বহুব্রীহি পর্ব (১৭)- হুমায়ূন আহমেদ

নারী কণ্ঠ আবারাে তীক্ষ্ণ গলায় বললেআপনি 

আমার নাম আনিসআমি বাড়ির ভাড়াটেআপনি কি ভয় পেয়েছেন? ভয়ের কিছু নেইআমি মানুষভূত কখনাে কবিতা বলে নাতাছাড়া ভূতের ছায়া পড়ে নাএই দেখুন আমার ছায়া পড়েছে। 

বহুব্রীহি

নারীমূর্তি কিছু বলল নাগায়ের চাদর টেনে দিলতাতে তার মুখ আরাে ঢাকা পড়ে গেলআনিস বলল, আপনি কে জানতে পারি কি

আমার নাম বিলুআমি বাড়ির বড় মেয়েছাদে কি করছেন? কিছু করছিনাটবের গাছগুলি দেখতে এসেছিলামমাঝখানে আপনিভয় দেখিয়ে দিলেন। 

সত্যি ভয় পেয়েছেন? হা। 

কেন বলুনতাে? | বিলু সহজ গলায় বলল, রহিমার মার ধারণা বাড়ির ছাদে নাকি ভূত আছেসে প্রায়ই দেখেআপনাকে হঠাৎ দেখেআচ্ছা যাই। 

বিলু সিড়ির দিকে রওনা হলআনিস বলল, আপনার টবের গাছ দেখা হয়ে গেল

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনার আরাে কিছুক্ষণ ছাদে থাকার ইচ্ছা ছিল, আমার কারণে চলে যাচ্ছেন। 

আপনার ধারণা ঠিক নাআমার শীত শীত লাগছেতাছাড়া অনেকক্ষণ ছাদে ছিলামআনিস সহজ গলায় বলল, আপনাকে ভয় দেখানাের জন্যে দুঃখিতবিলু হেসে ফেললবেশ শব্দ করে হাসলআনিস হাসি শুনে হতভম্ব হয়ে গেলএই হাসি তার পরিচিতজীবনে অনেকবার শুনেছে। রেশমা এম্নি করেই হাসত, কিশােরীদের ঝনঝনে গলা, যে গলায় একই সঙ্গে আনন্দ এবং বিষাদ মাখানাে। 

বহুব্রীহি পর্ব (১৭)- হুমায়ূন আহমেদ

বিলু বলল, যাই কেমন

আনিস দ্বিতীয়বার চমকালরেশমাও কোথাও যাবার আগে মাথা কাত করে বলত, যাই কেমন? যেন অনুমতি প্রার্থনা করছেযদি অনুমতি পাওয়া না যায় তাহলে যাবে না। 

বিলু তরতর করে সিড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছেসিড়ির মাথায় মূর্তির মত আনিস দাঁড়িয়েসে ফিসফিস করে বলল, আলােটুকু তােমায় দিলামছায়া থাক আমার কাছে। 

তার ভাল লাগছে নাকোথাও কিছু একটা ঘটে গেছেঅনেক অনেক দূরের দেশ থেকে যেন হঠাৎ রেশমা উঠে এলকেমন করে হয়? যে চলে গেছে সে আর আসে নামানুষের কোন বিকল্প হয় নাকি যেন কথাগুলি? পৃথিবী একবার পায় তারে কোন দিন পায় নাকো আর, লাইনগুলি কি ঠিক আছে না ভুল টুল কিছু হল

এমদাদ এবং তার নাতনীকে থাকার জন্যে যে ঘরটা দেয়া হয়েছে সে ঘর এমদাদের খুবই পছন্দ হলসে তিনবার বলল, দক্ষিণ দুয়ারী জানালা লক্ষ্য করে দেখঘুম হবে তােফাপুতুল শুকনাে গলায় বলল, ঘুম ভাল হইলেই ভালআরাম কইরা ঘুমাও। 

খাটও দুইটা আছেএকটা তাের একটা আমারবাবস্থা ভালইকি কস পুতু? | পুতুল চুপ করে রইল। এমদাদ বলল, ভয়ে ভয়ে ছিলাম বুঝলিকিছুই বলা যায় নাযদি চাকর বাকরের ঘর দিয়া বসেদিয়া বসতেও তাে পারেমানী লােকের মানতাে সবাই দেখে 

আরে আরে কারবার দেইখ্যাযাঘরের লগে পেসাবখানাএলাহী কারবার। 

আনন্দে এমদাদের মুখ ঝলমল করছেশুধু পুতুল মুখ কাল করে রেখেছেকিছুতেই তার মন বসছে নাঅন্যের বাড়িতে আশ্রিত হবার কষ্ট যন্ত্রণা সে তার ক্ষুদ্র জীবনে অনেকবার ভােগ করেছেএখন আবার শুরু হলইচ্ছা মৃত্যুর ক্ষমতা যদি মানুষের থাকতাে তাহলে বড় ভাল হতএই যন্ত্রণা সহ্য করতে হত না। 

বহুব্রীহি পর্ব (১৭)- হুমায়ূন আহমেদ

কি দাদাজান? ঘর ভালই দিছে ঠিক না? 

এখন খিয়াল রাখবি সবের সাথে যেন ভাল ব্যবহার হয়যে যা কয় শুনবি আর মুখে বলবিজ্বি কথা ঠিকএই কথার উপরে কথা নাইগেরাম দেশে লােক বলে মুখের কথায়চিড়া ভিজে নামিথ্যা কথা, মুখের কথায় সব ভিজেতাের মুখ এমন শুকনা দেহায় ক্যানরে পুতুল

এইখানে কদ্দিন থাকবা ? আসতে না আসতেই কন্দিন থাকবা? থাকা না থাকা নিয়া তুই চিন্তা করবি নাএইটাআমার উপরে ছাইড়া দেযা হাত মুখ ধুইয়া আয় চাইরভা দানাপানি মুখে দেইএই বাড়ির খাওয়া খাদ্যও ভাল হওনের কথা। 

এমদাদের আশংকা ছিল হয়ত চাকর বাকরদের সঙ্গে মেঝেতে পাটি পেতে খেতে দেবেযদি দেয় তাহলে বেইজ্জতির সীমা থাকবেনাদেখা গেল খাবার টেবিলেই খেতে দেয়া হয়েছেবাড়ীর কত্রী স্বয়ং তদারক করছেনচিকন চালের ভাত, পাবদা মাছ, একটা শজি, মুগের ডালখাওয়ার শেষে পায়েসতােফা ব্যবস্থামিনু বললেন, পেট ভরেছে তাে এমদাদ সাহেব? ঘরে যা ছিল তাই দিয়েছিনতুন কিছু করা হয়নি| কোন অসুবিধা হয় নাইশুধু একটু দৈ থাকলে ভাল হইতখাওয়ার পর দৈ থাকলে হজমের সহায়ক হয়তার উপর আপনার ছােটবেলা থাইক্যা খাইয়া অভ্যাস। 

বহুব্রীহি পর্ব (১৭)- হুমায়ূন আহমেদ

ভবিষ্যতে আপনার জন্য দৈয়ের ব্যবস্থা রাখবআলহামদুলিল্লাহ্এখন মা জননী অবস্থা পইড়া গেছেএকটা সময় ছিল খােন্দকার বাড়ির সামনে দিয়া লােকজন ছাতা মাথায় দিয়ে যাইত নানিয়ম ছিল নাজুতা খুইল্যা হাতে নিতে হইত বুঝলেন মা জননী। 

তাই বুঝি

জ্বিএকবার কি হইল শুনেন মা জননীখােলকার বাড়ির সামনে দিয়ে এক লােক যাইতেছে হঠাৎ খক করে কাশ ফেললসাথে সাথে দারােয়ান ঘাড় ধরে নিয়া আসলবলল হারামজাদা এত বড় সাহসখােন্দকার বাড়ির সামনে কাশ ফেলসনাকে খত দেমাটিতে চাটা দেতারপরে যা যেখানে যাবি| পুতুলের এইসব কথা শুনতে অসহায় লাগেনা শুনেও উপায় নেইদাদাজান যেখানে যাবে সেইখানেই এইসব বলবেপুতুলের ধারণা সবই মিথ্যা কথাসে খাওয়ার মাঝ পথে উঠে পড়লএমদাদের তাতে সুবিধাই হলসে জরুরী একটা কথা বাড়ির কত্রীর সঙ্গে বলতে চাচ্ছেপুতুল থাকায় বলতে পারছে নাএখন সুযােগ পাওয়া গেল। 

মা জননীকে একটা কথা বলতে চাইতেছিলামবলুনবলতে শরম লাগছেআবার না বলেও পারতেছি নাতারপর ভেবে দেখলাম আপনাদের না বললে কাদের বলব? আপনারা হইলেন বটবৃক্ষ। 

ব্যাপারটা কি? টেইন থাইক্যা নামার সময় বুঝলেন মা জননী পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়া দেখি পকেট কাটা। 

পকেট কাটা মানে

বহুব্রীহি পর্ব (১৭)- হুমায়ূন আহমেদ

ব্লেড দিয়ে পকেট সাফা করে দিছেমানিব্যাগে চাইরতেত্রিশ টাকা ছিল, সব শেষএখন পকেটে একটা কানা পয়সা নাইকি বেইজ্জতী অবস্থা চিন্তা করেন মা জননী। 

আচ্ছা ওর একটা ব্যবস্থা হবেহবে তাতাে জানিই! বটবৃক্ষতাে শুধু শুধু বলি নাচাইলতা গাছও তাে বলতে পারতামপারতাম না

আপনাকে কি মিষ্টি দেব? ঘরে মিষ্টি আছে” 

দেনআমার অবশ্য ডায়াবেটিসমিষ্টি খাওয়া নিষেধএত নিষেধ শুনলে তাে আর হয় নাকি বলেন মা জননী? মিষ্টি খাইতে পারবা না, ভালমন্দ খানা খাইতে পারবা না, সিগ্রেট খাইতে পারবা নাতাইলে খামুটা কি? বাতাস খামু? | দীর্ঘদিন পর এমদাদের খুব চাপ খাওয়া হয়ে গেলপেট দম সম হয়ে আছেখানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা দরকারএদের বাড়ি ঘর, লােকজন সবার সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা দরকার

সে দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেনাতনীটাকে বাড়িতে গছিয়ে যেতে হবেকাজেই পরিবারের সদস্যদের নাড়ি নক্ষত্র জানা থাকা প্রয়ােজনতার কাছে অবশ্যি বেশির ভাগ সদস্যকেই বােকা কিসিমের বলে মনে হচ্ছেএটা খুবই ভাল লক্ষণযে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অর্ধেক থাকে বােকা সেই পরিবার সাধারণত সুখী হয়। 

বহুব্রীহি পর্ব (১৭)- হুমায়ূন আহমেদ

এমদাদ ফরিদের ঘরে উঁকি দিলফরিদ চিন্তিত মুখে বিছানায় বসে আছেছবির পরিকল্পনা ভেঙ্গে যাওয়ায় তার মন খুবই খারাপএমদাদ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, বাবাজী কি জেগে আছেন? | ফরিদ কড়া চোখে তাকালথমথমে গলায় বলল, আপনি কি এর আগে কাউকে চোখ মেলে বসে বসে ঘুমুতে দেখেছেন যে আমাকে রকম একটা প্রশ্ন করলেনদেখেছেন এইভাবে কাউকে ঘুমুতে

Leave a comment

Your email address will not be published.