• Tuesday , 22 September 2020

বহুব্রীহি পর্ব (৯)- হুমায়ূন আহমেদ

তােমার আই কিউ বুঝি আইনস্টাইনের মত? আমি কারাে সঙ্গে তুলনায় যেতে চাচ্ছি না তবে বুদ্ধি বৃত্তির ক্ষেত্রে ১০০র ভেতর আমাকে ৯৩ থেকে ৯৫ দিতে পারিস

বহুব্রীহি

তাই নাকি? হ্যাঁআর তাের বুদ্ধি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬২র মধ্যেআর একই স্কেলে দুলাভাইয়ের বুদ্ধি ১৮ থেকে ২২র মধ্যে উঠানামা করে। 

তােমার তাই ধারণা

হ্যাঁ এবং আমি আমার ধারণার কথা বলতে কোন রকম দ্বিধা বোধ করি নাকারণ সত্য হচ্ছে আগুণের মতআগুণ চাপা দেবার কোন উপায় নেইআমি বুঝতে পারছি দুলাভাইয়ের বুদ্ধি কম বলায় তুই আহত হয়েছিল, কিন্তু উপায় কি যা সত্যি তা বলতেই হবেআমার মুখ হয়তবা তুই বন্ধ করতে পারবি, কিন্তু পাবলিকের মুখ তুই কি করে বন্ধ করবি? পাবলিক এক সময় সত্যি কথা বলবেই। 

বকবকানি থামাও তাে মামাথামাচ্ছিকিন্তু প্রসঙ্গটা যখন উঠলই তখন এই বাড়িতে আমার পরই কার আই কিউ বেশি সেটা জানা থাকা ভালআমার পরই আছে কাদেরঅসাধারণ ব্রেইন। 

চুপ করতাে মামাঅসাধারণ ব্রেইন হল কাদেরের! প্রপার এডুকেশন পেলে এই ছেলে ফাটাফাটি করে ফেলততুমিতাে প্রপার ডুকেশন পেয়েছতুমি কি করেছ

করবসময়তাে পার হয়ে যায় নিদেখবি দেশ জুড়ে একটা হুলুস্থুল পড়ে যাবেতােদের এই বাড়ি বিখ্যাত হয়ে যাবেলােকজন এসে বলবেএটা একটা বিখ্যাত বাড়িতােদের বই লিখতে হবেমামাকে যেমন দেখেছি কিংবা কাছের মানুষ ফরিদ মামা 

বহুব্রীহি পর্ব (৯)- হুমায়ূন আহমেদ

 কিছু মনে করাে না, আমার ধারণা তোমার আই কিউ খুবই কম। 

ফরিদ উচ্চাঙ্গের হাসি হাসলতার সম্পর্কে অন্যদের ধারণা তাকে খুব মজা দেয়এটা হচ্ছে পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিভাবান ব্যক্তিদের সাধারণট্র্যাজেডিপ্রিয়জনরা তাদের বুঝতে পারে 

আড়ালে হয়তবা হাসাহাসিও করেকরুকতাদের হাসাহাসিতে কিছু যায় আসে না| কাদের এসে ঢুকলগভীর মুখে ঘােষণা করল, নতুন ভাড়াটে চলে এসেছেসে মুখ কুঁচকে বলল, এক মালগাড়িতে বেবাক জিনিস উপস্থিতফকিরী পার্টি। 

বলেই সে আবার বারান্দায় চলে গেলনতুন ভাড়াটের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখা দরকারফুলের গাছ টাছ না ভেঙ্গে ফেলেএই বাড়িতে তার অবস্থান সম্পর্কেও জানিয়ে দেয়া দরকারভাড়াটে যদি তাকে সামান্য একজন কাজের মানুষ মনে করে তাহলে মুশকিলপ্রথম দর্শনে মনে করে ফেললে সারাজীবনই মনে রাখবেযখন তখন ডেকে বলবে, এক প্যাকেট সিগারেট এনে দাওতাে, চিঠিটা পােষ্ট করে দাওতাে, এক দৌড়ে খবরের কাগজটা এনে দাও। 

আনিস রিক্সা করে এসেছেটগর এবং নিশা দুজনেই গভীর ঘুমেমিলিদের বসার ঘরের দরজা খােলাআনিস বাচ্চা দুটিকে বসার ঘরের সােফায় শুইয়ে আবার বাইরে এসে দাঁড়ালকাদেরের দিকে তাকিয়ে বলল, কাদের তুমি স্যুটকেস দুটা উপরে দিয়ে আসতাে। 

কাদের তৎক্ষণাৎ বলল, কুলীর কাম আমি করি না ভাইজানসৈয়দ বংশবখশীস পাবেএই বংশের লােক বখশীসের লােভে কিছু করে না ভাইজানআমরা হইলাম আসল সৈয়দবােগদাদী সৈয়দ। 

বহুব্রীহি পর্ব (৯)- হুমায়ূন আহমেদ

আনিস নিজেই জিনিষপত্র টানাটানি করে তুলতে লাগলঠেলাগাড়ির লােক দুটি উপরেকিছু তুলবে নাদোতলার ছাদে তােলা হবে এই কথা তাদের বলা হয়নিএখন যদি তুলতে হয় পঞ্চাশ টাকা বাড়তি দিতে হবেঅবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে আনিসের হাতে এই মুহূর্তে পঞ্চাশটা টাকাও নেইবাড়িতে সে কপর্দকশূন্য অবস্থাতেই এসে উঠেছে| মিলি কি করতে জানি বসার ঘরে ঢুকেছিলসােফাতে দু’টি শিশুকে শুয়ে থাকতে দেখে সে এগিয়ে এলআহ্ কি মায়া কাড়া চেহারাদুটি দেবশিশু যেন জড়াজড়ি করে শুয়ে আছেমেয়েটির মাথাভর্তি রেশমী চুলচোখের তুরুগুলি যেন কোন চৈনিক শিল্পী সূক্ষ তুলী দিয়ে এঁকেছেকমলার কোয়ার মত পাতলা ঠোঁট বার বার কেপে উঠছেবাচ্চাটিকে কোলে নেবার এমন ইচ্ছা হচ্ছে যে মিলির রীতিমত লজ্জা লাগছেমিলি দোতলার ছাদে উঠে গেলআনিস খাটের ভারী একটা অংশ টেনে টেনে তুলছে। 

মিলি বলল, আপনি এত কষ্ট করছেন কেন? আপনার ঠেলাগাড়ির লােকজন কোথায় ? ওরা চলে গেছেদাঁড়ান আমি কাদেরকে পাঠাচ্ছি। 

না থাকবেচারা সৈয়দ বংশের মানুষ কুলীর কাজ করবে নাআমার অসুবিধা হচ্ছে নাতুলে ফেলেছি। তাইতাে দেখছিআপনার স্ত্রী কোথায়? আসে নিআসে নি মানে?মাকে ছাড়াই বাচ্চা দুটি চলে এসেছেউনাকে কবে আনবেন ? তাকে আনা সম্ভব হবে না। সে আসবে না। আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি নামারা গেছে। 

বেশ কিছুক্ষণ সময় মিলি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এত বড় একটা খবর তার হজম করতে সময় লাগলমিলি বলল, বাচ্চা দুটির মা নেই শুনে আমার খুব খারাপ লাগছেএটা নিয়ে আপনি রহস্য করবেন তা ভাবিনিআপনি হয়ত খুব রসিক মানুষ, সব কিছু নিয়ে রসিকতা করা হয়ত আপনার অভ্যাস কিন্তু এটা অন্যায়। 

বহুব্রীহি পর্ব (৯)- হুমায়ূন আহমেদ

আনিস বলল, ঠিক এই ভাবে কিছু বলিনিওর মৃত্যুর কথা সরাসরি বলতে খারাপ লাগে বলেই অন্য পথে বলতে চেষ্টা করি। 

আর করবেন নাআচ্ছা আর করব না। 

আনিস মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করল মিলি নামের এই মেয়েটি তার ঘর গুছিয়ে দিলমশারি খাটিয়ে দিল, টগর এবং নিশাকে কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলমেয়েরা প্রাকৃতিক নিয়মেই মমতাময়ী, কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে মমতার পরিমাণ অনেক অনেক বেশি। 

আনিস বলল, আপনাকে অনেক যন্ত্রণার মধ্যে ফেললাম। তা ঠিক। কাল সকালেই আমার টিউটোরিয়ালকিছুই করা হয় নি। 

আপনি আমার জন্যে অনেক কষ্ট করেছেন কাজেই আমি আপনার ক্ষুদ্র একটা উপকার করতে চাইগুড টার্ণ ফর গুড টার্ণ)মিলি বিস্মিত হয়ে বলল, কি উপকার করতে চান

একটা উপদেশ দিতে চাই যা আপনার খুব কাজে আসবেউপদেশটা হচ্ছে আমার বাচ্চা দুটিকে একেবারেই পাত্তা দেবেন না। 

সে কি! | ওদের একজনই আপনাকে পাগল করে দেবার জন্যে যথেষ্টদুজন মিলে কি করবে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও আপনার নেইকাজেই সাবধান| মিলি হাসলআনিস বলল, আপনার হাসি দেখেই বুঝতে পারছি আমার কথা আপনার বিশ্বাস হচ্ছেনাসাবধান করে দেবার দরকার ছিল করে দিয়েছি। 

বহুব্রীহি পর্ব (৯)- হুমায়ূন আহমেদ

| সােবাহান সাহেবকে ডাক্তার বলে দিয়েছেন রাত ঠিক দশটায় বিছানায় চলে যেতেরাত জাগা পুরােপুরি বারণডাক্তারের উপদেশ মত কিছুদিন তাই করলেনদেখা গেল রাত দশটার দিকে ঘুমুতে গেলে ঘুম আসে দেড়টা দুটার দিকে অথচ বারটার দিকে ঘুমুতে গেলে দশ পনেরাে মিনিটের মধ্যে ঘুম চলে আসেকিছুদিন হল তিনি তার নিজস্ব নিয়ম চালু করেছেন রাত বারােটায় ঘুমুতে যানতবে তিনি জানেন না যে শােবার ঘরের ঘড়ি এক ফাঁকে মিলি 

এসে এক ঘন্টা গিয়ে রাখে| শােবার ঘরের ঘড়িতে এখন বারােটা বাজছেযদিও আসল সময় রাত এগারােটামিনু ঘরে ঢুকলেনহাতে বরফ শীতল এক গ্লাস পানিবিছানায় যাবার আগে সােবাহান সাহেব ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খানমিনু পানির গ্লাস টেবিলের পাশে রাখতে রাখতে বললেন, ঘুমুবে না

সােবাহান সাহেব বললেন, একটু দেরী হবে মিনুতুমি শুয়ে পড়। 

দেরী হবে কেন? একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি

Related Posts

Leave A Comment