বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-২০)- হুমায়ূন আহমেদ

কী সমস্যা ? জানি না কী সমস্যা, বাবা বলেন নি। 

শামা আবারাে বিছানায় শুয়ে পড়লতার নিজের মেয়েটার কথা ভাবতে ভাল লাগছেমনে হচ্ছে সত্যি সত্যি তার একটা মেয়ে আছেএবং মেয়েটা এখন গুটিসুটি মেরে তার পাশে শুয়ে আছে

বৃষ্টি বিলাসমেয়েটার গায়ের গন্ধ পর্যন্ত তার নাকে লাগছেগাদাফুলের পাতা কচলালে যে গন্ধ আসে সেই গন্ধআচ্ছা মেয়েটার সুন্দর একটা নাম থাকা দরকার না ? তার যেমন দুই অক্ষরে নাম সে রকম দুঅক্ষরের নামদুঅক্ষরের নাম হলে নামটা অনেকক্ষণ মুখে রাখা যাবে

টেনে লম্বা করা যাবেতার নামটা যেমনশামা...টা অনেকক্ষণ মুখে রাখা যায়ইচ্ছামত টেনে লম্বা করা যায়আচ্ছা মেয়েটার নাম আশা হলে কেমন হয় ? আতাউরের আর শামার শাকী অদ্ভুত কাণ্ড! আতাউর এখন এল কীভাবে ? শামা দুহাত দিয়ে কল্পনার মেয়েটাকে ঠেলে সরিয়ে দিলমেয়েটা উহবলে চিৎকারও করল, কারণ তার চুল মাবালিশের নিচে আটকে গেছেএইসব চিন্তার কোনাে মানে হয়! না থাক, নিজের মেয়েকে নিয়ে চিন্তাটা আপাতত থাকুক। অন্য কোনাে বিষয় নিয়ে চিন্তা করা যাক। 

মজার কোনাে বিষয়আনন্দের কোনাে বিষয়| শামার ঘুম পাচ্ছেএখন আর ঘুমুতে ইচ্ছা করছে নাএখন ঘুমিয়ে পড়লে দশটার আগে আর ঘুম ভাঙবে নাআতাউরকে টেলিফোন করা যাবে না টেলিফোন করতেই হবেএশা সেজে টেলিফোনপর্দার আড়াল থেকে কথা বলাএই মজার টেকনিকটা শামা তার মেয়েকে শিখিয়ে দিয়ে যাবেশামার ঘরের দরজায় কে যেন হাত রাখলদরজার কড়ায় সামান্য শব্দ হলােতারপরই সুলতানার গলা শােনা গেলতিনি কোমল স্বরে বললেন, শামা চা খাবি

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-২০)- হুমায়ূন আহমেদ

শামা বলল, হ্যাআয় তাের বাবার সঙ্গে চা খাতাের বাবা তােকে ডাকছেশামা দরজা খুলে বের হলাে। মার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি যে জেগে 

আছি তুমি জানতে

সুলতানা বললেন, হঁ্যা

কীভাবে জানতে ? আমার দরজা ভেতর থেকে বন্ধআমি কোনাে সাড়া শব্দও করি নি। 

সুলতানা ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তােরা তিন ভাইবােনের যেকোনাে একজন জেগে থাকলে বুঝতে পারিআমার নিজেরাে তখন ঘুম হয় নাততাদের মধ্যে সবচে বেশি রাত জাগে এশা। 

বাবা আমার সঙ্গে চা খেতে চাচ্ছেন কেন

মনে হয় কিছু বলবে বিয়ে যে ভেঙে গেলকেন ভাঙলএইসব হয়ত তােকে বলবে। 

আমি বাবার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছি নাতুমি শুনে নাওতারপর যদি ইচ্ছা করে আমি তােমার কাছ থেকে শুনবইচ্ছা না করলে শুনব না। 

সুলতানা মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাবা ডাকলে কখনাে না করতে নেইতােকে ডেকেছে তারপর যদি না যাস তাহলে মনে কষ্ট পাবেমামনে কষ্ট দিলে কিচ্ছু হয় না, কিন্তু বাবার মনে কষ্ট দিলে তার ফল খুব খারাপ হয়আবদুর রহমান সাহেব শামাকে দেখে একটু নড়ে চড়ে বসলেনতার হাতে চায়ের কাপকাপে চুমুক দিতে যাচ্ছিলেনচুমুক না দিয়ে কাপ নামিয়ে নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেনশামা বলল, তুমি কিছু বলবে

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-২০)- হুমায়ূন আহমেদ

আবদুর রহমান সাহেব নরম গলায় বললেন, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আগে বােস তারপর বলিশামা বসলআবদুর রহমান সাহেব নিজেই মেয়ের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে বললেন, আমি হলাম বােকা মানুষ আমি নিজে বােকা তাের মাও বােকাদুই বােকা মিলে বিরাট ভুল করে ফেলেছিএই ভুলের মা বাপ নেইখোজ খবর না নিয়ে তাের বিয়ে ঠিক করে ফেললামছেলেও আসা যাওয়া শুরু করলকী অবস্থা

শামা বলল, আসা যাওয়া শুরু করে নি বাবাএকদিনই এসেছিল। 

সেই একদিন আসাটাও তাে ঠিক নাতাের মা যত্ন করে আবার ভাত খাইয়েছেতুই আবার তাকে নিয়ে নিউ মার্কেটে বান্ধবীর জন্যে উপহার কিনতে গেলিতাের মার কাছে শুনেছি এক রিকশায় গিয়েছিসকী ঘিন্নাকর অবস্থা! তাের অবশ্যি দোষ নেইদোষটা আমারআমি গ্রীন সিগন্যাল দেয়ার কারণেইতাে বাসায় এসে ভাত খাওয়া শুরু করলচিন্তা করলেই আমার কেমন যেন লাগে। 

একটা মানুষ একবেলা ভাত খেয়েছে এটা এমন কোনাে ব্যাপার না বাবাকতজনইতাে আমাদের বাসায় খেয়েছেতাতে কী হয়েছে

আবদুর রহমান সাহেব মেয়ের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেনহতাশ গলায় বললেন, অনেক কিছুই হয়েছেএতাে নরম্যাল ছেলে 

পাগল। 

সুলতানা হতভম্ব গলায় বললেন, পাগল মানে

মাথার অসুখপ্রায়ই হয়তখন কাউকে চিনতে পারে নাদরজা তালাবন্ধ করে রাখতে হয়এমন অবস্থা! এরা অসুখ গােপন করে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলমানুষের ধারণা আছে নাবিয়ে দিলে পাগল ভাল হয়তাই ভেবেছেকাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে দিয়ে দেবেপাগল ভাল হয়ে যাবেআমার মেয়ে হবে পাগল ভাল করার ট্যাবলেট

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-২০)- হুমায়ূন আহমেদ

এই ছেলের আগেও একবার বিয়ে ঠিকঠাক হয়েছিলপানচিনি হয়েছেমেয়েপক্ষ খবর পেয়ে পরে বিয়ে ভেঙে দেয়গতকাল আমি ছেলের বড় বােনের কাছে গিয়েছিলামতিনি ঘটনা স্বীকার করেছেনছেলে যেমন বজ্জাত, আত্মীয়স্বজনরাও বজ্জাতধরে এদের চাবকান উচিতজুতা পেটা করা উচিতএরা শিয়াল কুকুরেরও অধম। 

শামা বলল, এইসব কেন বলছ ? বলব না

বলবে না। বিয়ে ভেঙে গেছে ফুরিয়ে গেছেগালাগালি করবে কেন ? আমি এমন কী গালাগালি করলাম

Leave a comment

Your email address will not be published.