• Wednesday , 21 October 2020

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-৩)- হুমায়ূন আহমেদ

এশা বলল, মা আপাকে সাধারণ ঘরে পরার একটা শাড়ি পরতে বলব

বলতাের বাবা আবার রাগ না করেশখ করে একটা শাড়ি কিনে এনেছেবৃষ্টি বিলাসবাবা কিছু বুঝতে পারবে নাবাবা খুব টেনশনে আছে তােটেনশনের সময় মানুষ কিছু বুঝতে পারে নাবাবা ভালমতাে আপার দিকে তাকাবেই না মেয়েরা যখন বড় হয়ে যায় তখন বাবারা মেয়েদের দিকে কখনাে ভালমতাে তাকায় নাবাবাদের মনে হয় তাকাতে লজ্জা করে। 

সুলতানা ছােটমেয়ের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেনএই মেয়েটার ভাল বুদ্ধি আছেমেয়েটার বুদ্ধির খবর এই পরিবারে আর কেউ জানে নাশুধু তিনি জানেনএই নিয়ে তার দুশ্চিন্তাও আছেমেয়েদের বেশি বুদ্ধি ভাল না। বেশি বুদ্ধির মেয়ে কখনাে সুখী হয় নাসংসারে যে মেয়ের বুদ্ধি যত কম সে তত সুখী। 

শামা খুব সহজ ভঙ্গিতেই চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকল। সে ধরেই নিয়েছিল ঘরে ঢােকা মাত্র সবাই এক সঙ্গে তার দিকে তাকাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা শক্ত হয়ে যাবেদেখা গেল সবাই তার দিকে তাকাল নাআতাউর নামের ছেলেটা মাথা 

নিচু করেই বসেছিল, সে মাথাটা আরাে খানিকটা নিচু করে ফেললশামা তার দিকে এক ঝলক তাকালএক ঝলকে তার অনেকখানি দেখা হয়েছে। 

বৃষ্টি বিলাস  হুমায়ূন আহমেদ

ছেলেটা ছায়ার কচুগাছের মতাে ফর্সাহাতের নীল নীল শিরা বের হয়ে আছেঅতিরিক্ত রােগাঘুমের সমস্যা মনে হয় আছেচোখের নিচে কালিবাম চোখের নিচে বেশি কালিডান চোখে কমমাথায় অনেক চুল আছেচেহারা ভালগোঁফ নেইএটাও ভালপুরুষ মানুষের নাকের নিচে গোঁফ দেখলেই শামার গা শিরশির করেমনে হয় ঘাপটি মেরে মাকড়সা বসে আছেতাড়া দিলেই নাকের ফুটো দিয়ে ঢুকে যাবে। 

কালাে আচকান পরা মুখভর্তি দাড়ি এক ভদ্রলােক শামার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যে মা, আমাদের জন্যে চা নিয়ে চলে এসেছকেমন আছ গাে মা

শামা বলল, জি, আমি ভাল আছি। 

বােস মা, তুমি আমার পাশে বােসএমন সুন্দর কন্যা পাশে নিয়ে বসাও এক ভাগ্যের ব্যাপার। 

আচকান পরা ভদ্রলােক সরে গিয়ে শামার জন্যে জায়গা করলেনশামা সহজ গলায় বলল, আমি খাবারটা হাতে হাতে দিয়ে নিতারপর বসি

ঠিক আছে মাঠিক আছেআগে কাজ তারপর বসা, তারপর আলাপআর এই জগতে খাওয়ার চেয়ে বড় কাজতাে কিছু নেইকী বলেন আপনারা ? | কেউ কিছু বলল নাশুধু আতাউর নামের ছেলেটা কাশতে লাগলশামা মনে মনে বলল, এই যে খাতাউর ভাইয়া, আপনার এই কাশি ঠাণ্ডার কাশি, না যক্ষাটক্ষা আছে

প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে শামা ভাবল খাবারের প্লেট সবার আগে যিনি মুরুব্বি তার হাতে দেয়া দরকারতা না করে সে যদি যক্ষারােগী খাতাউরের হাতে দেয় তাহলে কেমন হয় ? যক্ষারােগী নিশ্চয়ই ভাবছে না তাকে প্রথম দেয়া হবেতার কাশি আরাে বেড়ে যাবেআচকান পরা মওলানা বেশি ফটফট করছেমওলানার ফটফটানি কিছুক্ষণের জন্য হলেও কমবেমওলানা হয়ত মনে মনে বলবেনাউজুবিল্লাহ, মেয়েটাতাে মহানির্লজ্জবলুক যার যা ইচ্ছা। 

বৃষ্টি বিলাস হুমায়ূন আহমেদ

শামা খাবারের প্লেট আতাউরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল, আপনার কি ঠাণ্ডা লেগেছে ? এত কাশছেন কেন

শামা যা ভেবেছিল তাই হলােআচকান পরা মওলানা হকচকিয়ে গেলেনতিনি শামার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছেনযক্ষারােগীর কাশি কিছুক্ষণের জন্য হলেও থেমেছেশামার বাবাও অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। 

মনে হচ্ছে ঘটনা কী ঘটছে তিনি বুঝতে পারছেন না| আচকান পরা মওলানা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, মা শােন, পুরুষ মানুষের কাশিকে তুচ্ছ করতে নাইপুরুষ মানুষ চেনা যায় কাশি দিয়েকথায় আছে— 

ঘােড়া চিনি কানেরাজা চিনি দানে কন্যা চিনি হাসে 

পুরুষ চিনি কাশেআতাউরকে চিনতেছি তার কাশিতে আর তােমারে চিনতেছি তােমার হাসিতেহা হা হা। 

শামা লক্ষ করল সবাই হাসতে শুরু করেছেএমনকি তার বাবাও হাসছেনযিনি কখনাে হাসেন নাকারণ হাসিকে তিনি চারিত্রিক দুর্বলতা মনে করেনসবাই হাসছে, শুধু যক্ষারােগীর মুখে কোনাে হাসি নেইসে মাথা আরাে নিচু করে ফেলেছে। 

কালাে আচকান পরা মওলানা পাত্রের মেজো চাচাসৈয়দ আওলাদ হােসেননেত্রকোনা কোর্টে ওকালতি করেনতিনিই পাত্রের অভিভাবকবিয়ের কথাবার্তার সময় পাত্রের অভিভাবকরা ক্রমাগত কথা বলেনসৈয়দ সাহেব তার ব্যতিক্রম ননতিনি দাড়ি কমা ছাড়াই কথা বলে গেলেন এবং বিদায়ের আগে আগে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, যাবার আগে একটা কথা বলে যাইকন্যা আমাদের সবারই অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে

বৃষ্টি বিলাস  হুমায়ূন আহমেদ

আলহামদুলিল্লাহশুধু কন্যা পছন্দ হয়েছে বললে ভুল বলা হবেকন্যার পিতাকেও পছন্দ হয়েছেবেয়ান সাহেবের সাথে দেখা হয় নাই, তার রান্না পছন্দ হয়েছেসিঙ্গাড়া অনেক জায়গায় খেয়েছিএরকম স্বাদের সিঙ্গাড়া খাই নাইবেয়ান সাহেবকে দূর থেকে জানাই অন্তরের অন্তস্তল থেকে মােবারকবাদএখন বিবাহের তারিখ নিয়ে দুটা কথাআমি সবচে’ খুশি হতাম আজকে রাতেই বিবাহ দিতে পারলে সেটা সম্ভব না

আমাদের নিজেদের কিছু আয়ােজন আছেআমরাতে শহরের লােক না, গ্রামের লােকবিয়ে শাদি সবাইকে নিয়ে দিতে হয়কাজেই বিবাহ হবে ইনশাল্লাহ আষাঢ় মাসেআবদুর রহমান সাহেব আপনার কিছু বলার থাকলে বলেনআবদুর রহমান সাহেব বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, আপনারা যা ঠিক করবেন তাই হবেএই মেয়ে এখন আপনাদের মেয়ে। 

আওলাদ হােসেন সবগুলি দাঁত বের করে দিয়ে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ 

এই যে আপনি বললেনআপনাদের মেয়ে, এতে সব কথা বলা হয়ে গেলমেয়েতাে আমাদের অবশ্যই, আপনাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিহা হা হা। 

আওলাদ সাহেব আচকানের পকেট থেকে আংটি বের করে শামার আঙুলে পরিয়ে দিলেনশুধু আংটি না, আংটির সঙ্গে খামে ভর্তি টাকাও আছেএক হাজার এক টাকা । 

বৃষ্টি বিলাস হুমায়ূন আহমেদ

আওলাদ সাহেব বললেন, এই যে এক হাজার এক টাকা দিলাম এর একটা ইতিহাস আছেইতিহাস না বললে বুঝবেন নাহয়ত ভাববেন টাকা দিচ্ছে কেন? ছােটলােক নাকি? এখন ইতিহাসটা বলিআজ আমাদের খুবই গরিবি হালতসব সময় এরকম ছিল নাআমার পূর্বপুরুষরা ছিল ঈশ্বরগঞ্জের আনি জমিদারতাদের নিয়ম ছিল কন্যাকে এক হাজার একটা আশরাফি দিয়ে মুখ দেখা

 এই নিয়মতাে এখন আর সম্ভব নাতারপরেও পুরনাে স্মৃতি ধরে রাখাশামা বাবার চোখের ইশারায় তার হবু চাচা শ্বশুরকে পা ছুঁয়ে সালাম করে বােকার মতাে দাঁড়িয়ে রইলতার কাছে মনে হচ্ছে সে একটা নাটকে পাঠ করছে যে নাটকে তার চরিত্রটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কোনাে সংলাপ নেইপরিচালক তাকে বুঝিয়েও দেন নি স্টেজে উঠে কী করতে হবেএক হাজার এক টাকা ভর্তি খামটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে খুবই অস্বস্তি লাগছেএটা যদি কোনাে হাসির নাটক হত তাহলে সে খাম খুলে টাকাগুলি বের করে গুণতে শুরু করত এবং একটা নােট বের করে বলত, এই নােটটা ময়লা, বদলে দিনকিন্তু এটা কোনাে হাসির নাটক না

খুবই সিরিয়াস নাটকনাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রের একজন ঈশ্বরগঞ্জের আনি জমিদারের উত্তরপুরুষ সৈয়দ ওয়ালিউর রহমান এখন আবেগে আপ্লুত হয়ে কাঁদছেন এবং রুমালে চোখের পানি মুছছেননাটকের আরেক চরিত্র শামার বাবা আবদুর রহমান সাহেবের চোখেও পানিঅন্যান্য পার্শ্ব চরিত্রেরাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেমন্টুকে দেখা যাচ্ছেসে ব্যাপার দেখে পুরােপুরি হকচকিয়ে গিয়েছেতার হাতে একটা পানির গ্লাস

(চলবে)

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-২)- হুমায়ূন আহমেদ

Related Posts

Leave A Comment