বিশ্ব জুড়ে নতুন আতঙ্কের নাম

করোনা ভাইরাস

বিশ্ব জুড়ে নতুন আতঙ্কের নাম :

ভাইরাসটির নাম এখন COVID-19, যা করোনা ভাইরাস নামেই পরিচিত । এ করোনা ভাইরাস এখন একটি আতঙ্কের নাম । চীনের উহান শহরে যার প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং দ্রুত চীনের আরও কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে । একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে চীনের পার্শ্ববর্তী হংকং, তাইওয়ানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। চীনের পর সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে বেশি লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে । চীন এখন কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন । ১৯ ফেব্রুয়ারির খবর অনুযায়ী, চীনে মৃত্যু ১৮৬৬ জন, চীনের বাইরে মৃত্যু ৫ জন এবং চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭২,৪৩৬ জন।

করোনা ভাইরাস কী ?

করোনা ভাইরাস নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাস নয় । বরং এটি একটা ভাইরাস পরিবারকে বোঝানো হয়, যাতে অসংখ্য ভাইরাস আছে । তবে এ পরিবারের মাত্র ছয়টি ভাইরাসই মানুষকে সংক্রমণ করতে পারত। নতুন ভাইরাস নিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ালো সাতে। নতুন ভাইরাসের প্রথম নাম দেওয়া হয়েছিল ‘২০১৯ নভেল করোনা ভাইরাস বা এনসিওভি (2019-nCOV)’ । করোনা ভাইরাসের আক্রমণ এবারই প্রথম নয় । চীনেই ২০০২ সালে আরেকটি করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছেল । এর নাম সিভিয়ার একিউট রেস্পিরেটরী সিনড্রোম বা সার্স করোনা ভাইরাস ।

এতে ৮,০৯৮ জন আক্রান্ত হয় এবং ৭৭৪ জন মারা যায় । ২০১২ সালে সৌদি আরবে আরেকটি করোনা ভাইরাস ছড়ায়, যার নাম ছিল মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরী সিন্ড্রম বা মার্স করোনা ভাইরাস । এতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৫০০ জন আক্রান্ত হয়ে ৮২৪ জনের মৃত্যু হয় । এরা প্রত্যেকেই ফুসফুসজনিত রোগেরে লক্ষণ প্রকাশ করে । কোন প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে করোনাভাইরাস ? ৩১ ডিসেম্বর (২০১৯) চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের একটি সামুদ্রিক বাজারে প্রথম করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাদুড়জাতীয় প্রাণী থেকে এ ভাইরাসের উৎপত্তি।

করোনা ভাইরাস-এর আনুষ্ঠানিক নামকরণ ঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে নতুন করোনা ভাইরাসের কারণে হওয়া রোগের আনুষ্ঠানিক নাম কোভিড-১৯। জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস অ্যাঢানম গেব্রেইসাস বলেন, ’এখন রোগটির একটি নতুন নাম রয়েছে আমাদের কাছে । সেটি হলো কোভিড-১৯ ।’ এটি ’করোনা ভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ এর সংক্ষিপ্ত রূপ । এই ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়ানোর পর এই ঘোষণা এলো । করোনা ভাইরাস শব্দটি রোগ সৃষ্টিকারী নতুন ভাইরাসটিকে উল্লেখ না করে ঐ গ্রুপের সব ভাইরাসকে ইঙ্গিত করে । ভাইরসের নাম প্রদানকারী আর্ন্তরতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব ট্যাক্সনমি অব ভাইরাসেস এই ভাইরাসটিকে সার্স-সিওভি-২ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে ।

কোনো বিশেষ গ্রুপ অথবা দেশকে কেন্দ্র করে যেন ভীতি না ছড়ায়, তা নিশ্চিত করতে ভাইরাসটির আনুষ্ঠানিক একটি নাম দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন গবেষকরা। নতুন নামটি তৈরি করা হয়েছে ’করোনা’, ‘ভাইরাস’ ও ’রোগ’ শব্দগুলো থেকে । ২০১৯ দ্বারা রোগটির ছড়িয়ে পড়ার বছর বোঝানো হয়েছে ।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগের লক্ষণ ঃ

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগে শুরু হয় জ্বর দিয়ে, এরপর শুরু হয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহ পর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন অনেক রোগীরই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। প্রতি ৪ জন আক্রান্ত ব্যক্তির একজনের রোগরে তীব্রতা বেশি । সার্স ভাইরাসের লক্ষণের সাথে মিল এর কিছুটা মিল থাকলেও বেশ কিছু পার্থক্য আছে । ভাইরাসে আক্রান্তদের শতকরা ২০ ভাগ রোগীর সর্দি, হাঁচি, গলা ব্যথা, ডায়রিয়া থাকলেও নতুন করোনা ভাইরাসে এসব লক্ষণ নেই। বৃ্দ্ধ ও নবজাতক শিশু, যাদের রোগ প্রতিরোদ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস রোগ হতে পারে নতুন করোনা ভাইরাস থেকে ।

যেভাবে ছড়ায় এ ভাইরাস ঃ

করোনা ভাইরাস সংক্রমিত প্রাণীর সাথে মানুষের সংস্পর্শে এই ভইরাস ছড়ায় । এরপর একজন মানুষ থেকে বিভিন্ন উপায়ে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে । একে বলা হয় তৃতীয় প্রজন্ম সংক্রমণ । তাছাড়া এই ভাইরাস বিবর্তিত হচ্ছে, যার কারণে আরোদ্রুত ও সহজে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ থেকে মানুষে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাস থেকে. আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, যেমন- শারীরিক স্পর্শ বা করমর্দন করলে, ভাইরস আছে এমন বস্তুতে হাত রেখে পরে সে হাত নিজের শরীরে স্পর্শ করলে। হাত না ধুয়ে মুখ, নাক বা চোখে স্পর্শ করলে ।

চিকিৎসা ঃ

করোনা ভাইরাসের নির্দিষ্টে কোনো চিকিৎসা নেই । বেশিরভাগ রোগী এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবেন । তাই এর চিকিৎসা মূলত বিশ্রাম নেয়া আর জ্বর ও ব্যথার ওষুধ খাওয়া । এছাড়া কাশির জন্য গরম পানি দিয়ে গোসল করা যেতে পারে । একইসাথে প্রচুর পরিমাণ তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে । বেশি অসুস্থ অনুভুত হলে হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

প্রতিরোধ ঃ

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য এখনো কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার হয়নি । তাই এই ভাইরাস প্রতিহত করার জন্য একমাত্র উপায় হলো, সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাস ছাড়ানো প্রতিরোধ করা । সেন্টার ফর সিডিসি-এর তথ্যানুযায়ী সুস্থ ব্যক্তিদের সাবান এবং পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধুতে হবে । হাত না ধুয় নিজের মুখ, চোখ কিংবা নাকে স্পর্শ করা যাবে না। যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে ।

এছাড়া নিজে ঠান্ডায় আক্রান্ত হলে যেভাবে সাহায্য করবেন- অসুস্থ অনুভূত হলে বাড়িতে অবস্থান করতে হবে, অন্যদের সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না । হাঁচি-কাশি যখন আসবে, তখন টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে । তারপর টিস্যুটি ময়লা রাখার স্থানে ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে । প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।

বিশ্ব যেভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিচ্ছে ঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসের জন্য চীনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যায়নি বলছে। তবে খুব দ্রুতই যে ছড়িয়ে যাবে, তার আশঙ্কাও আছে। তাই বিভিন্ন দেশ এখনই সতর্কতা অবলম্বন করছে।‍ সিঙ্গাপুর, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ বিমানবন্দরে চীন থেকে আগত যাত্রীদের স্ক্রিনিং করছে । যদিও এটি কতটুক কার্র‌কর হচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ আছে । কারণ, করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তির লক্ষণ প্রকাশ পেতে পাঁচদিন সময় লাগে । এ সময়ে যেকোনো সংক্রমিত ব্যক্তি অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারবেন।

Leave a comment

Your email address will not be published.