• Wednesday , 25 November 2020

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩-হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা

ঘোড়সওয়ার বাহিনী দুর্গের মূল ফটকের কাছে রাখা হয়েছে । পাথরের তৈরি দুর্গ হালকা কামান দেগেও কিছু করা যাবে না ।

উছি বেগের সঙ্গে বৈরাম খাঁ বৈঠকে বসেছেন । উছি বেগের উদ্দেশ্য যদি ধরা যায় । উছি বেগ বারবারই বলছেন-আমি একজন বিপদগ্রস্ত রাজ্যহারা মানুষকে সাহায্য করছি, এর বেশি কিছু না ।

বৈরাম খাঁ বললেন, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে দেখা যায় কিন্তু রাজ্যহারা মানুষকে কেউ সাহায্য করে না ।

উছি বেগ বললেন, কেউ করে না ঠিক না, আমি তো করছি ।

আপনি কি পুরষ্কারের আশায় এই কাজ করছেন ?

না । ভালো কাজ পুরষ্কারের লোভে কেউ করে না ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনার মহানুভবতায় আমি মুগ্ধ । কোনো এক শুভক্ষণে সম্রাট হুমায়ূন নিশ্চয়ই আপনাকে পুরস্কৃত করবেন।

আপনারা যত দিন ইচ্ছা এই দুর্গে থাকবেন । দুর্গে রসদ নেই, পানি নেই । আমি ব্যবস্থা করছি । হাম্মামখানায় কিছু পানি আছে, তাতে আজকের রাতটা চলবে । ভোর হোক, সব ব্যবস্থা হবে ।

আল্লাহ্পাক আপনার মঙ্গল করুন ।

হাম্মামখানায় পানি পাওয়া গেল না । হাম্মামখানার কল খোলা, সব পানি বের হয়ে গেছে। দুর্গের রসদঘর শূন্য । একদানা চাল বা গম পাওয়া গেল না । বৈরাম খাঁ প্রমাদ গুনলেন । তিনি নিশ্চিত উছি বেগের উদ্দেশ্য ভালো না ।

ভোরবেলা রসদ বা পানি কোনোটাই এলো না। পানিশূন্য অবস্থায় সারা দিন কাটল । জওহর আবতাবচির সংগ্রহে দুই মশক পানি আছে । হুমায়ূনের প্রয়োজন মিটবে, কিন্তু অন্যদের কী হবে ?  বৈরাম খাঁ উছি বেগের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকের ব্যবস্থা করলেন। উছি বেগ দুর্গের ভেতর আসতে রাজি হলেন না । বৈঠক হবে উছি বেগের তাঁবুতে । বৈরাম খাঁ তাতেই রাজি । নিরস্ত্র অবস্থায় তিনি উছি বেগের তাঁবুতে ঢুকলেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

তাঁদের কথোপকথন-

বৈরাম খা : সম্রাট-পত্নী হামিদা বানু সন্তানসম্ভবা! তিনি অসুস্থ । প্রবল জ্বরে কাতর ।

উছি বেগ : শুনে দুঃখিত হলাম । আমার সঙ্গে কোনো চিকিৎসক নেই । থাকলে পাঠিয়ে দিতাম ।

বৈরাম খাঁ : দুর্গে পানি নেই । খাবার নেই ।

উছি বেগ : আমি এই বিষয়ে কিছু করতে পারছি না । চেষ্টা করেও সংগ্রহ করতে পারি নাই । আমাদেরও খাদ্য-পানির সংকট ।

বৈরাম খাঁ : বাদশাহ হুমায়ূন আপনার কাছে একটা প্রস্তাব উপস্থিত করতে আমাকে বলেছেন । তিনি নিজ পত্নীর অবস্থা দেখেই এমন একটা প্রস্তাব করছেন ।

উছি বেগ : বলুন কী প্রস্তাব ।

বৈরাম খাঁ : উনার সঙ্গে একটি বহু মূল্যবান রত্ন আছে । রত্নটি আপনি উপহার হিসেবে পাবেন ।

উছি বেগ : রত্নটির নাম কি কোহিনুর ?

বৈরাম খা : হ্যাঁ, কোহিনুর । আপনি খোঁজখবর ভালোই রাখেন । দুর্গপ্রধান না হয়ে আপনার রাজ্যপ্রধান হওয়া উচিত ছিল । যাই হোক, সম্রাটের একটি শর্ত আছে ।

উছি বেগ : শর্ত দেওয়ার মতো অবস্থায় আপনার সম্রাট নেই, তার পরেও শুনি ।

বৈরাম খাঁ :  আপনি আমাদের সিন্ধুনদ পার হওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন । পানি এবং রসদ সরবরাহ করবেন ।

উছি বেগ : কোহিনুর কখন পাব ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

বৈরাম খাঁ : পানি এবং রসদ নিয়ে আপনার লোকজন ঢুকবে । তাদের সঙ্গে আপনিও দুর্গে ঢুকবেন । তখনই আপনার হাতে কোহিনুর দিয়ে দেওয়া হবে । আপনি কি রত্ন চেনেন ?

উছি বেগ : না ।

বৈরাম খাঁ : তাহলে কী করে বুঝবেন এটিই মহামূল্যবান কোহিনুর ?

উছি বেগ  : আমার এখানে একজন রত্নব্যবসায়ী আছে । সে চিনবে ।

বৈরাম খাঁ  : আপনি তাহলে আগে থেকেই প্রস্তুত । কোহিনুরের জন্যে এই কাণ্ড করছেন ?

উছি বেগ : আপনার অনুমান সঠিক । কোহিনুর আগে আমার হাতে পৌঁছাবে হবে । পানি এবং রসদ পাথর হাতে পাওয়ার পর সরবরাহ করা হবে ।

বৈরাম খাঁ : পাথর আপনি নিজে নেবেন ? নাকি আমাকে নিয়ে আসতে হবে ?

উছি বেগ : আপনি নিয়ে আসবেন । রত্নব্যবসায়ী আপনার সঙ্গে যাবে । সে রত্ন ঠিক আছে কি না দেখে নেবে ।

বৈরাম খাঁ : রত্নব্যবসায়ীকে আমার সঙ্গে দিন । আমি পাথর নিয়ে ফিরছি । আমাকে কিছু সময় দিতে হবে। কোহিনুর বিশেষ জায়গায় লুকানো । খুঁজে বের করতে সময় নেবে । এর মধ্যে আপনি পানি এবং রসদের ব্যবস্থা করুন ।

উছি বেগ : বিলম্ব হলে সমস্যা নেই ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

রত্নবণিকের নাম মহাবীর । সে জাতিতে জৈন, পরম অহিংস । মুখে-নাকে পাতলা কাপড় পরে রাখে, যেন মশা-মাছি নাকে-মুখে ঢুকে মারা না যায় । মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটে যেন পায়ের নিচে পড়ে পিঁপড়া মারা না যায় ।

রত্নবণিককে দুর্গে ঢুকিয়েই দুর্গের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো । বৈরাম খাঁ বললেন, আমরা যে মহাবিপদে পড়েছি তা কি বুঝতে পারছেন ?

মহাবীর বলল, আমি ব্যবসায়ী মানুষ এইসব কিছু বুঝি না । কোহিনুর আমাকে দেখাবেন । আমি বলব আসল জিনিস কিংবা নকল। আমার কাজ শেষ ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি মন দিয়ে আমার কথা শুনুন । পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী হলো আহত ব্যাঘ্র। আমি আহত ব্যাঘ্র ।

খাঁ সাহেব, গেট খুলে দেন। আমি অহিংস মানুষ । পিঁপড়া পর্যন্ত মারি না ।

আপনাকে পিঁপড়া মারতে হবে না । খামাখা পিঁপড়া কেন মারবেন ?

আপনি দেখবেন আমরা কী করে মানুষ মারি ।

খাঁ সাহেব, গেট খুলে দেন ।

এক্ষুনি গেট খুলে দেব । আমরা দুজন গেট দিয়ে বের হব । আমার হাতে থাকবে রেশমি রুমালের ভেতর সাধারণ একখণ্ড পাথর । আমি রুমাল উঁচু করে উছি বেগের তাঁবুর দিকে এগুতে থাকব । উছি বেগ তাঁবু থেকে ছুটে আসবে । আর তখনই আমার তীরন্দাজরা তাকে মারবে । উছি বেগের মৃত্যুবিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর আমার ঘোড়সওয়ার বাহিনী বের হবে । কিছুক্ষণ যুদ্ধ হবে। আপনি মানুষের মৃত্যু দেখবেন ।

হতভম্ব মহাবীর বলল, আপনার লোক যখন তীর ছুঁড়বে সেই তীর তো আমার গায়েও লাগতে পারে ।

সম্ভাবনা আছে, তবে আমার তীরন্দাজদের হাতের নিশানা ভালো । তাদের উপর ভরসা রাখতে পারেন ।

পরের অংশ সংক্ষিপ্ত। উছি বেগ প্রথম তীরের আঘাতেই ধরাশায়ী হলেন । তার দলের লোকদের হতভম্ব ভাব কাটার আগেই বৈরাম খাঁ’র বাহিনী বের হয়ে এল । ভারতবর্ষে সেনাপতির মৃত্যু মানেই যুদ্ধে পরাজয় । উছি বেগের লোক পালাতে শুরু করেছে । বৈরাম খাঁ’র জন্যে একটি ঘোড়া এবং তরবারি নিয়ে আসা হয়েছে । বৈরাম খাঁ লাফ দিয়ে ঘোড়ায় উঠতেই যুদ্ধ শেষ  ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

হুমায়ূন তাঁর বাহিনী নিয়ে নির্বিঘ্নে সিন্ধুনদ পার হলেন । উছি বেগের সৈন্যদের কাছ থেকে পাওয়া রসদ এবং পানির এখন আর অভাব নেই ।

হামিদা বানুকে নৌকায় শুইয়ে রাখা হয়েছে । তিনি একবার বললেন, আমরা কোথায় ?

হুমায়ূন বললেন, সিন্ধুনদ পার হচ্ছি ।

পানি খাব ।

হুমায়ূন বললেন, যত ইচ্ছা পানি খাও! পানির অভাব নেই ।

মহাবীর তীরবিদ্ধ হয় নি । সে বৈরাম খাঁ’র সঙ্গে আলাদা নৌকায় উঠেছে । মহাবীর বৈরম খাঁ’র দিকে তাকিয়ে বলল, আমার নাম মহাবীর কিন্তু আপনি সত্যি মহাবীর এবং অতি বিচক্ষণ ।

বৈরাম খাঁ হাই তুলতে-তুলতে বললেন, মানুষ মারা দেখে মজা পেয়েছেন?

মহাবীর বলল, এইসব কী বলেন? আমরা অহিংস জাতি পিঁপড়া পর্যন্ত মারি না ।

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি আমাদের সঙ্গে জুটেছেন কী জন্যে ? কোহিনুর হীরা এক নজর দেখে জীবন সার্থক করার ইচ্ছা! সুযোগ কি পাব ?

অবশ্যই পাবেন । তবে আগে কয়েকটা পিঁপড়া মারতে হবে । পারবেন ?

মহাবীর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, একটা পিঁপড়া মারতে রাজি আছি । এর বেশি পারব না ।

বৈরাম খাঁ বললেন, পিঁপড়া মারতে হবে না । পিঁপড়া মারা ছাড়াই আপনাকে কোহিনুর দেখাব। তবে কোহিনুর সামান্য পাথর ছাড়া কিছু না । জীবন্ত সঠিক মানুষ হলো আসল কোহিনুর । পেছনের নৌকার ‍দিকে তাকান । রাজ্যহারা সম্রাট হুমায়ূন স্ত্রীর হাত ধরে বসে আছেন । উনিই আসল কোহিনুর । দেখেছেন ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

হুঁ । আপনারা যাচ্ছেন কোথায় ?

শুধুমাত্র নদী জানে সে কোনদিকে যাচ্ছে । তার যাত্রা সমুদ্রের ‍দিকে । মানুষ নদী না বলেই সে কোনদিকে যাচ্ছে তা জানে না ।

মহাবীর বলল, আপনার সাহস এবং বীরত্ব দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি । আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই । আমি অর্থের যোগান দেব আপনি সৈন্য সংগ্রহ করবেন । সৈন্য হচ্ছে তীর্থের কাক । ভাত ছিটালেই আসে ।

বৈরাম খাঁ বললেন, অর্থের বিনিময়ে আপনাকে কোহিনুর দিতে হবে ?

হুঁ ।

বৈরাম খাঁ বললেন, শুনন মহাবীর । কোহিনুর বিক্রি হয় না । এটা উপহার হিসেবে পাওয়া যায় কিংবা তলোয়ারের সাহায্যে কেড়ে নিতে হয় । আর কথা না বলে নদীর শোভা দেখুন  ।

প্রেতযোনির হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা আচার্য হরিশংকর করেছেন । তান্ত্রিকের কাছ থেকে ‘রাম কবচ’ নিয়েছেন । গলায় পরেছেন অষ্টধাতু রক্ষাকবচ । তাঁর বিছানার নিচে সরিষা দানা, দরজায় ঝুলছে লোহার শিকল । প্রেতযোনি সরিষা এবং লোহা ভয় পায় । তারা আগুনও ভয় পায় । হরিশংকরের খাটের নিচে মাটির মালশায় দিনরাতই কয়লার আগুন জ্বলে । সারাক্ষণ আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্যে তিনি বয়রা নামে এক কিশোরকে চাকরি দিয়েছেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –২৩

প্রেতযোনির হাত থেকে ব্যাপক সুরক্ষা গ্রহণের ফল ফলেছে, হরিশংকর এখন আর খাটের উপর আকিকা বেগমকে পা ঝুলিয়ে বসতে দেখেন না । হরিশংকর ধর্মকর্মে ব্যাপক মনোযোগ দিয়েছেন । ভোরবেলা গঙ্গাস্নান করেন । গঙ্গায় বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে সূর্যপ্রণাম দিয়ে দিন শুরু করেন । মন্দিরে মন্দিরে ঘোরেন । সাধু-সন্তদের ধর্ম-উপদেশ শোনেন । দুপুরে কাকভোজন করান । কাকের রুপে আত্মারা মর্ত্যে ঘোরেন । কাকভোজন করান । কাকের রুপে আত্মারা মর্ত্যে ঘোরেন । কাকভোজন করালে আত্মাদের শান্তি হয়! পুণ্যলাভ হয় ।

সন্ধ্যার পর হরিনাম শোনার পালা । হরির পবিত্র নাম শোনার মধ্যেও পুণ্য । হরিশংকরের পুণ্য সংগ্রহ চলতেই থাকে । তবে তিনি শারীরিকভাবে খানিকটা অচল হয়ে পড়েছেন । বাঁ পায়ে কী-যেন হয়েছে । জায়গায় জায়গায় কালো হয়ে ফুলেছে । ব্যথা-বেদনা নেই, তবে স্পর্শানুভূতিও নেই । শুধু মাটিতে পা ফেললে যন্ত্রণায় অস্থির হন ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –২৪

Related Posts

Leave A Comment