখেই আপনাকে খবর দিয়েছি।

কুকুর মানুষ মেরে ফেলল, আপনারা কিছুই বলতে পারলেন না?

স্যার, এগুলি ভয়ংকর কুকর। আগেও একটা মানুষ মেরেছে।

বলেন কি?

খাঁটি কথা স্যার। এক বিন্দু বাড়িয়ে বলছি না। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমরা স্যার, কুকুরের ভয়ে রাতে ভালমত ঘুমুতেও পারি না।

আমরা বলছেন কেন? আমরা মানে কি? আর কে?

স্যার, আমার স্ত্রী।

আপনার স্ত্রীও কি ঐ বাড়িতে থাকে? তারও তো একটা জবানবন্দি নেয়া দরকার।

তাহের আগের সিগারেট ফেলে দিয়ে আরেকটা ধরাল। ভালমত চিন্তা করতে হবে। পারুলকে কিছুতেই পুলিশের কাছে নেয়া যাবে না। ওর মাথার ঠিক নেই। কি বলতে কি বলে বসবে। যা বলার পুলিশ তাই বিশ্বাস করবে। পুলিশ তো আর জানে না–অভাবে অনটনে পারুলের মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে।

পারুল!

উঁ।

চা দাও, একটু চা খাব।

দাঁড়াও, হাতের কাজ সেরে নেই। তুমি তো চা খেতে চাও না, আজ দেখি একেবারে সেধে সেধে খেতে চাচ্ছ।

তাহের জবাব দিল না। সে অবাক হয়ে পারুলের থালা-বাসন ধোয়া দেখছে। কি সহজ ভঙ্গিতে সে থালা বাসন ধুচ্ছে–আবার গুন গুন করছে। মনে কোন রকম দুঃশ্চিন্তা নেই। না, পারুলকে কিছুতেই পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিতে দেয়া যাবে না। জবানবন্দি দিতে গেলেই উল্টাপাল্টা কিছু বলবে। যা করতে হবে তা হচ্ছে–খুব ভোরবেলা ওকে অন্য কোথাও দিয়ে আসতে হবে। তারপর যেতে হবে পুলিশের কাছে। পুলিশ যখন জিজ্ঞেস করবে–আপনি একাই এ বাড়িতে ছিলেন? তখন বলতে হবে কিছুদিন আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে ছিল–তারপর ম্যানেজার সাহেব আপত্তি করলেন–আমি ওকে নিয়ে গেলাম।

কোথায় নিয়ে গেলেন?

ওর বড় চাচার বাসায়।

সেটা কবে? তারিখ বলুন, সময় বলুন।

এই যে আবার প্যাঁচের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।

চা নাও।

তাহের আগ্রহ করে চা হাতে নিল। এখন নিজেকে হালকা লাগছে। সমস্যা সমাধানের পথ পাওয়া না গেলেও পাওয়া যাবে। কিছু মিথ্যা বলতে হবে। তবে খুব গুছিয়ে বলতে হবে। এমন মিথ্যা যেখানে ফাঁক থাকবে না।

চা-টা ভাল হয়েছে পারুল।

সরে বোস, বৃষ্টির ছাট লাগছে।

তাহের সরে বসল। পারুল বলল, ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। এতে একটা লাভ হল। রক্ত ধুয়ে মুছে চলে গেল। এখন বাকি শুধু ডেডবডি মাটিতে পুঁতে ফেলা।

তাহের এমন ভাব করল মেন কথা শুনতে পাচ্ছে না। কথা শুনলেই কথার পিঠে কথা বলতে হবে। পারুলের পাগলামী আরো বাড়বে। এই পাগলামীকে কোন অবস্থাতেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।

পারুল চুক চুক করে চা খাচ্ছে। এরকম শব্দ করে সে তো কখনো খায় না। নাকি আগেও এরকম শব্দ করেই খেতো? সে লক্ষ্য করেনি। পারুল হালকা গলায় বলল, বৃষ্টি কমবে না। তোমাকে বৃষ্টির মধ্যেই কাজটা করতে হবে।

তাহের হতভম্ব গলায় বলল, কি কাজ?

গর্ত করতে হবে। বাগানে কোদাল আছে। বৃষ্টিতে ভিজে মাটি হয়েছে নরম। তোমাকে বেশি কষ্ট করতে হবে না।

তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?

মোটেই পাগল হইনি। গর্ত খুঁড়ে ডেডবড়ি চাপা না দিলে কুকুর ছিঁড়ে খুড়ে খাবে। সেটা ভাল হবে? কাল তুমি যখন ঘর থেকে বের হবে তখন দেখবে দরজার কাছে কামরুলের হাতের কব্জি পড়ে আছে। তখন কেমন লাগবে?

আমাদের পুরো ব্যাপারটা পুলিশকে জানাতে হবে। পুলিশ যা করার করবে। আমরা কিছুই করব না। রাতটা কোন মতে পার করে পুলিশের কাছে যাব।

পারুল শান্ত গলায় বলল, পুলিশ এসে আমাকে বেঁধে নিয়ে যাবে। হাজতে রাখবে। টর্চার করবে। আমার পেটে একটা বাচ্চা আছে, সেটা কি তার জন্যে ভাল হবে?

তোমাকে টর্চার করবে কেন? তুমি কি করেছ?

আমি কুকুর তিনটাকে দিয়ে ঐ লোকটাকে মারিয়েছি। লোকটা ছিল ভয়ংকর বদ–আমি তাকে কঠিন শাস্তি দিয়েছি।

চিন্তা-ভাবনায় তোমরা মাথা পুরোপুরি গুলিয়ে গেছে। তোমার যা দরকার তা হচ্ছে প্রচুর ঘুম, প্রচুর বিশ্রাম, নিরিবিলি।

পারুল সহজ গলায় বলল, প্রচুর ঘুম, প্রচুর বিশ্রাম এবং প্রচুর নিরিবিলির জন্যেই ডেডবডিটা কবর দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তুমি বুঝতে পারছ না–আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলছি–পুলিশের ঝামেলায় এখন আমরা যেতে পারব না। পুলিশ যদি আমাদের কিছু না করে একটা জিনিশ করবে–বাড়ি থেকে বের করে দেবে। দেবে কিনা তুমি বল।

পুলিশ না দিলেও ম্যানেজার সাহেব বের করে দেবেন।

তখন আমি যাব কোথায়? এমন কোন জায়গা কি তোমার আছে যেখানে তুমি আমাকে নিয়ে তুলতে পার? গল্পে উপন্যাসে গাছতলায় সংসার পাতার কথা থাকে। আমরা তো গল্প-উপন্যাসের মানুষ না। ঠিক বলছি?

হুঁ।

আমাকে এখান থেকে বের করে দিলে আমি কোথায় থাকব? রেলস্টেশনের প্লাটফরমে? হ্যাঁ সেখানে থাকা যায়–একদিন, দুদিন, তিনদিন–ধরলাম সাত দিন–তারপর? আমি তো একা না–আমার ভেতর আরেকজন আছে। তার সমস্যা আমি দেখব না?

তাহেরের মাথা ঝিম ঝিম করছে। কি পরিষ্কার কথাবার্তা নিখুঁত যুক্তি। তাহের অভিভূত হয়ে গেল।

পারুল শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে নিল। তাকে এখন একজন কিশোরীর মত লাগছে। সে আরো খানিকটা ঝুঁকে এসে বলল, ডেডবড়ি মাটির নিচে পুঁতে ফেললে আমরা অন্তত কিছুদিনের জন্যে নিরাপদে থাকতে পারব। সেই কিছুদিনও তো আমাদের কাছে অনেক দিন।

তাহের চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, না, কিছুদিনের জন্যেও নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারবে না। ম্যানেজার সাহেব এসে খোঁজ করবেন।

ম্যানেজার সাহেব কামরুলের খোঁজে আসবেন না। তিনি আমার খোঁজে আসবেন। আমাকে পাবেন না। নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি ফেরত যাবেন।

তোমাকে পাবেন না কেন?

আমাকে পাবেন না–কারণ আমি দোতলার সবচে কোণার ঘরটায় চলে যাব। ওখানেই থাকব। ম্যানেজার সাহেব জানেন দোতলায় ঐ ঘরগুলির চাবী আমার কাছে নেই।

আসলেই তো নেই।

আছে। সব চাবী আমি খুঁজে বের করেছি।

কিন্তু ম্যানেজার সাহেব খন আসবেন তখন তো দারোয়ানের খোঁজও করবেন।

করতে পারেন। তুমি বলবে সে দোকানে কিছু একটা কিনতে গেছে।

তাহের আর কি বলবে ভেবে পেল না। যুক্তি তার মাথায় ভাল আসে না। অন্যের যুক্তিই তার কাছে সব সময় শক্ত যুক্তি বলে মনে হয়। পারুল বলল–আদা দিয়ে আরেকটু চা করি?

না।

খাও না–ঠাণ্ডার মধ্যে ভাল লাগবে। চা খেয়ে বাগানে চলে যাও–গর্তটা গভীর করে করবে। ঘাসের চাপাড়াগুলি আগে খুব সাবধানে আলাদা করে নিও। পরে ঐ ঘাসের চাপড়াগুলি উপরে দিয়ে দেবে। বর্ষাকাল তো, দেখতে দেখতে সুন্দর ঘাস গজিয়ে যাবে।

তাহের আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, আমি কখনো এই কাজ করব না। বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে গোল। কপালে ঘাম জমল।

করবে না?

না।

আমার কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি করবে।

না পারুল, আমি করব না। তোমার জন্যে আমি অনেক কিছুই করব কিন্তু এই কাজটা করব না।

বেশ, তুমি না করলে আমিই করব। কষ্ট হবে–সময় বেশি লাগবে কিন্তু আমি করব।

তুমি নিজে কবর খুঁদবে?

হ্যাঁ। আমি যা বলি তা কিন্তু করি। তুমি অনেকবার তার প্রমাণ পেয়েছ। পাওনি?

তাহের জবাব দিল না। সে সিগারেট টেনে যাচ্ছে–পরপর তিনটি সিগারেট খাওয়ার জন্যেই হয়ত শরীর কেমন কেমন করছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। পারুল বলল, তুমি শুধু শুধু জেগে থেকো না। শুয়ে পড়। বিছানায় যাবার আগে একটু শুধু কষ্ট করে যাও। ঐ কোনায় দেখ একটা বড় ডেগচি আছে। ডেগচি ভর্তি করে পানি চুলায় দিয়ে দাও।

পানি দিয়ে কি করবে?।

সব কাজ-টাজ শেষ করে, সারা গায়ে সাবান মেখে গরম পানি দিয়ে গোসল করব। গোসল না করলে শরীর ঘিন ঘিন করবে।

তাহের মূর্তির মত বসে রইল। পারুল হাসিমুখে বলল, মনে হচ্ছে পানিও এনে দেবে না। থাক, আমিই আনব। তুমি শুয়ে পড়। শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ। ভয়ের কিছু নেই।

তাহের মন্ত্রের মত বলল, তুমি সত্যি মাটি খুঁড়তে যাবে?

পারুল সহজ গলায় বলল, হুঁ।

তোমার যেতে হবে না। আমিই যাব। কুকুর তিনটা তো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ওরা বাঁধা আছে।

কে বাঁধল?

আমিই বাধলাম, আবার কে।

কোদল কোথায় আছে বললে?

পারুল আঙ্গুল তুলে দিক দেথল। তাহের উঠে দাঁড়াল। নাক জ্বালা করছে। নাক জ্বালা করছে কেন? সে অজ্ঞান টান হয়ে যাবে না তো? অজ্ঞান হবার আগে কি মানুষের নাক জ্বালা করে?

পারুল বলল, বৃষ্টি দেখি আরো জোরে নামল। তুমি এক কাজ কর–খালি গায়ে যাও। শার্ট গায়ে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠাণ্ডা লাগবে। ভেজা কাপড় থেকে ঠাণ্ডা বেশি লাগে। আমি কি আসব তোমার সঙ্গে? পাশে দাঁড়িয়ে থাকব?

না।

তাহের টলতে টলতে এগিয়ে যায়।

০৬. অসুখ-বিসুখ

রহমান সাহেব বললেন, তোমার কি অসুখ-বিসুখ?

তাহের নিচু গলায় বলল, জ্বি-না স্যার। ঠাণ্ডা লেগেছে।

চোখ টকটকে লাল, ঠাণ্ডায় চোখ লাল হয় নাকি?

তাহের ফ্যাকাসে ভঙ্গিতে হাসল। কিছু একটা বলা উচিত–কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার গায়ে জ্বর আছে সে বুঝতে পারছে–সব কেমন হলুদ হলুদ লাগছে।

রহমান সাহেব বললেন, কাল তোমার ওখানে যাব বলে ভেবেছিলাম–বৃষ্টি-টৃষ্টি দেখে আর যাইনি। তোমার স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছ তো?

জ্বি স্যার। ওর বড় চাচার বাসায় দিয়ে এসেছি।

গুড। ভেরী গুড।

একা একা থাকতে খারাপ লাগে তো, এই জন্যে নিয়ে এসেছিলাম। অন্যায় হয়েছিল। কিছু মনে করবেন না স্যার।

নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে রাখবে এতে অন্যায় কি? কমপ্লেইন হচ্ছিল। স্যারের কানে গেলে স্যার রাগ করতে পারেন এই জন্যেই, অন্য কিছু না।

আমি বুঝতে পারছি স্যার।

ঠিক আছে, তুমি যাও। ও আচ্ছা শোন, কি একটা জরুরী কথা বলতে চাচ্ছিলাম–ভুলে গেলাম। ঠিক আছে মনে হলে বলব।

আমি কি স্যার ঘন্টাখানিক পরে আসব?

কেন?

কথা যেটা ভুলে গিয়েছিলেন সেটা যদি মনে পড়ে!

আসতে হবে না। এমন কিছু জরুরী কথা না। জরুরী কথা হলে মনে থাকত।

চলে যাব স্যার?

হ্যাঁ। বাড়ি-ঘর ঠিক-ঠাক রাখবে।

অবশ্যই স্যার। এর মধ্যে কি আপনি একবার আসবেন?

আসব। বাড়িটা রঙ করাতে হবে। র মিস্ত্রীকে নিয়ে এসে এস্টিমেট করাতে হবে।

কবে আসবেন স্যার?

দিন-তারিখের দরকার কি, চলে যাব এক সময়। ও আচ্ছা, কথাটা মনে পড়েছে–কামরুলের খবর কি?

তাহেরের বুক ধ্বক করে উঠল–মনে হল সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। কামরুলের খবর কি? এই প্রশ্নের উত্তরে সে কি বলবে?

তাহেরকে কিছু বলতে হল না। রহমান সাহেব বিরক্ত ভঙ্গিতে বললেন, কুকুর তিনটাকে ইনজেকশন দেয়ার জন্যে তার নিয়ে যাবার কথা–আমি ইনজেকশন আনিয়ে রেখেছি–সে আসছে না কেন? সব সময় এ রকম করে। একবারের জায়গায় দশবার বলতে হয়। ওকে খবর দেবে।

জ্বি আচ্ছা।

স্যার চিঠিতে জানতে চেয়েছেন ইনজেকশন দেয়া হয়েছে কি না। এক সপ্তাহ আগে তাকে বলেছি, আশ্চর্য, এমন গাফিলতি। তুমি তাকে কালই আসতে বলবে।

জ্বি বলব। তবে কাল বোধহয় আসতে পারবে না। জ্বর হয়েছে। বিছানায় শুয়ে আছে দেখলাম। কাছে অবশ্যি যেতে পারি নাই। কুকুরগুলির কারণে কাছে যেতে ভয় লাগে। কোন দিন এরা আমাকে মেরে ফেলে কে জানে।

রহমান সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, এখন তুমি যাও। তাহের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বের হয়ে এল। জ্বর বোধহয় আরো বেড়েছে। মাথা ঘুরছে। সকালে সে নাশতা না খেয়ে বের হয়েছে। পারুল নাশতা বানিয়েছিল–রুটি, আলু ভাজা। তার খেতে ইচ্ছে করেনি। তার ঘর থেকে বেরুতেও ইচ্ছা করেনি। পারুলই তাকে প্রায় জোর করে বাইরে পাঠিয়েছে। সহজ গলায় বলেছে–এই বাড়িতে থাকলেই তোমার আরো খারাপ লাগবে। গত রাতের কথা মনে পড়বে। তুমি বরং ঘুরে টুরে আস। সন্ধ্যাবেলা যখন ঘরে ফিরবে দেখবে আগের মত খারাপ লাগছে না।

কোথায় ঘুরব?

অফিসে যাও। সবার সঙ্গে গল্প-টল কর। যত গল্প করবে তত দ্রুত তুমি সহজ হবে। তাতে মাথা থেকে রাতের ব্যাপারটা চলে যাবে।

তুমি একা থাকবে?

একা কোথায়? আমার কুকুর তিনটা আছে না? আমি ভালই থাকব, আমার কোন সমস্যা হবে না–তুমি আসার সময় কিছু চা-পাতা নিয়ে এসো। চা-পাতা, আরেকটা বই–শিশুদের নামের বই। বাচ্চাদের নাম রাখার এখন সুন্দর সুন্দর বই পাওয়া যায়। এলফাবেটিকেলী সাজানো। বই-এ নাম, নামের অর্থ সব দেয়া থাকে। মনে থাকবে?

হুঁ, থাকবে।

চা-পাতা আনতে যদি ভুলেও যাও–বই আনার কথাটা কিন্তু ভুললে চলবে না।

তাহের ভুলেনি–তার মনে আছে। তার শরীর খারাপ, মাথা ঘুরছে, গায়ে জ্বর, তারপরে সবকিছুই তার মনে আছে। সে ম্যানেজার রহমান সাহেবের ঘর থেকে লবীতে চলে এল। রিসেপসনিস্ট মেয়েটি আজও সবুজ শাড়ি পরেছে। সম্ভবত তার অনেকগুলি সবুজ শাড়ি। মেয়ে শাড়ির রঙ মিশিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়–সবুজ রঙের লিপস্টিক কি পাওয়া যায়? নিশ্চয়ই যায়। সে তো আর খোঁজ-খবর করে না। খোঁজ-খবর করলে দেখত দোকান ভর্তি সবুজ বরে লিপস্টিক। আজ যখন বইমের দোকানে যাবে তখন সে লিপস্টিকের দোকানে খোঁজ করবে। কিনতে পারবে না, টাকা নেই। দামটা শুধু জানবে। দোকানদার বিরক্ত হবে। ওরা আবার চট করে ধরে ফেলে কে কিনতে এসেছে আর কে শুধু দরদাম করতে এসেছে।

হঠাৎ তাহেরের মন বিষণ্ণ হয়ে গেল–তার মনে পড়ল এখন পর্যন্ত সে পারুলকে কোন উপহার দেয়নি। কোন কিছুই না। এর মধ্যে তার একবার জন্মদিন গেল। তারা তখন সিরাজউদ্দিন সাহেবের বাসায় থাকে। সকালবেলা পারুল বলল, বুঝলেন জনাব, আজ আমার জন্মদিন। আজ অবশ্যই আমার জন্যে কয়েকটা গোলাপ ফুল কিনে আনবেন। বেশি আনার দরকার নেই–যা দাম। দুটা আনলেই হবে। খবর্দার, উপহার-টুপহার আবার আনতে যাবেন না।

তাহের উপহার আনেনি, ফুলও আনেনি। ভুলে গিয়েছিল। জন্মদিনের সেই উপহার আজ কিনে নিয়ে গেলে কেমন হয়? কিছু টাকা সঙ্গে আছে। লিপস্টিকের দাম কত সে জানে না–চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ টাকায় হলে কিনে ফেলা যায়। রিসেপসনিস্ট মেয়েটাকে কি সে জিজ্ঞেস করবে লিপস্টিকের দাম কত? রাগ করবে না তো আবার সুন্দরী মেয়েরা সব সময় রেগে থাকে। ব্যতিক্রম অবশ্যি আছে। যেমন পারুল কখনো রাগে না। সে রূপবতী এ কথাটা বোধহয় তার জানা নেই। জানলে সেও সারাক্ষণ রেগে থাকত।

রিসেপসনিস্ট মেয়েটি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এই শুনুন। তাহের তার দিকেই তাকিয়েছিল–সে চমকে উঠল।

আপনি কিছু বলবেন?

জ্বি-না।

কিছু বললেন না, তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? মেয়েদের দিকে এভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা যে অভদ্রতা এটা কি আপনার জানা নেই? আজ তো নতুন না, আপনাকে আগেও বলেছি।

তাহের নিজের অজান্তেই বলল, আপনার কি অনেকগুলি সবুজ রঙের শাড়ি?

মেয়েটি হকচকিয়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তার মুখে কোন জবাব আসছে না। তাহের বলল, সুন্দর করে যে সাজে সে তো অন্যকে দেখাবার জন্যই সাজে। কাজেই মানুষজন যদি তাকে অবাক হয়ে দেখে তাতে রাগ করার কিছু নেই–বরং খুশি হওয়া উচিত।

জ্বরের ঘোরে বোধহয় তাহেরের মাথায় কিছু হয়েছে কিংবা কাল রাতের ভয়াবহ ঘটনার ফলও হতে পারে–কেমন সুন্দর কথার পিঠে কথা বলে যাচ্ছে। মেয়েটিকে কোণঠাসা করে–এক ধরনের আনন্দও সে পাচ্ছে।

রিসেপসনিস্ট মেয়েটি থমথমে গলায় বলল–আপনি কি এই অফিসে কোন কাজে এসেছেন?

জ্বি-না। আমি এখানে কাজ করি। আমি এই প্রতিষ্ঠানেরই একজন।

কই, আমি তো জানি না। কি কাজ করেন?

আমি দারোয়ান। বড় সাহেবের বাড়ি পাহারা দেই। উত্তরখানে উনার একটা বাড়ি আছে। আমি ঐ বাড়ির পাহারাদার। পাহারাদার শুনেই এমন ছোট চোখে তাকাবার দরকার নেই। ছোটবেলায় বই-এ পড়েননি–পৃথিবীর কোন কাজই ছোট না। আপনার কাজের যে মর্যাদা একজন গোর খোদকের কাজেরও একই মর্যাদা।

প্লীজ, আপনি আমাকে যথেষ্ট বিরক্ত করেছেন। আর করবেন না।

জ্বি আচ্ছা–আর বিরক্ত করব না। ইচ্ছা থাকলেও করা যাবে না। আমাকে নিউ মার্কেটে বইয়ের দোকানে যেতে হবে–একটা বই কিনতে হবে। শিশুদের নামের উপর একটা বই–যেখানে নাম সব এলফাবেটিকেলী সাজানো থাকে–নামের অর্থ দেয়া থাকে। আমরা স্ত্রী বেবী এক্সপেক্ট করছেন–এখনো দেরি আছে। মেয়েরা বাচ্চার নাম-টাম নিয়ে আগেভাগেই চিন্তা করতে ভালবাসে।

রিসেপসনিস্ট মেয়েটি তীব্র দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। তার চোখে সামান্য হলেও ভয়ের ছায়া। ভয়ের এই ছায়াটি কি জন্যে তাহের পরতে পারছে না। তার এলোমেলো কথা বলার জন্যে? না-কি জ্বরে তার চেহারা অন্য রকম হয়ে গেছে সে জন্যে? ভয় পাওয়া মানুষকে আরো ভয় পাইয়ে দিতে ইচ্ছে করে। তাহেরেরও করছে, তবে সে বুঝতে পারছে না–ঠিক কি করলে মেয়েটা আরো ভয় পাবে। তাহের হাই তুলল। সুন্দরী মেয়েদের সামনে কোন পুরুষ কখনো হাই তুলে না। তাহের তুলছে। কারণ মেয়েটিকে এখন আর তার তেমন সুন্দর লাগছে না। তাহের সহজ গলায় বলল–যাই, পরে কথা হবে। দারোয়ানের সঙ্গে অনেক কথা বলায় আপনি যদি মনে করে থাকেন আপনার সম্মানহানি হয়েছে, তাহলে ভুল করবেন–আমি দারোয়ান হলেও শিক্ষিত দারোয়ান। এম. এ. পাশ। জিওগ্রাফী। এম. এ. অনার্স, দুটাতেই থার্ড ক্লাস, এই জন্যে কলেজে চাকরি হল না। প্রাইভেট কলেজেও লেকচারার-এর চাকরির জন্য অনার্স এম. এ.-এর একটাতে মিনিমাম সেকেন্ড ক্লাস লাগে। যাই, কেমন?

মেয়েটি শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

তাহেরের মাথা ঘুরছে। বুক জ্বালা করছে। মুখে টুক টুক ঝঝ। এসিডিটি নিশ্চয়ই। কিছু খাওয়া দরকার। খিদে হচ্ছে না–খাবে কি? খিদে হলে অফিস কাটিনে ঢুকে একটা সিঙারা খেয়ে নিত। নিউ মার্কেটে বই কেনার পর কয়েকটা চক্কর লাগালে খিদে হতে পারে।

বইয়ের দাম ত্রিশ টাকা। দোকানদার পাঁচ টাকা কমিশন দিল। না চাইতেই দিল। না চাইলে এই যুগে কেউ কমিশন দেয় না। বইয়ের দোকানদার দিয়েছে। তাহের তার ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে গেল। সে আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল, ভাই, মেনি মেনি থ্যাংকস। আমি দরিদ্র মানুষ তো–পাঁচটা টাকা আমার কাছে পাঁচশ টাকার মত।

আপনার কি শরীর খারাপ?

জ্বী, শরীর খুবই খারাপ। বলতে গেলে সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজেছি। রাতেই জ্বর এসেছে।

বাড়িতে চলে যান। বাড়িতে গিয়ে শুয়ে থাকেন।

তাই করব। এক্ষুণি রওনা দেব–বাড়ি অবশ্যি শহরের বাইরে। যেতে যেতে দুঘণ্টা লাগবে। ভাই যাই। এগেইন মেনি মেনি থ্যাংকস।

তাহের সরাসরি বাড়ির দিকে রওনা হল না। নিউমার্কেটে দুটা চক্কর দিল। আরো কি যেন তার কেনার কথা। মনে পড়ছে না। মনে করার জন্যে চক্কর দেয়া। পারুল বই ছাড়াও আরো কি যেন কিনতে বলেছে। সেটা কি? লিপস্টিক? না, লিপস্টিক না। লিপস্টিকের কথা কেউ তাকে বলেনি— এটা তার নিজের মাথায় এসেছে। আচ্ছা, লিপস্টিকের খোঁজটা নিয়ে গেলে হয় না? তাহের জমকাল করে সাজানো একটা দোকানে ঢুকে পড়ল।

ভাই, আপনাদের কি লিপস্টিক আছে?

আছে। কোন কোম্পানীর, কি রঙ?

যে কোন কোম্পানীর হলেই হবে।

রঙটা কি?

সবুজ রঙ।

সবুজ রঙ?

জ্বি সবুজ। গাঢ় সবুজ–কলাপাতার মত সবুজ।

সবুজ রঙের লিপস্টিক হয় না।

লাল ছাড়া অন্য কোন রঙের হয় না?

হবে না কেন? হয়। মেরুন আছে, মেটে রঙ আছে, হালকা ব্লু আছে, কালো আছে–সোনালী আছে।

সোনালা রঙের লিপস্টিক আছে?

জ্বি আছে। দেখবেন?

একটু দেখান না—প্লীজ।

কিনবেন?।

দামে পুষলে কিনব। পঞ্চাশ-পাঁচপঞ্চাশ টাকার ভেতর যদি হয়।

সোনালী রঙের লিপস্টিকের দাম তেত্রিশ শ টাকা।

কত বললেন?

তেত্রিশ শ টাকা। তিন হাজার তিন শ–সঙ্গে একটা লাইনার আছে। লাইনারটার দাম আলাদা।

লাইনার কি?

পেন্সিলের মত একটা জিনিস। লিপস্টিক দেয়ার পরে লাইনার দিয়ে বর্ডারের মত দিতে হয়। তাহলে লিপস্টিক ছড়িয়ে যায় না।

লাইনারটার দাম কত?

আটশ। তবে লিপস্টিক আর লাইনার একসঙ্গে কিনলে চার হাজারে দেয়া যাবে।

তাহের হতভম্ব গলায় বলল, সত্যি বলছেন না ঠাট্টা করছেন?

দোকানী সহজ গলায় বলল–ঠাট্টার কোন ব্যাপার না। খদ্দেরের সঙ্গে ঠাট্টা করা যায় না।

আমি আপনার খদ্দের না। আমি কোনদিন এই জিনিশ কিনতে পারব না। ভাই, যদি কিছু মনে না করেন–সোনালী রঙের লিপস্টিকটা আমি দূর থেকে একটু দেখব। হাতও দেব না।

হাত দিন। হাত দিয়ে দেখতে অসুবিধা কি? এটা তো আর আগুন না যে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে।

তাহের গভীর আগ্রহে সোনালী রঙের লিপস্টিক হাত দিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখছে। সামান্য এতটুক একটা জিনিশ, ঠোঁটে লাগানো হয়–এর দাম তেত্রিশ শ টাকা।

ভাই, এই লিপস্টিকের বিশেষত্ব কি?

বিশেষত্ব কিছু না। নামী কোম্পানী র‍্যাভলন। নন স্টিক। ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে চা খেলে চায়ের কাপে লিপস্টিকের দাগ লাগবে না।

চায়ের কাপে লিপস্টিকের দাগ পড়ে যায় এই তথ্যই তাহেরের জানা ছিল না। এই পৃথিবীতে কত কিছুই না আছে জানার।

কেউ কি এই লিপস্টিক কেন?

কেন কিনবে না? হরদম কিনছে। না কিনলে আমরা বাঁচব কি ভাবে?

ভাই, মেনি মেনি থ্যাংকস।

দুপুর হয়ে গেছে। মাথায় উপরে গনগনে সূর্য। এই রোদে বাসে করে রওনা হতে ইচ্ছা করছে না। পার্কের কোন বেঞ্চিতে ছায়ার মধ্যে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। আসলে বাড়ি ফিরতেই ইচ্ছা করছে না। তারপরেও ফিরতে হবে–পারুল বেচারী একা আছে। না জানি কত ভয় পাচ্ছে। কি জানি সে কিনতে বলেছিল মনে পড়ছে না। জরুরী কথা মনে পড়ে না। শুধু অদরকারী কথা মনে পড়ে। তাহের হেঁটে হেঁটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে রওনা হল। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে–কে জানে। হাঁটতে হাঁটতে ঘুমিয়ে পড়বে কি-না।

তাহের বিকেল পর্যন্ত ঘুমালো। পাকের লম্বা বেঞ্চে শুয়ে দীর্ঘ সুম। আরামের ঘুম। অনেকদিন এত আরাম করে সে ঘুমায়নি।

তাহের ঘুম ভাঙার পর অবাক হয়ে দেখল তাকে ঘিরে ছোটখাট একটা ভিড়। একজন পানওয়ালা, এই প্রচণ্ড গরমে সুয়েটার পরা এক বুড়ো লোক, মাস্তান টাইপ দুটা ছেলে। বুড়ো ভদ্রলোক বললেন, কি হয়েছে?

তাহের বেঞ্চিতে উঠে বসল। সে আরাম করে ঘুমুচ্ছিল। এর বেশি তো কিছু হয়নি। গায়ে জ্বর ছিল–টানা ঘুম দেয়ায় ঘরটা সেরে শেছে বলে মনে হয়। তাকে ঘিরে এই জটিলার কারণটা কি?

বুড়ো ভদ্রলোক ঝুঁকে এসে বললেন, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করছিলেন। তাহের বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, স্বপ্ন দেখছিলাম।

সে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত সরে পড়া উচিত। বুড়ো ভদ্রলোক বললেন, বই ফেলে যাচ্ছেন তো।

তাহের বইটা হাতে নিল। বইটা সে কিছুক্ষণ আগে কিনেছে এটা মনে করতে তার কিছুটা সময় নিল। আশ্চর্য, সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

মস্তান ধরনের ছেলে দুটির একটি বলল, ব্রাদার, শরীর ঠিক আছে তো?

জ্বি, ঠিক আছে।

পার্কে এইভাবে ঘুমাবেন না। পকেট থেকে মানিব্যাগ হাপিস হয়ে যাবে। মানিব্যাগ পকেটে আছে?

জি, আছে।

তাহের হাঁটা ধরেছে। একবার পেছন ফিরল–লোকগুলো এখনো তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে কৌতূহল। ঘুমের মধ্যে সে এমন কি করেছে যে লোকগুলো এখনো তাকিয়ে আছে? সাধারণত ভয়ংকর কোন স্বপ্ন দেখলেই মানুষ চেঁচিয়ে উঠে। সে কোন দুঃস্বপ্ন দেখেনি। শান্তির একটা ঘুম ঘুমিয়েছে।

এখন কটা বেজেছে? তাহেরের হাতে ঘড়ি নেই। সময়টা জানা থাকলে ভাল হত। ফিরতে ইচ্ছা করছে না। রাত হোক, সে রাতের অন্ধকারে ফিরবে। এমন ভাবে কবে যেন কেউ তাকে না দেখে। এতক্ষণ কি করবে? হাঁটবে রাস্তায় রাস্তায়? মন্দ কি?

০৭. ভদ্র হও নিকি

নিকি, তুমি কিন্তু দুষ্টামি করছ। ভদ্র হও নিকি। অন্যদের খেতে দাও। দেখ, তোমার জন্যে ফিবো খেতে পারছে না। এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। মেয়েদের লক্ষ্মী হতে হয়। তুমি মেয়ে হয়ে ছেলে দুটিকে খেতে দিচ্ছ না, এটা ঠিক হচ্ছে না। আমরা মেয়ে কি করি জান না? পুরুদের খাওয়া হয়ে গেলে তারপর খেতে বসি! ভাল ভাল খাবার পুরুষদের প্লেটে তুলে দিয়ে তারপর যা থাকে তাই সোনামুখ করে খেয়ে ফেলি। এটাই সাধারণ নিয়ম। মাইক, তোমার আর কি হল? দাঁত বের করে কাকে ভয় দেখাচ্ছ? লেজ মুলে দেব?

পারুল বড় একটা গামলায় কুকুরদের খেতে দিয়েছে। গরম গরম ভাত ডাল দিয়ে মাখানো। গোশত ছাড়া এরা কিছু খায় না। সারা দিনে এক বেলা খায়–হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করা মাংস। পুরোপুরি সেদ্ধ না–আধাসেদ্ধ। ঘরে মাংস নেই, তাহেরকে দিয়ে আনতে হবে।

ফিবো। তোমার সারা গায়ে কাদা লেগে আছে এটা কেমন কথা। নিকি আর মাইকের গায়ে তো কাদা লাগেনি। তুমি বুঝি কাদায় গড়াগড়ি করেছ? এখন যদি এক বালতি পানি তোমার গায়ে ঢেলে দি তাহলে ভাল হবে? কাল দুপুরে তোমাদের গোসল। করিয়ে দেব। সাবান মেখে ব্রাস ঢেলে দেব। বুঝেছ? আরেকটা কাজ করব–তোমাদের নাম বদলে দেব। ইংরেজি নাম আমার ভাল লাগে না। সুন্দর বাংলা নাম দেব। নামের বই ও আজ নিয়ে আসবে–সেই বই দেখে নাম রাখব। আচ্ছা, এই যে আমি এত কথা বলছি–ফিবো আর মাইক শুনছে–কিন্তু নিকি, তুমি কিছুই শুনছ না। এটা অভদ্রতা না?

নিকি মুখ তুলে তাকাল। চাপা শব্দ করল। পারুল বলল, এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। আদব-কায়দা জানে। এখন থেকে তোমাদের আমি আদব-কায়দাও শেখাব। গান গাইতে পারলে গান গেয়ে শুনতাম। গান জানি না। কবিতা জানি না। একটা শুধু জানি–দুই বিঘে জমি–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সেই কবিতা তো তোমাদের আগে একবার শুনিয়েছি। এই কবিতাটি ছোটবেলায় মুখস্থ করেছিলাম। আমাদের পাড়ায় একবার রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে। আমার সেখানে দুই বিঘে জমি কবিতা আবৃত্তি করার কথা। রোজ পল্টু ভাইদের বাড়িতে বিহার্সেল হত। চা-সিঙ্গারা খাওয়া হত। খুব মজা হত। আমার এত ভাল লাগত। শেষ পর্যন্ত আমি অবশ্যি রবীন্দ্র জয়ন্তীতে কবিতা আবৃত্তি করিনি। কেন শুনবে? আচ্ছা শোন–খবর্দার, কাউকে বলবে না। মানুষদের তোমরা বলতে পারবে না তা তো জানি, অন্য কুকুরদেরও বলবে না, কারণ খুব লজ্জার ব্যাপার। যেদিন রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে তার আগের দিন রাতে স্টেজ রিহার্সেল হবে। সেদিন আবার খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে। হারিকেন জ্বালিয়ে রিহার্সেল হল। রিহাসেলের পর সবাই চলে যাচ্ছে, পল্টু ভাই আমাকে বললেন–পারুল, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে তুই একা যাবি কি করে? তুই থাক, আমি পৌঁছে দেব। ড্রাইভার এক্ষুণি আসবে, তোকে নামিয়ে দেবে। আমি থেকে গেলাম–সবাই চলে গেল। পল্টু ভাই তখন একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড করল। মানুষেরা যে কি ভয়ঙ্কর কাণ্ড করতে পারে তোরা জানিস না, কারণ তোরা হলি পশু। মানুষের কত ভয়ঙ্কর তোরা জানবি কি করে? আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানিস? ঐ ভয়ঙ্কর কাণ্ডের পর পল্টু ভাই গাড়ি করে আমাকে বাসায় পোঁছে দিলেন। সহজ গলায় বললেন–কবিতা আবৃত্তির সময় তুই মাঝে মাঝে ফাম্বল করিস। কথা জড়িয়ে যায়। পরিষ্কার করে আবৃত্তি করবি। নো ফাম্বলিং।

তোদের সঙ্গে তো তখন পরিচয় হয়নি। তোদের বোধহয় তখন জন্মও হয়নি। তোরা যদি তখন আমার সঙ্গে থাকতি তাহলে অবশ্যই পলটু ভাইকে বুঝিয়ে দিতাম–দুই বিঘে জমি আসলে কতটুকু জমি।

পল্টু ভাই এখনো রবীন্দ্র শতবার্ষিকী, নজরুল জয়ন্তী এসব করে বেড়াচ্ছে। বিরাট ফার্মেসী দিয়েছে। ফার্মেসিীর নাম–উপশম। এইবার আমি তাকে উপশম শিখিয়ে ছাড়ব। সুন্দর করে পল ভাইকে একটা চিঠি লিখে এ বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ করব। উনি চিঠি পেয়ে দেরি করবেন না, সঙ্গে সঙ্গে চলে আসবেন। এই সব লোক কখনো কোন সুযোগ নষ্ট করে না। আমি গেট খুলে উনাকে ঢুকাব। হাসিমুখে বলব, কেমন আছেন পল্টু ভাই?

উনি বলবেন, ভাল। আরে, তুই এত বড় হয়ে গেছিস। বিয়ে-টিয়ে করে একেবারে ঘরণী হয়ে গেছিস। তোকে তো দারুন লাগছেরে।

আমি বলব, সুন্দর হয়েছি, তাই না? ছোটবেলায় তো আর এত সুন্দর ছিলাম না। আমি যখন ছোট ছিলাম সেই সময়ের কথা কি আপনার মনে আছে?

উনি একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে বলবেন, কিসের কথা বলছিস?

ঐ যে রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে, ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল–আপনি আমাকে থেকে যেতে বললেন, তখন ছোট ছিলাম, কিছু বুঝতাম না–এখন আপনাকে সব জেনেশুনে ডেকেছি। আর আপনাকে ফিরে যেতে দেব না।

উনি অস্বস্তির সঙ্গে কথা ঘুরাবার জন্যে বলবেন–এত বড় বাড়ি, এটা কার?

তখন আমি বলব, আমার বাড়ি। আবার কার? ঐ মে কুকুর লি দেখছেন ওরাও আমার। গায়ে শাদা ফুটকি সেটার তার নাম–নিকি। ও হল মেয়ে। ও সবচে ভয়ংকর। মেয়েরা মাঝে মাঝে দারুণ ভয়ংকর হতে পারে, জানেন তো? নাকি জানেন না?

পল্টু ভাই ততক্ষণে পুরো ব্যাপারটা আঁচ করে ফেলবেন। বুদ্ধিমান মানুষ তো। আঁচ করতে দেরি হবে না। আঁচ করে ফেললেও লাভ হবে না। ততক্ষণে আমি গেট বন্ধ করে দিয়েছি। হি হি হি।

তোদের তখন আমি ডেকে পাঠাব। তোরা এক সঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে পড়বি। পারবি না? কিংবা একজন ঝাঁপ দিয়ে পড়বি। বাকি দুজন তাকে ঘিরে চক্কর লাগাবি। নিকি তুই ঝাঁপ দিবি। তুই তো মেয়ে, তোর দায়িত্ব বেশি।

নিকি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাইক এবং কিবো লেজ নাড়ছে।

পারুল চাপা গলায় বলল, কাজটা শেষ হবার পর–তোদের আমি খুব সুন্দর করে দুই বিঘে জমি আবৃত্তি করে শোনাবো। নাকি এখনই শুনতে চাস?

নিকি, মাইক, কিবো তিনজনই একসঙ্গে লেজ নাড়ল। মনে হচ্ছে তারা শুনতে চায়। পারুল চাপা গলায় শুরু করল–

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সব গেছে ঋণে
বাবু কহিলেন, বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।
কহিলাম আমি, তুমি ভূস্বামী, ভুমির অন্ত নাই
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়োজোর মরিবার মত ঠাঁই।

গেটে শব্দ হচ্ছে। তিনটি ককর এক সঙ্গে গেটের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। পারুল বলল–ও এসেছে। যা, তোরা খেলা কর গিয়ে। বাকি কবিতাটা অন্যদিন শুনাব। যা বললাম।

পারুল চাবি হাতে গেটের দিকে রওনা হল। গেটের শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে না কে এসেছে। অন্য কেউও হতে পারে। পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে গেট খোলা যাবে না। তাহেরকে গেটে ধাক্কা দেবার একটা কৌশল শিখিয়ে দিতে হবে। পরপর তিনবার ধাক্কা দেবে থামবে তারপর দুবার দেবে।

তাহেরের গলা শোনা গেল, সে কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকছে–পারুল। এই পারুল! গেট খোল।

পারুল গেট খুলল। তাহের বিব্রত গলায় বলল, দেরি করে ফেললাম।

না, দেরি কোথায়! এসো। আমার বই এনেই?

হুঁ।

চা আর চিনি?

ভুলে গেছি।

থাক। ভুলে গেলে কি আর করা–এসো, ঘরে চল। দাঁড়িয়ে আছ কেন?

তাহের হাত তুলে দেখাল। নিকি, ফিবো আর মাইক–এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তাদের চোখ জ্বল জ্বল করছে। পরুল বলল–ওরা তাকিয়ে আছে তো কি হয়েছে? এসো। পারুল তাহেরের হাত ধরল।

তোমার গা গরম। জ্বর এসেছে?

বোধ হয়।

পারুল বলল, জ্বরের আমি একটা খুব ভাল চিকিৎসা জানি। এক্ষুণি সেই চিকিৎসা করা হবে– দেখলে কোথায় পালিয়েছে জ্বর।

পারুল সহজ স্বাভাবিক গলায় কথা বলছে। যেন কিছুই হয়নি, সব আগের মত আছে। তাহের পারুলের পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকল। কুকুর তিনটা এখনো তাকিয়ে আছে।

বাথরুমে তোমার জন্যে গরম পানি দিচ্ছি। আরাম করে গা ডলে গোসল কর।

জ্বর-গায়ে গোসল করব?

জ্বর-গায়ে গোসলই হচ্ছে জ্বরের অষুধ। একে বলে জল-চিকিত্সা। তুমি কি তোমাদের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছ?

হুঁ।

উনি কিছু বলেছেন

না।

কিছুই বলেননি?

কি কি যেন বলেছেন–ভুলে গেছি।

ভুলে যাওয়াই ভাল। পৃথিবীতে সবচে সুখী মানুষ কারা জান? যারা দ্রুত সব ভুলে যেতে পারে তারা। যারা কিছুই ভুলতে পারে না তারা দারুণ অসুখী। আজ রাতের খাওয়া কিন্তু খুব সাধারণ–শুধু ডাল আর ভাত। ঘরে যে কোন বাজার নেই তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। কাল বাজার করে দেবে।

আচ্ছা।

নিকি, ফিরো, মাইক এদের মাংস আনতে হবে।

আচ্ছা।

আজ সারাদিন কি করলে? মনে আছে না ভুলে গেছ?

পার্কের বেঞ্চিতে ঘুমিয়েছি।

এই তো একটা কাজের কাজ করছে। বেঞ্চিতে না ঘুমিয়ে গাছের নিচে ঘুমালে আরো মজা হত। ছেলে হয়ে জন্মানোর অনেক সুবিধা। যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে পড়তে পার। তুমি কি গোসলের পর এক কাপ চা খাবে? ঘরে সামান্য চা-চিনি আছে।

গোসল করব না।

অবশ্যই করবে। গোসলের পর পর দেখবে শরীরের জং পরা ভাব সেরে যাবে।

পারুলের কথাই ঠিক। গোসলের পর তাহেরের শরীর ঝরঝরে হয়ে গেল। মাথায় চাপা যন্ত্রণা ছিল, সেটিও সেরে গেল। আরাম করে ভাত খেল। ডালভাতি তবে তার সদে শুকনো মরিচ পড়িয়ে পেয়াজ মেখে একটা ভতার মত বানিয়েছে। আগুনের মত ঝাল–কিন্তু খেতে অসাধারণ। পারুল খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ বলল, তুমি কি কাল আমাকে একটা কাজ করে দেবে?

-কি কাজ?

আমি একটা চিঠি লিখে রেখেছি–একজনকে পৌঁছে দিতে হবে। পারবে না?

হুঁ, পারব।

কি লিখেছি সেই চিঠিতে জানতে চাও না?

তাহের কিছু বলল না। পারুল চোখ বড় বড় করে বলল, কার কাছে চিঠি লিখলাম, কি ব্যাপার কিছুই জানতে চাও না?

তুমি বললেই জানব। না বললে জানব কিভাবে?।

পল্টু ভাইকে একটা চিঠি লিখেছি। ভাল নাম মনে নেই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এই সব নিয়ে তিনি সব সময় খুব ব্যস্ত থাকেন। বাচ্চাদের নিয়ে তার একটা সংগঠন আছে–কিশোর মেলা।

ও অচ্ছি।

বিরাট একটা ফার্মেসী আছে। টুকটাক ব্যবসা আছে। ফার্মেসীটা কোথায় আমি জানি–তোমাকে বলে দেব–খুঁজে বের করে তাকে চিঠিটা দেবে।

আচ্ছা।

তোমার মাথা ধরা কমেছে, না?

হুঁ।

চল, খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা এই বাড়ির ছাদে ঘুরে বেড়াব।

কেন?

কেন আবার কি? মানুষ বেড়ায় কেন? আজ জোছনা আছে–ছাদ থেকে জোছনা দেখতে খুব ভাল লাগবে।

ঘুম পাচ্ছে তো।

ঘুম পেলে স্থানে ঘুমিয়ে পড়বে। সঙ্গে করে চাদর নিয়ে যাব, বালিশ নিয়ে যাব। চল এক কাজ করি–দুজনেই ছাদে ঘুমুব।

তাহের ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ পড়ল বাড়ির পেছনের বাগানে–বেশ বড়সড় একটা গর্ত। গর্ত নতুন করা হয়েছে। মাড়ি স্তূপ হয়ে আছে। মাটির পাশে কোদাল পড়ে আছে।

পারুল বলল, এত মন দিয়ে কি দেখছ?

তাহেরের বুক ধ্বক ধ্বক করছিল। সে আতংকিত গলায় বলল, ঐ খানে গর্ত কে করল?

আমি করেছি।

আমি করেছি মানে কি?

সারাদিন কিছু করার ছিল না–ভাবলাম, দেখি তো আমি গর্ত করতে পারি কি না। কোদাল দিয়ে কোপ দিয়ে দেখি মাটি মাখনের মতো নরম।

এই গর্ত তুমি করেছ?

এম্নি করেছি। গর্ত খোঁড়া তো অপরাধ না। বাংলাদেশের সংবিধানে কি কোথাও লেখা আছে গর্ত খোঁড়া যাবে না?

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তাহের প্রায় কাদো কাঁদো গলায় বলল, পারুল, তোমার কিছু একটা হয়েছে। আমি তোমার পায়ে ধরছি–চল আমরা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাই।

পারুল হালকা গলায় বলল, চলে তো যাবই। চির জীবনের জন্যে তো এখানে থাকতে আসিনি। যে অল্প কদিন আছি–ভালমত থাকি। দেখ কি সুন্দর চাঁদ।

তাহের চাঁদ দেখছে না, সদ্য খোঁড়া গর্তের দিকে ভয় ও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে।

তুমি একা একা এত বড় গর্ত খুঁড়েছ?

বললাম না মাটি খুব নরম। ফ্লাওয়ার বেড় করার জন্যে আগেই বোধহয় কেউ মাটি খুঁড়ে রেখেছিল।

তাহের মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে আছে। কুকুর তিনটাকে আসতে দেখা যাচ্ছে। এর গর্তের চারপাশে একটা চক্কর দিল। থমকে দাঁড়িয়ে গর্তের দিকে তাকালো। তিনজন এক সঙ্গে উপরের দিকে তাকালো–কিছু খুঁজল, আবার হাঁটতে শুরু করল। পারুল বলল, কুকুর যে জোছনা পছন্দ করে না সেটা কি তুমি জান?

তাহের বলল, না।

ওরা জোছনা একেবারেই পছন্দ করে না। আজ পূর্ণিমা তো, দেখবে ওরা কি রকম ছটফট করবে। মাঝরাতে কি করবে জান?

না।

মাঝরাতে তিনজনই চাঁদের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে শুরু করবে। কুকুরের কান্না তুমি কখনো মন দিয়ে শুনেছ?

না।

ভয়ংকর। না শোনাই ভাল। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে।

তাহের পকেটে হাত দিল। তার গা ঝিমঝিম করছে। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ঝিমঝিমানি হয়ত দূর হবে। পকেটে সিগারেট নেই। নিচে ফেলে এসেছে। পারুল বলল, আমি ঠিক করেছিলাম কুকুর তিনটার নাম বদলে বাঙালী ধরনের নাম রাখব। এখন ভাবছি সেটা ঠিক হবে না। ওরা তো আর দিশি কুকুর না। দিশি নাম ওদের পছন্দ হবে না। ঠিক না?

হুঁ।

ওদের বিদিশী নামই ভাল–নিকি, মাইক, ফিবো…।

তাহের এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কুকুর তিনটি গর্তের চারপাশে আবার ঘুরছে! ওরা কি কিছু আঁচ করতে পারছে?।

পারুল বলল, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে নাকি?

হুঁ।

তাহলে চল শুয়ে পড়ি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আনিকক্ষণ গল্প করি। তোমার তো আবার বিশ্রী অভ্যাস–বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুম। আজ কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প করব। দুজনে মিলে আমাদের বাবুর নাম ঠিক করব।

কুকুর তিনটা গর্তের চারপাশে ঘুরছে কেন?

কে জানে কেন? নতুন কিছু দেখেছে–কাজেই ঘুরে ঘুরে দেখছে। কুকুরের মনের কথা তো জানার উপায় নেই। চল ঘুমুতে যাই।

তাহের নিঃশব্দে নেমে এল।

বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুমে তাহেরের চোখ জড়িয়ে আসে–আজ আসছে না। খাটের পাশে সাইড টেবিলে পারুল টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়েছে। ল্যাম্পের আলো চোখে লাগছে। পারুলের হাতে নাম-এর বই। পারুল শান্ত গলায় বলল, আমি নামগুলি পড়ে যাব–প্রথম পড়ব মেয়েদের নাম, কারণ আমার ধারণা আমাদের প্রথম বাচ্চাটি হবে মেয়ে। তুমি চুপচাপ শুনে যাবে। যখনই কোন নাম পছন্দ হবে তখনি বলবে, স্টপ। নামের সঙ্গে সঙ্গে আমি অর্থও বলব। ঠিক আছে?

তাহের কোন উত্তর দিল না। তারা আজ আবার মেসবাউল করিম সাহেবের মূল শোবার ঘরে শুয়েছে। এই ঘরটার ভেতর দম বন্ধ করা কিছু আছে। তাহেরের দম বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বাসকষ্টের মত হচ্ছে।

পারুল বলল, প্রথম শুরু করছি আ দিয়ে–

আজরা–কুমারী
আতিয়া—দানশীল
আসিয়া—স্তম্ভ
আদিবা—শিষ্টাচারী
আতিকা–সুন্দরী
আরজু–ইচ্ছা
আনান—মেঘ
আনিকা–রূপসী
আসমা–অতুলনীয়।

কি ব্যাপার, এর মধ্যে একটাও তোমার পছন্দ হল না? আমার তো এর মধ্যে একটা পছন্দ হয়ে গেছে–আনান। আনান মানে কি বল তো? একটু আগে বলেছিলাম। কি, বলতে পারছ না?

না।

আনান মানে হচ্ছে–মেঘ। সুন্দর না নামটা?

তাহের বলল, আমার কেন জানি দম বন্ধ লাগছে। মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।

নিঃশ্বাস নিতে পারবে না কেন? নিঃশ্বাস নিতে পারছ। জব ভালভাবেই পালছ। তুমি নানা কিছু ভেবে অস্থির হয়ে পড়ে। অস্থির হবার কিছু নেই। মানুষ বর্তমানে বাস করে–অতীতেও না, ভবিষ্যতেও না। এই কথাটা তো তোমাকে আগেও বলেছি। বলিনি? আমাদের বর্তমানটা কি খারাপ যাচ্ছে? না, খারাপ যাচ্ছে না, ভালই যাচ্ছে। আরাম করে কত বড় একটা বিছানায় শুয়ে আছি। আমাদের পাহারা দিচ্ছে তিনটি ককল। এরা কাউকে আমাদের কাছে আসতে দেবে না। এরচে ভাল আর কি হতে পারে বল?

আমার সত্যি সত্যি দম বন্ধ হয়ে আসছে।

কি কালে তোমার বন্ধ দম খুলবে?

জানি না।

যখন জান না তখন চুপ করে শুয়ে থাক–আমি নাম পড়ে যাচ্ছি–তুমি নাম সিলেক্ট কর। প্রাথমিকভাবে আমরা কিন্তু একটা নাম সিলেক্ট করে ফেলেছি–আনান। আনান মানে কি বল তো?

জানি না।

ওমা–একটু আগে না কললাম–মেঘ।

তাহের হঠাৎ ভয়ংকর রকম চমকে উঠল। বাইরে থেকে বিশ্রী বিকট রক্ত জমাট করা শব্দ আসছে। তাহের বিছানায় উঠে বসল। সে থর থর করে কাঁপছে। তার কপালে ঘাম জমেছে। সে আতংকিত গলায় বলল, কি হচ্ছে পারুল?

কুকুর কাঁদছে। জোছনা দেখে কাঁদছে।

আলো তে কখনো কাঁদত না।

এরকম জোছনা আগে তো কখনো হয়নি–এ জন্যে কাঁদেনি। কিংবা হয়ত কেঁদেছে, তুমি ঘুমুচ্ছিলে বলে শুনতে পাওনি।

কামরুলের জন্যে কাঁদছে না?

তার জন্যেও কাঁদতে পারে। এতদিন একটা মানুষ তাদের সঙ্গে ছিল, এখন নেই।

আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে।

ভয়ের কিছু নেই। এক কাজ কর–আমাকে জড়িয়ে ধরে থাক। আমি তোমার পিঠে হাত বুলিয়ে দেব।

তাহের লরা গলায় বলল, পানি খাব।

সাইড টেবিলে পানির গ্লাস, ছগ ছিল। পারুল পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। কুকুর রক্ত হিম করা শব্দে ডেকেই যাচ্ছে। এখন তাদের কান্না–মানুষের কান্নার মত শুনাচ্ছে। যেন শত বছর বয়েসী তিন খুনখুনে বুড়ো হাপড়ের মত শ্বাস টানতে টানতে কেঁদে যাচ্ছে। তাহের বলল, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আমি মরে যাচ্ছি। জানালা খুলে দাও।

জানালা খোলাই আছে।

খুব খারাপ লাগছে।

পারুল বলল, তুমি চুপচাপ শুয়ে থাক। ফ্যান ছেড়ে দিচ্ছি। গায়ের উপর চাদর টেনে শুয়ে থাক। শীত শীত ভাব থাকলে ভাল ঘুম হয়। আজ হঠাৎ করে একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে না?

হুঁ।

দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। দূরে বৃষ্টি হলে–যেখানে বৃষ্টি হয় সেখানটা ঠাণ্ডা হয় না, কিন্তু আশেপাশের জায়গাগুলি ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

আনান নামটা কি পছন্দ হয়েছে?

তাহের তার জবাব না দিয়ে বলল, কুকুরগুলি কতক্ষণ কাঁদবে?

যতক্ষণ চাঁদ দেখা যায় ততক্ষণই কাঁদবে।

তাহের শুয়েছে। পারুল বলল, মাথায় হাত বুলিয়ে দেব?

হুঁ।

হুঁ আবার কি? দেব কি দেব না সেটা বল।

তাহের পাশ ফিরল। কুকুর তিনটা এখনো ডাকছে। কুকুরের ডাক শুনতে শুনতেই তাহের ঘুমিয়ে পড়ল। গাঢ় ঘুম। প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তায় কিছু কিছু মানুষের গাঢ় নিদ্রা হয়।

পারুল উঠে দাঁড়াল। চিঠিটা লিখে ফেলা দরকার। কাগজ এবং কলম খুঁজে বের করতে হবে। এ বাড়িতে কোথাও না কোথাও কাগজ-কলম নিশ্চয়ই আছে। সবগুলি ঘর পারুল খুলে দেখতে পারেনি। তার কাছে চাবির গোছ আছে। চাবিগুলির নম্বর—টম্বর কিছু দেয়া নেই। ট্রায়াল ও এরার মেথডে ঘর খুলতে হয়। প্রতিবারই অনেক সময় লাগে। এখন থেকে সে একটা কাজ করবে–যে ঘর খুলবে, সে ঘর আর বন্ধ করবে না। ঘর খোলাই থাকবে।

কাগজ-কলম পাওয়া গেছে। শুধু কাগজ-কলম না, থাম, পোস্টাল ট্রাম্প, গাম, কাঁচি! বড়লোকের সবকিছু খুব গোছানো থাকে। আর গরীবদের থাকে সব এলোমেলো। খাম পাওয়া গেলে কাগজ পাওয়া যায় না। কাগজ পাওয়া গেলে কলম পাওয়া যায় না।

চিঠি কোথায় বসে লিখবে পারুল বুঝতে পারছে না। তাহেরের কাছে বসেই লেখা উচিত। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে তাকে না দেখে চমকে উঠতে পারে। চিঠি লিখতে হবে গুছিয়ে খুব সুন্দর করে, যেন পল্টু ভাই চিঠি পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে যান। এত গুছিয়ে সে কি লিখতে পারবে? তারাই গুছিয়ে চিঠি লিখে যাদের চিঠি লিখে অভ্যাস আছে। তার অভ্যাস নেই। চিঠি লেখার মত মানুষ তার কখনো ছিল না। একজন ছিল, সব সময় ছিল। এখনো আছে। সে এত কাছে যে তাকে চিঠি লেখা হয়নি। আজ তাকেও একটা চিঠি লিখবে। পারুল তাহেরের মাথার কাছে বসল। হাঁটুর উপর কাগজ রেখে সে লিখছে। কাগজের নিচে শক্ত মলাটের একটা বই। বই ভর্তি মেয়েদের ছবি। চিঠি লেখা শেষ। সে ছবিগুলি দেখবে। ফ্যাশানের বই। মেসবাউল করিম সাহেবের ঘরে ফ্যাশানের বই কেন কে জানে!

পারুল লিখতে শুরু করেছে। তার হাতের লেখা সুন্দর, আজ তত সুন্দর হচ্ছে না।

শ্রদ্ধেয় পল্টু ভাই,

আপনি কি আমাকে চিনতে পারছো? আমার নাম পারুল। এক সময় আপনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। দুই বিঘে জমি কবিতাটি আপনি আমাকে খুব সুন্দর করে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এখন কি মনে পড়ছে?

কতজনের সঙ্গে আপনার পরিচয়! হয়ত মনে করতে পারছেন না। মনে করিয়ে দেবার জন্যে অনেকটা ঘটনা বলি। কবিতাটি শেষ পর্যন্তু আমি আবৃত্তি করতে পারিনি। যেদিন অনুষ্ঠান হবার কথা তার আগের রাতে আপনার বাসায় একটা ঘটনা ঘটে গেল। এখন কি মনে পড়েছে?

সে রাতে আপনার উপর আমি খুব রাগ করেছিলাম। কিন্তু মনে মনে আপনাকে আমি এত শ্রদ্ধা করতাম, এত ভালবাসতাম যে পুরোপুরি রাগ করতে পারিনি। এক সময় মনে হল, যা হবার হয়েছে। ভালই হয়েছে। দু একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা সব মেয়ের জীবনেই থাকা উচিত। এখন আমার খবর বলি। আমার বিয়ে হয়েছে। আমি স্বামীর সঙ্গে বিরাট এক বড়লোকের বাগানবাড়িতে একা থাকি। একা, কারণ আমার স্বামী বেচারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইয়ে চাকরির সন্ধানে ঘুর ঘুর করে। আমি থাকি একা। আমার সময় আর কাটে না। পুরোনো দিনের কথা ভাবি। তখন আপনার কথাও মনে। হয়। আপনি কি একদিন এসে আমাকে দেখে যাবেন? আমার বানানো এক কাপ চা খেয়ে যাবেন? আমাদের বাড়িটা শহর থেকে দুরে। বাড়ির নাম নীলা হাউস। আপনার একটু কষ্ট হবে। দোহাই আপনার। যদি আসেন, গাড়ি নিয়ে আসবেন না। আমি চাই না লোকজন জানুক। বিশেষ করে আমার স্বামী জানুক। সব কিছু সবার জানতে নেই। চিঠির উল্টো পিঠে বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিলাম।

বিনীতা–
পারুল

চিঠি শেষ করে করে পারুলের মনে হল–চিঠি পড়ে পল্টু ভাই নাও আসতে পাবেন। একবার যদি সামান্যতম সন্দেহ জাগে তাহলে তিনি আসবেন না। বুদ্ধিমান মানুষেরা কখনো চান্স নেয় না। পল্টু ভাইকে পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত করতে হবে। কাজেই পাল পুনশ্চ দিয়ে আবার লিখল—

পল্টু ভাই, আপনার কাছে আমার সামান্য আবদার আছে। আমার স্বামীর জন্যে একটা চাকরি জোগাড় করে দিন। আমরা খুব কষ্টে আছি।

এবারে পারুল নিশ্চিত হল। এখন আর সমস্যা হবে না। পল্টু ভাই ধরে নেবেন পারুল তাকে ডাকছে। ভালবাসায় অভিভূত হয়ে না, ডাকছে বিপদে পড়ে। এই সুযোগ তিনি নষ্ট করবেন না।

পারুল দ্বিতীয় চিঠি লিখতে বসল। ভেবেছিল দ্বিতীয় চিঠিটা তাহেরকে লিখবে। লিখতে গিয়েও লিখল না। দ্বিতীয় চিঠিটা তাহেরের অফিসের ম্যানেজার সাহেবকে লেখা যাক। শেষ চিঠিটা লিখবে তাহেরকে। সেই চিঠি তাহেরের মাথার কাছে বসে লিখবে না। অন্য ঘরে লিখবে। পারুল লিখছে–

ম্যানেজার সাহেব,
শ্রদ্ধাস্পদেষু।

আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি আপনাদের নীলা হাউসের সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যার হাতে–তাহের, তার স্ত্রী। আপনাকে আমার কিছু কথা বলা দরকার। আমার সেই সুযোগ নেই বলে চিঠির আশ্রয় নিচ্ছি। এতে কোন বেয়াদবি হলে ক্ষমা করবেন।

আমার স্বামী ভীতু প্রকৃতির মানুষ। এত বড় একটা বাড়িতে ভয়ে অস্থির হয়ে সে বাস করে। তিনটি কুকুর এবং দারোয়ান কামরুল অবশ্যি আচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে সে এদেরও ভয় পায়। প্রায় সারারাত সে জেগে বলে থাকে। ভয়ে অস্থির হয়ে সে আমাকে নিয়ে এসেছিল। আমি আপনাদের বিনা অনুমতিতে কয়েকদিন থাকলাম। তারপর যখন শুনলাম আপনি খুব রাগ করেছেন, তখন সে আবার আমাকে আমার বড় চাচার বাড়িতে রেখে এল। কারণ সে আপনাকে ভয় পায়।

আমি তো আপনাদের কোন সমস্যা করছিলাম না। ভীতু স্বামীকে সঙ্গ দেবার জন্যে তার পাশে ছিলাম। আমাদের যে ছোট্ট ঘর দেয়া হয়েছিল আমি সেখানেই থাকতাম। আপনাদের ইন্দ্রপুরী আমি নোংরা করিনি বরং সাধ্যমত তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেছি। আমাদের দুজনকে আলাদা করে দিয়ে আপনার কি কোন লাভ হয়েছে? কোন লাভ হয়নি। মাঝখান থেকে আমরা দুজন কষ্ট পাচ্ছি।

ও আপনার খুব প্রশংসা করে। এর ধারণা আপনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান কর্মযোগী পুরুষ। এমন একজন মানুষ অনেক কষ্ট বুঝবেন না তা তো হয় না। আপনি কি আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে আরেকটু ভাববেন? আমাদের দুজনকে কিছুদিনের জন্যে একসঙ্গে থাকতে দেবেন?

বিনীতা–
পারুল

চিঠি দুটি সে আমে বন্ধ করল। তারপর সাবধানে খাট থেকে নামল। শেষ চিঠিটা সে এখন লিখবে। তাহেরের কাছে চিঠি। স্বামীর কাছে লেখা স্ত্রীর প্রথম পত্র। কি লিখবে সে এখনো জানে না। যা মনে আসে তাই লিখবে। শুরুটা কি করে করবে? প্রিয়তমেষু দিয়ে। না, তা ঠিক হবে না। যার অনেক প্রিয়জন থাকে, তারই থাকতে পারে একজন–প্রিয়তম। পারুলের একজনই প্রিয় মানুষ। এটা কি খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার না সে পুরো পৃথিবীতে একজন তার প্রিয় মানুষ?

না না–আরেকজন প্রিয় মানুষ আছে। সে বড় হচ্ছে। এদিন সে মায়ের পেটে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমুছে। বাইরের ভয়াবহ ভয়ংকর পৃথিবী সম্পর্কে সে কিছুই জানে না।

পৃথিবীর সমস্ত বাবা-মা চায় তাদের সন্তানের ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে। তারা তা পারছে না। শিশুর জন্মের আগে বাবা-মারা তাদের জন্যে কত কি জোগার করে রাখেন। ছোট্ট বিছানা, ছোট্ট বালিশ, একটা ছোট্ট সার্টিনের লেপ। তুলতুলে মাখনের মত জুতা। তারা কোন কিছুই জোগার করতে পারেনি। মনে হয় পারবে না। তারা শুধু সুন্দর একটা নাম জোগার করে অপেক্ষা করবে। আনান–মেঘ।

জল ভরা দিন কালো মেঘ।

০৮. ফার্মেসীর নাম উপশম

ফার্মেসীর নাম উপশম।

বিশাল হুলুস্থুল কাণ্ডকারখানা। ফার্মেসীর মালিক আলাদা বসেন। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে হয়। ভদ্রলোকের নাম দেলোয়ার হোসেন। তবে দোকানের কর্মচারীরাও তাকে পল্টু নামেই চেনে। তাহেরের পল্টু সাহেবকে খুঁজে বের করতে দেরী হল না। পলু সাহেবের সামনে চার পাঁচটা চেয়ার। একজন সেই চেয়ারে পা তুলে বসে আছে। পল্টু সাহেব তাহেরকে বসতে বললেন না। চোখ মুখ কুঁচকে চিঠি পড়তে শুরু করলেন এবং প্রবল বেগে পা নাচাতে লাগলেন। মনে হচ্ছে পা নাচানো তার অভ্যাস। তাহেরের মনে হল পুরো চিঠি তিনি দুবার পড়লেন। তারপর তাহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোস বাস। তুমি করে বললাম, কিছু মনে করো ন। পারুল ছিল আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন। যতদূর মনে হয় তাকে তুই করে বলতাম। সেই হিসেবে তোমাকে তুমি বলছি।

অবশ্যই বলবেন স্যার।

আমাকে স্যার বলবে না। পারুল আমাকে পল্টু ভাই ডাকতো। তুমিও তাই ডাকবে। এবসুলিউটলি নো প্রবলেম। কি খাবে বল?

কিছু খাব না।

কিছু খাবে না বললেতো হবে না। পারুল যদি শুনে তার পল্টু ভাই কিছু না খাইয়ে তার স্বামীকে বিদায় করেছে তাহলে খুব অভিমান করবে।

এক কাপ চা খেতে পারি।

চা তো সবাই সবাইকে খাওয়ায়। তাতে বিশেষ কোন মমতা দেখানো হয় না। লাচ্ছি খাও। গরমের মধ্যে লাচ্ছি ভাল লাগবে। বাজে কটা, দশটা? গুড। পাশেই একটা দোকান আছে, দশটার দিকে গরম গরম সিঙ্গারা ভাজে। কলিজি সিঙ্গারা। একবার খেলে মুখে স্বাদ লেগে থাকে। বয়স হয়েছে, গুরুপাক জিনিস খেতে পারি না। তুমি খাও, ইয়াংম্যান, তোমার এখন লোহা হজম করার বয়স।

পল্টু সাহেব সিঙ্গারা ও লাচ্ছি আনতে দিলেন। হাসি হাসি মুখে তাকালেন। ভদ্রলোকের মাথার চুল ধবধবে শাদা। কিন্তু স্বাস্থ্য এখনো বেশ ভাল। ঠোঁট অবশ্যি ফোলা ফোলা।

তোমার নামটা কি তাতো জানা হল না।

আমার নাম তাহের।

শুধু তাহেরতো নাম হয় না। তাহেরের সঙ্গে আর কি আছে?

আবু তাহের।

ভেরী গুড। আবু তাহের। শুন আবু তাহের, পারুল চিঠিতে লিখেছে একবার তাকে গিয়ে দেখে আসতে। যাব, নিশ্চয়ই যাব। সময় পেলে হুট করে একদিন চলে যাব।

চাকরি বাকরি পাচ্ছ না বলে লিখেছে। আমি চেষ্টা করব। তুমি ছবিসহ বায়োডাটা দিয়ে যেও।

জ্বি আচ্ছ।

চাকরির বাজার খুবই খারাপ। তবু দেখি কি করা যায়। তোমরা যেখানে থাক সেই জায়গার ঠিকানাটা ভাল করে লিখে দাও দেখি। বাসে করে যদি যাই কোথায় নামব।

তাহের বলল, আপনি একা একা যাবেন না। বাড়িতে কুকুর আছে। কুকুরগুলা ভয়ংকর রাগী। আপনি কখন যেতে চান বলবেন, আমি নিয়ে যাব।

সেটাতো সবচে ভাল হয়। তবু তুমি ঠিকানা লিখে দাও। ঐ দিকে ব্যবসায় খাতিরে প্রায়ই যেতে হয়–অসময়ে উপস্থিত হয়ে পারুলকে চমকে দিয়ে আসব, হা হা হা।

তাহের সিঙ্গারা খেল, লাচ্ছি খেল, পান খেল। পল্টু সাহেব আরো ভদ্রতা করলেন। তিনি তাঁর গাড়ি দিয়ে বললেন, তুমি কোথায় যাবে বল। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। পারুলের তুমি হাসবেন্ড এইটুকু খাতির তো তোমাকে করতেই হবে।

অফিসে নেমেই তাহের শুনল রহমান সাহেব তার খোঁজ করছেন। বলেছেন তাহের এলেই যেন তার সঙ্গে দেখা করে। খুব জরুরী।

তাহের দেখা করতে গেল। রহমান সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন–কামরুলকে খবর দিতে বলেছিলাম, তুমি দিয়েছ? কাল রাতে হঠাৎ বড় সাহেব বাসায় টেলিফোন করে জানতে চেয়েছেন কুকুরগুলিকে ইনজেকশন দেয়া হয়েছে কি না। আমি না জেনেই বলেছি দেয়া হয়েছে। নয়ত উনি টেনশানে থাকবেন। অফিসে এসে শুনি কামরুল এখনো ইনজেকশন নিতে আসেনি। তুমি কি তাকে বলনি?

বলেছি, স্যার।

তাহলে আসছে না কেন? বড় সাহেব নেই বলে তেল বেশী হয়ে গেছে? চিপে তেল সব বের করে ফেলব—হারামজাদা–

তার শরীরটা খুব খারাপ এইজন্যে বোধহয় আসছে না। আজকেও জ্বর দেখে এসেছি। একটা কাজ করলে কেমন হয় স্যার। আমি ইনজেকশনগুলি নিয়ে যাই–আমি নিজের দায়িত্বে ইনজেকশন দেয়ায়ে দিব।

এটা মন্দ না। কোথায় নিতে হবে জানতো?

জানি স্যার, মহাখালি।

পারবে?

অবশ্যই পারব। অফিসের ভ্যান একটা নিয়ে যাও।

জ্বি আচ্ছা স্যার।

ভ্যান আছে কি-না এখন কে জানে। যখন যেটা প্রয়োজন সেটাতো কখনো থাকে না। দাঁড়াও, আমি দেখি ভ্যান আছ কি-না।

রহমান সাহেব টেলিফোন তুলে ভ্যানের ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তাহের তার মুখ দেখে বুঝতে পাল ভ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। তাহের বলল, ভ্যান না পাওয়া গেলেও অসুবিধা হবে না স্যার। আমি বরং ডাক্তার সাহেবকে বাড়িতে নিয়ে আসব, তিনি এসে ইনজেকশন দিয়ে দেবেন। আগে একবার দিয়ে গেছেন। তাকে তিনশ টাকা দিতে হবে। আর আপনি যদি বলেন তাহলে বেবীটেক্সী করে নিয়ে যেতে পারি।

যেটা ভাল বুঝ কর। তারপর একটা বিল দিও টাকা দিয়ে দেব। এক কাজ কর ক্যাশিয়ালের কাছ থেকে পাঁচশ টাকা এডভান্স নিয়ে যাও। যা খরচ লাগে কর। বাকিটা ফিরত দিও। এখনই চলে যাও। জিনিসটা আমি ঝুলিয়ে রাখতে চাই না। স্যারের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে। ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে।

স্যার, আমি তাহলে যাই।

দাঁড়াও এক মিনিট–তুমি নাকি মনিকার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছ? আমাদের রিসিপসনিষ্ট মনিকা।

আমি তো স্যার কারুর সঙ্গেই খারাপ ব্যবহার করি না।

আমি অবশ্য মনিকাকে তাই বলেছি। যাই হোক তার সঙ্গে তোমার কথা বলারই দকার নেই। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই কথা বলতে হবে?

আমি কি স্যার যাব?

অবশ্যই যাবে।

কুকুরকে ইনজেকশন দিয়ে কি স্যার খবর দিয়ে যাব?

তোমার নিজের আসার দরকার নেই। বরং সন্ধ্যার দিকে একটা টেলিফোন করে জানিয়ে দিও। তাহলে আমি নিশ্চিত হতে পারি।

এখনই আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যান স্যার। আজ দিনের মধ্যেই আমি ইনজেকশন দেয়া।

গুড।

আমি স্যার রাতে টেলিফোন করে দেব।।

টেলিফোন সন্ধ্যা ৭ টার আগে করবে। টেলিফোন নাম্বার আছে? মনিকার কাজ থেকে আমার একটা কার্ড নিয়ে যাও।

জি আচ্ছা স্যার।

তাহের হাসিমুখে বের হয়ে এল। ক্যাশিয়ারের কাছে ভাউচার সই করে পাঁচশ টাকা নিল। স্টোরের ফ্রীজ থেকে ইনজেকশানের এমপুল নিল। তারপর গেল মনিকার কাছে। হাসি মুখে বলল, ভাল আছেন?

মনিকা তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। জবাব দিল না।

তাহের বলল, রহমান সাহেব বলেছেন তাঁর একটা কার্ড আমাকে দিতে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে স্যারকে ইটারকমে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

মনিকা দুয়ার খুলে কার্ড ডেস্কে রাখল। কথা বলে সে সময় নষ্ট করতে চাচ্ছে না।

তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, স্যারের নামে আমার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করেছেন কেন? যা বলার আমাকে বললেই হত। কমপ্লেইন টমপ্লেইনতো ছেলেমানুষী ব্যাপার। বাচ্চারা করে, বড় বোনের কাছে নালিশ করে, মার কাছে নালিশ করে।

আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন না।

কোন কোন মানুষের ভেতর অবশ্যি নালিশ করার অভ্যাস থেকেই যায়। তারা ম্যানেজারকে নালিশ করে, বসকে নালিশ করে। যাদের ম্যানেজার বা বস বলে কেউ থাকে না–তারা আল্লাহর কাছে নালিশ করতে বসে।

মনিকা কঠিন স্বরে বলল, আপনার যদি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকে–স্যারকে গিয়ে বলুন।

আমি তো আগেই বলেছি আমার নালিশ করার অভ্যাস নেই। আমার স্ত্রীরও নেই। এই একটা দিকে আমাদের খুব মিল। অন্য কোনদিকে কোন মিল নেই। যেমন বাচ্চার নামের ব্যাপারটাই ধরুন। বাচ্চা আসতে এখনো অনেক দেরী–এর মধ্যে নাম খোঁজা খুঁজি। নামের জন্য বই কেনা। শেষ পর্যন্ত নাম ঠিক হয়েছে–আনান। আনান শব্দের অর্থ হল মেঘ। নামটা আপনার কেমন লাগছে?

মনিকা তীব্র গলায় বলল, আপনি যদি এক্ষুণী বিদেয় না হন তাহলে আমি স্যারের কাছে বাধ্য হয়ে যাব।

তাহের সহজ গলায় বলল, আমি চলে যাচ্ছি। অল্পতে রেগে যান কেন? মেয়েরা হবে সর্বংসহা। তাদের এত অল্পতে রাগলে চলে?

মনিকার ঠোঁট কাঁপছে। মেয়েটা ভয়ংকর রেগে গেছে। এত সুন্দর একটা মেয়ে কেন অকারণে এত রাগে? তাহের অফিস থেকে বেরুল। বাড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন উঠে না। কুকুরের ইনজেকশনতো অনেক পরের ব্যাপার। তিন শয়তানকে এক বেবীটেক্সীতে করে নিয়ে যাবে? হাস্যকর একটা কথা না? ম্যানেজার সাহেবের হাস্যকর কথা বিশ্বাস করার রহস্য হল, বিশ্বাস করার কারণে তার দায়িত্ব কমে গেছে। কুকুর নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না।

তাহের সময়টা কি ভাবে কাটাবে বুঝতে পারছে না। পার্কের কোন বেঞ্চিতে শুয়ে লম্বা ঘুম দেয়া যায়। গতকাল ঘুম এসেছিল বলে আজও যে ঘুম আসবে তা মনে হয় না। ঘুম না এলে সময় কাটানো একটা সমস্যা। সন্ধ্যা ছটার আগে বাড়িতে যাওয়া যাবে না। রহমান সাহেবকে টেলিফোন করতে হবে কাঢ়িায় কাটায় দুটায়। ম্যানেজার। সাহেবকে জানাতে হবে কুকরের ইনজেকশন যথারীতি দেয়া হয়েছে।

এতক্ষণ সময় সে কাটাবে কিভাবে? জসিমের সঙ্গে দেখা করে এলে কেমন হয়? দিনের পর দিন জসিমের বিছানায় সে ঘুমিয়েছে। কৃতজ্ঞতা বোধ বলেওতো একটা-কিছুক থাকা উচিত। বিয়ের পর সে একবারও জসিমের সঙ্গে দেখা করেনি। এতটা নিমক হান্নাম সে হল কি করে? জসিম কোথায় কাজ করে তাহেরের জানা নেই, সে মেসে চলে যাওয়াই ঠিক করল। অফিস শেষ করে মেসেতো সে ফিরে আসবেই।

জসিমকে মেসে পাওয়া গেল না। সে চার মাস হল মেস ছেড়ে দিয়েছে। পাঁচশ টকা বাকি ফেলে গেছে। কোথায় বাসা নিয়েছে সেই ঠিকানা দিয়ে গিয়েছিল। মেসের মালিক বরকতউল্লাহ সেই ঠিকানায় গিয়ে দেখে মিথ্যা ঠিকানা। বরকতউল্লা হতাশ গলায় তাহেরকে বলল–এই হচ্ছে আজকের যুগের ভদ্রলোকের নমুনা। তাকে সাহায্যতা কম করি নাই। দিনের পর দিন লোক জন নিয়ে ডাবলিং করেছে। আপনি নিজে ছিলেন তিন মাস। একটা কথা বলি নাই। বলতে গেলে সারাজীবন সিংগেল ভাড়া দিয়ে ডাবল থেকে গেছে। এই তার ফল। টাকা দিতে পারবে না বলুক–ভাই মাফ করে দেন। অসুবিধায় পড়েছি দিতে পারলাম না। এই কথা বলবে না। ফটকাবাজী করবে। শালা হারামী।

তাহের বলল, গালাগালি করবে না। গালাগালিতে কিছু মীমাংসা হয় না। পান কত আপনি?

পাঁচশ।

জসিম টাকা না দেয়, আমি দেব। আপাতত দুশ টাকা রাখুন। ছেলেবেলার বন্ধু তার সম্পর্কে গালাগালি শুনতে ভাল লাগে না। আমার অনেক উপকার করেছে। সে থাকতে না দিলে থাকতাম কোথায়?

দুশ টাকা আপনি দিবেন?

কি করব বলেন। বন্ধুর অপমানে আমার অপমান। নিল, নোটটা ভাঙ্গায়ে দুশ টাকা রাখুন।

দিচ্ছেন এখন পুরেটিাই দিয়ে দেন।

তাহের দরাজ গলায় বলল–রেখে দিন চারশ রেখে দিন। একশ টাকা শুধু ফেরত দিন। চা পাতা চিনি কিনতে হবে। নয়ত পুরোটাই দিয়ে দিতাম। একশ টাকার নোটটি কাইগুলি ভাঙ্গায় দিন। পাঁচশ টাকার নোটের ভাংতি পাওয়া যায় কিন্তু একশ টাকার নোটের ভাংতি পাওয়া যায় না। বিচিত্র দেশ।

বরকতউল্লাহ একশ টাকা ফেরত দিল। এবং অস্বস্থির সঙ্গে তাহেরকে দেখতে লাগল। তাহের বলল, বাকিটাও দিয়ে যাব। কোন এক ফাঁকে দিয়ে যাব।

টাকাটা দিতে পেরে তাহেরের স্বস্তি লাগছে। কুকুরের জন্যে নেয়া টাকা নিজের জন্যে খরচ করতে খারাপ লাগতো। মানুষ হিসেবে অনেক নিচে সে নেমে গেছে কিন্তু এখনো কুকুর হতে পারে নি।

প্রায় দুটা বাজে। গণগণে দুপুর। তাহেরের ক্ষিধে হচ্ছে না। ক্ষিধে হবে রাতে। তার স্বভাব প্রায় কুকুরের মতই হয়ে যাচ্ছে। একবেলা ক্ষিধে হয়। বাসায় ফিরে সে গপগপ করে ভাত খাবে। আপাতত কিছু না খেলেও চলবে। তাহের পার্কের দিকে রওনা হল। খালি বেঞ্চ জোগাড় করে শুয়ে থাকবে। ঘুম এলে ভাল। ঘুম না এলেও ক্ষতি নেই। এরপর থেকে সঙ্গে একটা শতরঞ্জির মত রাখবে। ভাঁজ করে পলিথিনের ব্যাগে বেখে। দেবে। প্রয়োজনে বিছিয়ে নিলেই সুন্দর বিছানা। একটা শতরঞ্জি থাকলে গাছের নিচেও শোয়া যায়। খালি বেঞ্চ খুঁজে বেড়াতে হয় না।

খালি বেঞ্চ পাওয়া গেছে। তাহের বেঞ্চে শুয়ে আছে। লক্ষণ ভাল মনে হচ্ছে না। ঘুম আসছে না। পরিচিত মানুষদের একটা তালিকা সঙ্গে থাকলে ভাল হত। তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও সময় কাটে।

শুধু দেখা হয়েছে। ভদ্রলোকের বোধহয় তাহেরকে মনেও নেই। ভদ্রলোকের নাম তফাতাল হোসেন। বিয়ে করেছেন কি না কে জানে। আশাদা পাড়ায় একবার চলে গেলে মন্দ হয় না। পারুলের দুর সম্পর্কের ভাই পরিচয় দিয়ে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলবে। তফাজ্জল সাহেবকে অবশ্যি বাসায় পাওয়া যাবে না। তিনি নিশ্চয়ই নানান কাজ কর্মে থাকেন। তাকে তাহেরের মত অবশ্যই দুপুরে পার্কে শুয়ে থাকতে হয় না।

একবার মুগদা পাড়ায় গেলে কেমন হয়?

মুগদাপাড়ায় পারুলের হলেও হতে পারত শ্বশুরবাড়ি। পারুলের বিয়ে সেখানে হয়েই যাচ্ছিল–মাঝখানে হুট করে সে ঢুকে পড়ল। ওদের সঙ্গে একটু দেখা করে আসা যেতে পারে। আর পারুলের শ্বশুর হবার কথা ছিল সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে।তাহেরের ভালই থাতির হয়েছিল। বাড়িঘর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। তাদের একটা নারকেল গাছে ছিয়াত্তরটা নারকেল হয়েছিল। তাদের ওল্ড মডেলের টয়োটা গাড়ি বিক্রি করে নতুন গাড়ি কেনার কথা ছিল। কিনেছেন কি না কে জানে। এই খবরটাও জান যেতে পারে।

যার সঙ্গে পারুলের বিয়ে হবার কথা ছিল তার সঙ্গে তেমন আলাপ হয়নি, একবার শুধু দেখা হয়েছে। ভদ্রলোকের বোধহয় তাহেরকে মনেও নেই। ভদ্রলোকের নাম তফাজ্জল হোসেন। বিয়ে করেছেন কি না কে জানে। মুগদা পাড়ায় একবার চলে গেলে মন্দ হয় না। পারুলের দুর সম্পর্কের ভাই পরিচয় দিয়ে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলবে। তফাজ্জল সাহেবকে অবশ্যি বাসায় পাওয়া যাবে না। তিনি নিশ্চয়ই নানান কাজ কর্মে থাকেন। তাকে তাহেরের মত অবশ্যই দুপুরে পার্কে শুয়ে থাকতে হয় না।

আশ্চর্যের ব্যাপার তফাজ্জল সাহেব বাসাতেই ছিলেন। কোথাও বোধ হয় বের হচ্ছিলেন–গায়ে ইস্ত্রী করা সিল্কের পাঞ্জাবী। সুন্দর করে চুল আঁচড়ানো। তাহের এর আগে ভদ্রলোকের চোখে চশমা দেখেনি— এখন সোনালী ফ্রেমের চশমা দেখা যাচ্ছে। সুন্দর মানিয়েছে চশমায়। যাদের চোখ অসুন্দর, চশমায় তাদের ভাল লাগে। চশমা চোখের ত্রুটি ঢেকে ফেলে। ভদ্রলোকের চোখ কি অসুন্দর? তাহের মনে করতে পারল না।

আপনি কাকে চাচ্ছেন?

আপনাকেই চাচ্ছি। আমার নাম তাহের। আবু তাহের। পারুলের দূর সম্পর্কের মামা।

আমিতো ঠিক চিনতে পারছি না।

না চেনারই কথা। ঐ যে পারুল নামের একটি মেয়ের সঙ্গে এনগেজমেন্ট হল। তারপর বিয়ে হল না।

ও আচ্ছা।

ভদ্রলোকের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। একটু আগে মানুষটাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল–এখন রাগী রাগী দেখাচ্ছে। বিয়ে ভাঙ্গার অপমান বেচারা এখনো ভুলেনি।

আমার কাছে কি ব্যাপার?

আমি আপনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কি মনে করে যেন ঢুকে পড়েছি। অপরাধ ক্ষমা করবেন। আসলে আপনাদের বাড়ি দেখে পুরানো কথা মনে পড়ে মনটা খারাপ হল। পারুলকে কত বুঝিয়েছিলাম। কত বলেছি–তুই ভুল করছিস, বিরাট ভুল। জীবন দিয়ে সেই ভুলের মাশুল শোধ করতে হবে। এখন তাই করছে। আপনার আবা কেমন আছেন? এরকম ভদ্রমানুষ এ যুগে সচরাচর চোখে পড়ে না। উনাকে আমার সালাম দিবেন।

বাবা বেঁচে নেই। গত নভেম্বরে ইন্তেকাল করেছেন।

বলেন কি? সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠছিলেন–হঠাৎ স্ট্রোকের মত হল–গড়িয়ে পরে গেলেন।

আহা হা। আমি তো দেখেছিলাম খুব ভাল স্বাস্থ্য।

স্বাস্থ্যতো উনার বরাবরই ভাল ছিল। মৃত্যুর আগের দিনও জগিং করেছেন।

তাহের সত্যি সত্যি ব্যথিত হল। সে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ভাই তাহলে যাই। হঠাৎ এসে বিরক্ত করলাম–কিছু মনে করবেন না।

না, না, মনে করার কি আছে?

বিয়ে করেছেন কি?

জ্বি।

আলহামদুলিল্লাহ। শুনে খুব খুশী হলাম। পারুল মেয়েটার উপর কোন রাগ রাখবেন না। দুঃখী মেয়ে এখন হাড়ে হাড়ে বুঝছে। এখন বুঝে আর লাভ কি বলুন? ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েই গেছে। ভাই যাই?

বসুন কিছুক্ষণ। চা খান।

আপনি বোধহয় কোথাও বেরুচ্ছিলেন।

দোকানের দিকে যাচ্ছিলাম। কর্মচারীরা আছে–পরে গেলেও হবে। আপনি আরাম করে বসুন। চায়ের কথা বলে আসি। ধুমপানের অভ্যাস আছে?

মাঝে মাঝে খাই।

নিন, আমার কাছ থেকে নিন।

ভদ্রলোক মালবরোর একটা প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরিয়ে দিলেন। খুশী খুশী গলার বললেন, পুরো এক কার্টুন মালবরো সিগারেট আমার এক ফ্রেণ্ড আমাকে প্রেজেন্ট করেছে। এদিকে স্ত্রী দিয়েছে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে। পকেটে সিগারেট নিয়ে ঘুরে বেড়াই। মাঝে মাঝে বন্ধু বান্ধবকে দেই। ওরা আরাম করে খায় দেখতে ভাল লাগে। আপনি চা খাবেন না কফি খাবেন? ভাল কফি আছে।

কফিটাই ভাল হবে।

আমি আগে চা খেতাম। আমার স্ত্রী এসে কফির অভ্যাস ধরিয়ে দিয়েছে। সারাদিনে এখন দশ কাপের মত কফি খাই।

মেয়েরা স্বামীদের কিভাবে যে বশ করে। বিয়ের আগের দিন এক মানুষ। বিয়ের পরের দিন অন্য মানুষ।

তফাজ্জল উৎল্ল গলায় বলল, একশ ভাগ খাঁটি কথা বলেছেন। ট্রুথ অব দ্য সেঞ্চুরী। বসুন কফির কথা বলে আসি।

তাহের আরাম করে সিগারেট টানছে। বুঝা যাচ্ছে তাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হবে। তাফাজ্জল সাহেব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পারুলের কথা জানতে চাইবেন। তার দুঃখের কথা যতই জানবেন ততই ভদ্রলোকের ভাল লাগবে। তাহের যদি ঠিকঠাক বলতে পারে তাহলে যাবার সময় ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। তাঁর পাঞ্জাবীর পকেটের সিগারেটর প্যাকেটটাও দিয়ে দেবার সম্ভাবনা আছে।

তফাজ্জল সাহেব ফিরে এলেন। তাহেরের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, তারপর ভাই বলুন–খবরাখবর বলুন।

খবরাখবর বলার মত কিছু নেই।

আপনার যে ভাগ্নির কথা বললেন সে ঢাকাতেই আছে?

জি। ঠিক ঢাকাতে না–ঢাকা থেকে দূরে উত্তরখান, রাজপ্রাসাদের মত এক বাড়ি।

রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি?

নকল রাজপ্রাসাদ।

নকল রাজপ্রাসাদ মানে?

রাজপ্রাসাদ ঠিকই আছে–বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে দাঁড়ালে আক্কেলগুড়ুম হয়ে যাবে তবে …।

তবে কি?

ওরা ঐ বাড়ির কিছু না। পারুলের হাসবেন্ড ও বাড়ির কেয়ারটেকার। দারোয়ানও বলতে পারেন। পারুল তার দায়োরান স্বামীর সঙ্গে থাকে।

কি বলছেন এসব?

পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে। এক ভদ্রলোকের সঙ্গে বিয়ে ঠিক ঠাক হল। পান চিনি হল, তারপর তাদের মুখে চুনকালি দিয়ে লোফার টাইপ একটা ছেলের সঙ্গে বের হয়ে যাওয়া–এই পাপের শাস্তি হবে না!

তফাজল আগ্রহের সঙ্গে বলল, ওর হাসব্যান্ড কি সত্যি দারোয়ান?

একশ ভাগ সত্যি। শিক্ষিত দারোয়ান। এম এস সি পাশ দারোয়ান–হা হা হা।

তফাজ্জল বলল, ভাই হাসবেন না। অন্যের দুঃখ কষ্ট নিয়ে হাসা ঠিক না।

মনের দুঃখে হাসি। আর কিছু না। পারুলের বোকামী দেখে হাসি।

খুব কষ্টে আছে?

কষ্ট কত প্রকার ও কি কি জানতে হলে ওদের দেখতে হয়। স্ত্রীর বাচ্চা হবে। এখন চলছে তিন মাস। এর মধ্যে কোন ডাক্তারের কাছে যায় নি। যাবে কি ভাবে? ডাক্তারতো মাগনা দেখবে না। স্বামীটি হল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ অপদার্থের একজন। পাঁচ বছর আগে এম. এস. সি. পাশ করেছে–এই পাঁচ বছরে একটা চাকরি জোগাড় করতে পারে না।

ভদ্রলোকের এরকম অবস্থায় বিয়ে করা ঠিক হয় নি।

ওর কথা বাদ দিন। পুরুষ মানুষ। বিয়ের কথা উঠলে পুরুষ মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। বৌকে খাওয়াতে পারবে কি পারবে না এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু পারুলতো পুরুষ না, পারুল হচ্ছে মেয়ে মানুষ। তার একটা বিবেচনা নেই?

তফাজ্জল বিষণ্ণ গলায় বলল, প্রেম ছিল। প্রেমের সময় বিবেচনা কাজ করে না।

প্রেমতো আর রান্না করে খাওয়া যায় না। খেতে হয় ভাত। প্রেম যদি খাওয়া যেত তাহলেতো কথাই ছিল না। বাড়িতে বাড়িতে প্রেমের পোলাও, প্রেমের কোরমা রান্না হত। দেশে প্রেমের অভাব নেই। দেশে অভাব হচ্ছে ভাতের।

আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। করেন কি আপনি?

অধ্যাপনা করি। প্রাইভেট কলেজে ম্যাথমেটিকস পড়াই।

পারুল কি ঐ বাড়িতেই থাকে?

জ্বি।

পার্মানেন্টলি থাকছে?

আরে না। পার্মানেন্টলি থাকলেতো ওদের সমস্যার সমাধানই হয়ে যেত। খুবই টেম্পোরারী ভাবে আছে। যার বাড়ি তিনি দেশের বাইরে। পারুলের স্বামীর উপর বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব। সে এই সুযোগে বউকে নিয়ে তুলেছে। ভদ্রলোক ফিরে ওদের গেট আউট করে দেবে। তখন কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফরমে থাকা ছাড়া এদের গতি নেই।

একটা কাজের ছেলে ট্রে হাতে ঢুকল। ট্রেতে কফির পট, পনিরের স্লাইস, জেলী মাখানো বিসকিট। তফাজ্জল বলল, আমার স্ত্রী বাসায় নেই, থাকলে পরিচয় করিয়ে দিতাম। ও গেছে তার খালার বাড়ি। ওর এক খালাতো ভাই এসেছে জাপান থেকে। ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছে। খালাতো ভাইটা আবার জাপানী এক মেয়ে বিয়ে করে ফেলেছে।

বলেন কি?

মেয়েটা দেখতে ভাল না। বড়ই গুটার মত সাইজ। বিরাট স্বাস্থ্য। দেখলে মহিলা কুস্তিগীরের মত লাগে। কি মনে করে বিয়ে করল কে জানে।

তাহের কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, প্রেম হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রেম। এই হল ঘটনা।

ঠিক বলেছেন। শুনুন ভাই সাহেব–সময় পেলে মাঝে মধ্যে চলে আসবেন। আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বললে আপনা ভাল লাগবে। একদিন সুযোগ পেলে গান শুনিয়ে দেব।

উনি গনি জানেন নাকি?

অল্প-স্বল্প জানে। রেডিও টিভিতে যায় নি। গেলে চান্স পাবে। তবে আমার ইচ্ছা না। কি দরকার? মাসমিডিয়াতে যাওয়ার?

তাই ভাল–ছাদে বসে ভাবী গান গাইবে, আপনি শুনবেন।

তফাজ্জল সিগারেটের প্যাকেট বের করে বলল, নিন আরেকটা সিগারেট নিন।

তাহের সিগারেট নিল।

প্যাকেটা রেখে দিন। আমার কাছে থাকা না থাকা একই। আমি তো খেতে পারছি না।

খেয়ে ফেলুন একটা। ভাবীতো আর দেখছে না?

ওকে চেনেন না। লুকিয়ে সিগারেট খেলেও ঠিক ধরে ফেলবে।

তাহলে না খাওয়াই ভাল।

তফাজ্জল তাহেরকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

পাঁচটা বাজে।

ম্যানেজার সাহেবকে টেলিফোন করার সময় হয়ে এসেছে। তফাজ্জল সাহেবের বাসায় আরো কিছুক্ষণ থাকলে সেখান থেকে কথা বলা যেত। তবে টেলিফোনের কথাবার্তা তফাজ্জল সাহেব শুনলে সমস্যা হয়ে যেত। অংকের প্রফেসর কুকরের ইনজেকশন নিয়ে ছোটাছুটি করছে… কেমন যেন লাগে।

কে কথা বলছেন?

স্যার, আমি তাহের।

ও আচ্ছা, তাহের।

ইনজেকশন দেয়া হয়েছে স্যার।

গুড।

বেবী টেক্সীতে তিনটাকে একসঙ্গে ঢোকানো একটু সমস্যা হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেছি।

ভেরী গুড। ডাক্তার ইমুনাইগ্রেশন সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেনতো?

জ্বিনা–কাল এসে নিয়ে যেতে বলেছেন।

দেশের কি অবস্থা। সামান্য একটা কাজ একবারে হয় না। দুবার তিনবার যেতে হয়। তুমি মনে করে কাল সাটিফিকেটটা নিয়ে এসো।

অবশ্যই নিয়ে আসব।

তাহের বলে, স্যার, তাহলে টেলিফোন রেখে দেই?

আচ্ছা। ও শোন–বড় সাহেবের একটা খবর আছে, তোমাকে দেয়া দরকার। খারাপ খবর। ভেরি ব্যাড নিউজ। উনার ক্যান্সার ধরা পড়েছে।

কি বলছেন স্যার?

এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তবু ক্যান্সার বলে কথা। স্যার চিকিৎসার জন্যে আমেরিকা চলে যাবেন। তোমাকে আরো বেশ কিছুদিন বাড়ি দেখাশোনা করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।

কোন অসুবিধা নেই স্যার।

তোমার কাজকর্মে আমি খুশি। বড় সাহেব এলে উনাকে বলে আমি তোমার জন্যে অফিসে পার্মানেন্ট একটা ব্যবস্থা করব। তুমি এম. এ. পাশ আমি জানতাম না। মনিকার কাছে শুনলাম।

থার্ড ক্লাস পেয়েছিলাম স্যার। থার্ড ক্লাস এম. এ. আর মেট্রিক একই।।

কথাটা মন্দ বলনি। যাই হোক, আমি দেখব–আরেকটা কথা–এতদিন যখন তোমাকে থাকতেই হবে–তুমি বরং তোমার স্ত্রীকে নিয়ে এসো। দুজন মিলেই থাক। বাড়ি দেখাশোনা কর।

আপনার দয়ার কথা কোনদিন ভুলব না স্যার।

তাহের কান্নায় মত একটা শব্দ করল। হেঁচকি তুলে ফেলল। যে দোকান থেকে টেলিফোন করা হচ্ছে সেই দোকানের দুজন কর্মচারী অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। তারা। অনেকদিন এমন উৎকৃষ্ট অভিনয় দেখেনি।

টেলিফোনের ওপাশ থেকে রহমান সাহেব কোমল গলায় বললেন, কি মুশকিল, কাঁদছ কেন? যাও, এখনি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আস। বিছানা, টুকটাক জিনিস সব নিয়ে চলে এসো। টেক্সি নিয়ে যাও। অফিসে বিল করে দিও। টেক্সি ভাড়া দিয়ে দেবে।

জ্বি আচ্ছা, স্যার।

টেলিফোনের জন্যে দোকানে পাঁচ টাকা দিতে হয়। তাহের দশ টাকা দিয়ে বলল, বাকিটা রেখে দিন ভাই। চা খাবেন।

প্রথম দিন পারুল যখন এ বাড়িতে এসেছিল, ভয়ে সে অস্থির হয়ে গিয়েছিল। আজ আবার কেন জানি ভয় লাগছে। ভয়টা সন্ধ্যা থকে শুরু হয়েছে। মতই সময় যাচ্ছে ততই বাড়ছে। বারান্দায় স্টোভ জ্বালিয়ে ভাতের চুলা বসানোর সময় গ্রিলের পাশে খক খক কাশির শব্দ শুনল। কাশির পর থু করে থুথু ফেলার শব্দ। অবিকল কামরুল যেমন থুথু ফেলত সে রকম। পারুল চোখ তুলে কিছু দেখার চেষ্টা করল না। আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। আগুন মানুষের ভয় কাটিয়ে দেয়, তার ভয় কাটছে না। বরং ভয়টা একটু একটু বাড়ছে। স্টোভ থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। শব্দটার ভেতরও কিছু আছে। সে কি স্টোভ নিভিয়ে শোবার ঘরে চলে যাবে? দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে? দরজা বন্ধ করে বসে থাকা যাবে না। শোবার ঘর থেকে গেটের শব্দ শোনা যায় না। তাহের এসে গেটে ধাক্কা দেবে, কলিংবেল টিপবে। সে শুনতে পাবে না। কাজেই তাকে বসে থাকিতে হবে বারান্দায়।

কে যেন বরান্দার পেছনে হাঁটছে। পা টেনে টেনে হাঁটছে। পারুলের হাত-পা শক্ত হয়ে আসছে। সে ঢাপা গালায় ডাকল, ফিবো, নিকি, মাইক।

কুকুর তিনটির ছুটে আসার কথা। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে থাকার কথা–কেউ আসছে না। ওরা আসছে না কেন? কেউ কি ওদের বলেছে–না, তোমরা যাবে না, ওদের পরিচিত কেউ?

স্টোভের শব্দ কমে আসছে। পাম্প করতে হবে। আশ্চর্য! পাম্প করার শক্তিও তার নেই। পারুল উঁচু গলায় ডাকল–নিকি, ফিবো, মাইক।

ঝন ঝন করে শব্দ হল। তখনি পারুলের মনে পড়ল, এরা শিকল দিয়ে বাধা। পারুল নিজেই বেঁধে রেখেছে, খুলে দিতে মনে নেই। এরাই হয়ত কাশছিল। কুকুরের ঠাণ্ডা লাগলে এরা অবিকল মানুষের মত কাশে।

গেটে শব্দ হচ্ছে। প্রথম পর পর তিনবার, একটু থেমে আবার দুবার। তাহের চলে এসেছে। এখন মুখ তুলে গ্রিলের বাইরে তাকানো যায়। পারুল কিছু দেখবে ভাবেনি। তারপরেও অস্পষ্টভাবে দেখল–মাটির স্তূপের উপর কে যেন বসে আছে। পাত অটছে। কামরুল না? হ্যাঁ, কামরুলই তো।

চোখের ভুল। অবশ্যই চোখের ভুল। ভয় পেলেই মানুষ চোখে ভুল দেখতে শুরু করে। গেটে শব্দ হচ্ছে। তিনবার–দুবার। তিনবার দুবার। আশ্চর্য! ছায়া ছায়া লোকটাও শব্দ শুনে গেটের দিকে তাকাচ্ছে।

পারুল উঠল। গেটের দিকে রওনা হল। যে তীব্র ভয় শুরুতে লাগছিল এখন তা লাগছে না। পারুলকে দেখে নিকি, ফিবো, মাইক ডাকাডাকি শুরু করেছে। পারুল। আগে তাদের দিকে গেল। ওদের ছেড়ে দিতে হবে। ওরা ছাড়া থাকলে ভয় থাকবে না। এরা বাড়ির চারপাশে চক্কর দেবে। মাটির স্তূপের উপর কাউকে থাকতে দেবে না।

তাহের খেতে বসেছে। পাগলের মত খাচ্ছে। মুঠি ভর্তি ভাত মুখে দিচ্ছে। ঠিকমত চিবুচ্ছে না, গিলে ফেলছে। পারুল অবাক হয়ে দেখছে। তাহের লজ্জিত মুখে বলল, রাক্ষসের মত খিদে লেগেছে।

তাই তো দেখছি।

একবেলা খাই তো, মনে হয় এই জন্যে। কুকুর স্বভাব হয়ে গেছে একবেলা আওয়া। হা হা হা।

এরকম অদ্ভুত করে হাসছ কেন।

তাহেরের মুখ ভর্তি ভাত। কখা বলা সমস্যা। তার মধ্যে বলল, একটা অসাধারণ। ভাল খবর আছে। মেসবাউল সাহেবের ক্যান্সার হয়েছে।

পারুল বলল, মুখের ভাত শেষ করে কথা বল। পানি খাও।

তাহের মুখের ভাত গিলে ফেলল। পুরো এক প্রান পানি খেয়ে হাঁপাতে লাগল।

পারুল বলল, কি বলছিলে?

আমার স্বভাব হয়ে গেছে শয়তানের মত। মিথ্যা বলা অভ্যাস হয়ে গেছে। বাইরে এখন বলতে গেলে সারাক্ষণই মিথ্যা বলি। খুব গুছিয়ে বলি।

মিথ্যা সব সময় গুছিয়ে বলতে হয়। সত্য গুছিয়ে বলতে হয় না।

ঠিক বলেছ। ভেরি রাইট। মিথ্যা বলায় এখন এমন এক্সপার্ট হয়েছি, যাকে যা বলি তাই সে বিশ্বাস করে।

মেসবাউল করিম সাহেবের সম্পর্কে কি যেন বলছিলে?

উনার ক্যান্সার হয়েছে। দুঃখজনক খবর, কিন্তু আমি বললাম, কি রকম করে দেখেছ? আমি বললাম–একটা অসাধারণ ভাল খবর আছে …, একেবারে কুকুরের মত হয়ে যাচ্ছি। কিছুদিন পর হতে দেখলে মেঝেতে চার পায়ে হামা দিচ্ছি।

পারুল শান্ত গলায় বলল, মেসবাউল করিম সাহেবের ক্যান্সার হওয়ায় আমাদের কিছু সুবিধা হয়েছে এই জন্যেই তুমি বলেছ–অসাধারণ ভাল খবর। মানুষ মাত্রই নিজের ভালটা আগে দেখে। এটা অপরাধ না। এবং এটা কুকুরের স্বভাবও না। মানুষের স্বভাব। সাধারণ মানুষের স্বভাব।

তাও ঠিক। আরো একটা খবর আছে। সেই খবরটা আরো ভাল। আন্দাজ কর তো খবরটা কি?

পারুল বলল–রহমান সাহেব তোমাকে বলেছেন যে তুমি আমাকে এনে তোমার সঙ্গে রাখতে পার।

আশ্চর্য তো। আসলেই তাই। কি করে বললে?

আমি উনাকে চিঠিতে অনুরোধ করেছিলাম।

চিঠি তো উনাকে দেইনি। চিঠির কথা মনে ছিল। দেয়ার সাহস হয়নি।

চিঠি না পড়েই তিনি আমাকে এখানে থাকার অনুমতি দিলেন?

হ্যাঁ। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আনান-এর জন্ম পর্যন্ত আমরা এ বাড়িতে থাকতে পারব।

তুমি কি পল্টু ভাইয়ের চিঠিটাও তাকে দাও নি?

হ্যাঁ, দিয়েছি।

উনি কি বললেন?

খুব খুশি হয়েছেন। বলেছেন একবার এসে তোমাকে দেখে যাবেন।

কবে আসবেন?

তা বলেননি। বিশিষ্ট ভদ্রলোক। ছবিসহ বায়োডাটা দিতে বললেন। আমার জন্যে চাকরির চেষ্টা করবেন। করবেন না কিন্তু তা জানি–তবুও তো বলল। আজকাল তো মুখের বলটাও কেউ বলে না।

পারুল হাসছে। তার হাসির বেগ বাড়ছে। সে আঁচলে মুখ চাপা দিল। তাহের তাকিয়ে আছে। এ কি বিশ্রী অভ্যাস হচ্ছে পারুলের! হাসির শব্দে আকৃষ্ট হয়ে কুকুর তিনটা এসেছে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাদের লম্বা মুখ ঢুকিয়ে দিয়েছে। পারুল হাসতে হাসতে বলল, খবর শুনেছিস? পল্টু ভাই আমাকে দেখতে আসবেন। বিশিষ্ট ভদ্রলোক। উনি এলে তোদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। উনাকে খুব ভাল লাগবে।

তাহের বলল, কুকুরের সঙ্গে কথা বলছ?

নগর মাছ সব সময়ই তো বলি। নতুন কি?

এইসব লক্ষণ ভাল না। খারাপ লক্ষণ।

খারাপ লক্ষ কেন? তোমার কি বা হাবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমিও এক সময় করে হয়ে যাব? চার পায়ে হামা দেব? এটা মন্দ না কিন্তু। তুমি আমি দুজনেই হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে হাঁটছি–হি হি হি।

তাহের খেতে শুরু করেছে। খাওয়া বন্ধ করে অনেকক্ষণ কথা বলার জন্যে খিদে। মরে গেছে, এখন আর খেতে ভাল লাগছে না। পারুল বলল, এই শোন। তাকাও আমার দিকে।

তাহের তাকালো। পারুল বলল, এখন এ বাড়িতে আমাদের গুছিয়ে বসতে হবে। কাজেই কামরুল যে নেই এটাও তোমাকে অফিসে জানাতে হবে।

কি বলব তাদের? আমরা তাকে মাটিতে পুঁতে রেখেছি, যাতে ফুলের বাগানে ভাল সার হয়?

কি বলবে তা তুমিই ঠিক করবে। একটু আগেই না বললে তুমি গুছিয়ে মিথ্যা বলতে পার। খুব গুছিয়ে কিছু একটা বলবে। ভাল কথা, তোমাকে যে একটা চিঠি লিখেছিলাম সেটা পড়েছ?

তাহের বিরক্ত মুখে বলল, কিছুই তো সেখানে লেখা নেই। শাদা একটা পাতি। এই রকম ঠাট্টা করার মানে কি? আমি তো ঘাম খুলে হতভম্ব।

পরুল আবার হাসতে শুরু করেছে। তার হাসির বেগ বাড়ছে। এই তো এখন মুখে আঁচল চাপা দিল। তাহের ঘাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। অবাক হয়ে সে পরুলকে দেখছে। নিকি, ফিবো ও মাইক ওর। ও দেখছে। তবে তারা অবাক হচ্ছে না। পশুদের বিস্মিত হবার ক্ষমতা থাকে না।

এত হাসছ কেন?

আনন্দ হচ্ছে এই জন্যে হাসছি। আচ্ছা শুন কুকর যে হাসতে পারে তা-কি তুমি জান?

কুকুর হাসতে পারে?

হ্যাঁ পারে। আজ সকালে কি হয়েছে শোন–আমি নিকিকে বললাম, এই নিকি তুই দুই স্বামী নিয়ে ঘুরে বেড়াস তোর লজ্জা লাগে না? তখন দেখি নিকি চুপ করে আছে। ফিবো হাসছে।

পারুল তোমার চিকিৎসা হওয়া দরকার?

আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখ ফিবো হাসছে। দেখ ভাল করে।

তাহের তাকাল।

সে রকমই তো মনে হচ্ছে। তাহেরের গায়ে কাঁটা দিল।

০৯. পা ছুঁয়ে কদমবুসি

টেবিলের নিচে রহমান সাহেবের পা। সেই পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতে হলে প্রায় হামাগুড়ির পর্যায়ে যেতে হয়। তাহের তাই করল। নিজেকে এখন তার সত্যি সত্যি কুকুর কুকুর লাগছে।

রহমান সাহেব বললেন, থাক এক। সালাম লাগবে না। স্ত্রীকে নিয়ে এসেছো?

জ্বি স্যার।

গুড। দুজনে মিলে বাড়ি দেখে-শুনে রাখ। স্যারের শখের বাড়ি।

জি আচ্ছা, স্যার।

কামরুলের জ্বর কমেছে?

বলতে পারছি না স্যার। ও গতকাল বাড়ি থেকে বের হয়েছে–বলেছে সদরঘাট যাবে। সেখানের কোন হোটেলে নাকি তার দূর সম্পর্কের এক ভাই থাকে। সেই যে গেছে আর ফিরে আসেনি।

রহমান সাহেবের মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। তিনি রাগী গলায় বললেন, এই হারামজাদা বিরাট বদ। আগেও এরকম করেছে। কুকুর তিনটাকে ফেলে দু দিনের জন্যে উধাও হয়ে গেছে। দিন কুকুর তিনটা শিকল দিয়ে বাধা হিল–খাওয়া নাই, পনি নাই। তখনি হারামজাদাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা উচিত ছিল। স্যারের জন্যে করতে পারিনি। এইবার আমি একশান নেব। স্যার রাগ করুন আর যাই করুন। তুমি কুকুর তিনটার মোটামুটি দেখা শোনা করতে পারি তো?

পারি স্যার। ভয় ভয় লাগে, তবু…

ভয় লাগার কিছু নেই–চেনা মানুষকে এরা কিছু করে না। তুমিই দেখে-শুনে রাখ। হারামজাদা যদি আসে আমি বাড়িতে ঢুকতে দেবো না। সরাসরি আমার কাছে পাঠাবে। দরকার হলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কুকুরের জন্যে নতুন লোক রাখব। এই কদিন তুমি চালিয়ে নিতে পারবে না?

পারব স্যার।

এদের যত্ন করে রাখ। স্যার খুশি হবেন। স্যারের অতি প্রিয় কুকুর। অসুখের মধ্যেও টেলিফোনে কুকুরের খবর জানতে চান। ছেলেপুলে নাই তো। কুকুরগুলি তাঁর সন্তানের মত।

আমি স্যার চেষ্টা করব যত্ন করতে।

আপাতত তুমি এবং তোমার স্ত্রী দুজনে মিলে এদের দেখাশোনা কর। কুকুরের জেন্যে বরাদ্দ টাকা নিয়ে যাও। ওদের ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করাবে। সপ্তাহে একদিন গোসল দেবে। কুকুরের দেখাশোনার জন্যে যে এক্সট্রা এলাউন্স আছে সেটাও তুমি নাও। হারামজাদা কামরুলকে আমি রাখব না।

আমি কি যাব স্যার।

যাও।

তাহের আবার কদমবুসির জন্যে নিচু হল। আবার তার কাছে নিজেকে কুকুরের মত লাগছে। রহমান সাহেব বললেন, থাক আক, এত সালাম লাগবে না। কথায় কথায় কদমবুলির কোন প্রয়োজন নেই।

তাহেরকে অফিস থেকে বেরুবার সময় মনিকার সামনে দিয়ে বেরুতে হয়। কিছু বলবে না বলবে না করেও সে বলে ফেলল, আমার একটা বড় সুসংবাদ আছে। আমি প্রমোশন পেয়েছি। এখন আমি কুকুরের সর্দার। আমার জন্যে একটু দোয়া রাখবেন।

মনিকা তাকাল। তার চোখে গভীর বিতৃষ্ণা। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের দিকে এমন বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকায় কিভাবে? একটি পশু যখন অন্য একটি পশুর দিকে তখন কি তার চোখেও বিতৃষ্ণা থাকে?

তাহের বলল, আজ আপনাকে অন্য দিনের চেয়েও সুন্দর লাগছে।

মনিকা কঠিন গলায় বলল, কমপ্লিমেন্টের জন্যে ধন্যবাদ।

সবাইকে সব রঙে মানায় না। আপনার জন্যে সবুজ রঙ। সবুজ রঙে আপনাকে অদ্ভুত লাগে।

মনিকা বলল, আপনার নাম তো তাহের তাই না?

জ্বি তাহের। আবু তাহের।

আপনি বসুন। আপনার সঙ্গে দুটা কথা বলব।

বলুন।

মনিকা শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলল, কেন আপনি আমাকে বিরক্ত করেন?

বিরক্ত করি?

হ্যাঁ বিরক্ত করেন। অসম্ভব বিরক্ত করেন।

আমি কিন্তু আপনাকে বিরক্ত করি না। আমি যেহেতু দারোয়ান শ্রেণীর একজন মানুষ সেহেতু আমার কথাগুলি আপনার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। আমি যদি দারোয়ান না হয়ে অফিসার গোত্রের কেউ হতাম তাহলে আমার কথা শুনে আপনি বিরক্ত হতেন না। আর আমি যদি বিখ্যাত কেউ হতাম তাহলে আমার কথাগুলি আপনার কাছে অসাধারণ মনে হত। আপনি আমাকে তখন বিনীতভাবে নিমন্ত্রণ করতেন এক কাপ কফি খেয়ে যাবার জন্যে। কফি না খাইয়ে ছাড়তেন না।

মনিকা বলল, কফি খাবেন?

জ্বি খাব।

মনিকা কফি পটের দিকে গেল। তার হাতের কাছেই পার্কোলেটার কফি বীনস সিদ্ধ হচ্ছে। চারদিকে কফির নেশা ধরা গন্ধ।

ক্রীম দুধ দিয়ে দেব?

দিন।

তাহের শান্ত মুখে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে। মনিকা তাকিয়ে আছে। তাহের বলল, অনেকদিন আমি আর আপনাকে বিরক্ত করব না।

কেন?

খুব ব্যস্ত থাকতে হবে। বড় সাহেবের কুকুর তিনটার দায়িত্ব এসে পড়েছে। এদের গোসল করানো, খাওয়ানো, খেলা দেয়া–অনেক কাজ। এদিকে আসা হবে না। আর এলেও আপনার সঙ্গে দেখা করব না।

দেখা করবেন না কেন?

কুকুরের সঙ্গে দিনরাত থাকব তো–গায়ে কুকুরের গন্ধ হয়ে যাবে। কুকুর কুকুর গন্ধ নিয়ে তো আর আপনার সঙ্গে দেখা করা যায় না।

আপনি কি আমাকে একটা সত্যি কথা বলবেন?

অবশ্যই বলব। ইদানিং আমি অবশ্যি সত্যি কথা বলা ভুলে যাচ্ছি। ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলছি। তবে আপনাকে সত্যি কথাই বলব।

মনিকা ইতঃস্তত করে বলল, আপনি প্রায়ই যেচে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসেন। কেন?

সবদিন কিন্তু আসি না। যেদিন আপনার গায়ে সবুজ শাড়ি থাকে সেদিনই আসি। সেদিনই কথা বলি।

সবুজ শাড়ির ব্যাপারটা আমি লক্ষ্য করিনি। তবু স্বীকার করে নিচ্ছি। এখন বলুন কেন সবুজ শাড়ি পরা দেখলেই কথা বলতে আসেন?

তাহের কফির মগ নামিয়ে রাখল। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমার যখন সাড়ে তিন কিংবা চার বছর বয়স তখন আমার মার দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়। বাবা মারা গিয়েছিলেন, মার বিয়ে করা ছাড়া কোন পথ ছিল না। মার দ্বিতীয় স্বামী বিপত্নীক একজন মানুষ। ইংল্যাণ্ডে তার হোটেলের ব্যবসা। কথা ছিল ভদ্রলোক আমাকেও নিয়ে যাবেন। বিয়ের পর আমাকে সঙ্গে নিতে রাজি হলেন না। শুধু মাকে নিয়ে যাবেন বলে ঠিক হল। মা এখন আমার কাছ থেকে বিদায় নিতে আসেন তখন খুব সেজেগুজে এসেছিলেন। তাঁর পরনে ছিল সবুজ সিল্কের শাড়ি। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।

আমি অবাক হয়ে আমার সাজ-পোশাক দেখছি। মা হাসিমুখে বললেন, তোকে শেষবারের মত দেখতে এসেছি রে খোকন। আমার সুন্দর চেহারাটা যেন তোর মনে থাকে এই জন্যেই সেজে এসেছি। তোর জন্যেই সেজেছি আমি, কোলে আয়। আমাকে কোলে নিলেন। এবং চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, আমার খোকনের সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। আমার খোকনের সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।

তিন-চার বছরের কোন স্মৃতি মানুষের থাকে না। আমারো নেই। শুধু মার সবুজ শাড়িটার কথা মনে আছে। আপনার পরনে যখন সবুজ শাড়ি দেখি তখন…

আপনার মার সঙ্গে আপনার আর দেখা হয়নি?

জ্বি না। মা ইংল্যাণ্ডে যাবার ছবছরের মাথায় মারা যান। ঐখানেই তার কবর বাঁধানো আছে। কোন দিন যদি টাকা হয়–মার কবরটা ছুঁয়ে দেখার জন্যে একবার ইংল্যাণ্ডে যাব।

আপনি কি আরেক কাপ কফি খাবেন

জ্বি-না।

প্লীজ খান, প্লীজ।

না না–লাগবে না। চা-কফি এম্নিতেই আমি খাই না।

তাহের বের হয়ে গেল। কোথায় যাবে সে বুঝতে পারছে না। বাসায় ফিরতে ইচ্ছা। করছে না। আজকের দিনটাও সে বাইরে বাইরে ঘুরবে। সন্ধ্যার পর ফিরবে। কাল থেকে বাসাতেই থাকবে। কুকুরের যত্ন করবে। বাগান করবে। লনের ঘাস বড় হয়ে গেছে। ঘাসগুলি ছেটে সমান করে দিতে হবে। মালীর কাজও সে-ই করবে। যেন নীলা হাউসে অন্য কেউ ঢুকতে না পারে।

এখন কোথায় যাওয়া যায়? পল্টু সাহেবের ফার্মেসিতে গেলে কেমন হয়? উপশম। উনার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্পগুজব করা যেতে পারে। ভদ্রলোককে বলতে হবে, স্যার, আমার জন্যে চাকরি খুঁজতে হবে না। আমি খুব ভাল আছি। সুখেই আছি। I am a happy man.

পল্টু সাহেব ফার্মেসিতে ছিলেন না। কোথায় গিয়েছেন কেউ বলতে পারল না। সকাল বেলাই বেরিয়ে গেছেন। তার গাড়ি নেননি।

তাহেরের কেন জানি মনে হল, উনি গিয়েছেন নীলা হাউসে। পারুলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন।

তাহের পার্কের দিকে রওনা হল। বেঞ্চিতে শুয়ে আজ বিশ্রাম করবে। কাল থেকে নানান কাজ–বিশ্রামের সময়ই পাওয়া যাবে না। সন্ধ্যা পর্যন্ত একটা জমাট ঘুম দেবে। নাক ডাকিয়ে ঘুমুবে।

১০. পল্টু ভাই

গেটের দরজা খুলে পারুল হাসিমুখে বলল, আসুন পল্টু ভাই, আপনি সত্যি সত্যি আসবেন ভাবতেই পারিনি।

পল্টু সাহেবের গায়ে সুন্দর একটা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বোতামগুলি সোনার। আলো পড়ে ঝকঝক করছে। তার চোখে সানগ্লাস। তিনি সানগ্লাস খুলে হাতে নিতে নিতে খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, এত বড় বাড়ি।

হুঁ। বিরাট বাড়ি।

বাইরে থেকে বোঝা যায় না ভেতরে এত সুন্দর একটা বাড়ি। তোমার স্বামী কোথায়? তাহের, আবু তাহের?

ও বাসায় নেই। এ তো সকালে যায়। একেবারে সন্ধ্যায় আসে।

তাহেরকে বলেছিলাম ছবিসহ বায়োডাটা দিতে। দেয়নি। আমি দু-এক জায়গায় কথা বলেছি। ওকে পাঠিয়ে দিও।

জ্বি আচ্ছা, পাঠাব।

পারুল গেটে তালা দিতে দিতে বলল, আপনি আসায় আমি কি যে খুশি হয়েছি। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল, আবার একবার আপনার সঙ্গে দেখা হবে।

তুমি খুব সুন্দর হয়েছ পারুল।

সত্যি বলছেন তো?

হ্যাঁ সত্যি।

আপনি কিন্তু আগের মতই আছেন।

বুড়ো হয়েছি তো।

বুড়ো বুড়ো কিন্তু লাগছে না।

তুমি ছাড়া আর কেউ এ বাড়িতে থাকে না?।

না।

পারুল হাসছে। খিল খিল করে হাসছে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, একটু দাঁড়ান পল্টু ভাই। এক মিনিট। আমার তিনটা কুকুর আছে। এদের ছেড়ে দিয়ে আসি। এই সময় এরা খানিকক্ষণ বাগানে চক্কর দেয়। সময়মত না ছাড়লে খুব রাগ করে।

কি ধরনের কুকুর?

গ্রে হাউন্ড।

গ্রে হাউড ভাল কুকুর। বাড়ি পাহারার জন্যে আদর্শ। আমার নিজেরো একটা ছিল। কুমিল্লার সরাইলের কুকুর। গ্ৰ হাউরেই একটা ভ্যারাইটি। মারা গেছে। তোমার এই কুকুরগুলির ভেতর মাদি কুকুর আছে?

আছে–নিকি। নিকি হল মেয়ে কুকুর।

বাচ্চা হলে দেখ তো আমাকে একটা দেয়া যায় কি-না।

আপনি চাইলে অবশ্যই দেব। আপনি কিছু আমার কাছে চাইবেন আর আমি দেব না, তা কখনো হবে না। যা চাইবেন তাই পাবেন। কুকুরের ছানা ছাড়া আর কিছু চান?

পল্টু সাহেব আনন্দের হাসি হেসে বললেন–আপাতত এক কাপ চা চাচ্ছি। তারপর দেখা যাক…

পারুল কুকর ছেড়ে দিয়েছে। তারা একবার অপরিচিত মানুষটার দিকে তাকালো, তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে বাড়ির চারদিকে হাঁটতে শুরু করল। পল্টু সাহেব বললেন–এ তো দেখি ভংয়কর কুকুর। এদের ম্যানেজ কর কিভাবে?

এরা আমাকে খুব পছন্দ করে। আমাকে খুব মানে। যা করতে বলি তাই করে। পল্টু ভাই আসুন, আমরা বাগানে বসে চা খাই। চা খাবার পর আপনাকে ঘরে নিয়ে যাব। এখানে দাঁড়ান, আমি চেয়ার নিয়ে আসি।

চেয়ার লাগবে না। আমি ঘাসের উপরই বসছি।

তাহলে বসুন। আমি চা বানিয়ে আনছি।

তিনি বসলেন। সিগারেটের জন্যে পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়েই তার গা হিম হয়ে গেল। তিনটা কুকুর পায়ে পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তিনজন তিন দিক থেকে আসছে। পালিয়ে যাবার পথ নেই। তিনি ভাঙা গলায় ডাকলেন–পারুল, এই পারুল।

পারুল স্টোভ জ্বালিয়ে চায়ের কেতলি বাসিয়েছে। তার মুখ হাসি হাসি। পল্টু সাহেব উঁচু গলায় ডাকলেন–পারুল, পারুল!

পারুল বলল, চা বানাচ্ছি তো।

দুটি কুকুর পটু সাহেবকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরছে। একজন স্থির হয়ে আছে। তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। সে কোন একটা সংকেতের অপেক্ষা করছে। সংকেত পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

তার পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে জব জব করছে। তিনি পেছনে ফিরলেন–পিছনে বড় একটা গর্ত।

তিনি ব্যাকুল হয়ে ডাকলেন, পারুল, পারুল!

পারুল চায়ের কাপ হাতে বের হয়ে এল। তিনি ভীত গলায় বলল, দেখ কুকুরগুলি কেমন যেন করছে।

পারুল হাসতে হাসতে বলল, ওরা এরকম করে। এটা ওদের একটা খেলা।

খেলা দেখে আমি ভয়ে প্রায় মারা যাচ্ছিলাম। শুধু আমার জন্যে চা এনেছে? তুমি খাবে না?

না। চিনি হয়েছে কি-না দেখুন।

তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন–পারফেক্ট চিনি হয়েছে। ভেরি গুড। বুঝলে পারুল, তোমার ঐ কুকুর তিনটার কাণ্ডকারখানা দেখে ভয় যা পেয়েছিলাম বলার না। একবার ইচ্ছা করছিল লাফ দিয়ে গর্তে পড়ে যাই।

পারুল হাসছে। খিল খিল করে হাসছে। তিনি হৃষ্ট গলায় বললেন, তোমার হাসি খুব সুন্দর।

পারুল বলল, আমার শরীরও খুব সুন্দর, তাই না পল্টু ভাই? ছোটবেলায় যত সুন্দর ছিল এখন তারচেয়েও সুন্দর হয়েছে। আমার স্বামী তো বোকা মানুষ। সৌন্দর্য নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু আপনি হলেন রূপের উপাসক।

পল্টু সাহেব আবার অস্বস্তি বোধ করা শুরু করেছেন। পারুল তার কাছ থেকে দূরে। সরে গেছে। কুকর দুটি আবার চক্রাকারে ঘোরা শুরু করেছে। একটা কুকর শুধু স্থির হয়ে আছে।

পারুল ডাকল, নিকি।

নিকির শরীর ঋজু হয়ে গেলো। তাকে এখন আর কুকুর বলে মনে হচ্ছে না। মনে। হচ্ছে গ্রানাইট পাথরের মূর্তি। পল্টু সাহেবের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। তিনি কি যেন বলতে গেলেন–বলতে পারলেন না। নিকি বিদ্যুতের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল।

১১. ঘটনা এবং প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক

নীলা হাউসে তাহের এবং পারুল সুখেই আছে। পারুলের এখন আট মাস চলছে। তার শারীর ভারী হয়েছে। আগের মত পরিশ্রম করতে পারে না। সে বেশীর ভাগ সময় বারান্দার বেতের চেয়ারে বসে থাকে। তাহের এখন দিনরাত ঘরেই থাকে। পারুলের পাশে বসার তার সময় হয় না। তার এখন অনেক কাজ। কুকুরের দেখাশোনা, বাগান। করা। বলতে গেলে দম ফেলার সময় নেই।

নীলা হাউসের বাগান খুব সুন্দর হয়েছে। অসংখ্য গোলাপ ফুটেছে। রহমান সাহেব বাগান দেখে খুব প্রশংসা করে গেছেন। তাহেরের পিঠে হাত রেখে বলেছেন, বড় সাহেব গোলাপ বাগান দেখলে খুব খুশি হবেন।

তাহের বলেছে, উনি কবে আসবেন?

বুঝতে পারছি না। চিকিৎসা চলছে। ক্যান্সার তো, এর চিকিৎসাও জটিল।

অবস্থা কেমন?

আছে মোটামোটি। এইসব নিয়ে তুমি চিন্তা করবে না। তুমি তোমার কাজ কর।

তাহের কাজ করে যাচ্ছে। দিনরাতই কাজ করছে।

সে বাড়ির পেছনে দুটা বড় গর্ত করে রেখেছে। পারুল করতে বলেছে, সে করেছে। তার কাছে মনে হয়েছে থাকুক না দুটা গর্ত। কখন কি কাজে আসে কে জানে। গর্ত করা এমন কিছু পরিশ্রমের কাজ না।

আজকাল তাদের সময় খুব আনন্দে কাটে। তাহেরের এখন প্রায়ই মনে হয় তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়েছে। শুধু জোছনার রাতগুলিতে একটু সমস্যা হয়। কুকুর তিনটা চাপা গলায় কাঁদে। সেই কান্না ভয়ংকর লাগে। জোছনা রাতে বাগানে আরো কিছু অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়–যেন দুজন মানুষ। তারা পাশাপাশি থাকে। মাঝে মাঝে তারা নীলা হাউসের দিকে তাকায়। লোক দুটির চোখের মণি কুকুরের চোখের মণির মতই জ্বল জ্বল করে। দূর থেকে জ্বলন্ত অঙ্গারের মত লাগে।

তাহের জানে এইসব কিছুই না, চোখের ভুল। চোখের ভুলকে গুরুত্ব দেয়া ঠিক না। কোন কিছুকেই আসলে গুরুত্ব দেয়া ঠিক না। এই পৃথিবীতে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বেঁচে থাকা। আর সবই গুরুত্বহীন।

তারা দুজন বেঁচে থাকতে চায়। শুধুই বেঁচে থাকতে চায়। প্রকৃতির অমোঘ নির্দেশ পালন করতে চায়–হে মানব, তোমরা বেঁচে থাক। মানব প্রজাতি রক্ষার জন্যে সন্তান উৎপাদন কর। কিছুতেই যেন এই প্রজাতির বিস্তার বন্ধ না হয়। কারণ, তোমাদের নিয়ে আমার অনেক বড় পরিকল্পনা আছে। তোমরা যথাসময়ে তা জানবে।

পারুল তার সন্তানের জন্যে যে আগ্রহ, যে আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করে ঠিক সেই পরিমাণ আগ্রহ ও আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করে নিকি। সেও সন্তান-সম্ভবা হয়েছে। প্রকৃতি সব ধরনের প্রজাতিই রক্ষা করতে চায়। সবাইকে নিয়েই তার হয়ত পরিকল্পনা আছে।

আমরা তুচ্ছ মানুষ। আমরা সেই মহাশক্তির বিপুল রহস্য বুঝতে পারি না বলেই বিচলিত হই। বিচলিত হবার কিছু নেই।*

—————-

  • ঘটনা এবং প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *