• Tuesday , 22 September 2020

বহুব্রীহি পর্ব ( ২)- হুমায়ূন আহমেদ

এম, পড়া মানে শুধু শুধু সময় নষ্টবর্তমানে তার দিন কাটছে ঘুমিয়েঅল্প যে কিছু সময় সে জেগে থাকে সেই সময়টায় সে ছবি দেখেঅধিকাংশই আর্ট ফ্লিমকোন কোন ছবি সাতবার করেও দেখা হয়বহুব্রীহি

বাকি জীবনটা সে এই ভাবেই কাটিয়ে দিতে চায় কিনা জিজ্ঞেস করলে অত্যন্ত উচ্চ মার্গের একটা হাসি দেয়সেই হাসি অতি মধুর, তবু কেন জানি সােবাহান সাহেবের গা জ্বলে যায়ইদানীং ফরিদকে দেখা মাত্র তীর ব্রহ্মতালু গরম হয়ে উঠে, ঘাম হয়আজও হলতিনি তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেনআগেকার আমলের মুনি ঋষিরা হয়ত এই দৃষ্টি দিয়েই দুষ্টদের ভস্ম করে দিতেনফরিদ তার দুলাভাইয়ের দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল

What a lovely day

ফরিদের খালি গাকাঁধে একটা টাওয়েলমুখ ভর্তি টুথপেষ্ট্রের ফেনাকথা বলতে গিয়ে ফেনা তার গায়ে পড়ে গেল এতে তার মুগ্ধ বিস্ময়ের হের ফের হল নাসে আনন্দিত স্বরে বলল, দুলাভাই শরৎকালের এই শােভার কোন তুলনা হয় নাঅপূর্ব! অপূর্ব! আমার মনটা দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে দুলাভাইI am dissolving in the nature

সােবাহান সাহেব মেঘ গর্জন করলেন, ফরিদ এসব কি হচ্ছে আমি কি জানতে পারি

নেচারকে এপ্রিসিয়েট করছি দুলাভাইনেচারকে এপ্রিসিয়েট করায় নিশ্চয়ই কোন বাধা নেই। 

টুথপেষ্টের ফেনায় সারা গা মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে সেই খেয়াল আছে?তাতে কিছু যায় আসে না দুলাভাইযায় আসে না?” 

খালি গায়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছ, রাস্তায় লােকজন চলাচল করছে তাতেও তােমার অসুবিধা হচ্ছে না

জ্বি নাপােষাক হচ্ছে একটা বাহুল্য। 

পােষাক একটা বাহুল্যজ্বিআমি যখন খালি গা থাকি তখন প্রকৃতির কাছাকাছি থাকিকারণ প্রকৃতি যখন আমাদের পাঠান তখন খালি গায়েই পাঠায়এই যে আপনি জাৰ্ব জোৱা পরে বসে আছেন এইসব খুলে পুরো দিগম্বর হয়ে যান দেখবেন অন্য রকম ফিলিংস আসবে‘ 

স্তম্ভিত সােবাহান সাহেব বললেন, তুমি আমাকে সব কাপড় খুলে ফেলতে বলছ? জ্বি বলছি” 

সােবাহান সাহেব লক্ষ্য করলেন তাঁর ব্রহ্মতালুতে জ্বলুনী শুরু হয়েছে, গা ঘামছেএসব হার্ট এ্যাটাকের পূর্ব লক্ষণ কিনা কে জানেতামৃত্যু হার্ট এটাকে হবে এটা তিনি বুঝতে পারছেন, ফরিদের কারণেই হবেকত অবলীলায় কথাগুলি বলে কেমন হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে। 

ফরিদ বলল, আপনি চোখ মুখ এমন শক্ত করে বসে আছেন কেন দুলাভাই ? আনন্দ করুনআনন্দ করব?‘ 

হাঁ করবেনজীবনের মূল জিনিসই হচ্ছে আনন্দএমন চমৎকার একটা সকালআচ্ছা দুলাভাই রবি ঠাকুরের গানটার কথাগুলি আপনার মনে আছেআজি শারদ প্রভাতে মনে আছে? প্রথম লাইনটা কিআজি শারদ প্রভাতে, নাকি হেরিনু শারদ প্রভাতে

সােবাহান সাহেব বললেন, তুমি দয়া করে আমার সামনে আসবে নাফরিদ বিস্মিত হয়ে বলল, কেন? আবার কথা বলে, যাও বলছি আমার সামনে থেকে বহিষ্কার, বহিস্কারকি যন্ত্রণা আবার সাধু ভাষা ধরলেন কেন? বহিস্কার বার কি? বলুন বেড়িয়ে যাওমুখের ভাষাকে আমাদের সহজ করতে হবেদুলাভাই, তৎসম শব্দ যত কম ব্যবহার করা যায়ততই ভাল। 

যাও বলছি আমার সামনে থেকেযাও বলছিযাচ্ছিযাচ্ছিবিনা কারণে আপনি রকম রেগে যান কেন এই ব্যাপারটাই আমি বুঝি না। 

ফরিদ চিন্তিত মুখে ঘরের ভেতর ঢুকলসােবাহান সাহেবের স্ত্রী তার কিছুক্ষণ পর বারান্দায় এসে বললেন, তুমি কি মিলিকে কিছু বলেছ? কাঁদছে কেন

সােবাহান সাহেবের মনটা আরাে খারাপ হয়ে গেল, একুশ বছর বয়েসী একটা মেয়ে যদি কথায় কথায় কেঁদে ফেলে তাহলে বুঝতে হবে দেশের নারী সমাজের চরম দুর্দিন যাচ্ছে। 

কথা বলছ না কেন, কিছু বলেই মিলিকে? মেয়ে বড় হয়েছে এখন যদি রাগারাগি কর– 

সােবাহান সাহেব শীতল গলায় বললেন, মিনু তােমাকে এখন একটা কঠিন কথা বলব, মন দিয়ে শােনআমি তােমাদের সংসারে আর থাকব না। 

তার মানে, কোথায় যাবে তুমি

সেটা এখনাে ঠিক করিনিআজ দিনের মধ্যে ঠিক করব। মিনু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেনসােবাহান সাহেব বললেন, একটা অপ্রিয় ডিসিসান নিলামবাধ্য হয়েই নিলাম। 

বনে জঙ্গলে গিয়ে সাধু সন্ন্যাসী হবে? এই বিষয়ে তােমার সঙ্গে কোন কথা বলতে চাই নাসােবাহান সাহেব উঠে দাঁড়ালেনমিন বললেন যাচ্ছ কোথায়

তিনি এই প্রশ্নের জবাব দিলেন নাঅতি দ্রুত গেট খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেনতাঁর বাড়ির সামনের রাস্তার ওপাশেই এখন একটা মাইক ভাড়ার দোকান হয়েছেসারাক্ষণ সেখান থেকে হ্যালাে মাইক্রোফোন টেস্টিংওয়ানটুখ্রীহলাে মাইক্রোফোন টেস্টিংওয়ান টুখ্রী হয়এখন হচ্ছে নাএখন তারা একটা রেকর্ড বাজাচ্ছেহাওয়া মে উড়তা যায়ে মেরা লাল দুপাট্টা মলমলএই লক্ষ কোটি বার শােনা গান শুনে মেজাজ আরাে খারাপ হবার কথা, তা হল নাসােবাহান সাহেব লক্ষ্য করলেনগানটা শুনতে তাঁর ভাল লাগছেতিনি এর কারণ বুঝতে পারলেন নাতিনি আকাশের দিকে তাকালেন, আকাশ ঘন নীল, নীল আকাশে সাদা মেঘের স্তুপআকাশ এবং মেঘ দেখতেও তাঁর ভাল লাগলতাঁর মনে হলমানব জীবন বড়ই মধুরএই জীবনের আনন্দ হেলা ফেলার বিষয় নয়। 

মানব জীবন বড়ই মধুর এই কথা সবার জন্যে সম্ভবত প্রযােজ্য নয়গ্রীন ফার্মেসীর নতুন ডাক্তার মনসুর আহমেদের জন্যে তাে অবশ্যই নয়তার কাছে মনে হচ্ছেমানব জীবন অর্থহীন যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নয়এই রকম মনে করার আপাত দৃষ্টিতে তেমন কোন কারণ নেই। সে মাত্র মাস আগে ইন্টানীশীপ শেষ করে বের হয়েছেএর মধ্যেই ভােলা উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটা চাকরিও পেয়েছেঢাকা ছেড়ে যাবার ইচ্ছা নেই বলে চাকরি সে নেয়নিআপাতত সে গ্রীণ ফার্মেসীতে বসছেগ্রীণ ফার্মেসীর মালিক কুন্দুস সাহেব তাকে ফার্মেসীর উপরে দুটি ঘর ছেড়ে দিয়েছেনমনসুর ঘর দুটিতে সংসার পেতে বসেছে। প্রতিদিন কিছু রুগী টুগীও পাচ্ছেবড় কিছু নাসর্দি জ্বর, কাশি, ডায়রিয়াএকদিন অল্পবয়সী একটা মেয়েকে নিয়ে মেয়ের মা এসেছিলেন, চেংড়া ডাক্তার দেখে মেয়ের অসুখ প্রসঙ্গে কিছু বললেন 

গম্ভীর গলায় বললেন, না থাক আপনাকে দেখতে হবে নাআমার দরকার একজন বয়স্ক ডাক্তারআপনি তাে নিতান্তই বাচ্চা ছেলে। 

কুদ্স সাহেব বললেন, ডাক্তারদের কোন বয়স নেই আপাডাক্তার হচ্ছে ডাক্তারআর এর বয়স কম হলে কি হবে জাতসাপ| জাত সাপের প্রতি রুগী বা রুগীনির মা কারােরই কোন আগ্রহ দেখা গেল নারুগীনি বলল, আমি উনাকে কিছু বলব না মা। 

রকম দু একটা কেইস বাদ দিলে রুগী যে খুব খারাপ হচ্ছে তাও নাভিজিটের টাকা চাইতে মনসুরের লজ্জা করেদায়িত্ব কুদ্দসাহেব খুব ভাল ভাবেই পালন করছেন। 

দশ টাকা কি দিচ্ছেন ভাই? উনার ভিজিট কুড়ি টাকাবয়স কম বলে অশ্রদ্ধা করবেনগােল্ড মেডালিষ্ট। 

মনসুর বিব্রত গলায় বলেছে, কুদুস ভাই, সব সময় গােল্ড মেডেলের কথা বলেনকোন মেডেল ফেডেল তাে আমি পাই নি| কুদ্স সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেছেন, পাওয়ার দরকার নেইমানুষের মুখেই জয়মানুষের মুখেই ক্ষয়মুখে মুখে মেডেলের কথাটা রটে যাকসুটকেস খুলে কেউতাে আর মেডেল দেখতে আসবে না। 

এইসব মিথ্যা কথা বলে লাভ কি

নাম ফাটবেরে ভাই নাম ফাটবেতােমার নাম ফাটা মানে ফার্মেসীর উন্নতিফার্মেসীর উপর বেঁচে আছিফার্মেসীর উন্নতি দেখতে হবে না

কুদুস সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছিতিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফার্মেসীতে বসে থাকেনসারাক্ষণ কথা বলেনমানুষটাকে মনসুরের বেশ ভাল লাগেতাঁর বকবকানি এবং উপদেশ শুনতেও মনসুরের খারাপ লাগে না। 

তােমার সবই ভাল বুঝলে ডাক্তার, তবে তােমার একটা বড় সমস্যা কি জান? তােমার কোন উচ্চাশা নেই। 

সেটা সমস্যা হবে কেন

এইটাই সবচে বড় সমস্যাদুধরনের মানুষের উচ্চাশা থাকে না, মহাপুরুষদের এবং বেকুবদের। তুমি এই দুদলের কোন দলে সেটা বুঝতে পারছি নাসম্ভবত দ্বিতীয় দলে!‘ 

আমাকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই। 

দরকার থাকবে না কেন, অবশ্যই আছেরকম ইয়াং একজন ছেলেগােল্ড মেড়ালি, অথচ তার কোন উচ্চাশা নেই। 

গােল্ড মেডেলের কথা আবার বলছেনএকই হলপেতেও তো পারতেআমি যা বলছি তার সারমর্ম হচ্ছেসুযোগ খুঁজতে হবেবিলেত আমেরিকা যেতে হবে, এফ আর সি এস, এম আর সি পি হয়ে এসে রুগীদের গলা কেটে পয়সা করতে হবে

Related Posts

Leave A Comment